বাবরি মসজিদ মামলার রায় উগ্র হিন্দুত্ববাদের প্রতিধ্বনি – হারুন ইবনে শাহাদাত

বাবরি মসজিদ মামলার রায় উগ্র হিন্দুত্ববাদের প্রতিধ্বনি - হারুন ইবনে শাহাদাতভারতের কলকাতা থেকে প্রকাশিত বিখ্যাত বাংলা দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে দক্ষিণ এশিয়া চর্চার অধ্যাপক শেলডন পোলককে প্রশ্ন করেছিল যে, ‘অনেকে বলেন ইসলামী আক্রমণের পর সংস্কৃতের পতন হল, শাসকের দাপটে সবাই উর্দু, ফার্সি শিখতে ছুটল।’ উত্তরে তিনি বলেছিলেন, ‘বাজে কথা। তোমাদের বাংলার নবদ্বীপ বা মিথিলা সংস্কৃত ন্যায়চর্চার কেন্দ্র হয়েছিল সুলতানি আমলে। দারাশিকো বেদান্ত পড়ছেন বারানসির পণ্ডিতদের কাছে। মুসলমান শাসকরা এ দেশে প্রায় বারোশো বছর রাজত্ব করেছিলেন। তারা জোর করে ধর্মান্তর করালে এ দেশে একজনও হিন্দু থাকত না। তাদের উৎসাহ না থাকলে সংস্কৃতও টিকে থাকত না। ধর্মের সঙ্গে ভাষার উত্থান-পতন গুলিয়ে তাই লাভ নেই।’ (আনন্দবাজার পত্রিকা, ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫) ভারত ও হিন্দু ধর্মদর্শন সম্পর্কে নিজের গবেষণার ব্যাপারে অধ্যাপক শেলডন পোলক এতটাই আত্মপ্রত্যয়ী যে তিনি নিজেকে ‘ইহুদি ব্রাহ্মণ’ বলে পরিচয় দেন।
দীর্ঘ বারো শত বছরেরও বেশি সময় মুসলিম শাসকরা ভারতবর্ষ শাসন করেছেন। তারা জাতি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষ সকলের অধিকার সংরক্ষণ করেছেন। বুকভরা দেশপ্রেম আর মানুষের প্রতি ভালোবাসা নিয়ে পরম মমতায় গড়েছেন ভারতবর্ষকে। অধ্যাপক শেলডন পোলকের মতো পাশ্চাত্যের অনেক পণ্ডিতই মুসলিম শাসনের উদারতার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। তারা বিশ্বাস করেন মুসলিম শাসকরা যদি জোর করে ভারতের হিন্দুদের ধর্মান্তর করতেন তাহলে একজন হিন্দুও এদেশে থাকত তো। অথচ উগ্রধর্মান্ধ হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা ভারতবর্ষে মোগল সাম্রাজ্যের সূচনাকারী উদারচেতা শাসক সম্রাট বাবরকে রাম মন্দির দখল করে মসজিদ দখলের অভিযোগে অভিযুক্ত করছে। সেই দেশের সর্বোচ্চ আদালত ইতিহাসের সত্য-মিথ্যার বিচার না করেই উগ্রবাদীদের পক্ষে রায় ঘোষণা করেছেন। বিষয়টি ব্যাপকভাবে সমালোচিত হচ্ছে। ভারতের পত্র-পত্রিকা ও বিভিন্ন ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় সে দেশের সাবেক প্রধান বিচারপতি, মিডিয়াকর্মী, ইতিহাসবিদ, মানবাধিকারকর্মীরা রায়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন।

কী আছে বাবরি মসজিদ মামলার রায়ে

গত ৯ নভেম্বর ভারতের সুপ্রিম কোর্ট অযোধ্যায় রামমন্দির তৈরির জন্য বাবরি মসজিদের ২.৭৭ একর জমি রামলালাকে দেয়ার রায় দিয়েছেন। মামলার মুসলিম পক্ষ সুন্নি ওয়াকফ বোর্ডকে অযোধ্যার বিকল্প জায়গায় পাঁচ একর জমি দেয়ার রায় ঘোষণা করেছেন আদালত। গত ৯ নভেম্বর শনিবার সকাল সাড়ে ১০টা থেকে সুপ্রিম কোর্টের আদালতের ১ নম্বর ঘরে এই রায় পড়েন প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ। বেঞ্চের বাকি সদস্যরা হলেন, বিচারপতি এস এ বোবদে, ডিওয়াই চন্দ্রচূড়, অশোক ভূষণ এবং এস আবদুল নজির। রায়ে প্রথমেই শিয়া ওয়াকফ বোর্ডের দাবি খারিজ করে মুসলিম পক্ষ হিসেবে সুন্নি সেন্ট্রাল ওয়াকফ বোর্ডকে স্বীকার করা হয়। বাতিল হয় নির্মোহী আখড়ার দাবিও। হিন্দু পক্ষ হিসেবে রাম জন্মভূমি ন্যাসকে স্বীকৃতি দেয়া হয়। (ন্যাস শব্দটি এসেছে ‘নি’ পূর্বক ‘অস’ ধাতু যোগে যার অর্থ হল বিশেষভাবে স্থাপন। মূল কথা হল দেহের বিভিন্ন স্থানে উপাস্য দেবতার অধিষ্ঠান। তান্ত্রিক পূজায় বিভিন্ন প্রকার ন্যাসের উল্লেখ আছে- অঙ্গন্যাস, করন্যাস, মাতৃকান্যাস, বর্ণন্যাস, ব্যাপকন্যাস, তত্ত্বন্যাস, বীজন্যাস, ষোঢ়ান্যাস, ঋষ্যাদিন্যাস, পীঠন্যাস ইত্যাদি। পীঠন্যাসের তাৎপর্য হচ্ছে দেহের বিভিন্ন স্থানে দেবতার পীঠস্থানের ভূমিরূপ চিন্তা।)
রায়ে আরো বলা হয়েছে, বাবরি মসজিদ কোনো ফাঁকা জায়গায় তৈরি হয়নি। পুরাতাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণের রিপোর্টে দেখা গেছে, মসজিদের নিচে আরো প্রাচীন একটি কাঠামো ছিল এবং সেটা কোনো ইসলামী স্থাপত্য ছিল না। মসজিদের নিচে যে কাঠামোর সন্ধান মিলেছিল, তা কোনো মন্দিরেরই কাঠামো ছিল, এমনটা অবশ্য পুরাতাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণের রিপোর্টে স্পষ্ট হয়নি। কিন্তু সেই সময়ের সেই কাঠামোটি যদি কোনো হিন্দু স্থাপত্য হয়েও থাকে, তাহলেও আজকের দিনে এসে ওই জমিকে হিন্দুদের জমি হিসেবে ধরে নেয়া যায় না। তবে ওই স্থানকে যে হিন্দুরা রামের জন্মস্থান হিসেবে বিশ্বাস করেন, তা নিয়ে কোনো সংশয় নেই। রায়ে বলা হয়, রাম জন্মভূমি হিসেবে যে ১৮৫৭ সালের আগেও (অর্থাৎ মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের আগে) হিন্দু পুণ্যার্থীরা যেতেন, তার প্রমাণ মিলেছে। বিতর্কিত জমির বাইরের অংশে যে হিন্দুরাই পূজার্চনা করতেন, সে প্রমাণও খুব স্পষ্ট। কিন্তু সুন্নি ওয়াকফ বোর্ড এই মামলায় এমন কোনো প্রমাণ দাখিল করতে পারেনি, যাতে বলা যায়, ১৮৫৭-এর আগে বিতর্কিত জমিটির দখল পুরোপুরি তাদের হাতে ছিল। বিতর্কিত জমিকে তিন ভাগে ভাগ করে তা মামলার তিনটি পক্ষকে দিয়ে দেয়ার যে নির্দেশ এলাহাবাদ হাইকোর্ট দিয়েছিল, সে রায় ঠিক ছিল না বলে সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছেন। ওই রায় প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ হলো- ‘এই মামলা কোনো জমি ভাগাভাগির মামলা ছিল না।’

আদালতের সরল স্বীকারোক্তির পরও  ন্যায়বিচার বঞ্চিত মুসলমানরা

বিশ্বাসের ভিত্তিতে আদালত রায় দিয়েছেন, কোন তথ্য প্রমাণ বা দলিলের ভিত্তিতে নয়। কিন্তু আইন, আদালতের বিধান হলো বিশ্বাসের ভিত্তিতে নয় প্রমাণের ভিত্তিতেই রায় দিতে হবে। আদালত এমন স্বীকারোক্তি করে রায়ে বলেছে, ‘যেহেতু বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে জমির মালিকানা ঠিক করা সম্ভব নয়, তাই আইনের ভিত্তিতেই জমির মালিকানা ঠিক করা উচিত। আপাতত কেন্দ্রীয় সরকার ওই জমির মালিকানা পাবে। কেন্দ্রকে তিন মাসের মধ্যে বোর্ড অব ট্রাস্ট গঠন করে তাদের হাতে বিতর্কিত জমি তুলে দিতে হবে। ট্রাস্টের তত্ত্বাবধানেই বিতর্কিত ২.৭৭ একর জমিতে মন্দির নির্মাণ হবে। সুন্নি ওয়াকফ বোর্ড ওই জমিতে অধিকার দাবি করতে পারবে না। তবে তারা মসজিদ নির্মাণের জন্য বিকল্প জমি পাবে। অযোধ্যার কেন্দ্রের কোথাও তাদের পাঁচ একর জমি দেয়া হবে এবং সেখানে তারা মসজিদ নির্মাণ করতে পারবে।’

আইন ভঙ্গকারীদের পক্ষেই রায়

আদালতের রায়ে বলা হয়েছে, ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর বাবরি মসজিদ ধ্বংস করা বেআইনি ছিল। কিন্তু এর মদদ দাতাদের কোন শাস্তি রায়ে দেয়া হয়নি। বরং সম্প্রীতি রক্ষার কথা বলে আদালত উগ্র হিন্দুবাদের কাছে আত্মসমর্পণ করে রায়ে উল্লেখ করেছেন, তবে বিতর্কিত জমির ওপরে রামলালার অধিকার স্বীকার করে নেয়াটা আইনশৃঙ্খলা এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বহাল রাখার প্রশ্নের সাথে সম্পৃক্ত।’ তার মানে তার উগ্রবাদীদের পক্ষে না গেলে তারা আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটাবে, আদালত এমন আশঙ্কায় তাদের বিশ্বাসকেই প্রাধান্য দিয়েছেন।

মুসলিম পারসোনাল ল’ বোর্ডের বক্তব্য

বাবরি মসজিদ মামলার ‘বিতর্কিত’ রায়ে অসন্তুষ্টির কথা জানিয়েছে ভারতীয় মুসলিমদের ঐক্যবদ্ধ সংগঠন অল ইন্ডিয়া মুসলিম পারসোনাল ল বোর্ড। রায়ের পরই তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানায় সংগঠনটি। সুপ্রিম কোর্টে মুসলমানদের প্রতিনিধিত্বকারী আইনজীবী জাফরইয়াব জিলানি সংবাদ সম্মেলনে বলেন, বাবরি মসজিদের জমির মালিকানার পক্ষে সব ধরনের প্রমাণ সুপ্রিম কোর্ট স্বীকার করেছেন। অযোধ্যায় ১৫২৮ সালে মসজিদটি নির্মাণ করা হয়েছিল। ১৯৪৯ সালের ২২-২৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত সেখানে নিয়মিত নামাজ আদায়ের বিষয়টিও বিচারকরা স্বীকার করেছেন। কিন্তু মামলার রায়ে তার প্রতিফলন ঘটেনি। আইনজীবী জাফরইয়াব জিলানি বলেন, এটা ন্যায়বিচার হতে পারে না। ইসলাম ধর্মে মসজিদ কখনো পরিবর্তন হতে পারে না। যেখানে একবার মসজিদ নির্মিত হয়, সে জায়গাটি মসজিদেরই থাকে। মসজিদ স্থানান্তরিত করার কোনো সুযোগ নেই। রায়ের আগে হাফিংটন পোস্ট ইন্ডিয়াকে তিনি বলেছিলেন, আমরা আইনের শাসন ও গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করছি। কেবল একটি মসজিদের জন্যই না। আমাদের ভবিষ্যতের জন্য লড়াই করে যাচ্ছি আমরা। যদি আমরা আত্মসমর্পণ করি, তবে দেশের কোনো মসজিদই নিরাপদ থাকবে না, কোনো সংখ্যালঘুই নিরাপদ বোধ করবেন না। কাজেই আমাদের লড়াই কেবল এক টুকরো জমির জন্যই নয়।
রায়ের পর তিনি বলেন, ‘আজকের রায়ে আমরা অসন্তুষ্ট। পরবর্তী করণীয় নিয়ে আমরা আলোচনা করব। আমরা পুরো রায় পড়ব। তারপর রিভিউয়ের আবেদনের সিদ্ধানত নিবো।’ তারা রিভিউয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকা অনুযায়ী বাবরি মসজিদের ৫০০ বছরের ইতিহাস

১৫২৮ ঈসায়ী সালে মুঘল সম্রাট বাবরের সেনাপতি মীর বাকি অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ তৈরি করেন। ১৮৮৫ ঈসায়ী সালে ফৈজাবাদ জেলা আদালতে বাবরি মসজিদের বাইরে চাঁদোয়া টাঙানোর আবেদন জানান মহান্ত রঘুবর দাস। আদালতে আবেদন নাকচ হয়ে যায়। ১৯৪৯ সালে বিতর্ক সৃষ্টির লক্ষ্যে সাম্প্রদায়িক হিন্দুরা ধাঁচার মূল গম্বুজের মধ্যে নিয়ে আসা হলো রাম লালার মূর্তি। ১৯৫০ সালে রামলালার মূর্তিগুলোর পূজার অধিকারের আবেদন জানিয়ে ফৈজাবাদ জেলা আদালতে আবেদন করলেন গোপাল শিমলা বিশারদ। ১৯৫০ সালে মূর্তি রেখে দেয়ার এবং পূজা চালিয়ে যাওয়ার জন্য মামলা করলেন পরমহংস রামচন্দ্র দাস। ১৯৫৯ সালে ওই স্থানের অধিকার চেয়ে মামলা করল নির্মোহী আখড়া। ১৯৬১ সালে একই দাবি জানিয়ে মামলা করল সুন্নি সেন্ট্রাল ওয়াকফ বোর্ড। ১৯৮৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি স্থানীয় আদালত সরকারকে নির্দেশ দেয়, হিন্দু তীর্থযাত্রীদের প্রবেশাধিকার দিতে। সে সময়ে রাজীব গান্ধী ছিলেন প্রধানমন্ত্রী। অযোধ্যা রামজন্মভূমির রামলালা বিরাজমনের নিকট বন্ধু তথা এলাহাবাদ হাইকোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি দেবকী নন্দন আগরওয়ালের মাধ্যমে মামলা দায়ের করে। ১৯৮৯ সালের ১৪ আগস্ট এলাহাবাদ হাইকোর্ট নির্দেশ দেয়, বিতর্কিত স্থানে স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে হবে। ১৯৯০ সালের ২৫ ডিসেম্বর বিজেপি নেতা লালকৃষ্ণ আদবানি গুজরাটের সোমনাথ থেকে রথযাত্রা শুরু করেন।
১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর করসেবকরা বাবরি মসজিদ ভেঙে ফেলে। ১৯৯৩ সালের ৩ এপ্রিল অযোধ্যার জমি অধিগ্রহণ করার জন্য বিতর্কিত এলাকার অধিগ্রহণ আইন পাস হয়। এলাহাবাদ হাইকোর্টে এই আইনের বিভিন্ন বিষয়কে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে রিট পিটিশন জমা পড়ে। সংবিধানের ১৩৯ এ অনুচ্ছেদের মাধ্যমে ওই রিট পিটিশন বদলি করে দেয় সুপ্রিম কোর্ট। ১৯৯৪ সালের ২৪ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্ট ঐতিহাসিক ইসমাইল ফারুকি মামলায় রায়ে জানায়, মসজিদ ইসলামের অন্তর্গত ছিল না। ২০০২ সালের এপ্রিলে মালিকানা নিয়ে হাইকোর্টে শুনানি শুরু হয়।
২০০৩ সালে সুপ্রিম কোর্ট বলে, অধিগৃহীত জমিতে কোনও রকমের ধর্মীয় কার্যকলাপ চলবে না। ১৪ মার্চ সুপ্রিম কোর্ট বলে, এলাহাবাদ হাইকোর্টে দেওয়ানি মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার জন্য অন্তর্র্বর্তী আদেশ কার্যকর থাকবে। ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১০ হাইকোর্ট রায় দেয়, বিতর্কিত জমি সুন্নি ওয়াকফ বোর্ড, নির্মোহী আখড়া এবং রামলালার মধ্যে সমবণ্টন করে দেয়া হোক। এই রায়ে তিন বিচারপতি সহমত পোষণ করেননি। ২-১ ভিত্তিতে রায়দান হয়। ৯ মে, ২০১১ অযোধ্যা জমি বিতর্কে হাইকোর্টের রায়ে স্থগিতাদেশ ঘোষণা করে সুপ্রিম কোর্ট। ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬- বিতর্কিত স্থানে রাম মন্দির তৈরির অনুমতি চেয়ে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেন সুব্রহ্মণ্যম স্বামী।
২১ মার্চ, ২০১৭- প্রধান বিচারপতি জে এস খেহর যুযুধান পক্ষগুলোকে আদালতের বাইরে সমঝোতার প্রস্তাব দেন। ৭ আগস্ট- এলাহাবাদ হাইকোর্টের ১৯৯৪ সালের রায়কে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে করা আবেদনের শুনানির জন্য তিন বিচারপতির বেঞ্চ গঠন করে সুপ্রিম কোর্ট। ৮ আগস্ট- উত্তর প্রদেশের শিয়া সেন্ট্রাল বোর্ড সুপ্রিম কোর্টে জানায়, বিতর্কিত স্থান থেকে কিছুটা দূরে মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় মসজিদ বানানো যেতে পারে। ১১ সেপ্টেম্বর- সুপ্রিম কোর্ট এলাহাবাদ হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতিকে নির্দেশ দেয়, বিতর্কিত জমির ব্যাপারে সদর্থক মধ্যস্থতার জন্য দু’জন অতিরিক্ত জেলা বিচারককে ১০ দিনের মধ্যে মনোনয়ন করতে হবে। ২০ নভেম্বর- উত্তর প্রদেশের সিয়া সেন্ট্রাল ওয়াকফ বোর্ড সুপ্রিম কোর্টকে বলে, অযোধ্যায় মন্দির ও লখনউয়ে মসজিদ বানানো যেতে পারে।
১ ডিসেম্বর- এলাহাবাদ হাইকোর্টে ২০১০ সালের রায়কে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে আবেদন করেন ৩২ জন নাগরিক অধিকার রক্ষাকর্মী। ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮- সুপ্রিম কোর্টে সমস্ত দেওয়ানি মামলার আবেদনের শুনানি শুরু হয়। ১৪ মার্চ- সুব্রহ্মণ্যম স্বামী-সহ সকল অন্তর্র্বর্তী আবেদন (যারা এই মামলার পক্ষ হতে চেয়েছিল) নাকচ করে সুপ্রিম কোর্ট। ৬ এপ্রিল- ১৯৯৪ সালের রায়ে যে পর্যবেক্ষণ ছিল তা বৃহত্তর বেঞ্চে পুনর্বিবেচনা করার জন্য সুপ্রিম কোর্টে আবেদন জানালেন রাজীব ধাওয়ান। ২০ জুলাই- সুপ্রিম কোর্ট রায়দান স্থগিত রাখে। ২৭ সেপ্টেম্বর- পাঁচ বিচারপতির সাংবিধানিক বেঞ্চে মামলা নিয়ে যেতে অস্বীকার করল সুপ্রিম কোর্ট। জানানো হয়, ২৯ অক্টোবর থেকে মামলার শুনানি হবে নবগঠিত তিন বিচারপতির বেঞ্চে। ২৯ অক্টোবর- সুপ্রিম কোর্ট জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে যথাযথ বেঞ্চে মামলার শুনানি স্থির করল, ওই বেঞ্চই শুনানির দিন ধার্য করবে। ২৪ ডিসেম্বর- সুপ্রিম কোর্ট সিদ্ধান্ত নিলো, এ সম্পর্কিত সমস্ত আবেদনের শুনানি হবে ৪ জানুয়ারি থেকে। ৪ জানুয়ারি, ২০১৯- সুপ্রিম কোর্ট জানায়, তাদের তৈরি করা যথোপযুক্ত বেঞ্চ মামলার শুনানির তারিখ ১০ জানুয়ারি স্থির করবে। ৮ জানুয়ারি- সুপ্রিম কোর্ট পাঁচ সদস্যের সাংবিধানিক বেঞ্চ ঘোষণা করে। শীর্ষে রাখা হয় প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈকে। এ ছাড়া বেঞ্চের অন্য বিচারপতিরা হলেন এস এ বোবদে, এনভি রামানা, ইউইউ ললিত এবং ডিওয়াই চন্দ্রচূড়। ১০ জানুয়ারি- বিচারপতি ইউইউ ললিত নিজেকে মামলা থেকে সরিয়ে নিয়ে সুপ্রিম কোর্টকে বলেন, ২৯ জানুয়ারি নতুন বেঞ্চের সামনে মামলার শুনানি শুরু করতে। ২৫ জানুয়ারি- সুপ্রিম কোর্ট পাঁচ সদস্যের নতুন সাংবিধানিক বেঞ্চ গঠন করে। নতুন বেঞ্চের সদস্যরা হলেন বিচারপতি রঞ্জন গগৈ, বিচারপতি এস এ বোবদে, ডিওয়াই চন্দ্রচূড়, অশোক ভূষণ এবং এস এ নাজির। ২৯ জানুয়ারি- কেন্দ্র সুপ্রিম কোর্টে বিতর্কিত অংশ বাদ দিয়ে বাকি ৬৭ একর জমি তাদের আদত মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দেবার আবেদন জানায়।
২০ ফেব্রুয়ারি- সুপ্রিম কোর্ট জানায়, মামলার শুনানি শুরু হবে ২৬ জানুয়ারি থেকে। ২৬ ফেব্রুয়ারি- সুপ্রিম কোর্ট মধ্যস্থতার কথা বলে, আদালত নিযুক্ত মধ্যস্থতাকারীদের কাজে লাগানো হবে কিনা সে সিদ্ধান্ত নেবার জন্য ৫ মার্চ দিন স্থির হয়। ৬ মার্চ- জমি বিতর্ক মধ্যস্থতার মাধ্যমে মীমাংসা করা হবে কি না সে সম্পর্কিত রায় দান মুলতবি রাখে সুপ্রিম কোর্ট। ৯ এপ্রিল- নির্মোহী আখড়া কেন্দ্রের জমি ফেরানোর আবেদনের বিরোধিতা করে। ৯ মে- তিন সদস্যের মধ্যস্থতাকারী কমিটি সুপ্রিম কোর্টে তাদের অন্তর্র্বর্তী রিপোর্ট জমা দেয়। ১৮ জুলাই- সুপ্রিম কোর্ট মধ্যস্থতা চালিয়ে যেতে বলে, ১ আগস্ট রিপোর্ট জমা দেয়ার দিন ধার্য হয়। ১ আগস্ট- মধ্যস্থতা সংক্রান্ত রিপোর্ট বন্ধ খামে সুপ্রিম কোর্টে জমা পড়ে। ৬ আগস্ট- সুপ্রিম কোর্ট জমি মামলায় দৈনিক ভিত্তিতে শুনানির কথা জানায়। ১৬ অক্টোবর- সুপ্রিম কোর্টে শুনানি শেষ হয়, রায়দান মুলতবি রাখা হয়। ৯ নভেম্বর ২০১৯-ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট মসজিদের স্থানে মন্দির নির্মাণের ন্যায়ভ্রষ্ট রায় ঘোষাণা করেন।

বিশিষ্টজনদের প্রতিক্রিয়া

অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ মামলার রায়ে যে ন্যায়বিচারের প্রতিফলন ঘটেনি সে প্রসঙ্গে আনন্দবাজার, এনডিটিভি, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, জিনিউজসহ বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশিত বিশিষ্টজনদের বক্তব্য তুলে ধরা হলো : ভারতের সুপ্রিম কোর্টের সাবেক বিচারপতি অশোক কুমার গঙ্গোপাধ্যায় কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকায় লিখেছেন, ‘রায়টা কিসের ভিত্তিতে দেওয়া হলো, সবটা ঠিক বুঝতে পারছি না। সুপ্রিম কোর্ট দেশের সর্বোচ্চ আদালত। সেই আদালত একটা রায় দিলে তাকে মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। কিন্তু অনেকগুলো প্রশ্নের উত্তর আমি খুঁজে পাচ্ছি না। চার শ-পাঁচ শ বছর ধরে একটা মসজিদ একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিল। সেই মসজিদকে আজ থেকে ২৭ বছর আগে ভেঙে দেয়া হলো বর্বরদের মতো আক্রমণ চালিয়ে। আর আজ দেশের সর্বোচ্চ আদালত বলল, ওখানে এবার মন্দির হবে। সাংবিধানিক নৈতিকতা বলে তো একটা বিষয় রয়েছে! এমন কোনো কাজ করা উচিত নয়, যাতে দেশের সংবিধানের ওপর থেকে কারও ভরসা উঠে যায়। আজ অযোধ্যার ক্ষেত্রে যে রায় হলো, সেই রায়কে হাতিয়ার করে ভবিষ্যতে এই রকম কাণ্ড আরও ঘটানো হবে না, সে নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারবেন?’ ‘১০৪৫ পাতার রায়ে বিচারপতিদের যে সব পর্যবেক্ষণ সামনে এসেছে, তা থেকে কিন্তু মনে হচ্ছে না যে, সব যুক্তি ঝুঁকে রয়েছে কোনো একটি পক্ষের দিকে। সর্বোচ্চ আদালত কোথাও বলেছে, বাবরি মসজিদ কোনো ফাঁকা জমিতে তৈরি হয়নি, তার নিচে আরও প্রাচীন অমুসলিম স্থাপত্যের সন্ধান পেয়েছে পুরাতাত্ত্বিক সর্বেক্ষণ। আবার তার পরেই বলেছে, মসজিদের নিচে যে স্থাপত্য মিলেছে, তা হিন্দু স্থাপত্যও যদি হতো, তা হলেও ওই জমি হিন্দুদের হয়ে যায় না। তা হলে বিতর্কিত জমি কার? বিচারপতিরা রায়ে লিখেছেন, ১৮৫৭ সালের আগেও যে রামজন্মভূমিতে হিন্দু পুণ্যার্থীদের যাতায়াত ছিল। বিতর্কিত অংশের বাইরের চত্বরেও যে হিন্দুরাই পূজার্চনা করতেন, তা-ও স্পষ্ট ভাবে প্রমাণিত বলে আদালত মনে করেছে। কিন্তু ১৮৫৭ আগে ওই অংশ সম্পূর্ণ ভাবে মুসলিমদের নিয়ন্ত্রণে ছিল, এমন কোনো প্রমাণ সুন্নি ওয়াক্ফ বোর্ড দাখিল করতে পারেনি বলে আদালত মনে করছে।’ বিচারপতি অশোক কুমার গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছেন, ‘ওয়াক্ফ বোর্ড শুধুমাত্র ওই প্রমাণটা দাখিল করতে পারল না বলেই কি জমির দখল রামলালা পেলেন? না, তেমন কোনো কথাও রায়ে লেখা নেই। বিতর্কিত জমির ওপরে রামলালা বিরাজমানের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার নেপথ্যে বরং অন্য দু’টি কারণ সামনে আসছে। প্রথমত, বিতর্কিত জমিকে যে হিন্দুরা রামের জন্মস্থান হিসেবে বিশ্বাস করেন, তা নিয়ে কোনো বিতর্ক বা বিরোধ নেই বলে আদালত মনে করেছে। আর দ্বিতীয়ত, বিতর্কিত জমিতে রামলালার অধিকার স্বীকার করে নেওয়াটা আইন-শৃঙ্খলা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বহাল রাখার প্রশ্নের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে বিচারপতিরা মনে করেছেন।’
রায় পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় সমাজবিজ্ঞানী আশিস নন্দীর কথায়, ‘এখন প্রধানমন্ত্রীর হাতে যা ক্ষমতা তার ধারে কাছে কেউ নেই। সেটা আরএসএস-ও জানে। এটাও ঘটনা যে দেশের সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ই মোদির শক্তির উৎস অর্থাৎ তাঁর ভোট ব্যাংক। ফলে সমাজের এই অংশের মন জয় করে চলাটাই বিধেয় মোদির কাছে। এই কার্যকারণ থেকেই দেশকে হিন্দু রাষ্ট্রের অভিমুখে চালনা করার প্রশ্নটা উঠে আসছে।’
দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক অশোক মজুমদার অবশ্য জানাচ্ছেন, ‘বিশ্বাস করি না যে গোটা দেশ হিন্দু রাষ্ট্রের পথে হাঁটছে। নিচের তলায় হিন্দুত্বের আস্ফালন থাকলেও তা সমাজের সর্বস্তরে পৌঁছায়নি।’
ভারতের সংবিধান বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যা, হিন্দু দেবতাদের ‘জুরিস্টিক পারসন’ বা আইনের চোখে ব্যক্তি হয়ে ওঠার সূত্রপাত ব্রিটিশ জমানায়, ‘ইংলিশ কমন ল’ থেকে। প্রবীণ আইনজীবী আদীশ চন্দ্র আগরওয়াল বলেন, ‘আইনের চোখে ব্যক্তি হিসেবে দেবতার সব রকম আইনি অধিকার রয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করা হয়, তিনিও মামলা করতে পারেন। তবে তাঁর সাংবিধানিক মৌলিক অধিকার নেই। তা শুধু দেশের নাগরিকদের জন্য।’
কলকাতার অধ্যাপক মিরাতুন নাহার এ বিষয়ে বিবিসি বাংলাকে বলেন, “একটা সম্পূর্ণ ‘তৈরি করা বিবাদ’ যে এভাবে দেশের শীর্ষ আদালত পর্যন্ত গড়াতে দেওয়া হলো, আমি তাতে প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ। দেশপ্রেমী একজন ভারতীয় নাগরিক হিসেবে আমি ভাবতেই পারি না, যাদেরকে আমরা দেশের ক্ষমতায় বসিয়েছি তারা কিভাবে ধর্মীয় বিভাজনের রাজনীতিকে এভাবে উসকানি দিতে পারেন! শুধুমাত্র নিজেদের সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থের কথা ভেবে তারা ভারতের মহান সংবিধানকেও অপমান করলেন।” তিনি আরও বলেন, “জমির দখল নিয়ে বিবাদ, সম্পত্তি নিয়ে বিবাদ দুটো পরিবারের মধ্যে হয়, কখনো বা কোর্টেও গড়ায়-এটাই চিরকাল জেনে এসেছি। কিন্তু সেই জমির বিবাদকে ঘিরে দেশের দুটো ধর্মীয় সম্প্রদায়কেও যে লড়িয়ে দেওয়া যায় তা কখনো ভাবতেও পারিনি, আর সে কারণেই পুরো বিষয়টা আমার কাছে এতটা কষ্টদায়ক! আজকের রায় নিয়ে আর কী বলব? কোর্টে গেলে যা হওয়ার তা-ই হয়েছে, তাই সেটা নিয়ে নতুন করে কিছু বলার মানে হয় না। আমার প্রশ্ন তাই একটাই, এই যে বিবাদ নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে যাওয়া হয়েছিল সেটা কি আপনা থেকেই তৈরি হয়েছিল না কি সচেতনভাবে গড়ে তোলা হয়েছিল?
জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক পার্থ দত্তের বক্তব্য, ‘ব্রিটিশ রাজের সময় থেকে সরকার মন্দির-মসজিদের মতো স্থাবর সম্পত্তির ওপর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ আনতে কর আদায় ব্যবস্থা চালু করে। এই রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের জায়গা থেকেই দেবস্থানের অসি পরিষদে সরকারি প্রতিনিধি রাখা শুরু হয়। সেই সংক্রান্ত কোনো মামলা মোকদ্দমা তৈরি হওয়ায় দেবতাকে আইনি দরবারে টানা শুরু হয়। ঔপনিবেশিক এই প্রথা হিন্দু আইনেও বলবৎ আছে এবং কালক্রমে তা পুষ্ট হয়েছে।’
পর্যবেক্ষকমহল মনে করেন, ভারত সাংবিধানিকভাবে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র বলে দাবি করলেও বর্তমানে যারা ক্ষমতায় আছেন তারা ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদে বিশ্বাসী নন। উগ্রহিন্দু জাতীয়তাবাদী শক্তির এই উত্থান শুধু ভারতের জন্য নয়, গোটা এশিয়ার শান্তি, সংহতি ও নিরাপত্তার জন্যই হুমকি।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও কথাসহিত্যিক

SHARE

Leave a Reply