post

পাকিস্তানের বিচার বিভাগের শক্তির উৎস

হারুন ইবনে শাহাদাত

০৩ জুন ২০২৩

পাকিস্তানের রাজনীতি এক চরম সংকটকাল অতিক্রম করছে। অবশ্য দেশটির রাজনীতিতে এই অবস্থা এটিই প্রথম নয়। পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মের পর থেকে নিয়ে দেশটিতে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব চলছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশেষজ্ঞরা এজন্য রাজনীতিবিদদের ব্যর্থতাকে দায়ী করেন। এই প্রতিবেদকও মনে করেন, রাষ্ট্রটির সৃষ্টি যে লক্ষ্য উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে হয়েছিল, সেই লক্ষ্য উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের উপযোগী নেতৃত্বের অভাব, প্রতিবেশী ভারতের প্রভাব এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ষড়যন্ত্রের কারণেই বার বার হোঁচট খাচ্ছে পাকিস্তান। 

‘ইসলামিক রিপাবলিক অব পাকিস্তান’ নামকরণের মধ্যেই দেশটির সৃষ্টি লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য লুকিয়ে আছে। কিন্তু এই লক্ষ্য উদ্দেশ্য বিরোধী অনেক শক্তি রাজনীতি থেকে নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি অঙ্গে সক্রিয়। ১৯৪৭ থেকে নিয়ে একজন প্রধানমন্ত্রীও মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেননি। এ জন্য সেনাবাহিনীকে দায়ী করা হয়। কারণ সেনাশাসন মানেই সংবিধান স্থগিত। বন্দুকের নলই তখন হয় সকল ক্ষমতার উৎস। বিচার বিভাগও তখন স্বাধীনভাবে ভূমিকা পালন করতে পারে না। পকিস্তানের রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর নাক গলানোর প্রসঙ্গ আসলেই বিশেষজ্ঞরা ভারতের সাথে তুলনা করেন, কারণ দুইটি দেশ মাত্র এক দিন আগে পরে স্বাধীন হয়েছে: ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান ও ১৫ আগস্ট ভারত। ভারতে সংকট উত্তরণে জরুরি আইন জারি হলেও একদিনের জন্যও সামরিক শাসন জারি হয়নি। অথচ পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর ব্যাপারে প্রচলিত ধারণা হলো, কে ক্ষমতার মসনদে কতদিন থাকবেন তা তারাই নির্ধারণ করেন। এমন অবস্থায় ক্রিকেটের মাঠ থেকে উঠে এসে রাজনীতিতে চমক সৃষ্টিকারী সদ্য বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ভরসা রাখছেন বিচার বিভাগের ওপর। তিনি সম্প্রতি তাকে নিয়ে সৃষ্ট সংকট উত্তরণ প্রসঙ্গে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণে জানিয়েছেন, ‘আমাদের গণতন্ত্র সুতোয় ঝুলছে এবং বিচার বিভাগই একে বাঁচাতে পারে। এই মাফিয়ারা বিচার বিভাগকে আক্রমণ করে যাচ্ছে, তাই আমি জাতিকে আমাদের বিচার বিভাগ ও সংবিধানের পাশে দাঁড়াতে বলেছি। পাকিস্তানের স্বাধীন বিচার বিভাগকে ধ্বংস করেছেন নওয়াজ। যখন একটি স্বাধীন বিচার বিভাগ ধ্বংস হয় তখন আপনার স্বাধীনতা আপনা-আপনি চলে যায়। কেননা বিচার বিভাগ আপনার মৌলিক অধিকার রক্ষা করে।’ এমন অবস্থায় প্রশ্ন বিচার বিভাগ কতটা স্বাধীন, শক্তির উৎস কোথায়?


বিচার বিভাগ কতটা স্বাধীন?

শুধু পাকিস্তান নয়, এমন প্রশ্ন প্রতিটি দেশের বিচার বিভাগ নিয়েই আছে। কারণ সংবিধান স্বীকৃত অধিকার রাষ্ট্রের কোন অঙ্গ প্রতিষ্ঠানই একা বাস্তবায়ন করতে পারে না, রাজনীতি সঠিক পথে না চললে এবং জনগণ অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকা পালন না করলে। জনগণ অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকা তখনই পালন করতে পারে যখন তাদের সামনে সাহসী, বিচক্ষণ ও সৎ নেতৃত্ব। পাকিস্তানের বর্তমান ঘটনা প্রবাহে এই তিনের সমন্বয় ঘটেছে বলে মনে করেন, পর্যবেক্ষকরা।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মিডিয়ার প্রতিবেদন ও বিশ্লেষণে এই সত্য উন্মোচিত হয়েছে। যেমন: নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে ইমরান খানের গ্রেফতারের পর জনবিক্ষোভের চিত্র তুল ধরতে গিয়ে বলা হয়েছে, ‘একদল বিক্ষোভকারী দেশটির আর্মি হেডকোয়ার্টারের গেটে পর্যন্ত হামলা করেছে। পাকিস্তানে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বিক্ষোভকারীদের এমন সহিংস প্রতিবাদ যেন অনেকটা অকল্পনীয়। কেননা এতদিন পর্যন্ত দেশটির টালমাটাল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও সেনাবাহিনী ছিল অনেকটা ধরাছোঁয়ার বাইরে।  পাকিস্তানের রাজনীতিতে ঐতিহাসিকভাবেই সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রয়েছে। তবে সম্প্রতি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে গ্রেফতারের পর থেকে দেশটির আর্মি জেনারেলরা যেন একটু বেকায়দায় পড়ে গিয়েছেন। পাকিস্তান স্বাধীনতা লাভের পর থেকে দীর্ঘ ৭৫ বছর ধরে দেশটির রাজনীতি ও বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণ ছিল। যার ফলশ্রুতিতে তিনটি সফল সেনা অভ্যুত্থান ও কয়েক দশকের সেনা শাসনের মুখোমুখি হয়েছে পাকিস্তানের জনগণ। এমনকি জনগণের ভোটে নির্বাচিত বেসামরিক সরকারের সময়ও সেনা কর্মকর্তারাই মূল কলকাঠি নেড়েছেন। নিজেদের পছন্দনীয় রাজনৈতিক নেতাকে ক্ষমতায় থাকতে সহায়তা করেছেন; আর সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণ থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করলেই তাকে করা হয়েছে ক্ষমতাচ্যুত। তবে খুব অল্প সংখ্যক ব্যক্তিই প্রকাশ্যে সেনাবাহিনীর এ কাজের সমালোচনা করেছেন। 

রাজনীতিবিদ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে যারা অভিযোগ করেছেন, তারা সরাসরি দেশটির সেনাবাহিনী কিংবা শক্তিশালী আন্তঃবাহিনী গোয়েন্দা সংস্থাকে দায়ী করেননি। বরং অনেকটা পরোক্ষভাবে ‘এস্টাবলিশমেন্ট’ এর বিপক্ষে আওয়াজ তুলেছেন। কেননা সকলেই জানতেন যে, সরাসরি সেনাবাহিনীকে দায়ী করলে গ্রেফতার, দেশত্যাগ কিংবা গুম হয়ে যাওয়ার মতো বাজে পরিস্থিতির শিকার হতে পারেন। তবে পাকিস্তানের রাজনীতিতে ইমরান খানের আবির্ভাব যেন ধীরে ধীরে সব সমীকরণ পাল্টে দিতে থাকে। দীর্ঘ দুই দশকের রাজনৈতিক জীবনে ধীরে ধীরে জনসাধারণের মাঝে গ্রহণযোগ্যতা পান ইমরান খান। বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় ইমরান খান দেশটির অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় সংস্কার ও দুর্নীতি প্রতিরোধের মতো প্রকট সমস্যা সমাধানের প্রতিশ্রুতি দেন। এতে করে দেশটিতে বিদ্যমান প্রথাগত রাজনৈতিক ধারার বাইরে ভিন্নধর্মী এক নেতা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন তিনি। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৮ সালে নির্বাচনে জয়লাভের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন ইমরান খান। কিন্তু তার ক্ষমতা গ্রহণের ক্ষেত্রে সহযোগী হিসেবে দেশটির সেনাবাহিনীর নামও বার বার উঠে এসেছে। এমনকি প্রতিপক্ষকে ইমরানের বিরুদ্ধে না যেতে চাপ প্রদান কিংবা গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণেরও অভিযোগ রয়েছে তাদের ওপর। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইমরান খানের ক্ষমতা গ্রহণের পর সময়ের সাথে সাথে দেশটির সেনাবাহিনীর সাথে ইমরানের সম্পর্কের অবনতি ঘটতে থাকে। এমনকি সাবেক এ তারকা ক্রিকেটার ২০২২ সালের এপ্রিল মাসে সংসদে অনাস্থা ভোটে প্রধানমন্ত্রিত্ব হারান। প্রধানমন্ত্রিত্ব হারানোর পেছনে সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের হাত ছিল বলে সেসময় অভিযোগ করেন ইমরান। তিনি তার রাজনৈতিক আন্দোলনের বিরুদ্ধে আর্মি জেনারেলদের ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তোলেন। এরপর গত বছরের নভেম্বরে দেশটির পাঞ্জাব প্রদেশের ওয়াজিরাবাদে লংমার্চের সময় ইমরান খান পায়ে গুলিবিদ্ধ হন। তাকে ‘হত্যাচেষ্টা’র পেছনে সেনাবাহিনীর একজন উচ্চপদস্থ গোয়েন্দা কর্মকর্তার নাম উল্লেখ করে তাকে অভিযুক্ত করেন সাবেক এ প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রিত্ব হারানোর পর থেকেই ইমরান খানের বিরুদ্ধে বহু মামলা হতে থাকে। আর গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর নিজের নিরাপত্তাকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করে দুর্নীতির অভিযোগে করা মামলাগুলোর জন্য কোর্টে হাজিরা দেওয়া এড়িয়ে চলেন তিনি। ইমরান খানের কোর্টে হাজিরা না দেওয়ার সিদ্ধান্তের ফলে যেকোনো সময়েই তিনি গ্রেফতার হতে পারেন বলে আশঙ্কা ছিল। অন্যদিকে তার দল পিটিআই সমর্থকেরা তীব্র সমালোচনার পাশাপাশি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ভঙ্গুর করার পেছনেও সামরিক বাহিনীকে দায়ী করতে থাকেন। ইসলামাবাদ হাইকোর্টে হাজিরা দিতে গেলে ইমরান খানকে আল কাদির ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় গ্রেফতার করা হয়। এর প্রতিবাদে ইমরান খানের সমর্থকেরা বিক্ষোভের পাশাপাশি সেনাবাহিনীর স্থাপনাগুলোতে হামলা করতে থাকেন।

ইমরান খান প্রধানমন্ত্রিত্ব হারানোর পর থেকে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের ক্ষমতা চলাকালে দেশটিতে রেকর্ড মুদ্রাস্ফীতি দেখা দেয়; নিত্য-প্রয়োজনীয় বস্তুর দাম বাড়তে থাকে। অর্থনৈতিক এ টালমাটাল পরিস্থিতি যেন চলমান বিক্ষোভে আরও বাড়তি মাত্রা যোগ করেছে। বিক্ষোভ দমনে দেশটির অন্তত দুটি প্রদেশে ইতোমধ্যেই সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। কিছু কিছু স্থানে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষ হচ্ছে। বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে লাঠিপেটা ও টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করছে পুলিশ। বিক্ষোভ চলমান থাকলে পাকিস্তানজুড়ে স্থবিরতা নেমে আসতে পারে বলে অনেকে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। এ অবস্থায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফও অনেকটা বেকায়দায় পড়তে পারেন। একইসাথে সামরিক স্থাপনাগুলোতে হামলার ঘটনায় দেশটির সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি ব্যাপকভাবে ক্ষুণœ হতে পারে। এ ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনা সেনাবাহিনীর জন্য খুব একটা সহজ হবে না বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা।

যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত মালিহা লোধি বলেন, ‘বর্তমান পাকিস্তানের রাজনৈতিক টালমাটাল পরিস্থিতির ফলাফল খুবই ভয়াবহ। পূর্বে সেনাবাহিনী রাজনৈতিক সংকটে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করেছে। কিন্তু বর্তমানে এমন ভূমিকা পালন করার জন্য দেশে আর কোনো প্রতিষ্ঠানই নেই।’

গত ১০ মে ইসলামাবাদ পুলিশ লাইনে গঠিত বিশেষ আদালতে ইমরান খানকে তোলা হয়। ঘুষ গ্রহণের অভিযোগে করা মামলাটিতে সাবেক এ প্রধানমন্ত্রীর আট দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। অন্যদিকে স্থানীয় গণমাধ্যমে রিপোর্ট মতে, ইমরান খান তার বিরুদ্ধে আনা সকল দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। একইসাথে তিনি নিজের নিরাপত্তা নিয়েও শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থা পাওয়া রাষ্ট্রীয় উপহার বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগেও তার বিরুদ্ধে পৃথক মামলা রয়েছে। স্থানীয় গণমাধ্যমের সংবাদ অনুযায়ী, ইমরান খান গ্রেফতারের পর থেকে চলমান বিক্ষোভে অন্তত পাঁচ জন নিহত হয়েছে। শুধু পাঞ্জাব প্রদেশেই প্রায় এক হাজার বিক্ষোভকারীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে কর্তৃপক্ষ বহু জায়গায় ইন্টারনেট সুবিধা বন্ধ করে দিয়েছিল।  তবে এত সব দমন-পীড়নের মাঝেও বিক্ষোভকারীদের থামানো যায়নি। ফলে নবনিযুক্ত আর্মি চিফ জেনারেল সৈয়দ আসিম মুনিরের নেতৃত্বে সেনাবাহিনী যেন একটু অস্বস্তিকর অবস্থায় পড়েছেন। কেননা ইমরান খানের প্রতি সেনাবাহিনীর একটা অংশের সমর্থন রয়েছে। এক্ষেত্রে বিক্ষোভকারীদের ওপর নিপীড়নের মাত্রা বাড়ানো হলে সেনাবাহিনীর ভেতরেই অস্থিতিশীল অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে। ২০০৭ সালে সামরিক শাসক জেনারেল পারভেজ মোশাররফের ক্ষমতা হারানোর মধ্য দিয়ে যেমনটা ঘটেছিল।  

ইউনাইটেড ইনস্টিটিউট অব পিসের সিনিয়র এক্সপার্ট আসফান্দার মীর বলেন,  ‘সেনাবাহিনীর মধ্য থেকে, বিশেষ করে সিনিয়র জেনারেলদের পক্ষ থেকে আর্মি চিফ জেনারেল মুনিরকে সম্ভবত কঠোর অবস্থান থেকে সরে এসে ইমরান খানের সাথে সমস্যা সমাধানের জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে।’ তবে পাকিস্তানের নাগরিকদের একটা অংশ এখনো মনে করেন, দেশটির দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনৈতিক অবস্থাকে সামাল দিতে সেনাবাহিনীর কার্যকর ভূমিকা পালনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। দেশটির বন্যা থেকে শুরু করে সকল দুর্যোগে সেনাবাহিনী সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে ত্রাণ পৌঁছে দিয়েছে। একইসাথে তালেবান সংকটসহ দেশটিতে সন্ত্রাসবাদ নির্মূলে সামরিক বাহিনীর ভূমিকা রয়েছে। তবে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ইমরান খান যে আর্মি জেনারেলদের দায়ী করেছেন, সে অভিযোগে জনগণের একটা বিরাট অংশের সমর্থন রয়েছে। এর প্রমাণ মেলে পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানের কিছু উপ-নির্বাচনে পিটিআইয়ের জয়ের মধ্যে দিয়ে। এমনকি ইমরান খান আগাম জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানেরও দাবি জানিয়েছেন।   

এ প্রসঙ্গে ওয়াশিংটনের ব্রুকিংস ইনস্টিটিউটের ফেলো মাধিহা আফজাল বলেন, ‘ইমরান খানের জনপ্রিয়তার কারণেই তিনি এতদিন পর্যন্ত এস্টাবলিশমেন্টের বিরুদ্ধে টিকে আছেন। কিন্তু বর্তমানে এস্টাবলিশমেন্টই সংকটের মুখে আছে। এ অবস্থায় পাকিস্তানের জন্য ভবিষ্যতে কঠিন সময় অপেক্ষা করছে।’


পাকিস্তানের সর্বোচ্চ আদালতের সাহসী উদ্যোগ

পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি উমর আতা বান্দিয়ালের ভূমিকায় আইনের শাসনের প্রতি আদালতের অবিচল আস্থা আবারো প্রমাণিত হয়েছে বলে মনে করেন, বিশ্লেষকরা। আদালত সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে এক ঘণ্টার মধ্যে সুপ্রিম কোর্টে হাজির করার নির্দেশ দেন। এই নির্দেশ আসে ইমরান খানকে গ্রেফতারের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে শুনানি চলার সময়। এর মধ্যেই সুপ্রিম কোর্ট এক অপ্রত্যাশিত আদেশ দেন। যেখানে বলা হয়, ইমরান খানকে আদালতে এখনই হাজির করুন। পরের ঘটনা এখন অতীত। এক ঘণ্টার মধ্যেই তাকে হাজির করা হয়। শুনানির একপর্যায়ে আদালতের তরফে অবিলম্বে ইমরান খানকে মুক্তির নির্দেশ দেওয়া হয়। ইমরান খান যখন আদালতে পৌঁছান তাকে উদ্দেশ্য করে প্রধান বিচারপতি বলেন, আপনাকে দেখে ভালো লাগছে। আদালত ইমরানকে ইসলামাবাদ হাইকোর্টে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেন। আদালত স্পষ্ট করে জানিয়ে দেন, ইমরান খানের গ্রেফতার ছিল সম্পূর্ণ বেআইনি। যাই হোক, এটা স্বীকার করতেই হবে শত চাপের মুখেও পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্ট নতি স্বীকার করেনি। অসহায় আত্মসমর্পণও করেনি। পর্যবেক্ষকরা ইমরান খানকে জোরপূর্বক ইসলামাবাদ হাইকোর্ট প্রাঙ্গণ থেকে গ্রেফতারের ঘটনাটিকে সেনাবাহিনীর মধুর প্রতিশোধ হিসেবে দেখছেন। বিভিন্ন মিডিয়ার খবরে বলা হয়, পাকিস্তানের আধা সামরিক বাহিনী ন্যাশনাল অ্যাকাউন্টেবিলিটি ব্যুরোর চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত লে. জেনারেল নাজির আহমেদের নির্দেশেই ইমরানকে তার হুইলচেয়ার থেকে উঠিয়ে হাইকোর্টের বায়োমেট্রিক্স রুমে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়। সন্দেহ নেই শাহবাজ শরিফের সরকার কেবল সামনে থেকে কাজ করছে। পেছনে কলকাঠি নাড়ছে পাকিস্তান সেনাবাহিনী। সব দেশেরই সেনাবাহিনী আছে। কিন্তু পাকিস্তানে ভিন্ন। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর রয়েছে একটি দেশ। ইমরানকে গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে রাজনীতি এবং রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের অবিশ্বাসের জন্ম হবে। মাঝখানে পিটিআই জনসমর্থন আদায়ে সক্ষম হবে। ইমরান খান যেভাবে ঘৃণার রাজনীতির জন্ম দিয়েছেন এর জন্য অনেকেই তাকে সমর্থন করেন না। কিন্তু নির্বাচনী ও রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা থেকে যেভাবে তাকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে সেটাও কেউ সমর্থন করেন না। পাক সেনাবাহিনীর মধ্যে ভিন্ন সুর লক্ষ্য করা যাচ্ছে। একজন কর্মরত অফিসারের মা প্রকাশ্যেই বলেছেন, আমি একজন সম্মানিত সৈনিকের মা হতে চাই। একজন অসম্মানিত, ঘৃণিত জেনারেলের নয়। 

এর আগে আদালত চত্বর থেকে পাকিস্তান তেহরিকে ইনসাফ দলের প্রধান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে ইসলামাবাদ হাইকোর্ট থেকে গ্রেফতারের ফলে বিচার বিভাগকে কলঙ্কিত করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেন দেশটির প্রধান বিচারপতি উমর আতা বান্দিয়াল। এতে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘এ ইস্যুতে যথাযথ একটি অর্ডার ইস্যু করবে আদালত। এ বিষয়ে আদালত খুবই সিরিয়াস।’ তাঁর এই সাহসের মূল উৎস কোথায়, এই প্রশ্নের উত্তর পরবর্তী ঘটনা প্রবাহের মধ্যেই নিহিত আছে বলে মনে করেন, বিশ্লেষকরা।


উমর আতা বন্দিয়াল এবং ইমরানকে ক্ষমতাচ্যুত করার রায়

২০২২ সালের ১০ এপ্রিল ইমরান ক্ষমতাচ্যুত হন। প্রধান বিচারপতি উমর আতা বন্দিয়ালই অনাস্থা ভোটের মাধ্যমে ইমরান খানকে ক্ষমতাচ্যুত করার মধ্যরাতের প্রক্রিয়া ঠিক ছিল বলে রায় দিয়েছিলেন। আর তখন থেকেই রাজনৈতিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। এ কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে মুসলিম লিগের (নওয়াজ) নেতা মরিয়ম নওয়াজ পাকিস্তানের বর্তমান বিশৃঙ্খল রাজনৈতিক পরিস্থিতির জন্য প্রধান বিচারপতি উমর আতা বন্দিয়ালকে দায়ী করেছেন। বলেছেন, বিচার বিভাগ দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও পাকিস্তান তেহরিক-ই ইনসাফের (পিটিআই) চেয়ারম্যান ইমরান খানের পক্ষ নিয়েছে। গত ৯ এপ্রিল ইমরান খানকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। আর সুপ্রিম কোর্ট ইমরান খানের গ্রেফতার অবৈধ ঘোষণা করে তাকে অনতিবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার নির্দেশ দেন। একদিন পর তাকে দুই সপ্তাহের জামিন দেন ইসলামাবাদ হাইকোর্ট। 

যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর, আটলান্টিক কাউন্সিলের অনাবাসিক সিনিয়র ফেলো এবং আমেরিকান ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজের প্রেসিডেন্ট আলী রিয়াজ বলেছেন, ‘পাকিস্তানে তিনবার সামরিক শাসন জারি করা হয়েছে এবং প্রতিবারই তাকে বৈধতা দিয়েছেন আদালত। পাকিস্তানে প্রথম সামরিক শাসনের সূচনা হয় ৮ অক্টোবর ১৯৫৮ সালে, জেনারেল আইয়ুব খানের সেনাশাসন। প্রধান বিচারপতি মুনির তাকে বৈধতা দেন ‘বিপ্লবী বৈধতা’র তত্ত্ব দিয়ে। বলা হয়েছিল যে আদালত একটি সামরিক অভ্যুত্থানকে বৈধতা দেবেন, যদি তা কার্যকারিতার পরীক্ষায় উতরে যায় এবং আইন প্রণয়নের বাস্তবতায় পরিণত হয়। পাকিস্তানের আদালত ইয়াহিয়া খানের সামরিক অভ্যুত্থানকেও বৈধতা দিয়েছিলেন। যদিও দেশে বেসামরিক শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর বলেছেন যে ওই সামরিক শাসনের কোনো সাংবিধানিক বৈধতা ছিল না। কিন্তু তারপর ১৯৭৭ সালে যখন জিয়াউল হক সেনাশাসন জারি করেন, তখন আদালত তাঁকে কিছুই বলেননি, উপরন্তু বেগম নুসরাত ভুট্টো তা চ্যালেঞ্জ করলে আদালত ‘ডকট্রিন অব নেসেটিটি’র কথা বলেই তা খারিজ করে দিয়েছিলেন। ১৯৯৯ সালে পারভেজ মোশাররফের ক্ষমতা দখলের পর আদালতে দায়ের করা মামলাগুলো যখন জমে উঠছিল, তখন আদালতের বিচারকদের বাধ্য করা হয়েছে জেনারেল জিয়ার মতোই এক আইনের আওতায় পারভেজ মোশারফের করা আইনের প্রতি আনুগত্য প্রকাশে।

পাকিস্তানের আদালতের এই সব ভূমিকার পাশাপাশি আদালতের এবং বিচারকদের অন্য ধরনের ভূমিকাও আছে। জেনারেল জিয়া ১৯৮১ সালের সাময়িক সংবিধান আইন (পিসিও) জারির মাধ্যমে এই আদেশের সঙ্গে সম্মত হয়ে সব বিচারকের জন্য নতুন করে শপথ নেওয়া বাধ্যতামূলক করেন। কিন্তু তাতে অসম্মত হওয়ায় ১৬ জন বিচারক বরখাস্ত হন এবং ৩ জন শপথ নিতে অস্বীকৃতি জানান। বাকিরা অবশ্য চাপের মুখে আত্মসমর্পণ করেন। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে না হলেও বিচারকদের মধ্যে সংবিধান এবং আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধার একটি উদাহরণ হয়ে ওঠে এই ঘটনা। ১৯৮৮ সালে জিয়াউল হক যখন সংসদ ভেঙে দেন, তার আগে সংবিধানের অষ্টম সংশোধনীর মাধ্যমে যুক্ত ৫৮(২) অনুচ্ছেদ তাঁকে দিয়েছে অসীম ক্ষমতা। তা সত্ত্বেও তাঁর মৃত্যুর পর আদালত বলেছিলেন যে ওই আদেশ সাংবিধানিক ছিল না। তবে আদালতের বড় ধরনের ভূমিকা দেখা যায় ১৯৯৩ সালে। এপ্রিল মাসে নওয়াজ শরিফ সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে পার্লামেন্ট ভেঙে দেন প্রেসিডেন্ট গুলাম ইসহাক খান। আদালতের রায়ে নওয়াজ শরিফ ক্ষমতায় ফেরেন মে মাসে। নির্বাহী বিভাগ, বিশেষ করে প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের বিচারপতি এবং আদালতের অবস্থান কতটা শক্তিশালী, তা বোঝা যায় ২০০৭ সালের মার্চ মাসে প্রধান বিচারপতি ইফতেখার মুহাম্মদ চৌধুরীকে বরখাস্ত করার পর। প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফের এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সারা দেশে গড়ে ওঠে আন্দোলন। সুপ্রিম কোর্টের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ জুলাই মাসে ১০-৩ ভোটে প্রেসিডেন্টের এ সিদ্ধান্তকে অসাংবিধানিক বলে চিহ্নিত করে প্রধান বিচারপতিকে স্বপদে বহাল করেন, তাঁর বিরুদ্ধে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে আনীত অভিযোগ এবং যে আইনের ভিত্তিতে প্রেসিডেন্ট প্রধান বিচারপতিকে বরখাস্ত করেছিলেন, সেটা বাতিল করে দেন। পারভেজ মোশাররফের সঙ্গে আদালতের প্রত্যক্ষ বিরোধের দ্বিতীয় পর্ব ঘটে ২০০৭ সালের শেষ দিকে। অক্টোবরে অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের বৈধতাকে আদালত চ্যালেঞ্জ করলে মোশাররফ প্রধান বিচারপতি ইফতেখার চৌধুরীসহ ষাট বিচারপতিকে বরখাস্ত করেন এবং প্রধান বিচারপতিসহ শীর্ষস্থানীয় বিচারপতিদের গৃহবন্দী করেন। এ অবস্থার বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় পতন ঘটে মোশাররফের। ২০০৭ সালের এ ঘটনাপ্রবাহ থেকে আদালতের স্বাধীন আচরণের যে লক্ষণ দেখা যায়, তার আরেকটি প্রমাণ পাওয়া যায় ২০১২ সালে, যখন আদালত প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানির বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগে তাঁকে শাস্তি প্রদান করেন এবং শেষ পর্যন্ত তাঁকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেন।’

২০২২ সালের ১০ এপ্রিলের ঘটনা প্রসঙ্গে আলী রিয়াজের বিশ্লেষণ, ‘পাকিস্তানের আদালতের ইতিহাসের এ দুই ধারার সঙ্গে যাঁরা পরিচিত, তাঁরা অনুমান করতে সক্ষম হবেন যে গত কয়েক দিনে প্রধান বিচারপতি উমর আতা বান্দিয়াল এবং সুপ্রিম কোর্টের আচরণ গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা অভূতপূর্ব নয়। পাকিস্তানে আদালত দেশের রাজনৈতিক শক্তিগুলোর অবস্থান দ্বারা প্রভাবিত হন না, তা দাবি করা যাবে না। কিন্তু ইমরান খানের সরকারের আচরণের সাংবিধানিক দিক বিচারে পাকিস্তানের আদালত অন্য শক্তির দ্বারা প্ররোচিত বা প্রভাবিত এমন দাবির পক্ষে যুক্তি বা প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে না। আদালত অনাস্থা ভোটের জন্য সময় বেঁধে দিয়েছিলেন, তা পালনে স্পিকারের অনাগ্রহের কারণেই প্রধান বিচারপতি মধ্যরাতে আদালত বসানোর ব্যবস্থা করেছিলেন। অন্যদিকে তেহরিক-ই-ইনসাফ যেন দলত্যাগীদের কারণে পতনের মুখে না পড়ে, সে জন্য আদালত বলেছিলেন, এ অনাস্থা ভোটের সময় সংবিধানের ৬৫(এ) অনুচ্ছেদ বিবেচনায় নিতে হবে। ওই অনুচ্ছেদে দলের বিরুদ্ধে ভোট দিলে সদস্যপদ হারানোর বিধান আছে। ফলে আদালত সংবিধান রক্ষার নামে সরকারের পতনের সব রাস্তা খুলে দিয়েছিলেন তা নয়, বরং আদালতের আচরণ সংবিধানে রক্ষার চেষ্টা বলেই প্রতীয়মান হয়।’


সংবিধান প্রদত্ত ক্ষমতা চর্চা জরুরি

ক্ষমতার ভারসাম্য ও জনগণের অধিকার রক্ষার কথা চিন্তা করেই সংবিধান রচনা করা হয়। যদিও স্বৈরাচারী শাসকরা নিজেদের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাতে সুযোগ পেলেই তাদের ব্যক্তিগত ডায়েরির মতো সংবিধান পরিবর্তন করেন। যা ইচ্ছা তা লিখে দম্ভভরে বলেন, ‘সংবিধানের বাইরে কিছু হবে না।’ এত কিছু করার পরও তারা সংবিধান প্রদত্ত অন্য সবার অধিকারও ক্ষমতার জোরে কেড়ে নিতে কুণ্ঠিত হন না। নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে রায় লিখলে প্রধান বিচারপতিকে দেশ ত্যাগে বাধ্য পর্যন্ত করা হয়। তাই লিখিত আইনের চেয়ে ব্যক্তির নৈতিক শক্তি এবং সাহস ন্যায় প্রতিষ্ঠায় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক শক্তি যত দিন সত্য, ন্যায় ও নৈতিকতার ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকে তত দিনই জনগণের অধিকার সুরক্ষিত থাকে। তাই সবার আগে রাজনীতিকে দূষণ মুক্ত করতে হবে। এ কথা শুধু পাকিস্তান নয় সবার জন্যই সমান প্রযোজ্য।

লেখক : কথাসাহিত্যিক ও সিনিয়র সাংবাদিক

আপনার মন্তব্য লিখুন

কপিরাইট © বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির