মহানবী সা.-এর আদর্শ শান্তিময় সমাজের রূপরেখা -আবুল খায়ের নাঈমুদ্দীন

মহানবী হযরত মুহাম্মদ সা. আল্লাহর প্রেরিত রাসূল। এক নাম এক সম্মান, আসমান ও জমিনের, দুনিয়া ও আখেরাতের একক নক্ষত্র। তিনি একজনই যিনি দোজাহানের মানবতার মুক্তির দূত। মুহাম্মদ সা.-এর অকল্পনীয় সহনশীলতা, ধৈর্য শক্তি, চিন্তা- চেতনা, ধ্যান-ধারণা, চলাফেরা, আদব-কায়দা। শিষ্টাচার, সুমধুর ব্যতিক্রমী ব্যবহার, নিষ্ঠাবান সংগ্রামী জীবন, তাঁর পর্যবেক্ষণ পারদর্শিতা, বিচক্ষণতা, জ্ঞান, প্রজ্ঞা, প্রখর বুদ্ধিমত্তা তাঁকে বিশ্বের মহান আদর্শের মহামানব হিসেবে সম্মানিত করেছে।

তিনি একজনই জীবনে যা বলেছেন তা নিজে করে সমাজকে দেখিয়েছেন শ্রেষ্ঠ উপমা। এজন্যই আল্লাহ নিজে তাঁকে সার্টিফিকেট দিয়েছেন- ‘লাকাদ কানা লাকুম ফি রাসূলিল্লাহি উসওয়াতুন হাসানাহ্।’ অর্থাৎ ‘রাসূলুল্লাহ সা.-এর জীবনে তোমাদের জন্য রয়েছে সর্বোত্তম আদর্শ।’ (সূরা আহযাব : ২১) কেউ যদি কোনো আদর্শ খোঁজ করে তবে সে যেন সমাজ সংস্কারে, বাস্তব জীবনে, সাংগঠনিক জীবনে, পারিবারিক জীবনে, রাষ্ট্রীয় জীবনে, এমনকি সর্বাবস্থায় সর্বোত্তম আদর্শ হিসেবে তাঁকে গ্রহণ করতে পারে।

সমাজজীবনের সর্বক্ষেত্রে সুখ ও শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটি আদর্শ জীবনবিধান প্রতিষ্ঠা করে সর্বাধিক কৃতিত্বের আসনে সমাসীন হয়েছেন বিশ্বনবী মুহম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সা.। তিনি এমনি এক যুগ সন্ধিক্ষণে পৃথিবীতে আগমন করেন যখন আরবের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, নৈতিক ও ধর্মীয় অবস্থা অধঃপতনের চরম সীমায় পৌঁছে ছিল। চরম উচ্ছৃঙ্খলতা, পাপাচার ও ব্যভিচারে ভরপুর ছিল তখনকার আরবীয় সমাজ। সেই ঘোরতর অন্ধকারে ভূ-পৃষ্ঠে হিদায়াতের আলোকবর্তিকা নিয়ে ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দের ১২ রবিউল আউয়াল মক্কার সম্ভ্রান্ত কুরাইশ বংশে মা আমিনার গর্ভে রাসূলুল্লাহ সা.-এর শুভাগমন ঘটে।

মুহম্মদ সা.-কে শান্তি, মুক্তি, প্রগতি ও সামগ্রিক কল্যাণের জন্য বিশ্ববাসীর রহমত হিসেবে আখ্যায়িত করে পাঠিয়েছেন। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, ওমা আরসালনাকা ইল্লা রাহমাতাল্লিল আলামিন। ‘আমি আপনাকে সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য রহমত রূপে প্রেরণ করেছি।’ (সূরা আম্বিয়া : ১০৭)
তিনি প্রথমে সমাজ থেকে মিথ্যা উৎখাত করলেন। ‘জা আল-হাক্কু ওয়া জাহাকাল বাতিল ইন্নাল বাতিলা কানা যাহুকা’ যার সংক্ষেপ অনুবাদ হলো- সত্য সমাগত মিথ্যা বিতাড়িত। সত্যের আগমনে মিথ্যায় আর ঘুণে ধরা সমাজ কেঁপে উঠলো। সত্যের আগমনে মিথ্যার জং ধরা অন্যায় অপরাধের হোতারা নড়েচড়ে বসলেন। এই সত্য প্রতিষ্ঠার ফলে তিনি হয়ে উঠলেন আল-আমিন।

শান্তি প্রতিষ্ঠায় তাঁর ভূমিকা ছিলো অনন্য। অল্প বয়সেই তিনি পরিপক্ব মানুষের মনে শান্তির বীজ ঢুকিয়ে দিলেন। ফলে সাধারণ জনতা তাঁর অনুস্মরণ করতে শুরু করলো। তাদেরকে নিয়ে তিনি গোত্রে গোত্রে কলহ-বিবাদ, রক্তপাত ও অরাজকতা দূরীভূত করে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান আর সৌহার্দ্য-সম্প্রীতির ভিত্তিতে তিনি একটি কল্যাণমূলক আদর্শ সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। তিনি দল-মত-গোত্র নির্বিশেষ সকল সম্প্রদায়ের লোকের কাছে গ্রহণযোগ্য অনুকরণীয় ও আদর্শবান হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। তারাই তাঁর প্রশংসা করতে শুরু করলো। এমনিভাবে অল্প সময়ে তাঁর অনুপম চরিত্র-মাধুর্য ও সত্য নিষ্ঠার কথা বিশ্বের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছিল।

সকলকে সঙ্গে নিয়ে কিশোর বয়সে তিনি ‘হিলফুল ফুযুল’ নামক শান্তিসংঘ গঠন করে সামাজিক অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। আর্তমানবতার সেবা, অত্যাচারীকে প্রতিরোধ, মাজলুমকে সহযোগিতা করে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু করেন। কুরআনের বর্ণনা এভাবে- ‘মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ ওল্লাযিনা মায়াহু আশিদ্দাউ আলাল কুফফার, রুহামাউ বাইনাহুম।’ অর্থাৎ মুহাম্মদ হচ্ছেন আল্লাহর রাসূল আর যারা তাঁর সঙ্গী তারা (নীতির ব্যাপারে) কাফেরদের প্রতি অত্যন্ত কঠোর। নিজেদের মধ্যে তারা খুবই সহানুভূতিশীল। এই আয়াতে রাসূলের সময়োপযোগী কঠোরতা ও নমনীয়তার গুণের পরিচয় দেয়া হয়েছে।

আরব সমাজে ‘দাস প্রথা’ মানুষে মানুষে চরম শ্রেণী বৈষম্যের সৃষ্টি করেছিল। পরিচয় দু’ধরনের দাস আর প্রভু। প্রভুর আসনে যারা তারা নিজেদেরকে রাজাধিরাজ মনে করতো। নিজেরাই নিজেদের সুবিধা মতো আইন প্রণয়ন করতো আর তা দাস নামীয় মানুষের ওপর চাপিয়ে দিতো। মানুষে মানুষে কত ব্যবধান, মুদ্রার বিনিময়ে মানুষ আদান প্রদান। হযরত মুহাম্মদ সা. প্রথম মানুষ যিনি সমাজ থেকে দাসত্ব প্রথার বিলোপ করলেন। মানুষ শ্রমিক থাকতে পারে। পারিশ্রমিকের বিনিময়ে শ্রম দিবে এটা সহজ হয়ে উঠলো। এতে করে শ্রমিকের অধিকারও স্থাপিত হলো।

তৎকালীন সময়ে কন্যাশিশুকে আরবে জীবন্ত মাটির নিচে প্রোথিত করা হতো। হায়! মানবতা। নিজেদেরকে দুর্ভাগা মনে করতো, মেয়েদের জন্মকে অকল্যাণ বলে ধরা হতো। রাসূলুল্লাহ সা. এ জঘন্য প্রথা বন্ধ করেন। মেয়েদেরকে জান্নাতের টুকরা বলে সম্বোধন করেছেন।
রাসূলুল্লাহ সা. বলেন, যদি কারো একটিও কন্যা হয়, আর সে তার প্রতি ইহসান করতে থাকে তবে সেও ইনশা-আল্লাহ-তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবে। যেমন- ইমাম আহমাদ, ত্ববারানী ও হাকিম আবু হুরাইরাহ্ রা.-এর উদ্ধৃতিতে নবী সা. হতে বর্ণনা করেন, যে ব্যক্তি দু’কন্যা লাভ করল, অতঃপর সে তাদের উভয়ের প্রতি ইহসান করল, তার উভয়ে যতদিন তার নিকট থাকল বা সে যতদিন তাদের নিকট থাকল, তবে তারা উভয়ে তাকে অবশ্যই জান্নাতে প্রবেশ করাবে। (আল আদবুল মুফরাদ-৭৭)।

নবী সা. আরো বলেন, ‘যে ব্যক্তির তিন কন্যা হয়, আর সে তাদের সঙ্কট, দুঃখ ও সুখের ক্ষেত্রে ধৈর্যধারণ করে, তবে আল্লাহ তায়ালা তার সে কন্যাদের প্রতি করুণার কারণে তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। (বুখারি-১২৪৮)
নারীদের অমর্যাদা ও বিশৃঙ্খল জীবন যাপন আরব সমাজের অশান্তির কারণ ছিল। নারী জাতিকে নির্যাতন ও দুর্দশার হাত থেকে উদ্ধার করে তিনি বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেন, ‘মায়ের পদতলে সন্তানের বেহেশত। নারী-পুরুষের সমান অধিকার। (আহমাদ, নাসাঈ) এভাবে রাসূল সা. নারীদের মর্যাদা বৃদ্ধি করে সমাজকে পারিবারিক, আন্তরিক ও সুগঠিত করে তোলেন। তিনি এমন সমাজ কায়েম করলেন তার বহু পরেও হযরত ওমর কুফাবাসীদেরকে আদর্শ নারী উপহার দিতে সূরা নূর শিক্ষা দিতে বললেন। তিনি স্ত্রীদের কাছেও ছিলেন আদর্শের প্রতীক।

মদিনায় হিজরতের পর সেখানে আদর্শ ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, নাগরিকদের মধ্যে শান্তি-সম্প্রীতি বজায় রাখাসহ ‘মদিনা সনদ’ প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করেন। এছাড়া সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধে বাস্তব ক্ষেত্রে তিনি সন্ধিচুক্তি ভঙ্গকারী সন্ত্রাসীদের মদিনা থেকে বহিষ্কারের মতো দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করেন। দয়ালু নবী হওয়া সত্ত্বেও সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠায় তিনি ছিলেন আপসহীন। কোথাও কোথাও সার্বজনীন ক্ষমা প্রদর্শন করে তাদের সঙ্গে উদার মনোভাব দেখিয়ে সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেন। কঠিন যন্ত্রণা- দুঃখ- কষ্ট-বেদনা সহ্য করে মাতৃভূমি থেকে বিতাড়িত হয়ে পাথরের আঘাত সয়েও তিনি মানবতার জয়গান গেয়েছেন।

এমনি হাজারো মহৎ গুণে মহানবীর জীবন ছিল আদর্শে পরিপূর্ণ। পৃথিবীর সবচেয়ে সফল সুমহান ব্যক্তিত্ব; ক্ষমা, উদারতা ও করুণার প্রতীক ছিলেন এই মুহম্মদ সা.। অন্যের দুঃখ-কষ্টে তাঁর হৃদয় কেঁদে উঠতো, মানুষের বিপদ-আপদে তাঁর চিত্ত ব্যথিত হতো। সমাজে অভাবী, অনাহারী মানুষকে অকাতরে তিনি দান করতেন। নিজে ক্ষুধিত হয়েও সমাজে ক্ষুধার্ত মুসাফির, এতিম, মিসকিনকে তিনি অকাতরে বিলিয়ে দিয়েছেন নিজের খাদ্য, অন্ন বস্ত্র।
একবার এক সাহাবী এসে আরজ করলেন ইয়া রাসূলাল্লাহ তিন দিন ধরে কিছু খাই না কিছু খাওয়ার ব্যবস্থা করেন। রাসূলুল্লাহ তাঁর জামা উঠিয়ে তাকে দেখিয়ে দিলেন- নিজের পেটে পাথর বেঁধে রেখেছেন। এভাবে সকল মানুষের মনের মানুষ হয়ে উঠলেন। নিজের ক্ষমতা ঐশ্বর্য আর বাহাদুরির জন্য নয় তিনি কাজ করেছেন মানবতার জন্য।

চলমান বিশ্বসমাজ সংসারে তাঁর নীতি, সুবিচার ও সুশাসন কায়েম হলে পৃথিবীতে কোনো প্রকার সামাজিক অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা বিরাজমান থাকতো না। আজও সেই আদর্শ সমাজই আমরা পেতাম। তাঁর প্রতিটি কাজ ছিলো রুটিন মোতাবেক। তিনি ফজরের পর ঘুমাতেন না। জোহরের আগে খেয়ে মসজিদে যেতেন। আসরের সময় বিবিদের খবর নিতেন। মাগরিবের আগে দোয়া করতেন। এশার পরে মসজিদে দেরি করতেন না। এবং শেষ রাতে তাহাজ্জুদ পড়তেন। সোমবার বৃহস্পতিবারে রোযা রাখতেন।

বিশ্ব মানবতার নেতা বিশ্ব জনদরদি মহানবী হযরত মুহম্মদ সা. উপস্থিত অনুপস্থিত সকল মানুষের জন্য দোয়া করতেন। সবাইকে জ্ঞান অর্জনের জন্য আবশ্যিক করে দিয়েছেন। রোগীকে দেখতে যেতেন এবং সবাইকে একাজ করতে বলেছেন। নরম মেজাজে কথা বলতেন। কারো অনুমতি না নিয়ে তার সাথে সাক্ষাতে যেতে নিষেধ করেছেন। কাউকে ধোঁকা দিতে নিষেধ করেছেন। আরো বলেছেন- যে ধোঁকা দেয় সে তাঁর উম্মত নয়। যে অন্যের বাবা মাকে গালি দিল সে যেন নিজের বাবা মাকেই গালি দিল।

সমাজকে সুন্দর করতে একের পর এক নতুন নতুন পদক্ষেপ ও নিয়ম চালু করলেন। মানুষের চরিত্রকে সংশোধনের জন্য বিভিন্ন উপায় অবলম্বন করেছেন। তিনি বলেছেন কেয়ামতের দিন যে জিনিসটি মোমিনদের পাল্লাকে ভারী করবে সেটি হচ্ছে সুন্দর চরিত্র। এই নবীই বলতে পেরেছেন, আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন আপনি বলুন- ইন কুনতুম তুহিব্বুনাল্লাহা ফাত্তাবিঊনি, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাসো তবে আমার অনুসরণ করো। আর আল্লাহ ঘোষণা করে দিয়েছেন, ইন্নাকা লাআলা খুলুকিন আযিম।

আল্লাহ নিজেই মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠ মানুষ হিসেবে তাঁকে সৃষ্টি করেছেন। হযরত আদম (আ) থেকে মুহম্মদ সা. পর্যন্ত সব নবীই তাঁর নাম নিয়ে দোয়া করতেন। আল্লাহ নিজেই এত সম্মান দিয়েছিলেন যে তিনি কখনো নবীর নাম ধরে ডাকেননি। তিনি সম্মান করেছেন সর্বোচ্চ। তিনি জগতের শ্রেষ্ঠ মানুষ হওয়ার পরও তিনি ঘোষণা করেছেন, ‘আনা বাশারুম মিসলিকুম’ আমি তোমাদের মতই মানুষ।

সর্বক্ষেত্রে খোদাভীতি দেখিয়েছেন। একটি কথাও তিনি নিজের মনগড়া বলেননি। সকল ক্ষেত্রে জবাবদিহিতার নিয়মও চালু করেছিলেন ফলে কোনো রকমের ব্যক্তি চিন্তা কোনো কাজে লাগাতে পারেননি। একবার সন্ধ্যায় হযরত ওমর রা.-এর কাছে একজন লোক দেখা করতে এলেন। হযরত ওমর তাঁর রাষ্ট্রীয় কাজ বন্ধ করে বাতি নিভিয়ে দিয়ে বললেন, আপনার কথা বলুন। লোকটি অবাক হয়ে জানতে চাইলেন- হযরত আপনি বাতি নিভিয়ে দিলেন কেন? তিনি অকপটে বলে দিলেন সেটা ছিলো আমার রাষ্ট্রীয় কাজ। আল্লাহ যদি আমাকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করেন কেন রাষ্ট্রীয় তেল ব্যবহার করলাম। তখন কি জবাব দেবো?

কবি ফররুখ আহমদ তাঁর ‘সিরাজাম মুনীরা মুহম্মদ মুস্তফা’ কবিতায় লিখেছেন –
তোমার আসার পথ চেয়ে চেয়ে আবেগে সকল আকাশ কাঁপে,
মুক্তপথ, হে আলো! ধন্য ধরণী তোমার আবির্ভাবে।
কে আসে, কে আসে সাড়া পড়ে যায়।
আল্লামা শেখ সাদী (রহ) লিখেছেন-
‘বালাগাল উলা বিকামালিহি কাশাফাদ্দুজা বিজামালিহি,
হাসানাত জামিউ খেসালিহি সাল্লু আলাইহি ওয়া আলিহি।’
‘মানবতার শীর্ষে তুমি হলে উপনীত,
রূপের ছটায় দূর করিলে আঁধার যত।
সকল গুণের সমাবেশে চরিত্র মহান,
তুমি ও তোমার পরিবার পরে হাজার সালাম।’
রাসূলুল্লাহ সা. একমাত্র মানব যিনি সর্বপ্রথম বিশ্ববাসীকে সন্ত্রাসও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ উপহার দিয়ে ইসলামের সাম্য, মৈত্রী, ঐক্য, শান্তি-শৃঙ্খলা এবং নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে দিয়েছেন। এবং নিজেই বলেছেন খায়রুল কুরুনি কারনি ‘আমার যুগ হলো শ্রেষ্ঠ যুগ’। তাঁর অনুপম জীবন চরিত ও সমাজ সংস্কারমূলক কর্মধারা সব মানুষের জন্য অনুসরণীয় ও অনুকরণীয় এক চিরন্তন আদর্শ।
সবচেয়ে আশ্চর্য হলো অমুসলিম পণ্ডিতগণও তাঁর ব্যাপারে নিশ্চিত বিশ্বস্ত ছিলো যে তিনি একক নেতৃত্বে আদর্শের সকল গুণাবলিতে পরিপূর্ণ ছিলেন।

ড. গেসটাউলি : তিনি ‘আরব সভ্যতা’ গ্রন্থে স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘ইসলামের সেই উম্মি নবীর ইতিবৃত্ত বড় আশ্চর্যজনক। তৎকালে কোনো বৃহৎশক্তি যে জাতিকে নিজের আওতায় আনতে পারেনি, সেই উচ্ছৃঙ্খল জাতিকে তিনি এক আওয়াজে বশীভূত করেন। অতঃপর সেই জাতিকে এমন স্তরে নিয়ে যান, যার মাধ্যমে পরাশক্তিগুলো তছনছ হয়ে যায়। বর্তমানকালেও সেই উম্মি নবী কবরে অবস্থান করে লাখ লাখ আল্লাহর বান্দাকে ইসলামের কালেমার ওপর অটল রেখেছেন’ (মারেফুল কুরআন)।

থমাস কার্লাইল : তিনি বলেছেন, ‘তাঁর (মুহাম্মদ সা.) চিন্তাধারা ছিল অতি পবিত্র এবং চরিত্র ছিল অসম্ভব উন্নত।
জর্জ বার্নার্ড শ : তিনি অতি তেজস্বী ভাষায় মহানবী সা.-এর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন- আমাদের মধ্যযুগীয় পাদ্রিরা হয় অজ্ঞতার কারণে, দুঃখজনক বিদ্বেষের ফলে পয়গাম্বরের মহান ব্যক্তিত্ব এবং তাঁর প্রচারিত ইসলাম ধর্মকে কালো অবয়বে উপস্থাপন করেছেন। আমি পূর্ণ দিবাদৃষ্টিতে এ কথা ঘোষণা করতে চাই যে, মুহাম্মদ সা. ছিলেন মানবজাতির পথপ্রদর্শক ও মুক্তিদাতা। আজ যেভাবে পৃথিবী অশান্তি অন্যায় অত্যাচারে ডুবে আছে। প্রতিটি মনে হাহাকার তখনি প্রয়োজন আমাদের মহানবীর মহান আদর্শ। ছোট বড় শিশু বৃদ্ধ, সকল মানুষের জন্য রয়েছে মহানবীর জীবনী। সকল কাজে, সকল স্তরে ন্যায় ও মুক্তির লক্ষ্যে আমাদের সমাজে তাঁর জীবনী অনুসরণ জরুরি হয়ে পড়েছে। মানবজাতির মধ্যে ভ্রাতৃত্ব-সংহতি ও সৌহার্দ্য-সম্প্রীতি সুরক্ষা এবং সমাজ থেকে অন্যায় অবিচার দূরীভূত করে শান্তি প্রতিষ্ঠায় বিশ্বমানবতার জন্য মহান অনুপ্রেরণার উৎস।
জগতে হিংসা-বিদ্বেষ, দুর্নীতি, শোষণ, বৈষম্য ও বিভ্রান্তি দূরীভূত হয়ে মানবসমাজে শান্তি ও সংহতি প্রতিষ্ঠায় ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যে সর্বক্ষেত্রে মহানবী সা.-এর জীবনাদর্শে রয়েছে বিশ্ব শান্তিময় সমাজব্যবস্থার রূপরেখা।

লেখক : অধ্যাপক, গবেষক ও প্রবন্ধকার

SHARE

Leave a Reply