সফল এবং ক্ষতিগ্রস্তদের পরিচয় -অধ্যাপক মুজিবুর রহমান

সফলতা সম্পর্কে আমাদের ধারণা : আমাদের অনেকেই মনে করেন বিপুল পরিমাণ সম্পদ অর্জনের নাম সফলতা। আবার অনেকের কাছে বিপুল পরিমাণ বিত্ত-বৈভবের মালিক হওয়া কিংবা বিপুল সুনাম অর্জনের নামই সফলতা। এখানে যার কয়েকটা বাড়ি আছে, কয়েকটা গাড়ি আছে আর সেই সাথে আছে অনেক টাকা, আর অনেক প্রভাব অনেক জনবল, মানুষ তাকেই খুব সফল লোক মনে করে থাকে। মানুষের এ ধারণা মোটেই ঠিক নয়। ভালোভাবে খোঁজ নিলে দেখা যাবে যাকে সফল ও সুখী মানুষ বলে মনে করা হচ্ছে হয়ত রাতে তার দুশ্চিন্তায় ঘুমই হয় না, শারীরিক মানসিক দিক দিয়ে সবচেয়ে অসুখী একটা মানুষ। প্রকৃতপক্ষে উপরে বর্ণিত বৈশিষ্ট্যগুলোর একটিও মুমিনের জন্য ইহকালীন ও পরকালীন জীবনের সফলতার মাপকাঠি নয়, মাপকাঠি হতে পারে না। পার্থিব জীবনে আমরা সফলতা বলতে বুঝি স্কুল, কলেজ জীবনে ভালো রেজাল্ট করা। তারপর ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার হওয়া বা বিসিএস ক্যাডার হওয়া। অনেকে সফল ব্যবসায়ী বা শিল্পপতিও হতে চায়। কেউ রাজনীতিবিদ, চেয়ারম্যান, এমপি, মন্ত্রী কেউবা অর্জন করতে চায় আরো বেশি জনপ্রিয়তা। এই সফলতা অর্জন করতে গিয়ে শুধু দৌড়াতে হয় প্রবৃত্তির খাহেশে। কেউ সফল হয় কেউ বা ব্যর্থ হয়। যারা দুনিয়াতে সফল হন তারা কতদিনই বা এই সফলতা ধরে রাখতে পারেন? সফল হতে যদি আপনার ৩০ বছর লাগে তবে ভোগ করতে সময় পাবে বড়জোর ৪০ বছর! তারপর তো চলে যেতেই হবে আখেরাতের চিরস্থায়ী গন্তব্যে। তখন এই সফলতার কিছুই সাথে যাবে না। তাহলে কি লাভ হলো এই ছোট্ট জীবনে এত প্রাচুর্য অর্জন করে? বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় দুনিয়াবি জীবনে সফলতা অর্জন করতে গিয়ে আখিরাতের জন্য কোনো কাজই করা হয় না! অনেকে আখেরাতের ক্ষতি করেও দুনিয়া লাভ করার চেষ্টা করে।

আল কুরআনের ঘোষণায় চূড়ান্তভাবে সফল যারা-একজন মুসলিমের জেনে রাখা উচিত পরকালের অনন্ত জীবনেই তার প্রকৃত সফলতা হবে এবং যারা সেখানে আগুন থেকে বাঁচতে পারবে ও জান্নাতি হবে তারাই চূড়ান্তভাবে সফল। এজন্য আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন- “প্রত্যেক প্রাণকেই মরণের স্বাদ নিতে হবে। কিয়ামতের দিন তোমাদের কর্মফল পুরো করে দেয়া হবে। যাকে আগুন থেকে দূরে রাখা হবে ও জান্নাতে যেতে দেয়া হবে সে-ই সফলকাম। আর পার্থিব জীবন তো প্রতারণার সামগ্রী ছাড়া আর কিছুই নয়।” (সূরা আলে ইমরান : ১৮৫)

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেছেন: “যে ব্যক্তি কুরআনুল মাজিদ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকবে তার জীবন হবে সঙ্কীর্ণ ও অন্ধ অবস্থায় তার হাশর হবে। সে বলবে আমি দেখতে পেতাম, আমাকে কেন অন্ধ করা হলো? আল্লাহ বলবেন তুমি আমার আয়াত ভুলেছিলে সেজন্য আজকে আমি তোমাকে ভুলে গেছি।” (সূরা ত্বহা : ১২৪-১২৬)

আমরা বলে থাকি, আল্লাহ আপনাকে সুস্থ রাখুন দুনিয়া ও আখেরাতে কল্যাণ দান করুন, সফলতা দান করুন। কিন্তু কাদেরকে আল্লাহ তায়ালা সফলতা দান করবেন বা করবেন না তা আমাদের জানতে হবে। আল্লাহর কথা হলো যারা আগুন থেকে রক্ষা পাবে এবং জান্নাতে গমন করতে পারবে তারাই সফল, আর যারা আগুন থেকে বাঁচতে পারবে না এবং জান্নাতে যেতে পারবে না তারাই ব্যর্থ হবে, ক্ষতিগ্রস্ত হবে ।
আল কোরআনে আল্লাহ মানবজীবনের সফলতার মানদণ্ড ঘোষণা করেছেন- সত্যিকারের সফল কারা। তিনি বলেন,
“তিনি মৃত্যু ও জীবন সৃষ্টি করেছেন যাতে তিনি তোমাদেরকে পরীক্ষা করতে পারেন, কে তোমাদের মধ্যে আমলের দিক থেকে উত্তম। আর তিনি মহাপরাক্রমশালী, অতিশয় ক্ষমাশীল।” (সূরা মুলক : ২)।

হিসাবের জন্য সব সংরক্ষিত আছে-
‘আমিই অবশ্যই একদিন মৃতদেরকে জীবিত করবো; তারা যা কিছু কাজ করেছে তা সবই আমি লিখে রাখি; যা কিছু তারা আগে পাঠিয়েছে এবং যা পিছনে রেখে যায়। আর প্রতিটি বস্তুকেই আমি সুস্পষ্ট কিতাবে সংরক্ষণ করে রেখেছি।’ (সূরা ইয়াসিন : ১২)।

সূরা কাহাফের ৪৭-৪৯ নং আয়াতে ‘আল্লাহ তায়ালা কিয়ামতের ভয়াবহতার বর্ণনা দিচ্ছেন। সেই দিন যেসব বিস্ময়কর বড় বড় কাজ সংঘটিত হবে, তিনি সেগুলো বর্ণনা করছেন। সেই দিন আকাশ ফেটে যাবে এবং পাহাড়-পর্বত উড়তে থাকবে যদিও তোমরা একে জমাটবদ্ধ দেখতে পাচ্ছ, কিন্তু ঐ দিন তা মেঘমালার মত দ্রুতবেগে চলতে থাকবে এবং ধুনো তুলোর মতো হয়ে যাবে। যমিন সম্পূর্ণরূপে সমতল ভূমিতে পরিণত হবে। তাতে কোনো উঁচু-নীচু থাকবে না। এই যমিনে না থাকবে কোন বাড়িঘর, না থাকবে কোন ছাউনি। কোনো আড়াল ছাড়াই সমস্ত সৃষ্টজীব মহামহিমান্বিত আল্লাহর সামনে হয়ে যাবে। কেউই তার থেকে কোথাও লুকিয়ে থাকতে পারবে না। কোথাও কোনো আশ্রয়স্থল ও মাথা লুকানোর জায়গা থাকবে না। কোন গাছ-পালা, পাথর ও তৃণ-লতা দেখা যাবে না। প্রথম থেকে নিয়ে শেষ পর্যন্ত যত লোক রয়েছে সবাই একত্রিত হবে। ছোট বড় কেউই অনুপস্থিত থাকবে না। সব মানুষ আল্লাহ তায়ালার সামনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে যাবে। রূহ ও ফেরেশতামণ্ডলী কাতারবন্দী হয়ে দাঁড়াবেন। কারো কোন কথা বলার সাহস হবে না। একমাত্র তারাই কথা বলতে পারবেন যাদেরকে আল্লাহ কথা বলার অনুমতি দান করবেন এবং তারাও সঠিক কথাই বলবেন। কিয়ামতকে যারা অস্বীকার করতো তাদেরকে সেই দিন বলা হবে: দেখো, যেমন ভাবে আমি তোমাদেরকে প্রথমবার সৃষ্টি করেছিলাম, তেমনিভাবে দ্বিতীয়বার সৃষ্টি করে আমার সামনে দাঁড় করিয়েছি। তোমরা তো এটা অস্বীকার করতে? আমলনামা তাদের সামনে হাজির করে দেয়া হবে, যাতে ছোট বড়, প্রকাশ্য ও গোপনীয় সমস্ত আমল লিপিবদ্ধ থাকবে। পাপীরা তাদের দুষ্কর্মগুলো দেখে ভীত বিহ্বল হয়ে বলবে: হায়! আমরা আমাদের আয়ুকে কি অবহেলায় না কাটিয়ে দিয়েছিলাম। বড়ই অনুতাপ যে, আমরা দুনিয়ায় শুধু দুষ্কার্যেই লিপ্ত থাকতাম। দেখো, এমন কোন কাজ নেই যা এই কিতাবে (আমলনামায়) লিখা পড়ে নাই। বরং ছোট-বড় সমস্ত গুনাহর কাজ এতে লিপিবদ্ধ রয়েছে।

বর্ণিত আছে যে, সাহাবীগণ বলেন : “হুনায়েনের যুদ্ধ শেষে আমরা মদিনায় প্রত্যাবর্তন করছিলাম। পথিমধ্যে এক ময়দানে আমরা সওয়ারি থেকে অবতরণ করি। রাসূলুল্লাহ সা. আমাদেরকে বলেন: “যাও লাকড়ি, খড়ি, ডাল-পাতা, কঞ্চি, ছিটকি যা পাবে কুড়িয়ে নিয়ে এসো।” আমরা এদিক ওদিক ছুটে পড়লাম এবং ডাল, পাতা, কাঁটা খোচ, লাকড়ি, যা কিছু কুড়িয়ে নিয়ে এলাম এবং এগুলোর একটি বড় ঢেরি হয়ে গেল। এ দেখে রাসূলুল্লাহ সা. বললেন: “এইভাবেই গুনাহ্ জমা হয়ে ঢেরি হয়ে যায়। আল্লাহকে তোমরা ভয় করতে থাকো এবং ছোট বড় গুনাহ হতে পরহেজ করো। সবই লিখে নেয়া হচ্ছে ও গণনা করা হচ্ছে। ভালো মন্দ যে যা কিছু করেছে তা সে বিদ্যমান পাবে। (এ হাদিসটি ইমাম তিবরানী রহ: বর্ণনা করেছেন)।
সম্পদ উপার্জনের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত থাকা : “প্রাচুর্যের লালসা তোমাদেরকে গাফেল রাখে, যতক্ষণ না তোমরা কবরে উপনীত হও। এটা কখনও উচিত নয়। তোমরা সত্বরই জেনে নেবে। অতঃপর এটা কখনও উচিত নয়। তোমরা সত্বরই জেনে নেবে। কখনই নয়; যদি তোমরা নিশ্চিত জানতে। তোমরা অবশ্যই জাহান্নাম দেখবে।” (সূরা তাকাসুর : ১-৬) তাফসির ইবনে কাসির থেকে গৃহীত সংক্ষিপ্ত বক্তব্য: “সূরা তাকাসুর মানুষকে দুনিয়ার প্রতি ভালোবাসা ও বৈষয়িক স্বার্থ পূজার অশুভ পরিণাম সম্পর্কে সতর্ক করে দেয়া হয়েছে। এই কারণে মানুষ মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত বেশি বেশি ধন-সম্পদ আহরণ, পার্থিব লাভ, স্বার্থ উদ্ধার, ভোগ, প্রতিপত্তি, ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব লাভ এবং তার মধ্যে প্রতিযোগিতামূলকভাবে একজন আর একজনকে টপকে যাওয়ার প্রচেষ্টা চালিয়ে যায়। আর এসব অর্জন করার ব্যাপারে অহঙ্কারে মত্ত থাকে। এগুলো শুধুমাত্র নিয়ামত নয় বরং এগুলো তোমাদের জন্য পরীক্ষার বস্তুও। এগুলোর মধ্য থেকে প্রত্যেকটি নিয়ামত সম্পর্কে তোমাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন: দুনিয়ার প্রতি ভালোবাসা, দুনিয়া পাওয়ার প্রচেষ্টা তোমাদেরকে আখেরাতের প্রত্যাশা এবং সৎকাজ থেকে বেপরোয়া করে দিয়েছে। তোমরা এ দুনিয়ার ঝামেলাতেই লিপ্ত থাকবে, হঠাৎ মৃত্যু এসে তোমাদেরকে কবরে পৌঁছিয়ে দিবে।
হযরত হাসান বসরী (রহ) বলেন যে, মানুষের ধন সম্পদ ও সন্তানসংখ্যা বৃদ্ধির লালসা তার মৃত্যুর চিন্তাকে দূরে নিক্ষেপ করেছে।
সহীহ বুখারী শরীফের কিতাবুর রিকাকে আছে যে, হযরত উবাই ইবনে কাব রা: বলেন: আমরা এটাকে কুরআনের আয়াত মনে করতাম, বনি আদমের যদি এক উপত্যকা ভর্তি সোনা থাকে, এটাকে কুরআনের আয়াত মনে করতাম, এমতাবস্থায় এ সূরাটি অবতীর্ণ হয়।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে শুখায়ের রা. হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন: আমি যখন নবী করীম সা.-এর দরবারে হাজির হই তখন তিনি এ আয়াত পাঠ করছিলেন। তিনি বলছিলেন: “বনি আদম বলছে: আমার, মাল, আমার মাল। অথচ তোমার মাল শুধু সেগুলো যেগুলো তুমি খেয়ে শেষ করেছে এবং পরিধান করে ছিঁড়ে ফেলেছ। অথবা সাদকা করে অবশিষ্ট রেখেছো।” সহীহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে অতিরিক্ত এ কথাও রয়েছে: “এ ছাড়া অন্য যা কিছু রয়েছে সেগুলো তুমি মানুষের জন্য রেখে চলে যাবে।”
সহীহ বুখারিতে হযরত আনাস ইবনে মালিক রা. হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: “মৃত ব্যক্তির সাথে তিনটি জিনিস যায়, তার মধ্যে দুটি ফিরে আসে, শুধু একটি সাথে থেকে যায়। আত্মীয়-স্বজন, ধন-সম্পদ এবং আমল। প্রথমোক্ত দুটি ফিরে আসে শুধু আমল সাথে থেকে যায়।”
হযরত যাহহাক (রহ) একটি লোকের হাতে একটি দিরহাম দেখে তাকে জিজ্ঞেস করেন: “এ দিরহাম কার?” উত্তরে লোকটি বললো: “আমার।” তখন হযরত যাহহাক (রহ) তাকে বললেন: “এটা তোমার তখনই হবে যখন তুমি এটাকে সৎকাজে অথবা কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনার্থে (আল্লাহর পথে) খরচ করবে।”

এরাই পরকালের বিনিময়ে পার্থিব জীবন ক্রয় করেছে। অতএব এদের শাস্তি লঘু হবে না এবং এরা সাহায্যও পাবে না। (সূরা বাকারা : ৮৬)

“মানবকুলকে মোহগ্রস্ত করেছে স্ত্রী, সন্তান-সন্ততি, রাশিকৃত স্বর্ণ-রৌপ্য, চিহ্নিত ঘোড়া, গবাদি পশুরাজি এবং ক্ষেত-খামারের মত আকর্ষণীয় বস্তুসামগ্রী। এসবই হচ্ছে পার্থিব জীবনের ভোগ্যবস্তু। আল্লাহর নিকটই হলো উত্তম আশ্রয়। বলুন, আমি কি তোমাদেরকে এসবের চাইতেও উত্তম বিষয়ের সন্ধান বলবো?-যারা আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহর নিকট তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত, যার তলদেশে প্র¯্রবণ প্রবাহিত-তারা সেখানে থাকবে অনন্তকাল। (সূরা আলে ইমরান : ১৪-১৫)

“হে মানুষ! আল্লাহ প্রতিশ্রুতি সত্য। সুতরাং পার্থিব জীবন যেন কিছুতেই তোমাদেরকে প্রতারিত না করে এবং কোন প্রবঞ্চক যেন কিছুতেই আল্লাহ সম্পর্কে তোমাদেরকে প্রবঞ্চিত না করে।” (সূরা ফাত্বির : ৫)

“জান্নাতকে উপস্থিত করা হবে আল্লাহভীরুদের নিকটে। তোমাদের প্রত্যেক অনুরাগী ও স্মরণকারীকে এরই প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল। যে না দেখে দয়াময় আল্লাহ তায়ালাকে ভয় করত এবং বিনীত অন্তরে উপস্থিত হতো। তোমরা এতে শান্তিতে প্রবেশ কর। এটাই অনন্তকাল বসবাসের জন্য প্রবেশ করার দিন। তারা তথায় যা চাইবে, তাই পাবে এবং আমার কাছে রয়েছে আরও অধিক। (সূরা ক্বাফ : ৩১-৩৫)

“কেউ জানে না তার জন্য কৃতকর্মের কী কী নয়ন-প্রীতিকর প্রতিদান লুক্কায়িত আছে।” (সূরা সাজদাহ : ১৭) ইয়া আল্লাহ, দুনিয়ার ছলনা থেকে আমাদের হেফাজত করুন।

অন্তর খারাপ হতে না দেয়া : মুহাম্মাদ সা.কে বলেন “সাবধান! তোমাদের দেহে একটি গোশতের টুকরা আছে, যখন টুকরাটি ঠিক থাকে তখন সমগ্র দেহ ঠিক থাকে, আর যখন গোশতের টুকরাটি খারাপ হয় তখন তোমাদের পুরো দেহ খারাপ হয়ে যায়, আর তা হলো, অন্তর। এটা শক্তিশালী দুর্গের মতো, যার আছে অনেকগুলো দরজা, জানালা। এ দুর্গকে রক্ষা করতে হলে, তার দরজা ও প্রবেশদ্বারসমূহে অবশ্যই পাহারা দিতে হবে। দৃষ্টান্তস্বরূপ হিংসা, বিদ্বেষ, লোভ-লালসা, কৃপণতা, রাগ, ক্ষোভ, শত্রুতা, খারাপ ধারণা, দুনিয়ার মহব্বত, তাড়াহুড়া করা, দুনিয়ার ভোগ-বিলাস ও চাকচিক্যের সাথে সম্পৃক্ত হওয়া, ঘর-বাড়ি এবং নারী-গাড়ির মোহে পড়া ইত্যাদি। আল্লামা ইবনে কাসীর (রহ) বলেন, “আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তার স্বীয় রাসূল মুহাম্মাদ সা.কে বলেন, হে মুহাম্মাদ তুমি মানবজাতির জন্য দুনিয়ার জীবনের উদাহরণ তুলে ধর! তাদের বলে দাও! দুনিয়ার জীবন হলো সাময়িক ও ক্ষণস্থায়ী তা একদিন শেষ ও ধ্বংস হয়ে যাবে, দুনিয়ার কোনো কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। যেমন, আমি মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আসমান থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করি তখন পানি জমিনে ছিটানো বীজের সাথে মিশে তা থেকে ফসল উৎপন্ন হয়ে তা যৌবনে উপনীত হয়। তারপর সবুজ শ্যামল হয়ে তা এক অপরূপ সৌন্দর্যে পরিণত হয়। একজন কৃষক এ অপরূপ সৌন্দর্য অবলোকনে মুগ্ধ হয়। কিন্তু তা চিরস্থায়ী হয় না। তারপর নেমে আসে বিপর্যয় ও দুর্ভোগ। পানি শুকিয়ে যাওয়ার পর ফসল ধীরে ধীরে শুকিয়ে খড়-কুটে পরিণত হয়। বাতাস তখন এদিক সেদিক উড়িয়ে নিয়ে যায়, কখনো ডান দিকে নেয়, আবার কখনো বাম দিকে নেয়। বাতাসের গতিরোধ করার মতো নিজস্ব কোনো ক্ষমতা ফসলের থাকে না। রাসূল সা.কে প্রেরণ করা হয়েছে মানবজাতিকে দুনিয়ার অন্ধকার থেকে বের করে আলোর সন্ধান দেখাতে। দুনিয়ার কোনো কিছুর প্রতি তার কোনো আকর্ষণ ছিল না। তাকে দুনিয়ার নারী, বাড়ি, গাড়ি ও রাজত্ব সবকিছুই দেয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তিনি কোনো কিছুই গ্রহণ করেননি। তিনি বলেছিলেন আমি একবেলা খাব অপর বেলা উপবাস থেকে তার নিয়ামতের কদর বুঝতে পারবো-এটাই আমার নিকট বেশি পছন্দনীয়। তিনি সাদাসিধে জীবন-যাপন করতে পছন্দ করতেন। কোনো প্রকার উচ্চাভিলাষ ও রঙ তামাশা করতে পছন্দ করতেন না।
উমর রা.-এর কান্না : উমর রা. রাসূল সা.-এর অবস্থার বর্ণনা দিয়ে বলেন, “একদিন আমরা রাসূল সা.কে খেজুর পাতার বিছানায় শুয়ে থাকতে দেখি। খেজুর পাতার বিছানার ওপর আর কিছুই বিছানো ছিল না, তার মাথার নিচে একটি চামড়ার বালিশ ছিল। পায়ের দিক দিয়ে একটি উন্মুক্ত তলোয়ার আর মাথার পার্শ্বে খাবারের একটি পোঁটলা। আমি তার মুবারক দেহে বিছানার দাগ দেখে কাঁদতে আরম্ভ করলাম। রাসূল সা. আমাকে জিজ্ঞাসা করে বললেন, তুমি কী কারণে কাঁদছ উমর? আমি বললাম হে আল্লাহর রাসূল! রোম ও পারস্যের রাজা-বাদশাহরা দুনিয়ার কত শান শওকত নিয়ে থাকে, আর আপনি আল্লাহর রাসূল; উভয় জাহানের বাদশাহ হয়ে একটি খেজুর পাতার বিছানায় শুয়ে আছেন। আমার কথা শোনে রাসূল সা. বললেন, তাদের জন্য দুনিয়া, আমাদের জন্য আখিরাত হওয়াতে তুমি কি সন্তুষ্ট নও?”
ধন-সম্পদ ও ক্ষমতার লোভ মারাত্মক : কা’ব ইবন মালেক রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সা. বলেন, “দুটি ক্ষুধার্ত বাঘকে কোনো ছাগলের পালের মধ্যে ছেড়ে দেওয়া, ছাগলের পালের জন্য ততটা ক্ষতিকর নয়, যতটা ক্ষতিকর হয় একজন মানুষের দীনের জন্য, যখন তার মধ্যে ধন-সম্পদ, ইজ্জত-সম্মান ও ক্ষমতার লোভ থাকে। এরকম দুনিয়ার জীবনে সফলতার জন্য দৌড়াতে গিয়ে যারা আখিরাতকে বেমালুম ভুলে গেছে তাদের জন্য নাজিল হয়েছে সূরা তাকাসুর।
মাল দান করলে নিজের অধীনে আসে,
নইলে মালের গোলাম হতে হয়

“যখন তুমি মাল (আল্লাহর পথে খরচ না করে) ধরে রাখবে তখন তুমি হবে তার মালিকানাধীন। আর যখন তুমি তা খরচ করবে তখন ঐ মাল তোমার মালিকানাধীন হয়ে যবে।” (এটা ইবনে আসাকির রহ. বর্ণনা করেছেন)
মুসনাদে ইবনে আবি হাতিমে হযরত ইবনে বুরাইদাহ রা. হতে বর্ণিত আছে যে, এই সূরাটি আনসারের দু’টি গোত্র বানু হারিসাহ্ এবং বানু হারিসের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। তারা একে অপরের উপর গর্ব প্রকাশ করতে থাকে। তারা বলে: দেখো, আমাদের মধ্যে অমুক ব্যক্তি এ রকম বাহাদুর, এ রকম অর্থ-সম্পদের অধিকারী ইত্যাদি। জীবিত ব্যক্তিদের ব্যাপারে এ রকম গর্ব প্রকাশ করার পর বলে: চলো, কবরস্থানে যাই। সেখানে তারা নিজ নিজ সর্দারের কবরের প্রতি ইশারা করে কথাগুলো বলতো।
হযরত কাতাদা (রহ) বলেন, মানুষ নিজের প্রাচুর্যের ব্যাপারে অহঙ্কার করছে আর একে একে কবরে গিয়ে প্রবেশ করছে। অর্থাৎ প্রাচুর্যের আকাক্সক্ষা তাকে উদাসীনতায় নিমজ্জিত রেখেছে এমতাবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছে এবং সমাধিস্থ হয়েছে।
এরপর আল্লাহ্ তায়ালা হুমকির সুরে দু’দুবার বলেন, কখনো নয়, শিগগিরই তোমরা জানতে পারবে। আবারও বলি: কখনো নয়, অচিরেই তোমরা জানতে পারবে।
অতঃপর আল্লাহ্ তায়ালা বলেন: এরপর অবশ্যই সেই দিন তোমাদেরকে নিয়ামত সম্বন্ধে প্রশ্ন করা হবে। স্বাস্থ্য, সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য নিরাপত্তা, রিযিক ইত্যাদি সকল নিয়ামত সম্বন্ধেই প্রশ্ন করা হবে। এসব নিয়ামতের কতটুকু কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়েছে তা জিজ্ঞেস করা হবে।
মুসনাদে ইবনে আবি হাতিমে হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রা. হতে বর্ণিত আছে যে, একদা ঠিক দুপুরে রাসূলুল্লাহ্ সা. ঘর হতে বের হন। কিছু দূর যাওয়ার পর দেখেন যে, হযরত আবু বকর রা.ও মসজিদের দিকে আসছেন। রাসূলুল্লাহ্ সা. তাকে জিজ্ঞেস করলেন: “এ সময়ে বের হলে কেন?” উত্তরে হযরত আবু বকর রা. বললেন: “যে কারণ আপনাকে ঘর হতে বের করেছে ঐ একই কারণ আমাকেও ঘর হতে বের করেছে।” ঐ সময়ে হযরত উমর রা.ও এসে তাঁদের সাথে মিলিত হন। তাঁকে রাসূলুল্লাহ্ সা. জিজ্ঞেস করলেন: “এই সময়ে বের হলে কেন?” তিনি জবাবে বললেন: “যে কারণ আপনাদের দু’জনকে বের করেছে ঐ কারণই আমাকেও বের করেছে।” এরপর রাসূলুল্লাহ্ সা. তাদের সাথে আলাপ শুরু করলেন। তিনি তাদেরকে বললেন: “সম্ভব হলে চলো, আমরা ঐ বাগান পর্যন্ত যাই। ওখানে আহারেরও ব্যবস্থা হবে এবং ছায়াদানকারী জায়গাও পাওয়া যাবে। তারা বললেন, “ঠিক আছে, চলুন।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ সা. তাদেরকে সঙ্গে নিয়ে আবুল হায়সাম রা. নামক সাহাবীর বাগানের দরজায় উপনীত হলেন। রাসূলুল্লাহ সা. দরজায় গিয়ে সালাম জানালেন এবং ভিতরে প্রবেশের অনুমতি চাইলেন। উম্মে হায়সাম দরজার ওপাশেই দাঁড়িয়ে সবকিছু শুনতে পাচ্ছিলেন, কিন্তু উচ্চস্বরে জবাব দিচ্ছিলেন না। তিনি আল্লাহর রাসূল সা.-এর নিকট থেকে শান্তির দু’আ বেশি পরিমাণে পাওয়ার লোভেই এ নীরবতা পালন করছিলেন। তিনবার সালাম জানিয়েও কোনো জবাব না পেয়ে রাসূলুল্লাহ্ সা. সঙ্গীদ্বয়সহ ফিরে আসতে উদ্যত হলেন। এবার উম্মে হায়সাম রা. ছুটে গিয়ে বললেন: “হে আল্লাহর রাসূল সা.! আপনার আওয়াজ আমি শুনছিলাম, কিন্তু আপনার সালাম বেশি বেশি পাওয়ার লোভেই উচ্চস্বরে জবাব দেইনি। এখন আপনি চলুন।” রাসূলুল্লাহ্ সা. হযরত উম্মে হায়সাম রা.-এর এ ব্যবহারে বিরক্ত হলেন না। জিজ্ঞেস করলেন: “আবু হায়সাম রা. কোথায়?” উম্মে হায়সাম রা. উত্তরে বললেন: “তিনি নিকটেই আছেন, পানি আনতে গেছেন। এক্ষুনি তিনি এসে পড়বেন, আপনি এসে বসুন!” রাসূলুল্লাহ্ সা. এবং তাঁর সঙ্গীদ্বয় বাগানে প্রবেশ করলেন। উম্মে হায়সাম রা. ছায়া দানকারী একটি গাছের তলায় কিছু বিছিয়ে দিলেন। রাসুলুল্লাহ সা. স্বীয় সঙ্গীদ্বয়কে নিয়ে সেখানে উপবেশন করলেন। ইতোমধ্যে আবু হায়সাম রা.ও এসে পড়লেন। রাসূলুল্লাহ্ সা. এবং তাঁর সঙ্গীদ্বয়কে দেখে তাঁর আনন্দের কোনো সীমা থাকলো না। এতে তিনি মানসিক শান্তি লাভ করলেন। তাড়াতাড়ি একটা খেজুর গাছে উঠলেন এবং ভালো ভালো খেজুর পাড়তে লাগলেন। রাসূলুল্লাহ্ সা. নিষেধ করার পর থামলেন এবং নেমে এলেন। এসে বললেন: “হে আল্লাহর রাসূল সা.! কাঁচা, পাকা, শুকনো, সিক্ত ইত্যাদি সব রকম খেজুরই রয়েছে। যেটা ইচ্ছা ভক্ষণ করুন।” তারা ওগুলো ভক্ষণ করলেন। তারপর মিষ্টি ও ঠাণ্ডা পানি দেয়া হলো। তারা সবাই পান করলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ সা. বললেন: “এই নিয়ামত সম্পর্কে তোমাদেরকে আল্লাহর দরবারে জিজ্ঞেস করা হবে।”

ক্ষতিগ্রস্ত হবে যারা

জমিনে ফ্যাসাদ সৃষ্টিকারীরাই ক্ষতিগ্রস্ত : আর তিনি গোমরাহির মধ্যে তাদেরকেই নিক্ষেপ করেন যারা ফাসেক, যারা আল্লাহর সাথে মজবুতভাবে অঙ্গীকার করার পর আবার তা ভেঙে ফেলে, আল্লাহ যাকে জোড়ার হুকুম দিয়েছেন তাকে কেটে ফেলে এবং জমিনে ফ্যাসাদ সৃষ্টি করে চলে। আসলে এরাই হবে ক্ষতিগ্রস্ত। (সূরা বাকারাহ : ২৭)
কুফরির নীতি অবলম্বনকারীরাই ক্ষতিগ্রস্ত : যাদেরকে আমি কিতাব দিয়েছি তারা তাকে যথাযথভাবে পাঠ করে। তারা তার ওপর সাচ্চা দিলে ঈমান আনে। আর যারা তার সাথে কুফরির নীতি অবলম্বন করে তারাই আসলে ক্ষতিগ্রস্ত। (সূরা বাকারাহ : ১২১)
হে ঈমানদারগণ! যদি তোমরা তাদের ইশারায় চলো, যারা কুফরির পথ অবলম্বন করেছে, তাহলে তারা তোমাদের উল্টো দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে এবং তোমরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। (সূরা আলে-ইমরান : ১৪৯)
পিছনে হটলে তোমরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে : হে আমার সম্প্রদায়ের লোকেরা! সেই পবিত্র ভূখণ্ডে প্রবেশ করো, যা আল্লাহ তোমাদের জন্য লিখে দিয়েছেন। পিছনে হটো না। পিছনে হটলে তোমরা ব্যর্থ ও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। (সূরা মায়িদাহ : ২১)
অবশেষে তার প্রবৃত্তির কুপ্ররোচনা তার ভাইকে মেরে ফেলা তার জন্য সহজ করে দিলো এবং তাকে মেরে ফেলে (কাবিল মেরে ফেলল হাবিলকে) ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেলো। (সূরা আল-মায়িদাহ : ৩০)।
আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎকে মিথ্যা গণ্যকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত : যারা আল্লাহর সাথে নিজেদের সাক্ষাতের ঘোষণাকে মিথ্যা গণ্য করেছে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যখন অকস্মাৎ সে সময় এসে যাবে তখন এরাই বলবে, “হায়, আফসোস! এ ব্যাপারে আমাদের কেমন ভুল হয়ে গেছে।” আর তারা নিজেদের পিঠে নিজেদের গোনাহের বোঝা বহন করতে থাকবে। দেখো, কেমন নিকৃষ্ট বোঝা এরা বহন করে চলেছে! (সূরা আনয়াম : ৩১)
‘আর যেদিন আল্লাহ তাদেরকে একত্র করবেন সেদিন যেন মনে হবে তারা পরস্পরের মধ্যে পরিচয় লাভের উদ্দেশ্য নিছক একদণ্ডের জন্য অবস্থান করেছিল। প্রকৃতপক্ষে যারা আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎকে মিথ্যা বলেছে তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং তারা মোটেই সঠিক পথে ছিল না।’ (সূরা ইউনুস : ৪৫)
নিজেদের সন্তানদেরকে হত্যাকারী ক্ষতিগ্রস্ত : নিঃসন্দেহে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যারা নিজেদের সন্তানদেরকে নির্বুদ্ধিতা ও অজ্ঞতাবশত হত্যা করেছে এবং আল্লাহর দেয়া জীবিকাকে আল্লাহর সম্পর্কে মিথ্যা ধারণাবশত হারাম গণ্য করেছে নিঃসন্দেহে তারা পথভ্রষ্ট হয়েছে এবং তারা কখনোই সত্য পথ লাভকারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিল না। (সূরা আনয়াম : ১৪০)
মিথ্যা রচনাকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত : এখন এরা কি এর পরিবর্তে এ কিতাব যে পরিণামের খবর দিচ্ছে তার প্রতীক্ষায় আছে? যেদিন সেই পরিণাম সামনে এসে যাবে সেদিন যারা তাকে উপেক্ষা করেছিল তারাই বলবে: “যথার্থই আমাদের রবের রাসূলগণ সত্য নিয়ে এসেছিলেন। এখন কি আমরা এমন কিছু সুপারিশকারী পাবো যারা আমাদের পক্ষে সুপারিশ করবে? অথবা আমাদের পুনরায় ফিরে যেতে দেয়া হবে, যাতে পূর্বে আমরা যা কিছু করতাম তার পরিবর্তে এখন অন্য পদ্ধতিতে কাজ করে দেখাতে পারি?” তারা নিজেরাই নিজেদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এবং যে মিথ্যা তারা রচনা করেছিল তার সবটুকুই আজ তাদের কাছ থেকে উধাও হয়ে গেছে। (সূরা আরাফ : ৫৩)
আল্লাহর পথনির্দেশনা থেকে বঞ্চিত ব্যক্তিই ক্ষতিগ্রস্ত : আল্লাহ যাকে সুপথ দেখান, সে-ই সঠিক পথ পেয়ে যায় এবং যাকে আল্লাহ নিজের পথনির্দেশনা থেকে বঞ্চিত করেন, সে-ই ব্যর্থ-ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকে। (সূরা আরাফ : ১৭৮)
অনর্থক বিতর্কে লিপ্ত ব্যক্তিই ক্ষতিগ্রস্ত : তোমাদের আচরণ তোমাদের পূর্ববর্তীদের মতোই। তারা ছিল তোমাদের চাইতে বেশি শক্তিশালী এবং তোমাদের চাইতে বেশি সম্পদ ও সন্তানের মালিক। তারপর তারা দুনিয়ায় নিজেদের অংশের স্বাদ উপভোগ করেছে এবং তোমরাও একইভাবে নিজেদের অংশের স্বাদ উপভোগ করছো। যেমন তারা করেছিল এবং তারা যেমন অনর্থক বিতর্কে লিপ্ত ছিল তেমনি বিতর্কে তোমরাও লিপ্ত রয়েছো। কাজেই তাদের পরিণতি হয়েছে এই যে, দুনিয়ায় ও আখেরাতে তাদের সমস্ত কাজকর্ম পণ্ড হয়ে গেছে এবং তারাই ক্ষতিগ্রস্ত। (সূরা তওবা : ৬৯)
সত্যের দাওয়াতকে ক্ষতিগ্রস্তকারীরা নিজেরাই ক্ষতিগ্রস্ত : আরো কিছু লোক আছে, যারা একটি মসজিদ নির্মাণ করেছে (সত্যের দাওয়াতকে) ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে, (আল্লাহর বন্দেগি করার পরিবর্তে) কুফরি করার জন্য মুমিনদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করার লক্ষ্যে এবং (এ বাহ্যিক ইবাদতগাহকে) এমন এক ব্যক্তির জন্য গোপন ঘাঁটি বানানোর উদ্দেশ্যে যে ইতঃপূর্বে আল্লাহ ও তার রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিল। তারা অবশ্যই কসম খেয়ে বলবে, ভালো ছাড়া আর কোনো ইচ্ছাই আমাদের ছিল না। কিন্তু আল্লাহ সাক্ষী, তারা একেবারেই মিথ্যেবাদী। (সূরা তওবা : ১০৭)
আল্লাহর আয়াতকে মিথ্যা সাব্যস্তকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত : কাজেই তুমি সন্দেহকারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না এবং যারা আল্লাহর আয়াতকে মিথ্যা বলেছে তাদের মধ্যেও শামিল হয়ো না, তাহলে তুমি ক্ষতিগ্রস্তদের দলভুক্ত হবে। (সূরা ইউনুস : ৯৫)
নাফরমানি করলেই ক্ষতিগ্রস্ত : সালেহ (আ) বললো, “হে আমার সম্প্রদায়ের ভাইয়েরা! তোমরা কি কখনো এ কথাটিও চিন্তা করেছো যে, যদি আমি আমার রবের পক্ষ থেকে একটি অকাট্য প্রমাণ পেয়ে থাকি এবং তারপর তিনি তাঁর অনুগ্রহও আমাকে দান করে থাকেন, আর এরপরও যদি তাঁর নাফরমানি করি তাহলে আল্লাহর পাকড়াও থেকে কে আমাকে বাঁচাবে? আমাকে আরো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করা ছাড়া তোমরা আমার আর কোন্ কাজে লাগতে পারো? (সূরা হুদ : ৬৩)
সূরা আসরে বর্ণিত চারটি গুণের মধ্যে শেষোক্ত দু’টি গুণ হল মুসলমানের প্রধান বৈশিষ্ট্য। যেটি আল্লাহ অন্যত্র ‘আমর বিল মারূফ ও নাহি আনিল মুনকার’ বলে অভিহিত করেছেন। ‘তোমরাই শ্রেষ্ঠ জাতি। যাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে এ জন্য যে, তোমরা মানুষকে ন্যায়ের আদেশ দিবে ও অন্যায়ের নিষেধ করবে এবং আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস রাখবে।’ (সূরা আলে ইমরান : ১১০)।
মুসলমানকে তার চিন্তা-চেতনায়, কথায়-কর্মে, ব্যবহারে-আচরণে সর্বদা সর্বাবস্থায় ন্যায়ের আদেশ ও অন্যায়ের নিষেধ-এর মূলনীতি অনুসরণ করে চলতে হবে। তবেই সমাজ পরিশুদ্ধ হবে। দুনিয়া ও আখেরাতে সফলতা আসবে।
অবশ্য সবকিছুর মূলে হলো ঈমান। ঈমানে যদি ভেজাল বা দুর্বলতা বা কপটতা থাকে, তাহলে বাকি তিনটিতে তার প্রভাব পড়বেই। ঈমান হলো বীজ ও বাকিগুলো হলো ফলের মত। তাই ঈমান যত সঠিক, সুদৃঢ় ও সুন্দর হবে, আমল তত নিখুঁত, নির্ভেজাল ও স্বচ্ছ হবে। তার পরকাল আরও সুন্দর হবে।
আরেকটি জরুরি বিষয় এই যে, আল্লাহ এখানে ‘তোমরা পরস্পরকে উপদেশ দাও’ বলেছেন। এর দ্বারা বুঝা যায় যে, এটি প্রত্যেক মুমিনের দায়িত্ব। তাই এটা স্পষ্ট যে, সূরা আসরের একটি বড় শিক্ষা হলো, মুক্তির জন্য কেবল নিজের কর্ম সংশোধিত হওয়াই যথেষ্ট নয়, অপরের কর্ম সংশোধনের চেষ্টা করাও অবশ্য কর্তব্য। নইলে ক্ষতি থেকে বাঁচার কোনো উপায় নেই। কেননা সমাজকে নিয়েই মানুষ। সমাজ অশুদ্ধ হয়ে গেলে ব্যক্তি একাকী শুদ্ধ থাকতে পারে না। এসব গুণাবলির সমন্বয় সাধন যারা করতে পারবে তারাই সফল। হে আল্লাহ! তুমি আমাদেরকে তোমার পূর্ণাঙ্গ ঈমানদার ও সৎকর্মশীল বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করে নাও এবং সত্যিকার সফলতা দান কর। আমিন!

লেখক : ইসলামী চিন্তাবিদ ও সাবেক সংসদ সদস্য

SHARE

Leave a Reply