সর্বশেষঃ
post

অগ্নিদগ্ধের আহাজারি ও ভৌতিক উন্নয়ন

সৈয়দ মাসুদ মোস্তফা

০৬ জুলাই ২০২২

বিশ্বের প্রায় সব দেশেই অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটলেও আমাদের দেশে তা একেবারে নিয়ন্ত্রণহীন। দেশে উন্নয়নে জোয়ার বইছে বলে দাবি করা হলেও আমাদের দেশে অগ্নিনির্বাপণ প্রক্রিয়া এখনো সেকেলে ও সনাতনী। ফলে প্রতি বছর ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় জনগণের জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলেও এ নিয়ে সরকার বা সংশ্লিষ্ট বিভাগের তেমন মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয় না। আমাদের দেশে চাঞ্চল্যকর অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার মধ্যে একটি হচ্ছে ‘নিমতলি ট্র্যাজেডি’। এই প্রাণঘাতী অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছিল রাজধানী ঢাকায় ২০১০ সালের ৩ জুন। পুরান ঢাকার নবাব কাটরার নিমতলি মহল্লায় এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড সংঘটিত হয়েছিল, যা নিমতলি অগ্নিকাণ্ড বা নিমতলি ট্র্যাজেডি নামে পরিচিতি পেয়েছে। এই অগ্নিকাণ্ডে ১১৯ বনি আদম প্রাণ হারিয়েছেন।

আমাদের দেশে আরো একটি ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা হচ্ছে ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টার অগ্নিকাণ্ড। এই মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দগ্ধ হয়ে নারী-পুরুষ ও শিশুসহ প্রাণ হারান ৭১ জন। ২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক সেই দুর্ঘটনার জন্য দায়ী কাউকে আজও বিচারের মুখোমুখি করা যায়নি। দীর্ঘদিন ঝুলে আছে ঘটনার তদন্তকার্যক্রম। ফলে আমাদের দেশে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা কমেনি বরং সংশ্লিষ্টদের উদাসীনতার কারণেই তা এখন ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে। স্বজনহারাদের আহাজারি আর আর্তনাদ শুনতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত। অথচ ‘মদন ঢুলী’রা উন্নয়নের বায়বীয় ঢাক-ঢোল পিটিয়ে যাচ্ছেন প্রতিনিয়ত। 

মূলত, অগ্নিদুর্ঘটনা আমাদের রীতিমতো নিয়তি হয়ে গেছে। দেশে লাগামহীন অগ্নিদুর্ঘটনার ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের বিএম ডিপোর কনটেইনারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। আগুনে পুড়ে গেছে পুরো ডিপো। মর্মান্তিকভাবে ঝরে গেছে অন্তত অর্ধশত প্রাণ। আগুনে দগ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হয়েছেন শত শত মানুষ। একই সাথে পুড়েছে হাজার কোটি টাকার মালামাল। ভেঙে গেছে অনেক পরিবারের রঙিন স্বপ্ন। বিস্ফোরণের পর অগ্নিদগ্ধদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে আশপাশের পরিবেশ। একই চিত্র দেখা গেছে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল এলাকায়। সারাদিন আহতদের নিয়ে দৌড়ঝাঁপ। নিহতদের লাশ ঘিরে কান্না। নিখোঁজ স্বজনের সন্ধানে আসা মানুষের মর্মন্তুদ আহাজারি। এর মধ্যে ফায়ার সার্ভিসের ৯ জন ফায়ার ফাইটারও অগ্নিদগ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। ঘটনাস্থলে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আহত হয়েছেন পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও। যা হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা করেছে। 

এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের কারণ কী তার কোনো সদুত্তর পাওয়া যাচ্ছে না সংশ্লিষ্টদের কাছে। দায় নিচ্ছেন না কেউই। এ বিষয়ে বেসরকারি কনটেইনার ডিপো মালিকদের সংগঠন ‘বিগডা’র বক্তব্য হচ্ছে, ওই ডিপোতে হাইড্রোজেন পার-অক্সাইডের একটি চালান ছিল। এই হাইড্রোজেন পার অক্সাইড থেকেই বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, ৩০ একর জায়গাজুড়ে অবস্থিত ডিপোটির কনটেইনার ধারণক্ষমতা ৬ হাজার ৫শ টিইইউ’স। এর মধ্যে ঘটনার দিন ডিপোটিতে রফতানির জন্য ৮শ টিইইউ’স বোঝাই তৈরি পোশাক এবং হিমায়িত খাদ্যপণ্য ছিল। যেখানে আমদানিকৃত পণ্য বোঝাই কনটেইনার ছিল ৫শ টি। আর এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় প্রাথমিকভাবে ৯ হাজার ৮১৩ কোটি টাকার বেশি আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

আমাদের দেশে অনেক চাঞ্চল্যকর ও ভয়াবহ অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটলেও তার কারণ অনুসন্ধান করে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। প্রত্যেক ক্ষেত্রে লোকদেখানো তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও এতে কোনো ইতিবাচক ফল পাওয়া যায়নি। ফলে আমাদের দেশে বিভিন্ন সময়ে ঘটে যাওয়া প্রাণঘাতী অগ্নিকাণ্ডের কিছু ঘটনা নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে প্রায়ই নিরাপত্তার নিয়ম লঙ্ঘন করা হয়। বিশেষ করে শিল্পখাতে। ফলে অগ্নিদুর্ঘটনা এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, ২০০৫ সালের পর থেকে এখানে কারখানা ও বিভিন্ন ভবনে অগ্নিকাণ্ডের ফলে শত শত মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। রয়টার্সের দেওয়া তথ্যমতে, ২০২১ সালের ডিসেম্বরে সুগন্ধা নদীতে একটি লঞ্চের ইঞ্জিন রুম থেকে আগুন লেগে অন্তত ৩৮ জনের মৃত্যু হয়। জুলাই মাসে রাজধানী ঢাকার দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত নারায়ণগঞ্জের একটি জুস তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত ৫২ জন নিহত ও ২০ জন আহত হন। একই বছর মার্চ মাসে কক্সবাজারে অবস্থিত রোহিঙ্গা শিবিরে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এতে অন্তত ১৫ জন নিহতের পাশাপাশি ৫৫০ জন আহত হন। তাছাড়া বাস্তুচ্যুত হয় ৪৫ হাজার। ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ঢাকার নিকটে একটি মসজিদের গ্যাসলাইনে বিস্ফোরণ হয়। ঐ ঘটনায় নিহত হন ১৭ জন ও আহত হয় কয়েক ডজন। 

২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে ঢাকার নিকটে একটি ফ্যানের কারখানায় আগুন লেগে যায়। এতে কমপক্ষে ১০ জন নিহত হন। নভেম্বর মাসে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে গ্যাসের পাইপলাইন বিস্ফোরণে সাতজন নিহত ও আটজন আহত হন। মার্চ মাসে ঢাকার একটি ২২ তলাবিশিষ্ট বাণিজ্যিক ভবনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ঐ ঘটনায় কমপক্ষে ১৯ জন নিহত ও ৭০ জন আহত হন। এ সময় ভবনটিতে বহু মানুষ আটকা পড়েন। ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশে দু’টি প্রাণঘাতী অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এ সময় পুরান ঢাকার একটি এলাকায় অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ৭০ জনের প্রাণহানি হয়। এছাড়া চট্টগ্রামের একটি বস্তিতে আগুন লেগে দুই শতাধিক ঘর পুড়ে যায়। এতে আটজন নিহতের পাশাপাশি ৫০ জনের বেশি আহত হন।

ফেব্রুয়ারি ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে টেক্সটাইল কারখানায় আগুন নেভানোর আগেই ছয় শ্রমিকের মৃত্যু হয়। ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে ঢাকার উপকণ্ঠে একটি প্লাস্টিক কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে ১৩ জনের মৃত্যু ও কয়েক ডজন আহত হন। ২০১২ সালের নভেম্বর মাসে বাংলাদেশের ইতিহাসে হৃদয়বিদারক ঘটনাটি ঘটে এ সময়ে। ঢাকার তাজরীন ফ্যাশনস কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে ১১২ জন শ্রমিক নিহত ও ১৫০ জনেরও বেশি আহত হন। ২০১০ সালের ডিসেম্বরে ঢাকার বাইরের একটি ক্রীড়া পোশাক কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে কমপক্ষে ২৬ জন নিহত ও প্রায় ১০০ জন আহত হন। 

একই বছর ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকার উপকণ্ঠে একটি পোশাক কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে ২১ শ্রমিক নিহত ও প্রায় ৫০ জন আহত হন। ২০০৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে চট্টগ্রামে একটি টেক্সটাইল কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ৬৫ জন শ্রমিক নিহত ও কয়েক ডজন আহত হন। ২০০৫ সালের জানুয়ারিতে ঢাকার বাইরে একটি পোশাক কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে ২২ জন নিহত ও ৫০ জনের বেশি আহত হন। কিন্তু এসব চাঞ্চল্যকর অগ্নিদুর্ঘটনা থেকে আমরা কোনোভাবেই শিক্ষা নিইনি। ফলে আমাদেরকে সীতাকুণ্ডের বিএম কনটেইনার ডিপোতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের মুখোমুখি হতে হয়েছে। যা আমাদের রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতাকেই স্মরণ করিয়ে দেয়। 

দুর্ঘটনার কারণ নিয়ে নানা জন নানা কথা বললেও মালিক পক্ষের উদাসীনতা, শঠতা ও দায়িত্বহীনতাকে এজন্য দায়ী করা হচ্ছে। মূলত, সীতাকুণ্ডের বিএম কনটেইনার ডিপোতে রেড ক্যাটাগরির রাসায়নিক হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড থাকার তথ্য গোপন করেছে মালিকপক্ষ। এমনকি রাসায়নিক রাখার অনুমতিও ছিল না তাদের। পরিবেশ অধিদফতর থেকে ডিপোতে শুধু অরেঞ্জ ক্যাটাগরির পণ্য রাখার অনুমোদন ছিল। সেখানে এমন ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিক রয়েছে, জানা ছিল না ফায়ার সার্ভিস কর্মী ও স্থানীয়দের। সঙ্গত কারণেই সেখানে বেশি মানুষ হতাহত হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, আগুন লাগার পর সেখানে রাসায়নিক রয়েছে এমন তথ্য পায়নি ফায়ার সার্ভিস। তাই অতি নিকটে গিয়ে আগুন নির্বাপণে কাজ করছিল সংস্থাটির কর্মীরা। আগুনে সেখানে এত বড় বিস্ফোরণ হতে পারে-এমন ধারণাও ছিল না কারও। তাছাড়া রাসায়নিক থাকলেও ডিপোতে ছিল না অগ্নিনির্বাপণের যথাযথ ব্যবস্থা।

ডিপোতে অগ্নিকাণ্ডের সূচনা হয়েছিল রাত ১০টায়। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস ও আশপাশের লোকজন ছুটে যান সেখানে। নিয়ন্ত্রণের কাজে লেগে পড়েন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। আগুনের তীব্রতার সঙ্গে বাড়ে ইউনিট। একইসঙ্গে ভিড় বাড়ে স্থানীয়দের। তখনও কেউ জানতো না এখানে রয়েছে, বিস্ফোরক হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড। মালিকপক্ষও সতর্ক করেনি। পানি পেয়ে হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড বোমায় রূপ নিয়েছিল। একের পর এক কনটেইনার বিস্ফোরণে পুরো এলাকা প্রকম্পিত হয়ে উঠেছিল। আশপাশের তিন কিলোমিটার এলাকার ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে অর্ধশতাধিক মানুষ মর্মান্তিকভাবে প্রাণ হারান। মৃতের মধ্যে ফায়ার সার্ভিসের ৯ জন কর্মীও রয়েছেন। রাসায়নিকের সঠিক তথ্য দিলে এত হতাহত না বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস।

এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদফতরের বক্তব্য হলো, ‘রাসায়নিক না থাকার কথা বলে বিএম কনটেইনার ডিপো অরেঞ্জ ক্যাটাগরির ছাড়পত্র নিয়েছিল। কিন্তু রেড ক্যাটাগরির রাসায়নিক রাখায় ছাড়পত্র বাতিল করছে পরিবেশ অধিদফতর।’ বিস্ফোরক পরিদফতর সূত্র বলছে, ‘রাসায়নিক থাকার তথ্য গোপনের কারণে বেশি মানুষ হতাহত হয়েছে। সঠিক তথ্য দিলে হতাহতের ঘটনা এড়ানো যেতো মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।’ ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষের দাবি, ‘রাসায়নিক থাকার ঘোষণা না দেওয়ায় হতাহত বেড়েছে। স্বাধীনতার পর একসঙ্গে এত ফায়ার সার্ভিস কর্মীর আর মৃত্যু হয়নি।’ তবে বিগডা দাবি করেছে, ‘এটি কমপ্লায়েন্স ডিপো ছিল। এটি নিছক দুর্ঘটনা। হাজার কোটি টাকার রফতানি পণ্য পুড়েছে।’

এদিকে বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কও শুরু হয়েছে। সীতাকুণ্ডে বিএম কনটেইনার ডিপোতে অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণে হতাহতের ঘটনাকে দুর্ঘটনা নয় বরং হত্যাকাণ্ড বলে দাবি করেছেন বিরোধীদলীয় এক সংসদ সদস্য। এ ঘটনার জন্য ডিপোর মালিকপক্ষের উদাসীনতাকে দায়ী করেছেন তিনি। তার ভাষায়, এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পরও ডিপোর মালিকের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ডিপোর পরিচালক চট্টগ্রাম দক্ষিণ ক্ষমতাসীন দলের কোষাধ্যক্ষ, এটাই তার খুঁটির জোর। ক্ষমতাসীন দলের এমন একটি পদে থেকে কোনো নিয়মকানুন মানার প্রয়োজনীয়তা সম্ভবত তিনি বোধ করেননি।

ডিপোর মালিকপক্ষের বিরুদ্ধে অবিলম্বে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে তিনি বলেছেন, সীতাকুণ্ডের ঘটনা কোনো দুর্ঘটনা নয়, এটি হত্যাকাণ্ড। চট্টগ্রামের বিস্ফোরক পরিদপ্তর বলেছে, ওই ডিপোতে দাহ্য পদার্থ রাখার বিষয়টি তাদের জানানো হয়নি। এ ধরনের পণ্য সংরক্ষণে বিশেষ ধরনের অবকাঠামো দরকার, কিন্তু ওই ডিপোতে সে ধরনের কোনো ব্যবস্থা ছিল না। অনুমোদন না নিয়ে ডিপোতে কেমিক্যাল রাখা হয়েছিল।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সেদিন অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হওয়ার সাথে সাথেই আগুন নেভাতে গিয়েছিলেন সীতাকুণ্ড ও কুমিরা ফায়ার স্টেশনের অগ্নিনির্বাপক কর্মীরা। আগুন প্রায় নিভিয়ে ফেলেছিলেন তারা। কিন্তু ঠিক ৪০ মিনিটের মাথায় ঘটে একের পর এক বিস্ফোরণ। সেই বিস্ফোরণ এতটাই শক্তিশালী ছিল যে পাঁচ কিলোমিটার দূর থেকেও শব্দ শোনা গেছে, কম্পন অনুভূত হয়েছে। বিস্ফোরণে ডিপোতে থাকা মালবাহী কনটেইনারগুলো দুমড়ে-মুচড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে। পরপর বেশ ক’টি বিস্ফোরণ হয়েছে। বাংলাদেশে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স বলছে, বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডে এ পর্যন্ত ৯ জন ফায়ার সার্ভিস কর্মীর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।

সংস্থাটির সিনিয়র স্টাফ অফিসার ও মিডিয়া সেলের দায়িত্বপ্রাপ্তরা জানিয়েছেন, ১৯৮১ সালে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স পুনর্গঠনের পর থেকে এ পর্যন্ত সব মিলিয়ে ১৭ জন ফায়ার সার্ভিস কর্মী মারা গেছেন। বাংলাদেশে একসাথে এতজন ফায়ার সার্ভিস কর্মীর প্রাণহানি আর কখনোই ঘটেনি। একসাথে এত সহকর্মীর মৃত্যুতে ভেঙে পড়েছেন সীতাকুণ্ড ও কুমিরা ফায়ার স্টেশনের যে কয়জন বেঁচে আছেন তারা। শোকের সুযোগও তারা পাচ্ছেন না। অগ্নিনির্বাপণের কাজ করে যেতে হচ্ছে। আর আহতরা হাসপাতালে কাতরাচ্ছেন।

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে কনটেইনার ডিপোতে রাসায়নিক পদার্থ মজুদের লাইসেন্স বা অনুমতি না থাকার পরও কিভাবে তা রাখা হয়েছিল এবং প্রাণহানি বা ভয়াবহ পরিস্থিতি যা হয়েছে, সেখানে দায় ও ব্যর্থতা কার? এসব নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। সীতাকুণ্ডে বিএম কনটেইনার ডিপোতে ভয়াবহ বিস্ফোরণের পেছনে হাইড্রোজেন পার-অক্সাইডকে অন্যতম কারণ বলে উল্লেখ করেছে পরিবেশ অধিদফতর। প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে এ অধিদফতরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ডিপোতে বেশ কয়েকটি কনটেইনারে হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড মজুদ থাকার বিষয়ে তারা নিশ্চিত হয়েছেন। কিন্তু এ ধরনের পদার্থ মজুদের ব্যাপারে কোনো অনুমতি ছিল কিনা, এ প্রশ্ন এখন সামনে এসেছে। ডিপোতে আগুন লেগে ভয়াবহ বিস্ফোরণে অনেক হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। ওই ডিপোতে হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড এবং কোনো রাসায়নিক পদার্থ মজুদের অনুমতি ছিল না বলে পরিবেশ অধিদফতর জানায়। কিন্তু ডিপোটিতে হাইড্রোজেন পার-অক্সাইডের ২৪টি কনটেইনার রফতানির জন্য রাখা হয়েছিল।

জানা গেছে, হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড বা কোনো রাসায়নিক পদার্থ মজুদের জন্য রেড লাইসেন্স দেয়া হয়। আর এ রেড লাইসেন্স পেতে হলে অর্থাৎ হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড বা অন্য কোনো রাসায়নিক পদার্থ মজুদের ব্যাপারে ফায়ার সার্ভিস এবং বিস্ফোরক পরিদফতরের অনুমতিপত্র নিতে হয়। ওই অনুমতিপত্রের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানকে পরিবেশ অধিদফতর রেড লাইসেন্স বা অনুমতি দিয়ে থাকে। কিন্তু রাসানিক সংরক্ষণের ক্ষেত্রে সেসব আইন বা নিয়ম পালিত হয়নি। তাই এই ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানির দায় ডিপো কর্তৃপক্ষ কোনোভাবেই এড়াতে পারে না।

সার্বিক দিক পর্যালোচনায় প্রায় সকল পক্ষ এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার জন্য দায় চাপিয়েছেন ডিপোর মালিক কর্তৃপক্ষের ওপর। যাদের সাথে সরকার ঘনিষ্ঠতার প্রমাণ মিলছে। ডিপোতে কী রাখা হচ্ছে, তা পরিদর্শন করার দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন করলে এ কর্মকর্তা বলেন, লাইসেন্স প্রতি বছর যখন নবায়ন করা হয়, তখন তারা তা পরিদর্শন করে থাকেন। এছাড়া ডিপো কর্তৃপক্ষ থেকেও তাদের হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড মজুদের বিষয়ে কিছুই জানানো হয়নি।

এই দুর্ঘটনার জন্য প্রায় সকল মহল থেকেই ডিপো কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা, প্রচলিত আইন এবং বিধির লঙ্ঘন ও অতি মুনাফাখোরিকে দায়ী করলেও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা প্রতিমন্ত্রী বিষয়টিকে ভিন্নভাবে দেখছেন। দুর্ঘটনার জন্য কারা দায়ী বা এই ব্যর্থতার দায় কার? এসব প্রশ্নের জবাব মিলবে তদন্তের পর বলে দাবি করেছেন তিনি। প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এখানে প্রায় সাড়ে চার হাজার কনটেইনার ছিল। এর মধ্যে ২৪টি কনটেইনার রাসায়নিক পদার্থের। বাকিগুলো গার্মেন্টস প্রডাক্ট রফতানির জন্য রাখা হয়েছিল।

মূলত, এ ডিপোটি স্মার্ট গ্রুপ নামের যে ব্যবসায়ী গ্রুপের। আর সে গ্রুরের মালিক মজিবুর রহমান এখনো তার ডিপোতে হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড মজুদের বিষয় অস্বীকার করছেন। যেসব অভিযোগ ও প্রশ্ন উঠেছে, সে বিষয়গুলোতেও তিনি পরিষ্কার করে কিছু বলেননি। তিনি বলেন, ‘আমার বক্তব্য হলো, আমি তো দীর্ঘদিন যাবৎ ব্যবসা করছি, আমার মার্কেটে গুডউইলটা দেখেন। অ্যাক্সিডেন্ট যখন হয়ে গেছে, আমি কী করতে পারি’। কিন্তু পরিবেশ অধিদফতর তার কথার সাথে একমত হতে পারছে না। তারা দাবি করেছে, ডিপোতে হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড ছিল। কিন্তু এটিসহ কোনো রাসায়নিক পদার্থ মজুদের অনুমতি নেই।

এ বিষয়ে গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক মেজর শামসুল হায়দার সিদ্দিকীর বক্তব্যও রহস্যজনক। কারণ, তিনি এই গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক হলেও নিশ্চিত করে কিছু বলছেন না। তিনি দাবি করেছেন, তাদের ডিপোতে হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড মজুদ ছিল কিনা-তা তদন্ত শেষ হওয়ার আগে তারা নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না। একইসাথে তিনি উল্লেখ করেন, অনুমতি না থাকলেও হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড ওই ডিপোতে কিভাবে আনা হলো এবং এটা কোনো নাশকতা কিনা, এ প্রশ্ন তাদের রয়েছে। অপর দিকে সরকারের যেসব প্রতিষ্ঠান বা বিভাগের বিষয়গুলো দেখভাল করার কথা, তারাও ব্যর্থতার দায় এড়িয়ে যাচ্ছেন।

নানা কারণেই আমাদের দেশে অগ্নিদুর্ঘটনার প্রকোপ বেশি। সরকার দেশে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে বলে দাবি করলেও বাস্তবতায় তা প্রমাণ হয় না। মূলত, আইনি দুর্বলতা সর্বোপরি আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাব, ইমারত নির্মাণে ইমারত বিধি অনুসরণ না করা, অগ্নিদুর্ঘটনায় প্রতিরোধে প্রাক-প্রস্তুতির ঘাটতি এবং অগ্নিনির্বাপণে সর্বাধুনিক প্রযুক্তির অভাব এর অন্যতম কারণ। আর ইমারত নির্মাণের সময় পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণের সুযোগ এবং আপদকালীন বহির্গমন ব্যবস্থা না রাখাও এজন্য কম দায়ী নয়। একই সাথে অনুনোমোদিতভাবে রাসায়নিক ও বিস্ফোরক দ্রব্য সংরক্ষণও ভয়াবহ অগ্নিদুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। সম্প্রতি চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের বিএম কনটেইনার ডিপোতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের প্রধান কারণই এটি।

বিএম কনটেইনার ডিপোতে রাখা ছিল ভয়াবহ দাহ্য কেমিক্যাল পদার্থ হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড। সঙ্গত কারণেই পরিস্থিতি এমন ভয়ানক আকার ধারণ করে। ডিপোটি লোকালয়ের পাশে অবস্থিত। লোকালয়ের পাশে অবস্থিত কোনো জায়গায় ব্যবসার জন্য এমন রাসায়নিক পদার্থ রাখার নিয়ম নেই। ঘটনায় বেসামরিক মানুষ ছাড়াও ফায়ার সার্ভিসের বেশ কয়েকজন কর্মী প্রাণ হারিয়েছেন। লোকালয়ের পাশে অনুমতিবিহীন হাইড্রোজেন পার-অক্সাইডের মতো ভয়ঙ্কর দাহ্য পদার্থ রেখে এত মানুষের করুণ মৃত্যুর দায়ভার কি স্মার্ট গ্রুপ নেবে! হবে কি দায়ীদের শাস্তি ? দেখা যায়, যখন যে সরকার ক্ষমতায় থাকে, তাদের সঙ্গে এ দেশের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকপক্ষের থাকে গাঁটছড়া। ফলে শেষ পর্যন্ত রাঘববোয়ালদের কিছুই হয় না। তারা টাকা ও ক্ষমতা দিয়ে সব ‘ম্যানেজ’ করে ফেলেন।

সীতাকুণ্ড ট্র্যাজেডিতে অসংখ্য মায়ের বুক খালি হয়ে গেল; কারও বাবা, কারও ভাই, কারও স্বামী এবং কারও পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিটিও অকালে এ করুণ মৃত্যুর শিকার হলো। মালিকের অসাবধানতা বা অতি মুনাফালোভী মানসিকতার জন্য আজ এতজন মানুষকে বিভীষিকাময় অকাল মৃত্যুর শিকার হতে হলো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এসব রুই-কাতলার হয়তো কিছুই হবে না বরং অগ্নিদগ্ধ জনতাকে আহাজারি আর্তনাদই করতে হবে। আর এটিই আমাদের নিয়তি।

দেশে প্রভূত উন্নয়ন হয়েছে বলে দাবি করা হলেও মূলত উন্নয়ন হয়েছে শ্রেণি ও গোষ্ঠী বিশেষের। সাধারণ মানুষের অবস্থার আরও অবনতিই হয়েছে। দেশে মেগা উন্নয়নের নামে মেগা দুর্নীতি করে লুটপাটের টাকা কানাডার বেগমপাড়ায় পাচার করা হয়েছে বলে মহল বিশেষের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। ১০ হাজার কোটি টাকার পদ্মা সেতু লুট করতে করতে ৩০ হাজার কোটি টাকায় নিয়ে গেছে। মেগা প্রকল্পের নামে মেগা দুর্নীতি করছে। কর্ণফুলী ট্যানেলসহ উড়াল সেতু, সেতু, বড় বড় প্রকল্পের নামে দুর্নীতি করে টাকা কানাডার বেগমপাড়ায় পাচার করছে-এমন অভিযোগ এখন সকল শ্রেণির মানুষের মুখে মুখে। মূলত, উন্নয়ন বলতে দেশের সার্বিক উন্নয়নকেই বোঝায়। দেশে যদি এতই উন্নয়ন হয় তাহলে দেশে প্রতিনিয়ত অগ্নিকাণ্ড ঘটছে কেন, অগ্নিনির্বাপণ পদ্ধতি এখনো কেন সেকেলে; কেনই বা অগ্নিদগ্ধ বনি আদমের আহাজারি? এসব কি উন্নয়নের কোরাসের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ? উত্তর তো নেতিবাচই হওয়ার কথা! 

জানা গেছে, ইতোমধ্যে সীতাকুণ্ডের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে তা শেষমেশ আলোর মুখ দেখবে কিনা, তা নিয়ে সংশয় রয়েই গেছে। অতীত ঘটনা থেকে দেখা যায়, তদন্ত কমিটি হয়, দাখিল হয় প্রতিবেদনও। কিন্তু দায়ীদের শাস্তির আওতায় আনা হয় না। দেশের আত্মসচেতন মানুষ আশা করে, ঘটনার সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য তদন্ত হোক। এতজন মানুষের করুণ মৃত্যুর জন্য যারা দায়ী, তাদেরকে কোনোভাবেই ছেড়ে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার মতো এমন বিভীষিকাময় ঘটনার পুনরাবৃত্তি আর যাতে না হয় সে প্রত্যাশায় দেশের আত্মসচেতন মানুষের! দেশ ও জাতি সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে দায়িত্বশীল আচরণ আশা করে। 

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট 

আপনার মন্তব্য লিখুন

কপিরাইট © বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির