আবু লাহাবের চরম পরিণাম -মুহাম্মদ জাফর উল্লাহ্

সকল অত্যাচারীর শেষ পরিণতি বড় ভয়ঙ্কর। মহান আল্লাহ্র বিচার থেকে কোনো অহঙ্কারী রেহাই পায়নি। এই পৃথিবীর বুকেই ঘটে যায় অনেকের বিপর্যয়, কারও জন্য থাকে পরকালে কঠিন শাস্তি। শেষ পর্যন্ত দোজখের ভীষণতম অগ্নিতে নিক্ষিপ্ত হয় সকলেই। রাসূলুল্লাহ (সা)-এর ওপর আবু লাহাব যে অমানবিক অত্যাচার করেছিল, আলোচ্য নিবন্ধে সেই জঘন্যতম অপরাধীর ভয়ঙ্কর পরিণাম সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে।
রাসূলুল্লাহ (সা)-এর প্রতি নিষ্ঠুরতম নির্যাতনে এবং জঘন্যতম ইসলাম বিরোধিতায় বিশ্ব ইতিহাসে যে লোকটি সর্বাধিক ধিকৃত এবং কুখ্যাত, সেই আবু লাহাবের প্রকৃত নাম আবদুল উজ্জা বা উজ্জার দাস। আবু লাহাব তার উপনাম। লাহাব অর্থ অগ্নিস্ফুলিঙ্গ। প্রকৃতই সুদর্শন এই লোকটির গায়ের রঙ ছিল উজ্জ্বল গৌরবর্ণের, অগ্নিশিখার মত লালিমাময়। এ জন্য তার ডাক নাম হয় আবু লাহাব অর্থাৎ অগ্নিশিখা সমন্বিত বা অগ্নিস্ফুলিঙ্গ যুক্ত। তার পিতা আবদুল মুত্তালিবই এ উপনামে তাকে আখ্যায়িত করেছিলেন।
তৎকালীন আরবে ‘চেলারেহমি’ অত্যন্ত গুরুত্ব এবং মর্যাদার সঙ্গে রক্ষিত হতো। আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা, আপন গোত্রের-লোকজনদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করা এবং সকল কাজে সর্বান্তকরণে তাদের সমর্থন করার নাম ‘চেলারেহমি’। আবু লাহাব ছিল হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চাচা। বনি হাশিম এবং বনু মুত্তালিবের সকলে যখন এক জোট (যদিও তাঁদের অনেকেই তখনও পর্যন্ত ইসলাম গ্রহণ করেননি) হয়ে রাসূলুল্লাহ (সা)-কে জোরালো সমর্থন করছিলেন, একমাত্র আবু লাহাব হেজাজে বহুল প্রচলিত এই ‘চেলারেহমি’ প্রথা ছিন্ন করে বিরোধী পক্ষে যোগ দিয়েছিলো। কেবল যোগ দেয়াই নয়, নবীজির প্রতি নির্যাতন এবং ইসলামবিরোধিতার প্রতিটি কার্যক্রমে সে রেখেছিলো প্রধান ভূমিকা।
দুশ্চরিত্র ছিল আবু লাহাব। তার সাথে সে ছিল সীমাতিরিক্ত অহঙ্কারী। আবদুল মুত্তালিবের দশ-বারটি পুত্রসন্তানের মধ্যে সেই ছিল সবচেয়ে কুখ্যাত। অন্যেরা পৃথিবীর ইতিহাসে যথেষ্ট খ্যাতিমান। নবী করিম (সা) এর প্রতিপালক হিসেবে আবু তালিব অবিস্মরণীয়। মহামহিম আবদুল্লাহ হলেন হুজুর (সা)-এর আব্বাজান। চাচা হযরত হামজা (রা) ও হযরত আব্বাস (রা) ইসলামের গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব।
এই মহান ভ্রাতাগণের পাশে আবু লাহাব যেন এক কলঙ্ক, অন্ধকার বিবরের এক বিষাক্ত সরীসৃপ। ধনাঢ্য এবং কুরাইশদের বিশিষ্ট নেতা হয়েও এমনই নীচ এবং চরিত্রহীন হয়ে পড়েছিল যে, সে হেরেম শরিফের কোষাগারে বহুকাল সযতেœ রক্ষিত একটি স্বর্ণমৃগ অবলীলায় অপহরণ করে অন্যের নিকট বিক্রি করতে তার বিবেকে বাধেনি। ইতিহাস গ্রন্থে এই কলঙ্কিত ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে। স্বর্ণ হরিণটি অন্যের নিকট থেকে পরে উদ্ধার করা হয়েছিল বলে উল্লিখিত হয়েছে কোন কোন বর্ণনায়। ঘটনা যাই ঘটুক, সমবেত কুরাইশগণ আবু লাহাবকে চোর আখ্যায়িত করতে এতটুকু সংকোচবোধ করেনি। সাধারণ মানুষেরা ভয়ে ভীত হয়ে তাকে কিছু সম্ভ্রম করলেও আবু লাহাবের প্রতি তাদের আন্তরিক শ্রদ্ধা ছিল না মোটেই।
এই অসৎ চরিত্রের লোকটি ‘চেলারেহমি’ ছিন্ন করে কেন যে হুজুর (সা)-এর বিরোধিতায় মেতে উঠেছিল, তার সঠিক কারণ উপলব্ধি করা সত্যই দুরূহ। রাসূলুল্লাহ (সা) তার সঙ্গে কোনো দুর্ব্যবহার করেননি, কটুবাক্য বলেননি, কোন উপকার ছাড়া এতটুকু ক্ষতি পর্যন্ত করেননি কোন দিন; অথচ লোকটি নবী করিম (সা)-এর জীবনের জন্য ভয়ঙ্কর রকম ক্ষতিকারক হয়ে উঠেছিল।
ঐতিহাসিকগণ এই শত্রুতার একটি মাত্র কারণই উল্লেখ করেছেন এবং তা হলো, কুরাইশদের সতর্ক করে রাসূলুল্লাহ (সা) বলতেন, ‘র্শিক বর্জন কর, পৌত্তলিকতা ত্যাগ কর এবং এক আল্লাহ্র ইবাদতে মগ্ন হও।’ মঙ্গলের পথে, কল্যাণের পথে, সত্যের পথে জনসাধারণকে আহ্বান করাই হলো তাঁর গুরুতর এবং একমাত্র অপরাধ!
‘চেলারেহমি’ ছিন্ন করা ছাড়াও নবী করিম (সা)-এর দ্বীন ইসলামের দাওয়াত প্রচার ও আন্দোলনকে ব্যর্থ ও অচল করে দেয়ার উদ্দেশ্যে সুদীর্ঘদিন ধরে আবু লাহাব জঘন্য শত্রুতা ও নির্মম আঘাত হেনে চলেছিল।
কাবা শরীফের নিকটবর্তী সাফা পর্বতের শীর্ষদেশে দাঁড়িয়ে প্রদত্ত হুজুরে পাক (সা)-এর ‘সাফা পর্বতের দাওয়াত’ থেকেই আবু লাহাব দীর্ঘস্থায়ী বিরোধ শুরু করল প্রত্যক্ষভাবে। নবুয়ত প্রাপ্তির পর প্রথম তিন বছর অত্যন্ত সংগোপনে ইসলামের প্রচারকার্য চালালেন হুজুর (সা)। প্রাথমিক এই তিন বছরে তাঁর ধৈর্য, অভিজ্ঞতা এবং সহনশীলতা বৃদ্ধি পেলে তাঁর ওপর নির্দেশ এলো প্রকাশ্যে ইসলাম প্রচার করার, “তুমি যে বিষয়ে আদিষ্ট হয়েছ (মহান আল্লাহ তোমার ওপর যা অবতীর্ণ করেছেন) তা প্রকাশ্যে (সকলের সম্মুখে) প্রচার কর।” (সূরা হিজর, রুকু ৬, আয়াত ৯৪)
সমসাময়িক কালে অবতীর্ণ হল আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ আয়াত, যাতে মহান আল্লাহ্ নবী করিম (সা)কে তাঁর পরিবার-পরিজন ও নিকট আত্মীয়-স্বজনদের সতর্ক করা ও পরকালের আজাব সম্পর্কে ভীতি প্রদর্শনের কথা বলেছেন। বলা হয়েছে, “তোমার স্বজনবর্গকে (পরিবার-পরিজন এবং আত্মীয়-স্বজনকে) তুমি সতর্ক করে দাও।” (সূরা শোয়েরা, রুকু ১১, আয়াত ২১৪)
এই দু’টি অতি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ প্রাপ্তির পর একদিন প্রভাতে হুজুর পাক (সা) সাফা পর্বতের শীর্ষ দেশে আরোহণ করলেন। কুরাইশদের উদ্দেশে এই পর্বতের শিখর হতে যতটা সম্ভব উচ্চস্বরে বললেন-
ইয়া সাবাহা….ইয়া সাবাহা….. সাবাহ্-
হায়, সকাল বেলার বিপদ! হায় সকাল বেলার বিপদ!
তৎকালীন আরবের রীতি অনুযায়ী কেউ যদি কোন শত্রুদলকে আপন গোত্রের প্রতি আক্রমণের জন্য অগ্রসর হতে দেখত, সাফা পর্বতে উঠে এই শব্দ দু’টি উচ্চারণ করলে সবাই অতিদ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করত। বিশেষ উদ্দেশ্যে সকল কুরাইশকে স্বল্পতম সময়ে এক স্থানে সমবেত করারও ছিল এ এক সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা। অতি প্রত্যুষে এ ধরনের আহ্বান শুনে সকলের মধ্যে বেশ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হলো, অনেকেই ব্যগ্রভাবে একে অন্যকে জিজ্ঞেস করল, কে ডাকছে? উত্তর এলো, মুহাম্মদ (সা)। তাড়াতাড়ি সবাই সাফা পর্বতের পাদদেশে এসে সমবেত হলো, যার পক্ষে উপস্থিত হওয়া সম্ভব হলো না- বক্তব্য শোনার জন্য সে প্রতিনিধি প্রেরণ করল। সমবেত কুরাইশদের প্রতিটি বংশের নাম ধরে ধরে সম্বোধন করে হুজুর (সা) বললেন : হে বনু আবদে মানাফ, হে বনু হাশেম, হে বনু আবদুল মুত্তালিব, হে বনু আদি, হে বনু ফিহর, হে অমুক বংশ!
ইবনে আব্বাস (রা) বলেন : কোরআনের আয়াত ‘হে মুহাম্মদ! তোমার নিকট আত্মীয়দের ভয় দেখাও’ অবতীর্ণ হলে নবী (সা) কুরাইশ সম্প্রদায়কে আহ্বান করে বলেন, বনু ফিহর, ওহে বনু আদি ইত্যাদি। (বুখারি শরীফ ২৫৫)
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন- রাসূলুল্লাহ (সা) কোরআনের আয়াত ‘হে মুহাম্মদ! তোমার নিকটাত্মীয়দের ভয় দেখাও’ অবতীর্ণ হলে দাঁড়িয়ে যান এবং বলেন, হে কুরাইশ সম্প্রদায় কিংবা এরূপ কোনো শব্দ। তোমরা নিজেদের আল্লাহ্র আজাব থেকে বাঁচাও। আমি তোমাদের জন্য কিছু করতে পারব না। হে বনু আবদে মানাফ, আমি তোমাদের জন্য আল্লাহ্র নিকট কিছু করতে পারব না। হে (রাসূলের) ফুপু সুফিয়া! আমি আপনার জন্য আল্লাহ্র নিকট কিছু করতে পারব না। হে ফাতিমা বিনতে মুহাম্মদ! তুমি আমার অর্থ সম্পদ যা ইচ্ছা চেয়ে নাও, কিন্তু আমি আল্লাহ্র নিকট তোমার জন্য কিছু করতে পারব না।
(বুখারি শরীফ, হাদিস ২৫৫১)। ‘হে বনি ফিহর, হে বনি আদি (হাদিস নং ৩২৬৩ এবং ‘হে উম্মে যুবাইর’ হাদিস নং ৩২৬৪) প্রভৃতি রূপেও সম্বোধন করেন।
আমি যদি বলি এই পর্বতের অপর পারে একদল শত্রু তোমাদের ওপর আক্রমণ ও আঘাত হানার জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে, তোমরা কি আমার কথা বিশ্বাস করবে? সমবেত জনমন্ডলী দ্বিধাহীনচিত্তে এককণ্ঠে জবাব দিল : নিশ্চয়ই।
জনতার নিকট থেকে এমন শঙ্কাহীন উত্তর আসার পর নবী করিম (সা) সকলকে সম্বোধন করে দৃঢ়তাব্যঞ্জক স্বরে বললেন : সত্য সত্যই আমি তোমাদেরকে আল্লাহ্র কঠিন আজাবের ভয় প্রদর্শন করছি। সম্মুখে এক কঠিনতম আজাব আসছে, সেই আজাব থেকে আমি তোমাদের সকলকে সতর্ক করছি।
রাসূলুল্লাহ (সা)-এর উচ্চারিত এ সাবধান বাণী অনেককেই উত্তেজিত করে তুলল। কিন্তু আবু লাহাবের মাত্রাতিরিক্ত শত্রুতা চোখে পড়ল সকলের। ক্রোধে অধীর হয়ে কারো কিছু বলার পূর্বে আবু লাহাব চিৎকার করে উঠল : তাব্বালাকা আলি হাযা জামায়াতানা…..
তোমার সর্বনাশ হোক! এ কথা বলার জন্যই কি তুমি আমাদেরকে একত্রিত করেছ?
কেবল এ অভিশাপ দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, নবী করিম (সা)কে আঘাত হানার জন্য সে একটি পাথরও তুলেছিল।
আবু লাহাব কেবল রাসূলুল্লাহ (সা)-এর চাচাই ছিল না, সে ছিল তাঁর নিকটতম প্রতিবেশী। একই প্রাচীরের মধ্যে ছিল তাদের বাসগৃহ। এ ছাড়া হুজুর (সা)-এর নিকট প্রতিবেশীদের মধ্যে ছিল উকবা ইবনে আবু মুয়িত, আদি ইবনে হাসরা, মারওয়ানের পিতা হাকাম ইবনে আ’স প্রমুখ। এসব শয়তান প্রকৃতির প্রতিবেশীরা নবী করিম (সা)কে কোন দিন শান্তিতে বসবাস করতে দেয়নি। আবু লাহাব কিংবা আবু জাহেলের প্ররোচনায় প্রতিটি মুহূর্তে এরা হুজুর (সা)-এর ক্ষতি সাধনে তৎপর থাকত। তিনি যখন নামাযে সিজদাবনত হতেন, এই শয়তানের দল ওপর থেকে ছাগল-ভেড়ার নাড়িভুঁড়ি নিক্ষেপ করত, রান্না শুরু হলে হাঁড়ি পাতিলের উপর ফেলত ময়লা-আবর্জনা। এসবে অতিষ্ঠ হয়ে হুজুর আকরাম (সা) একদিন মুশরিকদের উদ্দেশে বললেন, আপনারা তো আমার প্রতিবেশী অথচ এটা আপনাদের কী ধরনের আচরণ?
উম্মে জামিলা। আবু লাহাবের স্ত্রী। যোগ্য সহধর্মিণী হয়ে উঠেছিল তার স্বামীর। প্রাচীরের মধ্যে গৃহাভ্যন্তরে সে-ই হয়ে উঠেছিল নবী করিম (সা) এর অন্যতম নির্যাতনকারিণী। হাঁড়ি-পাতিল নোংরা করা ছাড়াও জঙ্গল থেকে প্রতিদিন সে কাঁটাযুক্ত গাছের ডাল খুঁজে আনত এবং গভীর রাতে সেগুলো হুজুর (সা)-এর দরজার সামনে রেখে আসত, কখনো কখনো এই কাঁটা গমনাগমনের পথে ছড়িয়ে দিত। উদ্দেশ্য একটাই- যাতে নবী করিম (সা) এবং তাঁর সন্তানেরা কণ্টকবিদ্ধ হয়ে যন্ত্রাণায় কষ্ট পায়।
সূরা লাহাবে তার সম্পর্কে যে সতর্কবাণী অবতীর্ণ হয় তা অবগত হয়ে এই রাক্ষসী রমণী হাতে পাথর নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সা)-কে আঘাত করার জন্য একবার কাবা শরিফ পর্যন্ত ছুটে এসেছিল। এসব জঘন্য কাজে আবু লাহাবের পূর্ণ সমর্থন ছিল।
নবুয়ত লাভের পূর্বেই আবু লাহাবের দুই পুত্র উতবা এবং উতাইবার সঙ্গে নবী করিম (সা)-এর প্রাণপ্রিয় দুই কন্যা হযরত রোকেয়া (রা) এবং হযরত উম্মে কুলসুমের (রা) শাদি মুবারক সম্পন্ন হয়। নবুয়ত লাভের পর আবু লাহাবের শত্রুতা চরমে ওঠে সে তার পুত্রদের নবী করিম (সা)-এর কন্যাদ্বয়কে তালাক দিতে বাধ্য করে। পুত্রদের উদ্দেশে ক্রোধভরে সে চিৎকার করে বলে ওঠে : যদি মুহাম্মদের (সা) কন্যাদের তালাক না দাও, তোমাদের মুখ দর্শন আমার জন্য হারাম।
অনুগত পুত্রদ্বয় পিতার এ উক্তিতে স্ত্রীদের সঙ্গে সঙ্গে তালাক দিয়ে দেয়। নবীজির দুই মেয়ে একসাথে হয়ে গেলেন তালাকপ্রাপ্তা। বড় জামাতা মন্দ আচরণ করলো নবীজীর সাথে।
নবুয়তের সপ্তম সনে বনু হাশিম গোত্রের সঙ্গে চরম বিরোধিতায় উন্মত্ত হয়ে ওঠে সম্মিলিত কুরাইশ গোত্র। নবীজি ও নওমুসলিমদের ওপর চালায় নির্মম অত্যাচার। মক্কায় নিজগৃহে বসবাস হয়ে পড়ে ঝুঁকিপূর্ণ। এই চরম শত্রুতায় নবী করিম (সা) অতিষ্ঠ হয়ে আবু তালিবসহ হাশিম গোত্রের সকলকে নিয়ে ‘শিয়াবে আবু তালিবে’ আশ্রয় গ্রহণ করতে বাধ্য হন। শত্রুতা সৃষ্টিতে প্রধান ভূমিকা ছিল আবু লাহাব এবং আবু জাহেলের। শিয়াবে আবু তালিবে সুদীর্ঘ তিন বছর অবরুদ্ধ হয়ে থাকার সময় খাদ্যবস্ত্র এমনকি পানীয় সরবরাহের সকল পথ ধীরে ধীরে রুদ্ধ হয়ে আসে। আর এর মূলে ছিল আবু লাহাবের সীমাহীন শত্রুতা। অর্ধাহার অনাহারে জর্জরিত শিয়াবে আবু তালিবে অন্তরীণ বনু হাশিম গোত্রের নিকট কোনো বিদেশি বণিককে যেতে দেয়া হতো না। খাদ্যদ্রব্যাদি নিয়ে যদিও বা কেউ অগ্রসর হতো, তাদের প্রলুব্ধ করে আবু লাহাব বলত : ওদের নিকট এমন উচ্চ মূল্য দাবি কর যেন ওরা ক্রয় করতে না পারে। বিক্রয় না হলে অবশ্য তোমাদের আর্থিক ক্ষতি হতে দেবো না, সব জিম্মাদারি আমার।
এ কথায় উৎসাহিত হয়ে বিদেশি বণিকেরা এমন উচ্চ মূল্য দাবি করত, যা ছিল শিয়াবে আবু তালিবে বন্দী নও মুসলিম অধিবাসীদের ক্রয়সীমার বাইরে। ফলে কিছু ক্রয় করতে না পেরে ইসলামের প্রথম যুগের এই সব মহান মুসলমানেরা রিক্ত হস্তে অর্ধমৃত সন্তান-সন্ততি ও প্রিয়জনদের মধ্যে প্রত্যাবর্তন করতেন, নতুন করে ক্রন্দনের রোল পড়ে যেত গোটা উপত্যকায়। শিশুকণ্ঠের সেই যন্ত্রণা কাতর করুণ কাতরোক্তি শুনে গিরি গুহার বাইরে আনন্দ উল্লাসে উন্মত্ত হয়ে উঠত আবু লাহাব আর আবু জাহেলের দল। ইবনে হিশামের বর্ণনা থেকে অবগত হওয়া যায় : প্রচলিত মূল্যেই সে সব দ্রব্য অবশেষে আবু লাহাব বিদেশি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ক্রয় করত। বিদেশিদেরও ধোঁকা দিত আবু লাহাব।
ভ্রাতুষ্পুত্রের বেদনায় চাচার মুখে হাসি, ভ্রাতুষ্পুত্রের অশ্রুতে চাচার আনন্দ- পৃথিবীতে বোধ হয় এমন অমানবিক উল্লাসের দৃষ্টান্ত আর দ্বিতীয়টি নেই।
আবু লাহাবের পাশবিক জীবনাচরণে এটা আমরা বার বার প্রত্যক্ষ করছি। নবী করিম (সা)-এর দুঃখ দেখে সে খুশি হয়েছে, সেই পবিত্র চোখে বেদনার অশ্রু দেখে সে আনন্দে নৃত্য করেছে। এ জঘন্য চরিত্রের মানুষটার মানসিকতা যে কত নীচ, একটি ঘটনায় তার প্রমাণ পাওয়া যায় সুস্পষ্ট।
রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর শিশুপুত্র হযরত কাসেমের অকাল বিয়োগের পর ইন্তেকাল করলেন তাঁর আর একমাত্র পুত্র আবদুল্লাহ। এই ইন্তেকালের সংবাদ তখনো সাধারণ্যে অবগত হয়নি, পাশাপাশি ঘর হওয়ায় সর্বাগ্রে সংবাদ পেয়ে গেল আবু লাহাব। ভ্রাতুষ্পুত্রের এই চরমতম শোকের মুহূর্তে কোথায় চাচা সহানুভূতিশীল এবং সহমর্মী হবে, কিন্তু তা না হয়ে আনন্দের আতিশয্যে আবু লাহাব ছুটে এলো বাইরে। এসে মিশল কুরাইশ জনতার সঙ্গে। সেখানে সে উচ্চ কণ্ঠে ঘোষণা করল : মুহাম্মদ ধ্বংস হয়ে গেল, সে এখন লেজকাটা, আজই তার একমাত্র বংশধর খতম হয়ে গেল। পৃথিবীতে তার নাম নেয়ার মতো একটি লোকও আর রইল না। এ উপলক্ষে সূরা কাওসার অবতীর্ণ করে মহান আল্লাহ তাঁর রাসূলকে এক অলৌকিক শাক্তি ও সান্ত¡না দান করেন।
অবিরাম অত্যাচার ও নির্মম নির্যাতন সহ্য করে হুজুর (সা) দিবারাত্র দীন ইসলামের দাওয়াত জোরদার করে তুলেছিলেন। বাড়িতে, মহল্লায়, শহরে বাজারে সর্বত্র তিনি দাওয়াতের কাজে ছুটে বেড়াচ্ছিলেন। এ সময় আবু লাহাব তাঁর প্রতি যে দুর্ব্যবহার করেছিল, তা স্মরণ করে ঐতিহাসিকগণ শঙ্কিত ও শিহরিত হয়ে ওঠে। প্রসিদ্ধ সাহাবী তারেক ইবনে আবদুল্লাহ আল মাহরেবি (রা) বলেন : আমি জুল মাজাজ বাজারে দেখলাম নবী করিম (সা) জনমন্ডলীকে সম্বোধন করে বলেছেন, হে লোক সকল! বল : লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ- আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। যারা এক আল্লাহ্র বন্দেগি করবে তারা তাঁর পক্ষ হতে প্রভূত কল্যাণ লাভ করবে। হুজুর (সা) এ কথা বলছেন আর পেছন থেকে এক ব্যক্তি অনবরত তাঁকে পাথর মারছে, এমনকি পাথরের আঘাতে তাঁর পায়ের গোড়ালি রক্তে ভিজে লাল হয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থায় পেছনের সে লোকটি সামনের লোকটিকে দেখিয়ে বলছে : হে লোক সকল! তোমরা কেউ এর কথায় কান দিও না, কেননা ও মিথ্যাবাদী। জনমন্ডলীকে জিজ্ঞেস করা হলো, এ লোকটি কে? লোকেরা বলল, বাধাদানকারী এ লোকটি মুহাম্মদের চাচা আবু লাহাব (তিরমিজি)
মসনাদে আহমদ, বায়হাকির বিবরণ অনুযায়ী হযরত রবিয়া ইবনে আব্বাস দেয়লির (রা) একটি হাদিসে অনুরূপ বর্ণনা পাওয়া যায়। তিনি বলেন : আমি অল্প বয়স্ক ছিলাম। আব্বার সাথে যখন আমি জুল মাজাজের বাজারে গেলাম, দেখলাম নবী করিম (সা) জনসাধারণের উদ্দেশে এরূপ বলছেন, “হে লোক সকল! বল, আল্লাহ ভিন্ন কোন মাবুদ নেই।” আর একটি লোক বলছে, “এ লোকটি মিথ্যাবাদী। পৈতৃক ধর্ম হতে এ লোকটা বিচ্যুত।”
এই হচ্ছে আবু লাহাব! কেবল বাড়িতেই নয়; হাটে-বাজারে শহরে-নগরে অলিতে-গলিতে সর্বত্র হুজুর (সা)কে নির্যাতন ও অত্যাচারে অতিষ্ঠ করার জন্যই যেন তার জন্ম হয়েছিল।
অন্য একটি বর্ণনায় হযরত রবিয়া ইবনে আব্বাস দেয়লি বলেন : হজের সময় মিনায় ‘আমি নবী করিম (সা) কে দেখলাম; তিনি এক গোত্রের তাঁবুতে গমন করেছেন এবং বলছেন : হে অমুক বংশের লোকেরা! আমি তোমাদের প্রতি প্রেরিত আল্লাহ্র রাসূল, আমি তোমাদের আহ্বান করছি, তোমরা এক আল্লাহ্র ইবাদত কর এবং তার সঙ্গে অংশী করো না। তোমরা আমাকে সত্য নবী বলে মেনে নাও এবং আমাকে সমর্থন কর, যেন আমি সে কাজ সম্পূর্ণ করতে পারি, যে কাজের জন্য আল্লাহ্ আমাকে পাঠিয়েছেন।
তাঁর পেছনে পেছনে আর এক ব্যক্তি আসে এবং বলতে থাকে হে অমুক বংশের লোকেরা! এই লোকটি তোমাদের লাত, উজ্জার দিক হতে ফিরিয়ে নিয়ে এর নিজের আনা বিদায়াত ও গুমরাহির দিকে নিয়ে যেতে চায়। এই লোকটির কথা আদৌ শুনবে না এবং এর অনুসরণ করবে না। আমি (দেয়ল) আমার পিতার নিকট জিজ্ঞেস করলাম, ‘এ-লোকটি কে? তিনি বললেন, নবী করিম (সা.) এর চাচা আবুল লাহাব।’
আবু লাহাব ছিল ধনাঢ্য ব্যক্তি। সমকালীন কুরাইশদের যে চারজন সৌভাগ্যবান ব্যক্তি এক কিনতার (৮০ তোলা সের হিসেবে ৮ সের ১০ তোলা) স্বর্ণের মালিক ছিল, তাদের একজন ছিল সে। অঢেল ধনৈশ্বর্য ছাড়াও সে ছিল বহু সন্তান-সন্ততির গর্বিত জনক। ঐশ্বর্য এবং সন্তান এই দুয়েরই গর্বে সীমাতিরিক্ত অহঙ্কারী হয়ে উঠেছিল সে। অর্থ-বল ও লোকবল উভয়ই তার ছিল। এ কারণেই সে নিজেকে সর্বাপেক্ষা মর্যাদাবান এবং অভিজাত বলে মনে করত সব সময়।
ইবনে যায়েদ (রা) বলেন : একদিন আবু লাহাব হুজুর (সা)-কে জিজ্ঞেস করল, আমি যদি তোমার প্রচারিত ধর্ম কবুল করি তা হলে কী পাবো? উত্তরে নবী (সা) বললেন, সকল ঈমানদার মানুষ যা পাবে আপনিও তাই পাবেন। সে বলল, আমার জন্য অতিরিক্ত কোনো মর্যাদার ব্যবস্থা থাকবে না? হুজুর (সা) উত্তর দিলেন, আপনি আর কী চান? সাথে সাথে সে উত্তর দিলো ‘তাব্বালাকা আলি হাযাদ্দিন….এ ধর্মের সর্বনাশ হোক; যাতে আমি অন্য লোকের সঙ্গে সমান হয়ে যাবো।’ (ইবনে জরির)
লোকবল ও অর্থ সম্পদে আবু লাহাব কী পরিমাণ অহংকারী ও অন্ধ হয়ে উঠেছিল তার সুন্দর বিবরণ পাওয়া যায় একটি হাদিসে। মর্যাদাবান সাহাবী হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বলেন- আবু লাহাব একদিন বলল : মুহাম্মদ (সা) বলে যে, মৃত্যুর পর অমুক অমুক কাজ হবে। এরপর সে তার হাতের দিকে ঈশারা করে বলল, সেগুলোর মধ্যে থেকে এই হাতে একটিও আসেনি। অতঃপর সে তার হাতকে লক্ষ্য করে বলল, তোমরা ধ্বংস হও, মুহাম্মদ (সা) যেসব বিষয় সংঘটিত হওয়ার কথা বলে আমি সেগুলোর মধ্যে একটিও তোমাদের মধ্যে দেখি না।
হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) যখন স্বগোত্রকে আল্লাহ্র আজাব সম্পর্কে সতর্ক করেন, আবু লাহাব এ কথাও বলেছিলেন, ‘আমারই ভ্রাতুষ্পুত্রের কথা যদি সত্যই হয় তবে আমার কাছে ঢের অর্থ ও লোকবল আছে। এগুলির বিনিময়ে আমি আত্মরক্ষা করব।’
আবু লাহাবের সারা জীবনের অহংকারী আচরণ এবং দদ্ভোক্তির ভয়ঙ্কর পরিণাম ঘোষণা করে আল্লাহ্র পক্ষ হতে অবতীর্ণ হলো ‘সূরা লাহাব’। হাত দিয়েই সবকিছু রোধ করতে চেয়েছিল সে, এই পরিপ্রেক্ষিতে সূরা লাহাবে বলা হলো : “আবু লাহাবের হস্তদ্বয় ধ্বংস হোক।” সে তার সম্পদ এবং সন্তানাদির গর্ব করেছিল তার পরিপ্রেক্ষিতে নাজিল হলো : “কারণ কাজে আসেনি তার ধন সম্পদ এবং সে যা উপার্জন করেছে।” শেষ পর্যন্ত সে ধ্বংস হয়ে লেলিহান অগ্নিশিখায় প্রবেশ করেছে এবং তার উপার্জনও তার কোন কাজে আসেনি।
এখানে উপার্জন বলতে কেবল ধন সম্পদ নয়, সন্তান-সন্ততিও। নবী করিম (সা) সন্তানকেও পিতার উপার্জন বলেছেন।
সকল অত্যাচারী জালিমের মর্মন্তুদ পরিণতির মতো ভয়ঙ্কর এবং বিভীষিকাময় পরিণতির সম্মুখীন হতে হয়েছিল অহংকারী আবু লাহাবকে। তার যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যুতে নির্মমভাবে বর্ণে বর্ণে সত্য হয়ে উঠেছিল আল কোরআনের ঘোষণা।
সূরা লাহাব অবতীর্ণ হওয়ার সাত আট বছরের ব্যবধানেই শুরু হয়ে গেল হক এবং বাতিলের সম্মুখ যুদ্ধ। মুসলমান এবং মুশরিকদের মধ্যে দ্বন্দ্ব- বদরের মহাসমর। এ যুদ্ধ শুরু হওয়ার কয়েকদিন পূর্বে হযরত আব্বাসের (রা) ভগ্নি আতিকা একটি দুঃস্বপ্ন দেখেন। স্বপ্নটি দেখার পর থেকে তিনি ভীষণ আতঙ্কিত পড়েন। স্বপ্নের মধ্যে তিনি দেখেন : জনৈক উষ্ট্রারোহী সবাইকে সম্বোধন করে বলছেন, হে প্রতারক ও বেওফার দল! তিন দিনের মধ্যে বধ্যভূমির দিকে অগ্রসর হও। অতঃপর তিনি মসজিদে প্রবেশ করলেন, তারা তাঁর অনুসরণ করল। এরপর আতিকা উষ্ট্রটিকে সেই আরোহীসহ প্রথমে কাবা শরীফের উপরে এবং পরে জবলে কুবায়েসের শীর্ষদেশে দেখতে পেলেন। উষ্ট্রারোহী উভয় স্থানেই পূর্বের কথাগুলোর পুনরাবৃত্তি করে বললেন, প্রতারক ও বেওফার দল! তিন দিনের মধ্যে বধ্যভূমির দিকে অগ্রসর হও। এরপর একখন্ড বৃহদায়তন প্রস্তর পর্বতের শীর্ষদেশ থেকে গড়িয়ে দিলেন তিনি, পাদদেশে পড়ে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল সেটি এবং প্রতিটি খন্ড মক্কার প্রতিটি গৃহের উপর পতিত হয়। আতিকা স্বপ্নটি সভয়ে ভ্রাতা হযরত আব্বাসের (রা) নিকট বর্ণনা করলেন এবং গোপনীয়তা রক্ষা করতে বললেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কুরাইশ নেতৃবৃন্দ স্বপ্নের বিষয়টি আনুপূর্বিক অবগত হয়ে গেল। এ বিষয়ে ভীত স্বন্ত্রস্ত কুরাইশরা পরামর্শ সভায় বসে গেল দারুন নাদওয়ায়।
ঠিক এর তিনদিন পর এলো আবু সুফিয়ান কর্তৃক প্রেরিত দূত জমজম। প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী উটের নাক কান কেটে এবং পরিধানের বসন কামিজ ছিন্ন করে সে ঘোষণা করল, হযরত মুহাম্মদ (সা) মদিনা থেকে আবু সুফিয়ানের বাণিজ্য কাফেলা লুণ্ঠন করার জন্য যুদ্ধসাজে বিরাট বাহিনী নিয়ে দ্রুত ধেয়ে আসছেন। নিজেদের সম্পদ রক্ষা করতে হলে এখনই যেন কুরাইশরা রণসাজে সজ্জিত হয়ে যায়। এর পর পরই আকাশ বাতাস মুখরিত করে বেজে উঠল বদর যুদ্ধের রণদামামা। স্থির হলো পরিবারের দু’জন কুরাইশের মধ্যে অন্তত একজনকে যুদ্ধে যোগদান করতেই হবে। নেতৃবৃন্দের অনেকেই যুদ্ধে যোগদান করতে ইতস্তত করছিল কিন্তু চাপে পড়ে শেষ পর্যন্ত যেতে হলো সকলকেই। একমাত্র আবু লাহাব গেল না। আতিকার স্বপ্নকে সে মনে প্রাণে সত্য বলে গ্রহণ করেছিল, তার বিশ্বাস হয়েছিল যুদ্ধে গেলে মৃত্যু অনিবার্য। তাই অতি কৃপণ লোকটি বহু অর্থ ত্যাগের বিনিময়ে আ’স বিন হিশামকে যুদ্ধে প্রেরণ করে। আ’স বিন হিশাম একবার আবু লাহাবের নিকট হতে চার হাজার দিরহাম ঋণ গ্রহণ করে তারপর সে দেউলিয়া হয়ে যায়, ঋণ পরিশোধের মতো কোন কিছুই আর অবশিষ্ট ছিল না তার। বদর যুদ্ধের দাদামা বেজে উঠলে পলায়নপর সুযোগসন্ধানী আবু লাহাব তাকে বলল, আমার হয়ে যুদ্ধ গেলে তোমার চার হাজার দিরহাম ঋণ আমি মওকুফ করে দেবো। দেউলিয়া আ’স জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ঋণ শোধ করতে সম্মত হয়ে আবু লাহাবের পক্ষে যুদ্ধে যোগদান করল।
কিন্তু গৃহের নিরাপদ আশ্রয়ে বন্দী হয়ে থাকলেই কি মহান বিচারকের বিচার থেকে মুক্তি পাওয়া যায়? বদর যুদ্ধের সমাপ্তির পর মক্কায় ফিরে আবু লাহাবকে পরাজিত কুরাইশদের দুরবস্থার বর্ণনা দিচ্ছিল আবু সুফিয়ান। সেখানে উপস্থিত ছিলেন হযরত আব্বাস (রা)-এর পত্নী উম্মুল ফজল (রা) এবং তাঁদের গোলাম আবু রাফে। এরা উভয়ে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন সংগোপনে। বর্ণনার কোনো একটি অংশ (স্বল্পসংখ্যক মুসলিমের কাছে বিশাল কোরাইশ বাহিনীর পরাজয় প্রসঙ্গে) শ্রবণ করে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে আবু রাফে বলে উঠেন, তাঁর ফেরেশতা। এ মন্তব্যে ইসলামের প্রতি সমর্থনের গন্ধ পেয়ে ক্রোধে অগ্নিশর্মা হয়ে ওঠে আবু লাহাব। সে আবু রাফেকে সজোরে চড় মারে। দুর্বল আবু রাফে সহ্য করতে না পেরে মাটিতে পড়ে যান। সঙ্গে সঙ্গে তার বুকের উপর চড়ে বসে সে। উম্মুল ফজলের পক্ষে অসহ্য হয়ে উঠেছিল এ দৃশ্য। তিনি একটি কাঠের টুকরো এনে সজোরে আঘাত হানলেন আবু লাহাবের উদ্ধত মস্তকে। রীতিমতো জখম ও আহত হলো আবু লাহাব। এভাবেই কেটে গেল কয়েকদিন।
বদর যুদ্ধের ঠিক সাত দিন পর অবশেষে সেই মারণব্যাধিতে আক্রান্ত হলো রাসূলবিরোধী আবু লাহাব। ভয়ঙ্কর ধরনের উৎকট প্লেগ দেখা দিলো তার গলদেশে। সমগ্র কণ্ঠনালী এক ধরনের মারাত্মক ফুসকুঁড়িতে ছেয়ে গেল। গলদেশ ফুলে একাকার, খাওয়া-দাওয়া বন্ধ। দুই হাত এবং অর্থ বিলিয়ে অহংকারী আবু লাহাব সবকিছু ঠেকাতে চেয়েছিল কিন্তু সেই হাত কোন কাজে এলো না। শক্তিশালী সেই হাত দু’টি নিসাড় হয়ে গেল ধীরে ধীরে। অর্থ সম্পদে এ রোগ দূর হলো না।
যে সন্তানের গর্বে সে ছিল গর্বিত, সেই সন্তানেরাই তাকে ঘৃণাভরে নির্জন প্রান্তরে ফেলে চলে গেল। যে ধরনের প্লেগে আক্রান্ত হয়েছিল আবু লাহাব, সবার ধারণা হয়েছিল তা অত্যন্ত সংক্রামক মারাত্মক পাপী না হলে এ ধরনের প্লেগে আক্রান্ত হয় না কেউ। সুতরাং সন্তানেরা কেউ পরিত্যক্ত পিতার নিকটবর্তী হলো না। অবশেষে অনাহার যন্ত্রণায় তিলে তিলে নিঃশেষ আবু লাহাবের কাতরোক্তিও স্তব্ধ হয়ে গেল একদিন। মৃত্যুর পরও কেউ এলো না তাকে স্পর্শ করতে। তিন দিন পড়ে থাকল সেখানে। বাতাসে সমগ্র এলাকা ভীষণভাবে দুর্গন্ধযুক্ত হলো। কয়েকজন হাবশি কৃতদাস নিয়োগ করা হলো তার লাশ গুম করতে। তারা কিছু দূরে একটি গর্ত খুঁড়ল এবং বেশ কিছু দূরত্ব বজায় রেখে সুদীর্ঘ কাঠখন্ডের সাহায্যে তার গলিত মৃতদেহ ঠেলে গর্তে ফেলে দিয়ে কোনোক্রমে মাটি চাপা দিল।
অন্য এক বর্ণনায় আছে পরিবার পরিজন পরিত্যক্ত অবস্থায় সে তার নিজের ঘরেই মারা যায়। তিন দিন পর গলিত লাশ সমাহিত হয়। এভাবেই অত্যাচারী আবু লাহাবের সমূহ অহঙ্কারের পরিসমাপ্তি ঘটে।
নবী ও তাঁর পরিবারকে কষ্ট দেয়া আবু লাহাবপত্নী উম্মে জামিলা মারা গেল পাহাড় থেকে কাঠের গুঁড়ি পিঠে করে আনার সময় গলায় ফাঁস পড়ে।
আবু লাহাবের বড় ছেলে উতবা; যে নবীকন্যাকে তালাক দিয়ে নবীজির প্রতি কটূক্তি করেছিল, সে বাণিজ্য কাফেলা নিয়ে বিদেশ যাওয়ার সময় বাঘের খাদ্যে পরিণত হলো। বাঘ তার বুক চিরে কলজে-গুরদা সব খেয়ে হাড্ডি-কঙ্কাল মরুভূমিতে ফেলে রেখে যায়।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও গবেষক

SHARE

Leave a Reply