post

ক্রিটিক্যাল থিংকিংয়ের অপপ্রয়োগ

রেদওয়ান রাওয়াহা

৩০ মে ২০২৩

ইদানীং খুব করে শুনবেন ক্রিটিক্যাল থিংকিং, যুগের সাথে তাল মেলানো, কুরআনের এসেন্স, যুগোপযোগী হওয়া ইত্যাদি শব্দসমূহ। এই ক্রিটিক্যাল থিংকিং ও যুগের সাথে তাল মেলানো কিংবা যুগোপযোগী হওয়ার বিষয় নিয়ে একশ্রেণির মুসলিম ভাইবোনেরা, আলিম পদধারী কিছু ব্যক্তিরা, এমনকি ইসলামি আন্দোলনের কর্মী পরিচয়দানকারী কিছু মানুষেরাও আমাদেরকে নানাবিধ কথাবার্তা শোনায়। বিশেষত পশ্চিমা এবং পশ্চিম প্রভাবিত শায়খদের থেকেই বেশি শুনি উপরিউক্ত শব্দ ও পরিভাষাগুলো। তাঁরা যুগোপযোগী হওয়া বলতে কিংবা ক্রিটিক্যাল থিংকিং বলতে আমাদেরকে বোঝান এবং নিজেরাও যেটা বুঝেন বলে মনে হয়- সেটা হচ্ছে কুফফারদের পরিয়ে দেওয়া চশমা দিয়ে দ্বীনকে দেখা। তাদের তৈরি করা বাউন্ডারির ভেতর অবস্থান করে দ্বীনকে পরখ করা। যদিও তারা এসব আমাদেরকে সরাসরিই বলেন না, কিন্তু তাদের কার্যক্রম, তাদের কথাবার্তা, তাদের চিন্তাধারা থেকে পরিপূর্ণ দ্বীনের বুঝ আছে, খোদার কালাম ও তাঁর হাবিবের নির্দেশনার পর্যাপ্ত পরিমাণ বিশুদ্ধ ইলম আছে- এমন যেকোনো মানুষই তাদের এই বিষয়টা (কুফফারদের পরিয়ে দেওয়া চশমা দিয়ে দ্বীনকে দেখা ও তাদের তৈরি করা বাউন্ডারির ভেতর অবস্থান করে দ্বীনকে পরখ করার বিষয়টা আরকি) উপলব্ধি করতে পারে এবং পারবে।

এখন কথা হলো, তাঁরা যেহেতু পশ্চিমাদের পরিয়ে দেওয়া বা তৈরি করা সেই চশমা দিয়েই দ্বীনকে দেখছে, তাদের বাউন্ডারির ভেতর অবস্থান করেই দ্বীনকে বুঝার চেষ্টা করে যাচ্ছে, সেহেতু সেই চশমার মাধ্যমে দ্বীনকে বেখাপ্পাই লাগবে, স্বাভাবিক। মনে হবে আল্লাহ প্রদত্ত শাশ্বত দ্বীন আল-ইসলামকে কিছুটা সংস্কার করা উচিত। ইসলামী শারিয়াহর ব্যাপারে আমাদের সনাতনী দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন এনে দ্বীনকে নতুন করে ব্যাখ্যা করা উচিত। এমনকি এ বিষয়গুলো তারা সরাসরিও নানান সময়ে নানাভাবে বলে।

এরপর তারা যখন এসব দৃষ্টিভঙ্গি মুসলমানদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে, তখন স্বাভাবিকভাবেই ফান্ডামেন্টালিস্ট মুসলিম এবং নবীগণের উত্তরসূরি আলিমগণ এসবের ব্যাপারে আপত্তি তুলবেনই। এই আপত্তি তোলার পরপরই তারা ফান্ডামেন্টালিস্ট মুসলিমদের এবং সম্মানিত আলিমদের সমালোচনা করা শুরু করে। তাঁদের ওপর অভিযোগ তোলেন এই বলে যে-বর্তমান যুগ বিবেচনায় না এনে, তরুণদের পালস না বুঝে, বিশ্ব-বাস্তবতাকে অনুধাবন না করে, তাঁরা এই যুগের সাথে বেমানান সেই প্রাগৈতিহাসিক পুরনো সব ধ্যানধারণা নিয়ে পড়ে আছেন। তাঁরা যুগের সাথে তাল মিলিয়ে ইসলামকে ‘আপডেট’ করার জন্য পর্যাপ্ত ইজতিহাদ করছেন না। যুগের চাহিদা অনুযায়ী ইসলামকে ব্যাখ্যা করার জন্য নতুন করে উসুল বিনির্মাণ করে ইসলামের পুনরায় ব্যাখ্যা বা আধুনিক ব্যাখ্যা হাজির করছেন না। অথচ দেখুন, আপনি তাদেরকে খুব একটা দেখবেন না বা দেখেন না যে-তারা পশ্চিমাদের বা ইসলাম বিরোধী গোষ্ঠীগুলোর গালভরা বুলিসমূহের ব্যবচ্ছেদ করে কিছু বলতে। তাদের কার্যক্রমকে, তাদের আদর্শের মানদণ্ডকে, মূলভিত্তিকে শক্তপোক্তভাবে প্রশ্ন করতে। তাদের হাজির করা সেক্যুলারিজম-লিবারেলিজম-ফেমিনিজম কিভাবে মানব সভ্যতার সর্বনাশ করছে সে বিষয়ে বিস্তর আলাপ তুলতে। বরং তারা ক্রিটিক্যাল থিংকিংয়ের নাম করে আল্লাহর দ্বীন বিরোধী বিষয়-আশয়কে মুসলমানদের মন-মননে স্বাভাবিক করার কোশেশ করেন। যেমন, সমকামিতা হারাম। শিরকের পরে সবচেয়ে সর্বনিকৃষ্ট একটা পাপ। যা মানবতা-বিধ্বংসীও বটে। কিন্তু এরকম একটা পাপের পক্ষেও অনেক ইসলামি চিন্তাবিদ নামধারী ব্যক্তি অবস্থান নেন। আমেরিকায় অবস্থানরত খুব জনপ্রিয় একজন সেলিব্রিটি স্কলার আছেন, তিনি তো সমকামীদের পক্ষে সরাসরি রাস্তায় নেমে আন্দোলনও করেছেন! কিন্তু এটা নিয়ে যখন কথা উঠলো, তখন তিনি ও তার মনোভাবাপন্ন-সমর্থক ব্যক্তিরা বলা শুরু করলো- আমাদেরকে একটু ক্রিটিক্যাল থিংকিংয়ে অভ্যস্ত হবে। আমরা পাপকে স্বীকৃতি দিচ্ছি না, বরং আমরা সিভিল-রাইটসের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছি। 

আরেকজন আছেন। যিনি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভীষণ জনপ্রিয়, খুব স্মুথলি ইংলিশে লেকচার প্রদান করেন। তো সেই ইসলামিক স্কলার ২০১১ সালে খুব সুন্দরভাবেই বলেছেন যে, সমকামীরা সৃষ্টির মধ্যে সর্বনিকৃষ্ট মানুষ। আর ২০২৩ সালে এসে এখন তিনি নিজেই বলছেন যে, সেটা তিনি ভুল বলেছেন। তার আগের সেই অবস্থান ছিলো ভুল (!)। আচ্ছা, আসলেই কি তাঁর আগের অবস্থানটা ভুল ছিলো? সৃষ্টির মধ্যে কুকুর-বিড়ালও কি সমলিঙ্গের সাথে যৌনাচার করে? করে না তো! তো যারা আল্লাহর দেওয়া এই স্বাভাবিক প্রকৃতির বিকৃতি ঘটিয়ে মানব-সভ্যতাকে ধ্বংসের মুখোমুখি ঠেলে দিচ্ছে, তারা যদি সৃষ্টির নিকৃষ্ট না হয়, তাহলে আর কারা হবে? অথচ উক্ত পপুলার শায়েখ আগের অবস্থান থেকে স্টেটমেন্ট দিয়ে সরে আসছেন, আর বলছেন তিনি আগে ভুল অবস্থানে ছিলেন! আমি সঙ্গত কারণেই সেসব ইসলামিক স্কলারের নাম বলছি না। তবে যারা চেনার এবং যারা বোঝার তারা বুঝে যাবেন নিশ্চয়ই। কিন্তু এই যে ওনারা উক্ত কাজটা করছেন, সেটাকে কিন্তু তাঁরা ক্রিটিক্যাল থিংকিং-যুগ বাস্তবতা, সূক্ষ্ম বুঝ; ইত্যাদি বলে চালিয়ে দিচ্ছেন। 

আচ্ছা, এটা কি একজন আলিমের কাজ হতে পারে? ইসলামিক স্কলারদের কাজ কি এরকমভাবে দ্বীনকে বিকৃতি করা বা দ্বীনের বিধানাবলির ব্যাপারে শিথিলতা আরোপ করা? একজন আলিম বা ইসলামিক স্কলারের কথা বাদ দিন, একজন আদর্শ মুসলমান হিসেবেও তো এটা উচিত না, ঈমানের সাথে সাংঘর্ষিক তা। সে কারণে একজন সত্যিকারের ও সাধারণ মুমিন হিসেবেও উচিত হচ্ছে আমাদের নিজেদের মৌলিক আকিদায় দৃঢ় থাকা। দ্বীনের অকাট্যতার ব্যাপারে, দ্বীনের সুপ্রেমেসির ব্যাপারে, অন্যান্য মতবাদের ওপরে দ্বীন হিসেবে ইসলামের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে সক্রিয় আর শক্তিশালী অবস্থান গ্রহণ করা। এই যেমন সমকামিতা বা ট্রান্সজেন্ডারের বিষয়টা, একজন মুসলিম হিসেবে ইসলামী আকিদার আলোকে তো ক্রিটিক্যাল থিংকিং করার কথা ছিলো এই জিনিসটা থেকে মুসলমানদের তো বটেই, অন্যান্য মানুষকেও কিভাবে ফিরিয়ে নিয়ে আসা যায়। কিভাবে এই ঘৃণিত কাজটার প্রতি মানুষের অন্তরে ঘৃণা পয়দা করা যায়। কিভাবে মানব-সভ্যতা বিধ্বংসী কাজটা পরিহার করার ব্যাপারে মানুষদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করা যায়। কিন্তু নাহ, আমাদের শখের শায়েখেরা সেটা করলেন না। বা তাদের দ্বারা বাস্তবিক কারণেই সেটা সম্ভব হলো না। হয়তো তারা মাজুর হবার কারণেই উক্ত অবস্থান গ্রহণ করেছেন কিংবা করতে বাধ্য হয়েছেন। কিন্তু তাদের এই পরাজিত অবস্থানটাকেই এক শ্রেণির মানুষ বা তারা নিজেরাও ক্রিটিক্যাল থিংকিং বলে চালিয়ে দেন। অথচ ক্রিটিক্যাল থিংকিং হওয়ার কথা ছিলো এরকম যে, দ্বীনের সকল বিধানের ব্যাপারেই (হোক সেটা ফরজ-ওয়াজিব, অথবা সুন্নত-নফল) কুরআন-সুন্নাহ ও সালাফদের অবস্থানকে শক্তিশালীভাবে গ্রহণ করে এরপর পশ্চিমা বিশ্ব বা ইসলাম বিরোধী গোষ্ঠীগুলোর যে  তত্ত্বগুলো আছে, সে তত্ত্ব ও মতবাদগুলো এবং সেই তত্ত্বগুলোর প্রয়োগ-সমূহ কিভাবে মানবসভ্যতার হন্তারকের ভূমিকা পালন করছে- সেটা জগদ্বাসীর নিকট সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা। কিন্তু তাঁরা তা না করে পশ্চিমাদের প্রশ্নের তোড়ে দিশেহারা হয়ে ইসলামকে তাদের নিকট একটু বেশি পিউর, একটু বেশি মানবিক, একটু বেশি আধুনিক হিসেবে উপস্থাপনের ব্যাপারে তোড়জোড় শুরু করে দেয়। এর পরিণতিতে এক পর্যায়ে দ্বীনের নানাবিধ বিধি-বিধানের ব্যাপারে একটু ছাড়, একটু কম্প্রোমাইজ-মূলক অবস্থান গ্রহণ করা হয়। এক পর্যায়ে গিয়ে মৌলিক আকিদায়ও শুরু হয় ছাড় দেওয়া। যেসব ভিত্তিগুলোর ওপর, যেসব বিধানের জন্য ইসলাম সারা দুনিয়ার বুকে বিজয়ী শক্তি ছিলো, তাঁরা সে সকল বিধানের ব্যাপারেও ছাড় দেওয়া শুরু করে। আর এভাবে ছাড়তে ছাড়তে এক সময় ইসলামের অবস্থাটা হয়ে যাচ্ছে বা যাবে পশমহীন কম্বলের মতো। কম্বলের পশম তুলে ফেললে যেভাবে কম্বল আর কম্বলের বৈশিষ্ট্য নিয়ে টিকে থাকতে পারে না, দ্বীনের অবস্থাটাও হয়ে যায় বা যাবে সে রকমই। আর ব্যক্তির ঈমান-আকিদা ও দ্বীনের ব্যাপারে যে গাইরাত থাকার কথা ছিলো, সেটার কথা না হয় না-ই-বা বললাম!


২.

গত শতাব্দীর অন্যতম শক্তিশালী একজন নওমুসলিম নারী ইসলামি চিন্তাবিদ বলেছেন যে, “আমরা যারা জীবন-বিধান হিসেবে ইসলামকে মেনে চলতে চাই, তাদেরকে এটা মনে রাখতে হবে যে, ইসলাম বিরোধী গোষ্ঠীগুলোর দ্বারা এই দ্বীন মেনে চলার কারণে প্রতিক্রিয়াশীল আখ্যায়িত হওয়ায় তাদের ভীত হওয়া উচিত নয়। আমাদের অবশ্যই বুঝা উচিত যে, তাদের দেওয়া এই আখ্যা আমাদের কোনো ক্ষতি করবে না। বরং আমরা ইসলামকে কথিত যৌক্তিক, আধুনিক, বৈজ্ঞানিক, গতিশীল, উদার ও প্রগতিশীল করে কাফিরদেরকে তুষ্ট করার চেষ্টা করাটাই আমাদের জন্য ক্ষতিকর।” (ইসলাম ও জাতীয়তাবাদ, মরিয়ম জামিলা : পৃষ্ঠা-১১)

ওনার এই কথাটা যে কতোটা যুৎসই এবং বাস্তব-সম্মত, এর প্রমাণ হিসেবে আমরা দেখতে পাই যে, পাশ্চাত্যের একজন লিবারেল-সেক্যুলার ব্যক্তি তাঁর আদর্শের ব্যাপারে যতোটা দৃঢ়, একজন বস্তুবাদী তার পিউর বস্তুবাদী ধ্যান-ধারণাকে ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে যতোটা কট্টর, এর ধারে কাছেও এই সমস্ত ক্রিটিক্যাল থিংকিংওয়ালা ইসলামিক স্কলার পদধারীরা নেই। আমরা কাফিরদের চোখে ইসলামকে একটু বেশিই পিউর করতে যেয়ে সমকামিতার মতো এরকম অগণিত বিষয়ে ছাড়-বিকৃতি ও আপসমূলক অবস্থান গ্রহণ করেছি, তার কোনো হিসেব নেই। উদাহরণস্বরূপ দ্বীনের অন্যতম একটা ফরজ বিধান জিহাদের কথাটাই ধরুন না। আমরা আত্মরক্ষামূলক বয়ান দিয়ে কাফিরদের করুণা পেতে এই বিধানটাকে এতোটাই হালকা করে দিয়েছি যে, আমরা এখন বয়ান করি, বিবৃতি দিই এই বলে যে- ইসলামের সকল জিহাদ ছিলো আত্মরক্ষামূলক। এমনকি জিহাদ বলতে যে দ্বীনকে বিজয়ী করার জন্য দ্বীনের দুশমনদের সাথে যুদ্ধ করা বুঝায়, সেটাও ভুলিয়ে দিচ্ছি জনগণকে এবং নিজেরাও মনে হয় সেটা ভুলে গিয়েছি। যার কারণে আমরা বলছি ইসলাম হচ্ছে শান্তির ধর্ম। অথচ ইসলাম তো শুধুই শান্তির ধর্ম না। ইসলাম হচ্ছে শান্তি প্রতিষ্ঠার ধর্ম। এই শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্যে প্রয়োজনে লেখালেখি হতে পারে। ব্যক্তিগত দাওয়াত হতে পারে। ওয়াজ-মাহফিল হতে পারে। আবার প্রয়োজনে অস্ত্রও হাতে নেওয়া লাগতে পারে। যেমন, কোনো গ্রামে ডাকাতের উৎপাত আছে। প্রতিদিন ডাকাত এসে আপনার মালামাল নিয়ে যায়। এখন সে গ্রামের মানুষেরা যদি বলে যে আমরা এই গ্রামের মানুষেরা শান্তি প্রিয়, আমরা যুদ্ধ-হাঙ্গামা বা মারামারি পছন্দ করি না। তাহলে তারা কি কস্মিনকালেও ডাকাতের হাত থেকে মুক্তি পাবে? বরং আপনি যদি শান্তি ফিরিয়ে আনতে চান, তাহলে ডাকাতকে শায়েস্তা করেই শান্তি ফিরিয়ে আনতে হবে। আর ডাকাতকে শায়েস্তা কেবল মিষ্টি কথা দিয়েই করা যায় না, অস্ত্রও হাতে নিতে হয়। শক্তিপ্রদর্শন করতে হয়। ডাকাতদলকে আচ্ছামত শায়েস্তা করতে হবে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনেই। ইসলামের শিক্ষাই এরকম। ইসলাম এসেছেই শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্যে। সকল বিধানের ওপর এক আল্লাহর বিধানকে বিজয়ী করার জন্যই দ্বীন-ইসলামের আগমন। শান্তির বিপরীত যে অশান্তি, সে অশান্তিকে দূর করার জন্যই আপনাকে অস্ত্রও হাতে তুলে নিতে হবে। মাঝে মধ্যে আক্রমণাত্মক জিহাদে যেতে হবে। তবে মাথামোটার মতো যখন তখন মন চাইল আর নিয়ে ফেললাম, এমনটা না। বিষয়টা শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যা রাহিমাহুল্লাহ খুবই অল্প কথায় অনেক সুন্দর করে ফুটিয়ে তুলেছেন । তিনি বলেন: ঈমান আনার পর দ্বীন ও দুনিয়া-বিধ্বংসী আগ্রাসী শত্রুর প্রতিরোধের চেয়ে বড়ো কোনো ফরজ নেই।’ (আল-ফাতাওয়া আল মিসরিয়্যা: ৪/৫০৮)

ইসলাম ও মুসলমানরা যেন আগ্রাসী শক্তির আগ্রাসনের মুখে না পড়ে, পৃথিবী যেন শান্তির পতাকাতলে, আল্লাহর বিধানের অধীনে চলে আসে, সে কারণেই দেখবেন যে মুসলিম খলিফার জন্য বছরে দু’ একবার কাফিরদের সীমান্তে ফৌজ পাঠিয়ে ইকদামি তথা আক্রমণাত্মক জিহাদ ফরজ। অথচ এখন দেখবেন ইসলাম ও জিহাদের কথা আসলেই আমরা অনেকেই আত্মরক্ষামূলক বয়ান তৈরি করে বলি যে, না না ইসলাম কিন্তু চাপিয়ে দেওয়ার বিষয় না। দ্বীন কাউকে চাপিয়ে দেওয়া যায় না। চাপিয়ে দেওয়া যায় কী যায় না, সেটা এখানের আলোচ্য বিষয় না। আলোচ্য বিষয় হচ্ছে ডিফেন্সিভ অবস্থান গ্রহণ নিয়ে। ক্রিটিক্যাল থিংকিংয়ের অপ-প্রয়োগ নিয়ে। আমরা জিহাদের বিষয় আসলে বলি যে, ইসলাম চাপিয়ে দেওয়ার বিষয় না। ইসলাম তরবারির জোরে প্রসার লাভ করেনি (আসলে ইসলাম কেবলই তরবারির জোরে প্রতিষ্ঠা হয়নি। ইসলাম প্রতিষ্ঠায় তরবারির দরকার। আল্লাহর রাসূলেরও তা লেগেছে)। অথচ দেখুন আজকের বিশ্বের দিকে, কোন বিষয়টা পশ্চিমাদের নেতৃত্বের নিউ-ওয়ার্ল্ড অর্ডার আমাদের ওপর চাপিয়ে না দিয়েছে? কোন বিষয়টা প্রসার ও প্রতিষ্ঠায় তরবারি বা বুলেট-বোমার জোর না লেগেছে? সেক্যুলারিজম কি আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়নি? সর্বপ্রথম মুসলিমদের ওপর তরবারির জোরে সেক্যুলারিজম কামাল আতাতুর্ক কি চাপিয়ে দেয়নি? তরবারি ও ক্ষমতার জোরে জোর করে মুসলিম নারীদের হিজাব-নিকাব কেড়ে নেয়নি? রাশিয়া বা সোভিয়েত ইউনিয়ন কি আমাদের ওপর কমিউনিজমকে চাপিয়ে দেয়নি? চীন কি তার মতাদর্শ অন্যের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে না? উইঘুর মুসলিমদের ব্যক্তিগত জীবনটা ঘেঁটে দেখুন, তাদের ব্যক্তিগত জীবনের দ্বীন পালন কি তারা কেড়ে নিয়ে তাদের রাষ্ট্রাচার-সমাজাচার মুসলিমদের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে না? আমেরিকা কি তার ধর্মহীন গণতন্ত্র মুসলিমদের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে না? এই যে খএইঞছ, সেটাও কি তারা মানুষের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে না? পাশ্চাত্যে বসবাসরত কোনো আলিম কি এটার বিরুদ্ধে এখন আর ওপেনলি কথা বলতে পারবেন? পারবেন না। এই যে না বলতে পারাটা, এটাও তো চাপিয়ে দেওয়া। আফগান-ইরাকের ওপর আমেরিকা তার অন্যায় যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছে না? আফগান থেকে তালেবানকে সরিয়ে দিতে তরবারি লেগেছে না পশ্চিমাদের? এখন আবার আফগান থেকে পলায়ন করছে না তালেবানদের তরবারির কাছে নত হয়ে? ফিলিস্তিন কি বর্বর পিশাচ ইয়াহুদিরা তরবারি ছাড়াই দখল করেছে? এখনও তো নিয়মিত ফিলিস্তিনের মাটিকে তরবারির জোরেই গ্রাস করে নিচ্ছে ইয়াহুদিরা। মোটকথা সবকিছুতেই তরবারি লেগেছে। এই যে আমেরিকানদের নেতৃত্বে আজকের বিশ্বব্যবস্থা, এই বিশ্বব্যবস্থার সবকিছুই তো চাপিয়ে দেওয়া। কেবল ইসলামটাই চাপিয়ে দেওয়া না আজকের দুনিয়ায়। অবশ্য পশ্চিমারা তাদের মতবাদ যে আমাদের চাপিয়ে দিচ্ছে বা দিয়েছে, এটাকে আমি এক দৃষ্টিতে স্বাভাবিকভাবেই দেখি। কারণ তারা বিজয়ী শক্তি। বিজয়ী শক্তি বলেই তারা তাদের মতাদর্শ পরাজিতদের ওপর চাপিয়ে দেবে, এটিই স্বাভাবিক তাদের জন্য। যদি এই চাপিয়ে দেওয়ার শক্তি তাদের না থাকতো, তাহলে তারা পরাশক্তি থাকতো না, হতেও পারতো না। যেভাবে এক সময় চাপিয়ে দেওয়ার শক্তি থাকার কারণে রাশিয়া পরাশক্তি ছিলো। আজকে রাশিয়া পরাশক্তি না। কারণ তার চাপিয়ে দেওয়ার শক্তি নেই। আবার এদিকে ইসলামি শক্তিগুলোর চাপিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা না থাকার কারণে তারা পরাজিত। যেদিন তারা চাপিয়ে দেওয়ার মতো সামর্থ্যবান হবেন, সেদিন তারাও বিজয়ী হবেন।


৩.

আজকে পশ্চিমা দর্শন বিজয়ী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত থাকার কারণে তারা আমাদের ওপর কেবল রাজনৈতিকভাবেই আধিপত্য বিস্তার করেনি, বা আমাদের রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণই গ্রহণ করেনি। বরং তারা চেষ্টা করেছে আমাদের মনমগজেরও নিয়ন্ত্রণ নিতে। নিয়ন্ত্রণ নিতে রুচিবোধের। এবং চেষ্টা করেছে আমাদের চোখে পরিয়ে দিতে তাদের লেন্স। আর এতে তারা অনেকাংশে সফলও হয়েছে। সেটা কিভাবে হয়েছে তা এক বিশাল ও ভিন্ন আলাপ। তাদের এই সফলতার কারণেই দেখবেন একজন বস্তুবাদী ব্যক্তির, একজন ধর্মবিরোধী নাস্তিকের, একজন সেক্যুলারের চিন্তাধারা কেমন, আর একজন আল্লাহর ইবাদাতকারী ঈমানদার ব্যক্তির চিন্তা ও কর্ম কেমন হওয়া উচিত, একজন সেক্যুলার-হিউম্যানিজমের ধ্বজাধারী কোন দর্শনের কারণে ইসলাম নিয়ে প্রশ্ন তোলে, কেন ইসলাম ও ইসলামি মূল্যবোধ নিয়ে তাদের এতো আফসোস আর আক্ষেপ; এ বিষয়গুলো আমরা বহু মুসলিমরা, এমনকি আলিম-ওলামাদেরও বড়ো একটা অংশ বুঝতে অক্ষম ও অপারগ। সোজা কথায় পাশ্চাত্যের লেন্সে দ্বীনকে পরখ করা ব্যক্তিরা বুঝতে অক্ষম ও অপারগ। অথচ যুগ যুগ ধরে পশ্চিমা আদর্শের একনিষ্ঠ অনুসারীরা, ভোগবাদী ও বস্তুবাদী, খ্রিস্টীয়-নাস্তিক্যবাদী সভ্যতার সৈনিকরা তাদের ভোগবাদী জীবনের শত্রু হিসেবে একমাত্র ইসলামকেই জানে ও চেনে। সে কারণেই তারা যুগের পর যুগ, শতাব্দীর পর শতাব্দী ইসলামের বিরুদ্ধে ক্রুসেড চালিয়ে আসছে। কখনো উদারতার বাতাবরণে ইসলামকে ছিন্নভিন্ন করতে চেয়েছে, কখনো ইসলামের লেভেল লাগিয়ে ইসলামকে ভেতর থেকে ইঁদুরের মতো কাটতে চেয়েছে। কখনো সরাসরি ও স্পষ্টভাবে ইসলামের মূল ভিত্তির ওপর হায়েনার মতো উন্মাদ হয়ে আঘাত হেনেছে। চেষ্টা করেছে আল্লাহর রাসূলের পবিত্র জীবনে কালিমা লেপন করতে। কখনো আল্লাহর কালাম পবিত্র কুরআনুল কারিমকে ভুল প্রমাণ করতে চেয়েছে। কখনো ইলমুল হাদিস কিংবা ইলমুল ফিকহের ওপর বর্বরোচিত হামলা চালিয়েছে। কখনো সরাসরি তির-ধনুক, বুলেট-বোমা দিয়ে মুসলমানদেরকে নৃশংসভাবে খুন করেছে। মুসলমানদের ভূমিগুলোকে দখল করেছে। এ পর্যায়ে এসে এক্ষেত্রে আমরা মরহুমা মুহতারিমা মরিয়ম জামিলা (রহ.)-এর একটি কথা স্মরণ করতে পারি। সেটা হচ্ছে তিনি বলেছেন- “আমাদেরকে এ বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা রাখা উচিত যে, ইসলামের আত্মরক্ষামূলক ব্যাখ্যা কিভাবে আমাদের ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক ধ্বংস ডেকে আনছে। আমরা যতোই এই আত্মরক্ষামূলক কথাবার্তা ও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের দিকে পা বাড়াবো, আমরা ততই আরো দুর্বল হবো।” (ইসলাম ও জাতীয়তাবাদ, মরিয়ম জামিলা : পৃষ্ঠা-১২)

মুহতারিমা মরিয়ম জামিলার (রহ.) উক্ত কথাটি আমার কাছে সবচেয়ে সুন্দর এবং দামি একটা কথা বলে মনে হলো। সত্যি বলতে কী, এসব আত্মরক্ষামূলক কথাবার্তা ও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ সার্বিকভাবে আমাদের কোনো উপকার করেনি। বরং আমাদেরকে হীনম্মন্য এক বিড়াল জাতিতে পরিণত করে দিয়েছে। আসলে মানুষ সব সময়ই শত্রুকে সমূলে ধ্বংস করতে চায়। যেকোনো উপায়ে, যেকোনোভাবেই শত্রুর ক্ষতি করতে চায়। আর যে ব্যক্তি শত্রুকে পরিপূর্ণরূপে চেনে, সে ব্যক্তি কমজোরওয়ালা হলেও (যদি শত্রুকে সমূলে বিনাশ করার মতো পর্যাপ্ত ক্ষমতা-শক্তি না থাকে) শত্রু থেকে আত্মরক্ষা করে চলতে চায়। আর শক্তিশালী হলে তো কথায়-ই নেই, যেকোনো মূল্যে শত্রুর শেকড়-সমেত উপড়ে ফেলতে চায়। সে কারণেই আপনি পশ্চিমাদের কর্মসূচি ও কর্মপন্থার দিকে একটু চোখ বুলালে বা খেয়াল করলেই দেখবেন যে- তারা পরিপূর্ণরূপে, দাগহীনভাবে, নাড়ি-নক্ষত্রসহ তাদের শত্রুকে চিনেছে। যার কারণেই তারা কেবল একজন লাদেনের অজুহাত দিয়ে আফগানকে তছনছ করেছে। গণবিধ্বংসী অস্ত্রের অজুহাতে সাদ্দামের ইরাককে মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়েছে। স্বৈরতন্ত্র হটিয়ে গণতন্ত্র আনার নামে সমৃদ্ধশালী লিবিয়াকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে। এভাবে প্রায় প্রতিটি জনপদেই তারা তাদের ভোগবাদী জীবনের একমাত্র শত্রু ইসলাম ও ইসলামের মুজাহিদ মুসলমানদেরকে শেকড়শুদ্ধ ধ্বংস করতে চেয়েছে এবং চায়। কিন্তু শত্রুকে চিনলো না কিংবা চেনার চেষ্টাও করলো না, অথবা চিনলেও তাদের ফাঁদ ধরতে পারলো না আমাদের এসব ক্রিটিক্যাল থিংকার নামক স্কলাররা! অথচ একজন সত্যিকারের ক্রিটিক্যাল থিংকারের ক্রিটিক্যাল থিংকিংয়ের দাবি ছিলো দ্বীনের বিধানের শ্রেষ্ঠত্বের ব্যাপারে ক্রিটিক্যাল থিংকিং করে জগদ্বাসীর নিকট দ্বীন হিসেবে আল-ইসলামকে গ্রহণীয় করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা। কিন্তু এ-সমস্ত লোকদের ক্রিটিক্যাল থিংকিং হচ্ছে কেবল দ্বীনকেই মডারেশনের চিপায় ফেলে এর অত্যাধিক বিশুদ্ধ আবেদনকে সংকীর্ণ করে ফেলা।

কথিত এসব ক্রিটিক্যাল থিংকাররা যে সবাই পশ্চিমা শায়খ বা স্কলার, তা না। বরং আরব-অনারব, ইরান-তুরান সব জায়গাতেই আছে এসব কথিত ক্রিটিক্যাল থিংকাররা। মূলত এটা হচ্ছে পরাজিত মানসিকতারই ফলাফল এবং অমুসলিম বিশ্বব্যবস্থারই প্রভাব। মুসলিম অধ্যুষিত এলাকার আলিমরা তো ইসলামী পরিবেশ বা সমাজ কিছুটা হলেও পায়,  সে কারণে কিছু কিছু সমাজ-বিধান তাঁরা নির্ভয়ে হীনম্মন্যতা ছাড়া বর্ণনা করতে পারেন। কিন্তু পশ্চিমা স্কলাররা তো তাও পায় না। যার কারণে তাঁরা হয় বিকৃত অবস্থান, নয়তো আপসমূলক অবস্থান গ্রহণ করেন দ্বীনের বিধিবিধানের ব্যাপারে। আর তাদের সেসব অবস্থান সোশ্যাল-মিডিয়ার বদৌলতে আমাদের মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলেও- যেখানকার সমাজটা কিছুটা হলেও ইসলামের অনুকূলে আছে, বা আলিমরা যেসব বিধান বলার ক্ষেত্রে তেমন একটা বাধার সম্মুখীন হয় না- সেসব এলাকায় পৌঁছায়। আর অমুসলিম পরিবেশে বেড়ে ওঠা সে সকল শায়েখদের প্রভাবে প্রভাবিত এসব অঞ্চলের মানুষও হয়। তখন তারা (প্রাচ্য পাশ্চাত্যে অবস্থানরত ইসলামিক স্কলাররা) বিজয়ী শক্তি পশ্চিমা সভ্যতার যথার্থ ব্যবচ্ছেদ না করে, তাদের আদর্শের অসারতা দুনিয়াবাসীর নিকট উন্মোচন না করে, বরং ইসলামের ওপর তাদের করা অফেন্সিভ আক্রমণের ডিফেন্সিভ কিছু জবাব দেওয়ার চেষ্টা করে। সোজা কথায় তাদের নির্লজ্জ, অগ্রহণযোগ্য ও অবিবেচনাপ্রসূত সমালোচনাকে পাত্তা দিয়ে এরপর তাদের চিন্তাধারাকে, তাদের পথ ও পন্থাকে, তাদের মূল্যবোধকে কিছু ক্ষেত্রে পুরোটা, কিছু ক্ষেত্রে আংশিক ইসলামাইজেশন করার চেষ্টা করে। এসব করার পর এক পর্যায়ে তারা এটার স্বপক্ষে চৌদ্দশত বছরের দুনিয়ার সকল আলিমদের মধ্য থেকে কয়েকটি ইজতেহাদি রায় খুঁজেটুজে “এটাও একটা মত”, কিংবা “এর স্বপক্ষেও দলিল দস্তাবেজ আছে” বলে ফিকহের বাতাবরণে হাজির করে। আর এসব করে ওনারা নিজেদেরকে বিশাল বড়ো ইন্টালেকচুয়াল, অনেক বড়ো ক্রিটিক্যাল থিংকার, খুবই যুগোপযোগী স্কলার এবং একজন মুজাদ্দিদ ও মুজতাহিদের রূপে তাবৎ দুনিয়ার মানুষের সামনে উপস্থাপন করেন। তারা না করলেও তাদের অনুসারীরা তো করেই। কারণ, অনুসারীরা তো সব সময় এক কাঠি সরেই সই করে! 

অথচ একজন আদর্শ মুসলিম হিসেবে, ঈমানদার-আলিম ক্রিটিক্যাল থিংকার হিসেবে তাদের উচিত ছিলো ইসলামের স্পষ্ট অবস্থান তুলে ধরা এবং সেই অবস্থানের যৌক্তিকতা ফুটিয়ে তুলে পাশ্চাত্যের নানাবিধ মতবাদকে জনগণের সামনে অগ্রহণযোগ্য, অ-অনুসরণযোগ্য হিসেবে প্রমাণ করে দেওয়া। ইসলামের সনাতনী বা খাইরুলকুরুনির (সর্বোত্তম যুগের মানুষদের) সর্বাধিক অনুসরণকৃত আমল নিয়ে প্রশ্ন না তুলে, এটাকে পুনঃব্যাখ্যা না করতে চেয়ে বরং পাশ্চাত্যের মূল্যবোধগুলোকে নানাবিধ প্রশ্নবাণে জর্জরিত করা। কিন্তু সেটা করা হয় না। শুধু সালাফদের প্রদান করা ফতোয়াগুলোকে, ইখলাস আর তাকওয়ার সর্বাধিক নিকটবর্তী ইসলামের বিধানাবলিকেই প্রশ্ন করা হয়। এগুলো নিয়েই ক্রিটিক্যাল থিংকিং করা হয়। ক্রিটিক্যাল থিংকিং নাম দিয়ে এসব বিধানাবলিকেই মডারেশনের চিপায় ফেলে থেঁতলে দেওয়া হয়।

আমরা কেন এই বিষয়টা বুঝতে পারছি না যে, আমরা আল্লাহর বিধানের ওপর ঈমান আনার পরে, তথা মুসলিম হবার পরেও যদি ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায়, উত্তম-অনুত্তম ইত্যাদি পরিমাপ করার বাটখারা কাফিরদের কাছ থেকে খরিদ করি, তাহলে তো সেই বাটখারায় খোদাদ্রোহী-তাগুত-ফাসিকদের সবকিছুই উত্তম, শ্রেষ্ঠ, ভালো, অনুসরণযোগ্যই মনে হবে। পক্ষান্তরে আল্লাহর প্রদত্ত আসমানি বিধানের সবটুকুই খারাপ মনে হবে। যেমনটি উস্তাদ মওদূদী রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন। তিনি বলেছেন- “যে ব্যক্তি পাশ্চাত্যের মাপকাঠিতে বিশ্বাসী, তার নিকট তো ইসলামের প্রতিটি বস্তুই সংশোধনযোগ্য মনে হবে। সে ইসলামী নির্দেশাবলির ব্যাখ্যা করতে বসলে তা পরিবর্তন করেই ছাড়বে।” (বই : পর্দা ও ইসলাম)


৪.

মুসলিম হিসেবে আমাদের তো এই কথাটুকু মনে রাখা উচিত যে, আমাদের কাছে রয়েছে আল্লাহ প্রদত্ত ওহি। আমাদের সবকিছুর মানদণ্ড হচ্ছে ওহির জ্ঞান। আমরা যদি সবকিছুকে খোদাদ্রোহী-তাগুত-ফাসিকদের বাটখারায় না মেপে আল্লাহ প্রদত্ত ওহির ইলম দিয়ে মেপে মেপে দেখতে পারি, তাহলে একেবারে সব স্ফটিকের ন্যায় স্বচ্ছ আর পরিষ্কার হয়ে যাবে আমাদের কাছে। এবং ওহিকেই একমাত্র প্রণিধানযোগ্য মাপকাঠি হিসেবে ঠিক/গ্রহণ করতে পারলেই কুফরের মনস্তাত্ত্বিক পরাজয় ঘটবে, ইনশাআল্লাহ। আর যদি তা না করতে পারি, তাহলে এভাবে একের পর এক সমালোচনা আসবে, আর আমরা ইসলামকে তাদের চোখে ও তাদের আদর্শের আলোকে কিউট প্রমাণ করে যেতেই থাকবো, যেতেই থাকবো। এরকম করতে করতে ইসলাম আর ইসলাম থাকবে না। ইসলাম খ্রিস্টবাদের মতো নাম এবং ¯্রফে উৎসবসর্বস্ব এক ধর্মে পরিণত হবে।

এই যে আজকে আমাদের মধ্যে যারা আল্লাহর দ্বীন ও শরিয়াহর ব্যাপারে কখনো আপসমূলক, আবার কখনো কখনো বিকৃত অবস্থানও গ্রহণ করেছে এবং করে যাচ্ছে, এসব করেও কি তাঁরা পাশ্চাত্যের চোখে যথেষ্ট উদার মুসলিম, ও মানবিক মানুষ হিসেবে কবুলিয়াত পেয়েছেন? তিউনিসিয়ার ইসলামী আন্দোলনের কথাটাই আমরা সামনে আনতে পারি, তারা যেভাবে সেক্যুলারিজমের সাথে আপস করেছে, এতে করেও কি তারা ক্ষমতার মসনদে নিজেদেরকে ধরে রাখতে পেরেছেন? উদার ও কথিত মানবতাবাদী আন্দোলন হিসেবে কবুলিয়াত পেয়েছেন? নিশ্চয়ই পায়নি। মহাগ্রন্থ আল-কুরআন হুবহু এ কথাটিই আমাদের সেই সাড়ে চৌদ্দশত বছর পূর্বে জানিয়ে দিয়েছেন- “ইহুদি নাসারারা কখনই তোমার প্রতি সন্তুষ্ট হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না তুমি তাদের মত হয়ে না যাও।” (সূরা বাকারা : ১২০)


৫.

তবে, বর্তমান বিশ্বে ইউরোপ-আমেরিকার শায়েখ ও তাদের প্রভাবিত ব্যক্তিদের এবং কিছু কিছু ইসলামি আন্দোলনগুলোর যখন এই করুণ অবস্থা, তখন সেক্ষেত্রে সার্বিক বিষয়ে বিশ্ব-ইসলামী আন্দোলনের অন্যতম মহীরুহ, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ আলিমে দ্বীন, ইমাম সাঈয়েদ আবুল আলা মওদূদীর (রহ.) চিন্তা ও কর্ম অনেকটাই ব্যতিক্রম। ব্যতিক্রম মুফাক্কিরে ইসলাম উস্তাদ সাঈয়েদ কুতুব রহিমাহুল্লাহও। গণতান্ত্রিক ধারার ইসলামী আন্দোলনগুলোর দিকে তাকালে দেখা যাচ্ছে যে, উস্তাদ মওদূদী রাহিমাহুল্লাহর প্রতিষ্ঠিত সংগঠনটা এখনো অন্যদের তুলনায় অধিকতর-ইসলামিক আছে। যাহোক, লেখাটির এই পর্যায়ে এসে উস্তাদ মওদূদীর একটি বিখ্যাত কথা সবার সামনে উপস্থাপন করতে চাই। যেখানে তিনি বলেছেন, “আমরা যাকে সত্য মনে করি, তার ‘যুগ’ যদি অতীত হয়েও থাকে তবুও আমাদের মধ্যে যুগের ‘কান’ ধরে সত্যের দিকে ফিরিয়ে আনার মতো ব্যক্তিত্ব ও আত্মজ্ঞান বর্তমান থাকা বাঞ্ছনীয়। কালের পরিবর্তনের সাথে সাথে নিজেকে পরিবর্তিত করা কাপুরুষের নীতি হতে পারে, কোনো আদর্শবাদী মানুষের নয়।” (বই : ইসলাম ও জাতীয়তাবাদ, সাঈয়েদ আবুল আলা মওদূদী ) 

উস্তাদ মওদূদীর এই বাক্যটি- যা বাহ্যিক দৃষ্টিতে কঠোর অথচ এটাই ইসলামের মূল প্রাণসত্তা এবং সত্যিকারের দাবি থেকে আমরা এটাই শিখতে পারি যে, ইসলামকে যুগোপযোগী করার চিন্তা করা নয়, বরং আমাদেরকে যুগের কান ধরে যুগকেই করতে হবে ইসলাম উপযোগী। ইসলামকে যুগের খাঁচায় বন্দি করার চেষ্টা নয়, বরং যুগকেই ইসলামের খাঁচায় বন্দি করার মতো ঈমানি দৃঢ়তা ও ইলমি-আমলি-আখলাকি যোগ্যতা অর্জন করতে হবে। সহজভাবে আমরা এটাই শিখতে পারি যে, ইসলামকে যুগোপযোগী নয়, বরং যুগের কান ধরে যুগকেই করতে হবে ইসলাম-উপযোগী। এবং ক্রিটিক্যাল থিংকিং এজন্যই করতে হবে। ইসলামের কোনো মাস’আলায় কোন ছাড় আছে, কোথায় কতোটুকু কাটছাঁট করে কী ছাড় দেওয়া যায় বা পাওয়া যায়, সেই কাজ করাটাকে একজন সত্যিকারের মুমিনের ক্রিটিক্যাল থিংকিং বলে না। আর যারা যুগ পরিবর্তনের দোহাই দিয়ে যুগ পরিবর্তনের সাথে সাথেই নিজ-আদর্শের পরিবর্তন করতে উঠে পড়ে লাগে, তাদের সেই নীতিকে বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইমাম, ইমাম মওদূদী কাপুরুষোচিত নীতি বলেই দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বর্ণনা করেছেন। 

ইমাম মওদূদীর রেখে যাওয়া আন্দোলনের উত্তরসূরিদের নিকট একটি প্রশ্ন রাখছি- আচ্ছা, বলুন তো, ইমাম মওদূদীর রেখে যাওয়া আন্দোলনের উত্তরসূরি হিসেবে আপনি কি যুগের কান ধরে যুগকে ইসলাম উপযোগী করার কাজ করে যাচ্ছেন? নাকি স্রােতের ভেলায় ভেসে ভেসে ইসলামেরই সংস্কার আর কাটছাঁট করে যাচ্ছেন? যদি সেটাই হয়, তাহলে একটু ভাবুন, নিজের বিবেকের কাছে প্রশ্ন করুন- আপনার ইসলামী আন্দোলনে শামিল হওয়াটা কি আল্লাহর সন্তোষ ও জান্নাতুল ফেরদৌস অর্জনের লক্ষ্যেই হয়েছে? দ্বীনকে অবিকৃত রেখে বিজয়ী করার জন্যই হয়েছে? যদি তা-ই হয়ে থাকে, রহমানুর রহিম মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার নিকট কায়মনোবাক্যে এই ফরিয়াদ, আমরা যে জান্নাত অর্জন করার জন্য ইসলামী আন্দোলনে শামিল হয়েছি, সে সুশোভিত-সুরভিত, মনোহর-মনোরম জান্নাতের পথের বিরাম-বিরতিহীন এক অপ্রতিরোধ্য যাত্রী করুন আমাদেরকে। আর আমাদের জীবনের সকল কিছুই এই দ্বীন থেকেই নেওয়ার মতো ইলম, ঈমান ও হিকমাহ প্রদান করুন। দ্বীনকে পরিপূর্ণ অবিকৃতরূপে রাখার জন্য যেরকম চিন্তা ও গবেষণা করার প্রয়োজন, আল্লাহ আমাদেরকে সেরকম চিন্তা-গবেষণা করার তাওফিক দান করুন। এমন ক্রিটিক্যাল থিংকিং থেকে মহান মালিক আমাদেরকে হেফাজত করুন, যে ক্রিটিক্যাল থিংকিং বা চিন্তা-গবেষণার মাধ্যমে সংস্কৃতি-অর্থনীতি, রাজনীতি-সমাজনীতির সমাধান খুঁজতে হয় কিংবা নিতে হয় দ্বীনের বাউন্ডারির বাহিরে গিয়ে, অথবা দ্বীনকে বিকৃতি করে। আল্লাহ আমাদেরকে হেফাজত করুন। আ-মি-ন, ইয়া রাব্বাল আ’লামিন! 

লেখক : ব্লগার, গবেষক ও কলামিস্ট

আপনার মন্তব্য লিখুন

কপিরাইট © বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির