সর্বশেষঃ
post

জ্ঞানার্জনের ১০টি নীতিমালা

আলী আহমাদ মাবরুর

২৪ জুন ২০২২

১. আল্লাহর সাহায্য কামনা করা

মানুষ মাত্রই দুর্বল ও অসহায়। আল্লাহর সাহায্য ও অনুমোদন ছাড়া মানুষের কিছুই করার ক্ষমতা ও সামর্থ্য নেই। যদি মানুষ নিজেকে শক্তিশালী মনে করে এবং কেবলমাত্র নিজের ওপরই ভরসা রাখে তাহলে তার ধ্বংস অনিবার্য। কিন্তু যদি সে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখতে পারে, নিজের অসহায়ত্ব অনুধাবন করে রাব্বুল আলামিনের কাছে সাহায্য চাইতে পারে তাহলে সে লক্ষ্যে পৌঁছতে পারবে। এই চিরন্তন সত্যটি জ্ঞানার্জনের ক্ষেত্রেও একইভাবে প্রযোজ্য। মানুষ যদি জ্ঞানার্জন করতে গিয়ে তার রবের কাছে খোলামনে চাইতে পারে তাহলে আল্লাহও তাকে সাহায্য করবেন। আল্লাহ কালামে পাকে মানুষকে সাহায্য করার ধরনও শিখিয়ে দিয়েছেন এভাবে, “আমরা শুধু আপনারই ইবাদত করি, আপনার কাছেই সাহায্য চাই।” (সূরা ফাতিহা : ৫) 

আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন, “যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর ভরসা করে তার জন্য তিনিই যথেষ্ট। আল্লাহ তার কাজ পূর্ণ করবেন।” (সূরা ত্বালাক : ৩)

অন্যত্র ইরশাদ করেন, “আল্লাহর উপর ভরসা কর যদি তোমরা মুমিন হও।” (সূরা মায়িদাহ : ২৩)

রাসূল সা. নিজেও বারবার আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সা.কে বলতে শুনেছি, যদি তোমরা আল্লাহর প্রতি যথার্থ ভরসা করো তাহলে তিনি তোমাদেরকে ঠিক সেভাবেই রিজিক দান করবেন, যেভাবে তিনি পাখিকে রিজিক দিয়ে থাকেন। তারা ভোরে খালি পেটে বের হয় এবং দিনের শেষে ভরা পেটে বাসায় ফিরে আসে।  (তিরমিজি-২৩৪৪, ইবনু মাজাহ-৪১৬৪)

আর রিজিকের সর্বোত্তম একটি উপকরণ হলো জ্ঞান। আমরা রিজিক বলতে শুধুমাত্র খাবার ও আয় রোজগার বুঝে থাকি- যা আমাদের জানার সীমাবদ্ধতা। আর রিজিকের যে কোনো উপকরণ পাওয়ার জন্যই আল্লাহর ওপর শতভাগ ভরসা ও নির্ভরতা রাখা জরুরি। হাদিস থেকে জানা যায়, রাসূল সা. যখনই ঘর থেকে বের হতেন তখনই তিনি এই দোয়া করতেন, ‘বিসমিল্লাহি, তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহি, ওয়া লা হাওলা ওয়া লা কুওয়্যাতা ইল্লা বিল্লাহি।’

অর্থ : আল্লাহর নামে বের হচ্ছি; আল্লাহর ওপর ভরসা করলাম। আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কোনো উপায় নেই; আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কোনো শক্তিও নেই।’ (তিরমিজি-৩৪২৬, আবু দাউদ-৫০৯৫)। এই দোয়াটি যেকোনো সময়ই বিশেষ করে অধ্যয়নের আগেও পাঠ করা যায়। কারণ এর মধ্য দিয়ে আল্লাহর ওপর আমাদের একনিষ্ঠ ভরসাও প্রকাশিত হয়।


২. নেক নিয়ত লালন করা

জ্ঞানার্জনের প্রক্রিয়ায় একজন মানুষকে অবশ্যই ভালোভাবে নিয়ত করতে হবে। জ্ঞানার্জনটি যেন হয় শুধুমাত্র আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্যই। খ্যাতিমান হওয়ার বাসনা কিংবা অন্য কোনো বৈষয়িক প্রাপ্তি অর্জনের লক্ষ্য নিয়ে জ্ঞানার্জন করা কাম্য নয়। তাই এ ধরনের নিয়ত বা সুপ্ত ইচ্ছাও লালন করা যাবে না। আল্লাহর জন্য কেউ যখন কোনো কাজ করে- আল্লাহ তাতে বরকত দান করেন, সফলতা প্রদান করেন। এই দৃষ্টিভঙ্গির বিচারে জ্ঞানার্জন বড় ধরনের একটি ইবাদত।

ইবাদত হোক বা আমল- তাতে কখনোই সফলতা আসবে না যদি কেবলমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির নিয়তেই করা না যায়। আর আমল করার ক্ষেত্রে বিশ^নবী সা.-এর সুন্নত অনুসরণ করাও জরুরি। আল্লাহ পাক বলেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদের সঙ্গে আছেন, যারা তাকওয়াবান এবং যারা সৎকর্ম করে।” (সূরা নাহল : ১২৮)

আর তাকওয়াবান হওয়ার একটি সুস্পষ্ট নমুনা হলো যে কোনো কাজকে শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য করার মতো মানসিকতা লালন করা। তাই যিনি প্রদর্শনেচ্ছা থেকে জ্ঞানার্জন করবেন, তিনি যেমন এই দুনিয়াতে লাঞ্ছিত হবেন তেমনি পরকালেও তার জন্য শাস্তিই নির্ধারিত হয়ে যাবে। এ ধরনের জ্ঞানী বা আলেমদের ভয়ঙ্কর পরিণতির বিষয়টি হাদিসেও পাওয়া যায়। হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত। রাসূল সা. বলেছেন, “কিয়ামতের সবার আগে যাদের বিচারের জন্য আনা হবে, তাদের মধ্যে অন্যতম দানবীর, আলেম (জ্ঞানী) ও আল্লাহর পথে জিহাদকারী শহীদ।” এর মধ্যে আলেম সংক্রান্ত অংশটি হলো, “আলেমকে আল্লাহর সামনে নিয়ে আসা হবে। আল্লাহ তায়ালা আলেমকে জিজ্ঞাসা করবেন, ‘তোমাকে আমি যে জ্ঞান দিয়েছিলাম- সেটি তুমি কোন পথে ব্যয় করেছো?’ তখন সে বলবে, ‘আমি আপনাকে খুশি করার জন্য সে জ্ঞান অন্য মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছি।’ আল্লাহ বলবেন, ‘তুমি মিথ্যা বলেছো। তুমি এসব জ্ঞান অন্যদের কাছে পৌঁছে দিয়েছো- যাতে লোকেরা তোমার প্রশংসা করে এবং তোমাকে গুরুত্ব দেয়। সেটি তুমি দুনিয়ায় পেয়ে গেছো। তাই এখানে তোমার জন্য আর কোনো প্রাপ্যই রাখা হয়নি।’ এরপর তাকেও জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। (তিরমিজি-২৩৮২)


৩. আল্লাহর সামনে বিনয়ী হওয়া এবং সফলতার জন্য 

    আল্লাহর কাছে দোয়া করা

জ্ঞানার্জনে আগ্রহী প্রত্যেকের উচিত আল্লাহর কাছে জ্ঞান বৃদ্ধির জন্য দোয়া করা। কারণ মানুষ মাত্রই অসহায় এবং তার প্রতিটি মুহূর্তেই আল্লাহর সাহায্যের প্রয়োজন। এ কারণে আল্লাহ পাক তাঁর বান্দাদেরকে উৎসাহিত করেছেন যাতে তারা মালিকের সামনে নমনীয় হয় এবং তাঁর কাছেই সাহায্য কামনা করে। আল্লাহ বলেন, “তোমরা আমাকে ডাকো, আমি নিশ্চয়ই সাড়া দেবো।” (সূরা মুমিন : ৬০)

রাসূল সা. আমাদের জানিয়েছেন আল্লাহ তায়ালা বান্দার ডাকে সাড়া দেয়ার জন্য প্রতিদিন সাত আসমান থেকে নেমে আসেন। আবু হুরায়রাহ্ রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেছেন, প্রতি রাতে শেষ তৃতীয়াংশে আমাদের মর্যাদাবান বরকতপূর্ণ রব দুনিয়ার আকাশে নেমে আসেন এবং বলেন, ‘যে আমাকে ডাকবে আমি তার ডাকে সাড়া দেব। যে আমার নিকট কিছু প্রার্থনা করবে আমি তাকে তা দান করব। যে আমার নিকট মাফ চাইবে আমি তাকে মাফ করে দেব।’ (বুখারি-১১৪৫, মুসলিম-৭৫৮)

আল্লাহ তায়ালা তার প্রিয় হাবিবকেও সা. জ্ঞানার্জনের জন্য দোয়া করার আহবান জানিয়েছিলেন। আল্লাহ বলেন, “এবং বলুন, হে আমার রব, আমার জ্ঞান বৃদ্ধি করুন।” (সূরা ত্বহা : ১১৪)। একইভাবে আল্লাহ পাক হযরত ইবরাহীম (আ)কেও জ্ঞানার্জনের জন্য দোয়া করার নির্দেশনা দিয়েছিলেন এবং হযরত ইবরাহিম (আ) এই মর্মে দোয়া করেছিলেন, “হে আমার রব, আমাকে প্রজ্ঞা ও জ্ঞান দান করুন এবং আমাকে সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত করুন। (সূরা শুআরা : ৮৩)

রাসূল সা. নিজেই তার প্রিয় সাহাবি হযরত আবু হুরায়রা রা. এর জন্য দোয়া করেছিলেন যাতে তার স্মৃতিশক্তি বেড়ে যায়। একইসঙ্গে তার আরেক প্রিয় সাহাবি হযরত ইবনে আব্বাসের রা.-এর জন্যও একইভাবে দোয়া করেন যে, ‘হে আল্লাহ! আপনি তাকে দ্বীনের সঠিক বুঝ দান করুন এবং কুরআনে কারিমের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের জ্ঞান দিন।’ আল্লাহ তায়ালা নবীজি সা. এর দুটো দোয়াই কবুল করেছিলেন। নবীজির সা. দোয়ার বরকতেই আবু হুরায়রা রা. অনেক বেশি হাদিস স্মরণে রাখতে পেরেছিলেন। আবু হুরায়রা রা.কে আমরা এখন সর্বোচ্চ সংখ্যক হাদিস বর্ণনাকারী সাহাবি হিসেবেই জানি। অন্যদিকে হযরত ইবনে আব্বাসও রা. উম্মাহর আলেম এবং কুরআনের সর্বশ্রেষ্ঠ মুফাসসির হিসেবে স্বীকৃতি পেয়ে এসেছেন। সুবহানআল্লাহ।

আমাদের পূর্বসূরি সালাফদের মাঝে যারা প্রকৃতার্থেই জ্ঞানের অনুশীলন করতেন তারা আলেমদের এই কাক্সিক্ষত বৈশিষ্ট্যগুলো লালন করে গিয়েছেন। তারা জ্ঞান নিয়ে বড়াই করতেন না। বরং আল্লাহর কাছে বারবার নিজেদের অপ্রতুল জ্ঞানের জন্য মাফ চাইতেন, ইলম বৃদ্ধির জন্য দোয়া করতেন। এক্ষেত্রে শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ)-এর প্রয়াস সম্পর্কে আমরা আলোকপাত করতে পারি। তিনি জ্ঞানার্জনের আগে মসজিদে চলে যেতেন। আল্লাহর দরবারে সিজদা দিতে, আর কান্নাভরা কণ্ঠে দোয়া করতেন, “হে আমার রব, হে ইবরাহিমের রব, হে সুলাইমানের রব, আপনি আমাকে জ্ঞান দান করুন। আমাকে বোঝার তাওফিক দিন।”

আল্লাহ তায়ালা শাইখুল ইসলামের এ দোয়া কবুল করে নিয়েছিলেন বলে তার সমসাময়িক অনেকেই মনে করেন। এ কারণে ইবনে দাকিক আল ঈদ তার সম্বন্ধে বলেন, “আল্লাহ তায়ালা এমনভাবে ইবনে তাইমিয়াকে জ্ঞান দিয়েছিলেন যেন জ্ঞানের সাগরটি তার দুচোখের মাঝেই দেখা যেতো। ইচ্ছেমতো সেই সাগর থেকে তিনি জ্ঞান আহরণ করতে পারতেন, আবার অপ্রয়োজন মনে করলে তিনি নিজেকে সংযতও করতে পারতেন।” (আদ দুররাত আল ইয়াতিমিয়া ফি আস সিরাত আত তাইমিয়া)


৪. একটি ন্যায়নিষ্ঠ অন্তর লালন করুন

আমাদের অন্তর হলো সেই স্থান যেখানে যাবতীয় জ্ঞান সুরক্ষিত থাকে। যদি অন্তরটাই দূষিত হয়, তাহলে এতে সংরক্ষিত সবটাই পচনের মুখে পড়বে। আর অন্তর পরিশুদ্ধ থাকলে এর ভেতর থাকা সবকিছুই ভালোভাবে সংরক্ষিত হবে। রাসূল সা. বলেছেন, “জেনে রাখ, শরীরের মধ্যে একটি গোশতের টুকরা আছে, তা যখন ঠিক হয়ে যায়, গোটা শরীরই তখন ঠিক হয়ে যায়। আর তা যখন খারাপ হয়ে যায়, গোটা শরীরই তখন খারাপ হয়ে যায়। জেনে রাখ, সেটি হলো কলব বা অন্তর।” (সুনানে দারেমি-২৫৬৯)

একটি অন্তর তখনই ন্যায়নিষ্ঠ হয় যখন তা তাকওয়ার ওজনে সমৃদ্ধ হয়। আল্লাহর সিফাত ও কার্যক্রম সম্বন্ধেও সচেতন হয়। সেই অন্তরই শুদ্ধ থাকতে পারে যা প্রতিনিয়ত ইবাদত ও জিকিরে ব্যস্ত থাকে- বিশেষ করে গভীর রাতেও আল্লাহর ইবাদতে মশগুল থাকে। প্রতিটি সচেতন মানুষের উচিত এমন কার্যক্রম থেকে দূরে থাকা যেগুলো তার অন্তরকে দূষিত করে ফেলে। আর অন্তর পচে গেলে তা আর জ্ঞান ধরে রাখতে পারে না। নতুন জ্ঞান যেমন আহরণ করতে পারে না তেমনি পূর্বে অর্জিত জ্ঞানগুলোও তার ওপর আর কোনো রেখাপাত করতে পারে না। আল্লাহ পাক এ ধরনের রোগাক্রান্ত ও দূষিত অন্তর সম্পর্কে বলেন, “আর আমি সৃষ্টি করেছি দোজখের জন্য বহু জিন ও মানুষ। তাদের অন্তর রয়েছে, তবে তা দিয়ে তারা বিবেচনা করে না, তাদের চোখ রয়েছে, তা দিয়ে দেখে না, আর তাদের কান রয়েছে, তা দিয়ে শোনেও না। তারা চতুষ্পদ জন্তুর মতো; বরং তাদের চেয়েও নিকৃষ্টতর। তারাই হলো গাফেল,  শৈথিল্যপরায়ণ।” (সূরা আরাফ : ১৭৯)

আমরা এ পর্যায়ে রোগাক্রান্ত অন্তর নিয়ে কথা বলছি। মনে রাখতে হবে, অন্তরের সাধারণত দুই ধরনের রোগ হয়।  একটি হলো সন্দেহ রোগ আর অপরটি হলো কামনা-বাসনা সংক্রান্ত রোগ। সন্দেহ সংশয়ে যখন একটি অন্তর আক্রান্ত হয় তখন তারা ধর্মের নতুন নতুন ব্যাখ্যা ও কার্যক্রম (বিদআত) সংযোজন করে; ক্ষেত্রবিশেষে ইসলামের গণ্ডি থেকে বের হয়ে নতুন করে কোনো আন্দোলন বা প্রয়াসও শুরু করে। আর কামনা-বাসনা সংক্রান্ত রোগটি তখন হয় যখন অন্তরে পার্থিব জীবনের প্রতি ভালোবাসা বেড়ে যায়। মানুষ তখন দুনিয়াবি আনন্দ উপভোগে মশগুল হয়ে যায়। অবৈধ ও হারাম জিনিসের প্রতি আসক্তি বেড়ে যায়। হারাম উপকরণগুলো দেখতে ও শুনতে শুরু করে। 

আরো কিছু বিষয় আছে যা প্রকৃত জ্ঞানার্জনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। যেমন: হিংসে, লোভ ও অহংকার প্রভৃতি। অন্তরকে আরো যে বিষয়গুলো কলুষিত করে তার মাঝে আছে মাত্রাতিরিক্ত ঘুম, অতিকথন এবং অতি আহার। এ কারণে প্রতিটি সচেতন মানুষের উচিত এ জাতীয় রোগ ও বাজে অভ্যাস থেকে দূরে থেকে অন্তরকে পরিশুদ্ধ ও ন্যায়নিষ্ঠ রাখার চেষ্টা করা।

৫. মেধা

মেধা একেবারেই সহজাত বা জন্মসূত্রে প্রাপ্ত হতে পারে আবার অর্জিতও হতে পারে। যদি কোনো মানুষ সহজাতভাবেই মেধাবী হয় তাহলে তার উচিত একে কাজে লাগানো এবং সরলপন্থায় নিজের বুদ্ধিমত্তাকে আরো বিকশিত করা। যদি কেউ সহজাতভাবে ততটা মেধাবী না হয় তাহলে তার এমন চেষ্টা চালানো উচিত যাতে সে এই নেয়ামতটুকু অর্জন করে নিতে পারে। মানুষের মেধাই হলো প্রধান শক্তি যা একজন ব্যক্তিকে জ্ঞানার্জনে, অনুধাবনে এবং মুখস্থকরণে সহায়তা করে। মেধা ও বুদ্ধিমত্তার বদৌলতেই একজন মানুষ একাধিক ফিকহি বিষয়াবলি, প্রমাণাদি বিশ্লেষণে এবং অন্যান্য বিষয় নিরূপণে সফল হয়ে থাকে। 


৬. জ্ঞানার্জনের তীব্র ইচ্ছা

আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদের সঙ্গে আছেন, যারা তাকওয়াবান এবং যারা সৎকর্ম করে।” (সূরা নাহল : ১২৮)

যখন একজন ব্যক্তি কোনো একটি বিষয়ের গুরুত্ব ভালোভাবে বুঝতে পারে তখনই সে তা অর্জনে তৎপর ও সক্রিয় হয়ে ওঠে। আর অর্জন করার ক্ষেত্রে মানুষের জন্য জ্ঞানের চেয়ে বরকতময় আর কোনো উপকরণ হতে পারে না। এ কারণে যারা জ্ঞানার্জনের পথে অগ্রসর হবেন তাদের দায়িত্ব হলো, জ্ঞান অর্জন, মুখস্থকরণ এবং অনুধাবন করার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পরিমাণ আকাক্সক্ষা লালন করা। জ্ঞানী ব্যক্তিদের সান্নিধ্যে থাকা এবং তাদের থেকে সবসময় কিছু শেখার বা জানার চেষ্টা করা। পাশাপাশি, সবসময় পড়াশুনা করার এবং নিজের অবসর সময়কে কাজে লাগানোর একটি তাগিদও ভেতরে থাকা চাই।


৭. একাগ্রতা, উৎসাহ ও পরিশ্রম করার 

    মানসিকতা থাকতে হবে

জ্ঞানার্জনে আগ্রহী মানুষকে অলসতা ও নিষ্ক্রিয়তা থেকে শতভাগ দূরে থাকতে হবে। তাকে নিরন্তর নিজের প্রবৃত্তি ও অনিষ্টকর ইচ্ছের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে। কারণ প্রবৃত্তি ও অনিষ্টতা জ্ঞানার্জনের পথে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা। যে কয়েকটি বিষয় একজন মানুষকে জ্ঞানার্জনে আগ্রহী ও উৎসাহী করে তুলতে পারে তার মধ্যে একটি হলো বেশি বেশি করে দুনিয়াখ্যাত স্কলার ও আলেমদের জীবনী অধ্যয়ন। বিশেষ করে পূর্বসূরি এই স্কলাররা বিপদাপদ ও মুসিবতের সময় কিভাবে ধৈর্য ধারণ করেছিলেন তা জানতে হবে। সামান্য একটি হাদিস সংগ্রহের জন্য তারা কতটা পরিশ্রম করেছেন, কত শত মাইল সফর করেছেন- এই ঘটনাগুলোও জ্ঞানার্জনে আগ্রহী মানুষের জন্য প্রেরণা হয়ে কাজ করতে পারে।


৮. দক্ষতা

জ্ঞানার্জনের পথে আগ্রহী একজন মানুষ যখন সর্বোচ্চ প্রয়াসটুকু চালাতে পারে তখনই সে কাক্সিক্ষত দক্ষতাও অর্জন করে নিতে পারে। এই দক্ষতা অর্জিত হলে মানুষ জ্ঞানার্জনে যেমন তৃপ্তি পায় আবার একইসঙ্গে নিজের ভেতর এক ধরনের শক্তি ও দৃঢ়তাও অনুভব করে। পাশাপাশি, প্রয়োজনীয় তথ্য মুখস্থকরণে এবং অনুধাবনেও তার পারদর্শিতা ও গতি অনেকটাই বেড়ে যায়। 


৯. একজন ভালো মানের শিক্ষকের সান্নিধ্যে থাকা 

জ্ঞান শুধু পড়ারই বিষয় নয়, বরং যারা জানেন তাদের কাছ থেকে শুনলেও অনেকটা জ্ঞান অর্জিত হয়। এই কারণে জ্ঞানার্জনে আগ্রহী মানুষের উচিত একজন দক্ষ ও দৃঢ় জ্ঞানস্তম্ভ খুঁজে বের করা। জ্ঞানী ও আলেমদের মজলিসে বসা এবং তাদের কথা শ্রবণ করা। এতে তার জ্ঞানার্জনের প্রক্রিয়াটি শক্তিশালী হবে। কুরআন তিলাওয়াত সঠিক ও সহিহ হবে। উচ্চারণে বড় কোনো ত্রুটি থাকলে তাও সংশোধিত হবে। তাছাড়া একটি বিষয়ের প্রকৃত ব্যাখ্যা বোঝাও তার জন্য অনেকটা সহজতর হবে। 

তাছাড়া একজন ভালো আলেমের পাশে থাকলে ছাত্রছাত্রীরা আদব, শিষ্টাচার ও তাকওয়ার অনুশীলনও শিখতে পারে। একা একা বই পড়ে সব জানার চেষ্টা করলে নানা ধরনের সংশয় ও অসম্পূর্ণ ধারণাও কারো মাঝে প্রবেশ করতে পারে। সেক্ষেত্রে একজন ভালো ওস্তাদ তার জন্য আশীর্বাদও হয়ে উঠতে পারে। আগে যেভাবে গুরুমুখী বিদ্যার অনুশীলন ছিল, এখন তা অনেকটাই অনুপস্থিত। তারপরও বাস্তবতা হলো, ভালো মানের আলেমের সংস্পর্শ ছাড়া এ যুগেও প্রকৃত জ্ঞানের সন্ধান পাওয়া বেশ কঠিন। প্রযুক্তি বা তথ্য সংগ্রহের সুযোগ অনেকটা সহজলভ্য হয়ে গেলেও ভালো মানের আলেম ও স্কলারের আবেদন এখনো প্রকটভাবেই রয়ে গেছে।


১০. সময় দিতে হবে 

একজন প্রকৃত জ্ঞানার্জনকারী ছাত্রের সময় নিয়ে পেরেশান হলে চলবে না। এক বছর বা দুই বছরের মধ্যে জ্ঞানার্জন শেষ হয়ে যাবে- এমনটিও মনে করার কারণ নেই। বরং একজন জ্ঞানমুখী ছাত্রের উচিত অনেক বছর সাধনা করার মতো মানসিকতা লালন করা। আল কাদী ইলিয়াদকে একবার প্রশ্ন করা হয়েছিল, একজন ছাত্রের কতদিন পর্যন্ত জ্ঞান অন্বেষণ করতে হবে? তিনি বলেছিলেন, ‘যতক্ষণ না তার মৃত্যু হয়।” এটিই প্রকৃত বাস্তবতা যে, মেধাবী ছাত্ররা কোনো নির্দিষ্ট সময় ধরে আলেমদের সাথে থাকেন না। নির্দিষ্ট সময় মেপে পড়াশুনাও করেন না। বরং তারা জীবনের শেষ মুহূর্ত অবধি এই প্রয়াসগুলো চালিয়ে যান। 

এগুলোই হচ্ছে জ্ঞানার্জন করার ক্ষেত্রে সাধারণ কিছু নীতিমালা। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে এই নীতিমালাগুলো অনুসরণ করার এবং কল্যাণকর জ্ঞানার্জনের তাওফিক দিন। আমিন।

(আবদুল্লাহ বিন সালফিক আয যুফাইরির ‘টেন গাইডলাইন্স ফর অবটেইনিং নোলেজ’ শীর্ষক কলাম অবলম্বনে)

লেখক : সাংবাদিক, অনুবাদক ও কলামিস্ট

আপনার মন্তব্য লিখুন

Masum

- 6 days ago

অনেক ধন্যবাদ এত সুন্দর করে পয়েন্টগুলো সাজিয়ে দেয়ার জন্য। এগুলা অনুসরণ করার চেষ্টা করবো ইনশাআল্লাহ🙂

কপিরাইট © বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির