সর্বশেষঃ
post

ভয়াবহ বন্যা নামমাত্র প্রকল্পের ১০ বছর পেরিয়ে

মুহাম্মদ নূরে আলম

০৬ জুলাই ২০২২

চারদিকে পানি আর পানি, প্রাণ বাঁচানোর আকুতি, চোখের সামনে প্রিয় মানুষগুলোর বীভৎস মৃত্যুযন্ত্রণা, সহায় সম্বল বসত-ভিটার ধ্বংসযজ্ঞ। সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন; বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ; আশ্রয়কেন্দ্রে আহাজারি বানভাসি মানুষের ঢল, তীব্র খাদ্যসঙ্কট। এক বন্যার ধকল সামলিয়ে উঠতে না উঠতেই আরেক বন্যার আঘাত। বাংলাদেশে প্রতি বছর বর্ষার আগমনের সাথে সাথে বন্যা হয়ে থাকে। তবে এবারের বন্যা একটু অন্যভাবে হানা দিয়েছে। ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে বন্যার প্রকোপ। ভারতের মেঘালয়ের বৃষ্টির পানি হঠাৎ করে বৃদ্ধি পেয়ে আঘাত হানে বাংলাদেশে। টানা বর্ষণ ও অব্যাহত পাহাড়ি ঢলে সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনাসহ উত্তরের জেলাগুলো একযোগে প্লাবিত হয়। এতে পানিবন্দী হয়ে পড়ে লাখ লাখ মানুষ। রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত অগণিত মানুষের মৃতদেহ উদ্ধার, অসংখ্য বাড়িঘর নষ্ট, ফসল-গবাদি পশু ধ্বংসের মাধ্যমে কয়েক লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই বন্যা যতটা না প্রাকৃতিক তার চেয়ে বেশি মানবসৃষ্ট এবং ক্ষতির পরিমাণ কয়েক হাজার কোটি টাকা। অথচ বাংলাদেশের বেপরোয়া বাজেট, অবাস্তবায়িত প্রকল্প, ভৌতিক উন্নয়ন, নৈরাজ্য, উদাসীনতা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় গাফিলতি নিয়ে সরকারের নেই মাথাব্যথা। নেই পানি নিয়ে ভারতের অপরাজনীতি মোকাবেলার কোনো চিন্তাভাবনা।


১০ বছরে প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়নি 

২০১২ সালে সুরমা নদীখননে সর্বপ্রথম একটি প্রকল্প গ্রহণ করে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। পাউবোর সিলেট কার্যালয় থেকে এই প্রকল্প প্রস্তাবনা মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করা হয়। প্রস্তাবনার পর নদীখননে সমীক্ষা চালানো হয়। সমীক্ষার পর নদীখননে উদ্যোগ নেওয়ার কথা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিলো। তবে এরপর এ ব্যাপারে আর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এরপর ২০১৭ সালে ৩০০ কোটি টাকার আরেকটি প্রকল্প প্রেরণ করে পাউবো। আবার ২০১৯ সালে সুরমা ও কুশিয়ারা নদীখনন, বাঁধ নির্মাণ ও নদীতীর প্রতিরক্ষার জন্য ২২শ কোটি টাকার একটি ডিপিপি প্রেরণ করে পাউবো। সেবারও সমীক্ষা চালানো হয়। তবে এবারও সমীক্ষাতেই আটকে যায় কার্যক্রম।

এরপর ২০২০ সালে অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) সুরমা খননে ৩ হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্প প্রস্তাবনা মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করে। ওই বছর তারা সমীক্ষাও চালায়। তবে এই প্রকল্পও এখন পর্যন্ত মন্ত্রণালয়ে আটকে আছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) সিলেট কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী আসিফ আহমদ গণমাধ্যমকে বলেন, নদীখননে আমরা তিনটি ডিপিপি মন্ত্রণালয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু প্রকল্পগুলো পাস হয়নি। পরে ২০২১ সালে আমরা নদীখননের বিষয়টি বাদ দিয়ে সুরমা ও কুশিয়ারা তীরে বাঁধ ও ডাইক নির্মাণ এবং নদীতীর প্রতিরক্ষায় ৪ হাজার কোটি টাকার আরেকটি ডিপিপি প্রেরণ করেছি। এটিও এখন সমীক্ষার পর্যায়ে আছে। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ অনেকদিন আগেই পরিকল্পনা কমিশনে জমা হয়েছিলো। তবে সেটিও আলোর মুখ দেখেনি। 


বন্যার ভয়াবহতা অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ

এবারের বন্যা দেশের অন্যান্য বারের চেয়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করে। গত ৫০ বছরেও মানুষ এতো ভয়াবহ বন্যা দেখেনি। বন্যার পানিতে আটকে পড়া মানুষকে উদ্ধারে সিলেট এবং সুনামগঞ্জের আটটি উপজেলায় সেনাবাহিনী নামানো হয়েছে। সিলেটে উজানের ঢল, টানা বৃষ্টিতে বন্যার পানির স্রােতে ভেসে গেছে ঘর, আসবাবপত্র, গবাদিপশু। বাড়ছে বন্যার পানি, সেইসঙ্গে বাড়ছে খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সঙ্কট, টেলিফোন নেটওয়ার্ক অকার্যকর হয়ে গেছে। ঢাকার সাথে সুনামগঞ্জ নেত্রকোনাসহ সিলেট বিভাগের সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। বন্যাকবলিত এলাকায় বিচ্ছিন্ন হয়েছে বিদ্যুৎ সরবরাহ। যে আশ্রয়কেন্দ্রের খোঁজে বানভাসি মানুষ এসেছিল সেগুলোতেও উঠেছে পানি। সিলেট বিমানবন্দরের সাথে বিমান যোগাযোগ হয়েছে বন্ধ। এসএসসি পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। বন্যাকবলিত এলাকায় বন্ধ ঘোষণা করা হয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। দুর্ভোগ বেড়েছে পানিবন্দী মানুষের। মানুষের মধ্যে খাবার তীব্র সঙ্কট দেখা দিয়েছে। হাসপাতালগুলোও তলিয়ে গেছে। ফলে সঙ্কটাপন্ন এই সময়ে ব্যাহত হয়েছে এই অঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবা। সবকিছু প্লাবিত হওয়ায় এলাকাবাসী দুর্বিষহ দিন পার করছেন। সপ্তাহজুড়ে চলা পাহাড়ি ঢল আর টানা বৃষ্টিতে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় এসব এলাকার পুকুরের মাছ তো ভেসে গেছেই। এইসব ক্ষতির পরিমাণ বলে শেষ করা যাবে না।


বন্যার কারণ 

বন্যার প্রধান কারণ ভারত থেকে আসা পানির ঢল। ভারতের আবহাওয়া অধিদফতর বলছে, তারা যেদিন থেকে এ অঞ্চলের বৃষ্টিপাতের তথ্য রাখা শুরু করেছে তখন থেকে এ পর্যন্ত জুনে একদিনে ৭৫০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে মাত্র ১০ বার। ১৯৯৫ সালের ১৬ জুন চেরাপুঞ্জিতে একদিনে ১৫৬৩ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছিল। আর বন্যার পূর্বের দিনগুলোতে সেখানে প্রায় আড়াই হাজার মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। এই অল্প কয়েক দিনে এত বৃষ্টির রেকর্ডও গত ১০০ বছরে নেই। বাংলাদেশের উজানে ভারতের আসাম ও মেঘালয়ে প্রায় আড়াই হাজার মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে শুধু তিন দিনেই। সেই বৃষ্টির পানি বাংলাদেশের সিলেট বিভাগের সব জেলায় প্রবেশ করার পর আশেপাশে অন্যান্য এলাকাকে প্লাবিত করে। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের পূর্বাভাস বলছে, আগামীতে আরো ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি হতে পারে। ফলে বন্যা পরিস্থিতির ক্ষতি বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকছেই। 

অপরদিকে হাওরাঞ্চলের বন্যার জন্য স্লুইস গেটকে অনেকাংশে দায়ী উল্লেখ করেন জলবায়ু ও পানি বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত। তিনি বলেন, স্লুইস গেটগুলোর নকশা ১৯৭০ সালের। সেগুলো বর্তমান প্রেক্ষাপটে আর কাজ করছে না। অথচ বাঁধগুলোতে এ গেটগুলো রয়েছে। কোথাও কোথাও বক্স কালভার্টও বন্যার পানি আটকে রাখছে। বন্যার পানি দ্রুত অপসারণ করতে হলে এ এলাকার স্লুইস গেট, কালভার্ট ও অপ্রয়োজনীয় বাঁধগুলোর অপসারণ করা জরুরি বলেও মন্তব্য করেন তিনি। 

ভয়াবহ বন্যার কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাওরে অপরিকল্পিত বাঁধ, রাস্তা ও স্লুইসগেট নির্মাণ বন্যার বড় একটি কারণ। এর সাথে যোগ হয়েছে কিশোরগঞ্জের ২৯ কিলোমিটার অল-ওয়েদার সড়ক, যা সমাধানের বদলে সমস্যার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিশোরগঞ্জের হাওর অঞ্চলের তিনটি উপজেলার মধ্যে সড়ক যোগাযোগ সহজ করতে নির্মিত হয়েছিল ২৯.৭৩ কিলোমিটারের দীর্ঘ একটি সড়ক, কিন্তু ওই অঞ্চলে সুবিধা দুর্দশার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে রাস্তাটি। অকাল বন্যা দেখা যাচ্ছে, হাজার হাজার হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে যাচ্ছে। কিশোরগঞ্জের ইটনা, মিঠামাইন ও অষ্টগ্রাম উপজেলার বাসিন্দারা বলছেন, ৮৭৪.০৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০১৬-২০২০ সালের মধ্যে নির্মিত এই সড়কের কারণে ঢলের পানি হাওর থেকে দ্রুত নদীতে নামতে পারছে না। সড়কের দু’পাশে সবুজ ধানক্ষেত বর্ষায় পানিতে থই থই করে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিসের হিসাব মতে, চলমান বন্যায়, গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত পানিতে তলিয়েছে-আউশ ধানের বীজতলা এক হাজার ৩০১ হেক্টর, বোরো ধান এক হাজার ৭০৪ হেক্টর এবং গ্রীষ্মকালীন সবজির এক হাজার ৪ হেক্টর জমি।

রাস্তা নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে যথাযথ পরিবেশগত সমীক্ষা না চালানো এর অন্যতম কারণ। হাওরের বৈশিষ্ট্য হলো জলের অবাধ প্রবাহ। ফলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সড়ক যদি নির্মাণ করতেই হয় তাহলে যেন ৩০ কিলোমিটার এই সড়কের অন্তত ৩০ ভাগ জায়গা উঁচু সেতু বা উড়াল সড়ক আকারে বানিয়ে পানি প্রবাহের সুযোগ রাখা উচিত। 

বন্যার আরো একটি কারণ হলো নদ-নদী ভরাট। সিলেট বিভাগের সুরমা, কুশিয়ারা, গোয়াইনসহ বেশির ভাগ নদ-নদীতে পলি পড়ে অনেক এলাকা ভরাট হয়ে গেছে। সিলেটকে বলা হতো দীঘির শহর। এখন নগরের ভেতরের সব পুকুর-দীঘি ভরাট করে বড় বড় বিল্ডিং গড়ে উঠেছে। হাওরগুলো ভরাট করে ফেলেছে। প্রায় ২৪৯ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে সুরমা দেশের দীর্ঘতম নদী। ভারতের বরাক নদী থেকে সিলেটের জকিগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে মেঘনায় মিলিত হয়েছে। এই নদী বছরের বেশির ভাগ সময় থাকে পানিহীন, মৃতপ্রায়। ভরাট হয়ে পড়েছে সুরমা নদীর উৎসমুখও। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) তথ্য মতে, সুরমা নদীর উৎসমুখের ৩২ কিলোমিটারে জেগেছে ৩৫টি চর। 

হাওর এলাকায় কৃষিকাজসহ নানা তৎপরতার কারণে পানি ধারণের ক্ষমতা কমে গেছে। যে কারণে বন্যার পানির উচ্চতা বেড়ে গেছে। পলি জমে ভরাট হয়ে পড়েছে নদীর তলদেশ। ফলে শুষ্ক মৌসুমে সুরমা হয়ে পড়ে বালুভূমি। অপরদিকে অল্প বৃষ্টিতেই নদী উপচে নদী তীরবর্তী এলাকায় দেখা দেয় বন্যা। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) হিসাবে, সিলেটে পুকুর-দীঘি মিলিয়ে তিন শতাধিক জলাশয় ছিল। এর দুই-তৃতীয়াংশই ভরাট হয়ে গেছে। অনেক জলাশয় ভরাট করে সরকারি প্রতিষ্ঠানও গড়ে উঠেছে।

এ ছাড়া সিলেটের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে ছোট-বড় প্রায় ২৫টি প্রাকৃতিক খাল। যা ‘ছড়া’ নামে পরিচিত। পাহাড় বা টিলার পাদদেশ থেকে উৎপত্তি হয়ে ছড়াগুলো গিয়ে মিশেছে সুরমা নদীতে। এসব ছড়া দিয়েই বর্ষায় পানি নিষ্কাশন হতো। ফলে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হতো না। এখন অনেক স্থানে এসব ছড়ার অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যায় না। ছড়াগুলো দখল হয়ে যাওয়ায় অল্প বৃষ্টিতেই নগরজুড়ে দেখা দেয় জলাবদ্ধতা। সিলেট সিটি করপোরেশনের এক কর্মকর্তা জানান, নগরীর ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া ১৩টি বড় ছড়ার দৈর্ঘ্য প্রায় ৭৩ কিলোমিটার। দীর্ঘদিন ধরেই এসব ছড়ার দু’পাশ দখল করে রেখেছে, স্থাপনা নির্মাণ করেছে অবৈধ দখলদাররা।

এছাড়া নগরের উপশহর এলাকার হাওর ভরাট করে গড়ে উঠেছে আবাসিক এলাকা। বাঘা এলাকার হাওর ভরাট করে হয়েছে ক্যান্টনমেন্ট। দীর্ঘদিন ধরে পাহাড়ি বালু-মাটি-পলি জমতে জমতে নদ-নদীগুলো প্রায় ভরাট হয়ে গেছে। অন্যদিকে, অপরিকল্পিত উন্নয়নকাজের কারণে নদীগুলো ক্রমে সংকোচন ও ভরাট হয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে নদীশাসনের নামে নদী-বিধ্বংসী কর্মকাণ্ড।

যত্রতত্র স্লুইসগেট ও অবকাঠামো নির্মাণের কারণেও নদীর প্রবাহপথ আরও বেশি সঙ্কুচিত হয়েছে। এতে এবার অতিবৃষ্টি ও উজানের ঢলে পানি জমে বন্যার সৃষ্টি করেছে। এ রকম পরিস্থিতি থেকে বাঁচার জন্য সিলেটের নদ-নদীগুলোর নাব্যতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। নদী দখলমুক্ত করে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে। ঢল ও ভারী বৃষ্টিপাত হলে যেন পানির বাড়তি চাপ ধারণ করতে পারে, এ জন্য বিল-ঝিল, হাওর-বাঁওড় ও জলাধার খনন করতে হবে।


বাসিন্দাদের দুর্বিষহ দিন

রাশিদা বেগম নামের এক মহিলা জানান, ঘর বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। চার সন্তান নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন ভাসুরের ঘরে। কিন্তু চারদিকে পানিঘেরা কাঁচাঘর কখন ভেঙে যায়, এ শঙ্কায় তার ঘুম নেই। তিনি বলেন, ভয়ে রাতে ঘুমাতে পারি না। ঘরে সাপ চলে আসে। খাবারও নেই। চার সন্তান নিয়ে বিপদে পড়ে গেছি। বন্যায় সব কেড়ে নিয়েছে। এখন আশ্রয়কেন্দ্রে এসেও পেটের ক্ষুধা মিটছে না। সরকারি ত্রাণসহায়তা অত পাচ্ছি না। গরিবের কোনো উপায় নেই। সামনের দিনগুলোতে কিভাবে খেয়ে বাঁচব তা নিয়ে দুঃশ্চিন্তা হচ্ছে। জৈন্তাপুরের আবুল হোসেন বলেন, টিউবওয়েলও পানির নিচে। বিদ্যুৎ নাই। খাবার পানিও নেই। বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট দিয়ে হাওরের পানিই খাচ্ছি, জীবনতো বাঁচাতে হবে। 

ত্রাণকার্যক্রম

অনেক আশ্রয় কেন্দ্রে জায়গার অভাবের পাশাপাশি খাবারের তীব্র সঙ্কট চলছে। অনেক জায়গায় দেখা যায় মানুষের সাথে রয়েছে গরু-ছাগলও। স্বেচ্ছাসেবকদের লোকজন তাদের মধ্যে রান্না করা খাবার বিতরণ করলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। অনেক আশ্রয়কেন্দ্রে পর্যাপ্ত ত্রাণসহায়তা পৌঁছেনি বলে জানা যায়। সিলেট সদর, দক্ষিণ সুরমা, কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর, কানাইঘাট, ছাতকেও, খাবারের সঙ্কট দেখা দিয়েছে।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তাদের কাছে পর্যাপ্ত ত্রাণের মজুদ আছে। কিন্তু, পরিবহনের অভাবে ত্রাণ মানুষের কাছে পৌঁছানো যাচ্ছে না। অনেক সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের পাঠানো অনুদানের শুকনো খাবার ভর্তি ট্রাক তারা পাঠাতে পারছেন না শুধুমাত্র যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণে। বন্যাকবলিত এলাকায় খাবারের পাশাপাশি পয়ঃনিষ্কাশনেরও সমস্যা হচ্ছে বলে ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন।

নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ড পানিবন্দী লোকজনকে উদ্ধার তৎপরতা শুরু করে। বন্যার তীব্রতা বৃদ্ধি পেলে উঁচু এলাকায়ও ঢুকতে শুরু করে বন্যা ও বৃষ্টির পানি। সিলেট রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মে পানি উঠে যাওয়ায় সিলেট থেকে সরাসরি ট্রেন চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। ১৮ জুন পানি কিছুটা কমতে শুরু করায় দুপুর ১২টা ৫৫ মিনিটের দিকে ফের ট্রেন চলাচল শুরু হয়। পাওয়ার গ্রিডে পানি উঠায় পুরো সিলেট জেলার বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থা বন্ধ হয়।


নৌকার জন্য হাহাকার

বন্যাকবলিত সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলায় নৌকার জন্য হাহাকার চলছে। অতিরিক্ত টাকা দিয়েও মিলছে না নৌকা। এই সুযোগে অনেক নৌকার মাঝি ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ভাড়া হাঁকাচ্ছে। এ কারণে পানিবন্দী লোকজনের উদ্ধার তৎপরতা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ছাতক উপজেলা শিক্ষা অফিসার পুলিন চন্দ্র রায় জানান, বন্যার কারণে বৃহস্পতিবার তিনিসহ তার আরো দুই সহকর্মী অফিসে আটকা পড়েন। শুক্রবার ৫ হাজার টাকায় একটি বলগেট নৌকা ভাড়া করে তারা তিনজন কোম্পানীগঞ্জ হয়ে সিলেটের টুকেরবাজারে এসে পৌঁছেন। এরপর তিনি নগরীর টিলাগড়ের বাসায় পৌঁছেন। তিনি জানান, নৌকা মালিকরা ডিজেলের অজুহাতে নৌকা ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছে।

সিলেট জেলা প্রশাসনের প্রেস উইং থেকে শনিবার সকালে সহকারী কমিশনার আহসানুল আলম জানান, সিলেটে বন্যার্তদের উদ্ধারে সিলেট ও সুনামগঞ্জে সেনাবাহিনীর পাশাপাশি নৌবাহিনীও কাজ শুরু করেছে। এছাড়া, বিমানবাহিনীর দুটি হেলিকপ্টারও উদ্ধারকাজে যুক্ত হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘নৌবাহিনী চলে এসেছে। ৩৫ জনের একটি ডুবুরি দল কাজ শুরু করেছে। 

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান তাৎক্ষণিক ৫০ লক্ষ টাকার অনুদান ঘোষণা করে সশরীরে বানভাসি মানুষে কাছে ত্রাণ নিয়ে গিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমানের ত্রাণ বিতরণে ছবি অনেক প্রশংসিত হচ্ছে।

১৮ জুন দিনভর সিলেট মহানগর এলাকাসহ শহরতলির বিভিন্ন বন্যাকবলিত এলাকায় তাঁর টিম পরিদর্শন করে। এসময় তাঁরা বন্যাদুর্গত মানুষের মাঝে জামায়াতের পক্ষ থেকে ত্রাণসহায়তা প্রদান করেন। আমীরে জামায়াত ডা. শফিকুর রহমান শনিবার সদরের সোনাতলা, বলাউড়া, বাদাঘাট মডেল উচ্চবিদ্যালয় আশ্রয়কেন্দ্র, ৩৯ নং ওয়ার্ডের রশিদিয়া মাদরাসা আশ্রয়কেন্দ্র, ৩৮ নং ওয়ার্ডের টুকেরবাজার এলাকায় নিজ হাতে বন্যাকবলিত মানুষের মাঝে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করেন। এসব এলাকায় জামায়াতের কেন্দ্রীয় ত্রাণ কমিটির উদ্যোগে ত্রাণ বিতরণ সভার আয়োজন হয়।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সিলেটবাসীর এ কঠিন পরিস্থিতিতে জামায়াতের পক্ষ থেকে ত্রাণকার্যক্রমের জন্য আপাতত ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে আরো সহযোগিতা করা হবে। 

বন্যার্ত মানুষের সাহায্যার্থে জামায়াতের প্রত্যেক জেলা ও মহানগর শাখায় পৃথক কমিটি করে ত্রাণকার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। জামায়াতের সকল স্তরের নেতা-কর্মীদের ঘরে বসে না থেকে অসহায়দের পাশে দাঁড়াতে হবে, সাধ্যমতো সহযোগিতা করতে হবে। খেলাফত মজলিসসহ আরও অনেক সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠন নিজেদের সাধ্যমতো ত্রাণ দিচ্ছে। 

লেখক : সাংবাদিক

আপনার মন্তব্য লিখুন

কপিরাইট © বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির