post

রাসূলুল্লাহর সা. রাষ্ট্রধারণা

ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ

১২ আগস্ট ২০২৩

বিশ্ব নবী মুহাম্মদ সা. রাসূল হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে রাষ্ট্রপ্রধানের ভূমিকাও পালন করেছেন। মদিনা সনদের মাধ্যমে তিনি ইসলামী রাষ্ট্রের রূপরেখা ঘোষণা করেছেন। তাঁর শাসিত রাষ্ট্রে নাগরিকরা সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক তথা সব অধিকার ভোগ করেছেন। তিনি প্রমাণ করেছেন, প্রত্যেক নাগরিকের খাওয়া, পরা, থাকা, চিকিৎসা ও শিক্ষালাভের সার্বিক অধিকার নিশ্চিত করা ইসলামী রাষ্ট্রের দায়িত্ব। মুহাম্মদ সা.-কে ইয়াসরিবের আবালবৃদ্ধবনিতা আবেগঘন পরিবেশে স্বাগত জানিয়ে আপন করে নেন। জনাকীর্ণ সংবর্ধনা সভায় ইয়াসরিববাসী মুহাম্মদ সা.-এর ঐতিহাসিক আগমনকে স্মৃতিবহ করে রাখার জন্য তাদের লালিত ইয়াসরিবের নামকরণ করেন ‘মদিনাতুন্নবী’ বা নবীর শহর। পরবর্তীতে এই নগরীই ‘মদিনা’ নাম ধারণ করে ইসলামী রাষ্ট্রের রাজধানীতে রূপান্তরিত হয়। এর বক্ষেই নির্মিত হয় মসজিদে নববী। এটিই ছিল ইসলামী রাষ্ট্রের কেন্দ্রবিন্দু ‘হাউজ অব ল’ সংসদ ভবন, সুপ্রিম কোর্ট। এখানেই প্রণীত হয়েছিল রাষ্ট্রপরিচালনার মৌলিক ও লিখিত সনদ। মদিনায় এ সনদ প্রণীত হয়েছিল বলেই একে মদিনা সনদ বলা হয়। 


সমকালীন বিশ্বে রাষ্ট্রব্যবস্থা ও রাসূলুল্লাহর সা. রাষ্ট্রধারণা

মানব ইতিহাসের শুরু থেকে ষষ্ঠ শতকের শেষভাগ পর্যন্ত সময়কালে মানবাধিকার আদায়ের সংগ্রামের কোনো ধারাবাহিক ইতিহাস জানা যায় না। তবে ইতঃপূর্বে সুমেরীয় রাজা ডুঙ্গি ‘ডুঙ্গি কোড’ ১৭৫৪ খ্রিস্টপূর্বে বেবিলনীয় রাজা হাম্মুরাবি ‘কোড অব হাম্মুরাবি বা হাম্মুরাবি আইন সংহিতা’ ও ৪৫০ খ্রিস্টপূর্বে রোমানরা ‘টুয়েলভ ট্যাবলস বা দ্বাদশ সারণি’ নামে সংবিধান প্রণয়ন করেন। যুগের চাহিদা অনুযায়ী এসব আইন বা সংবিধান অভিনব হলেও আধুনিক রাষ্ট্রীয় সংবিধানের ন্যায় তা রাষ্ট্র পরিচালনা ও নাগরিকদের সব ধরনের প্রয়োজন মেটাতে সক্ষম ছিল না। তদানীন্তন সময়ে বিশ্বের সরকার তথা শাসনপদ্ধতি ছিল ব্যক্তিকেন্দ্রিক। বিধিবদ্ধ শাসনতন্ত্র ছিল না বিধায় তৎকালীন শাসকদের খেয়াল-খুশিমত মুখোচ্চারিত বাণীই ছিল রাষ্ট্রের আইন। কাজেই সেখানে জনস্বার্থের পরিপন্থী শাসকের যথেচ্ছাচারের অবকাশ থাকাই ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু সপ্তম শতকে মুহাম্মদ সা. বিশ্ববাসীর সামনে নতুন আশা, নতুন আকাক্সক্ষার বাণী নিয়ে হাজির হন। তিনি বিশ্বাস করতেন, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে ঐক্য এবং সম্প্রীতি না থাকলে দেশের কল্যাণ সাধিত হতে পারে না। তাঁর মতে, যে দেশে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীর বাস, সে দেশে পরমত সহিষ্ণুতার প্রয়োজন অতীব গুরুত্ববহ। ‘নিজে বাঁচো এবং অন্যকে বাঁচতে দাও’ নাগরিক জীবনে এ নীতির গুরুত্ব ও তাৎপর্য উপলব্ধি করেছেন মুহাম্মদ সা.। 

৬২২ খ্রিস্টাব্দে মহানবী সা. যখন মদিনায় হিজরত করেন তখন মদিনার সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থা ছিল অত্যন্ত শোচনীয়। মদিনায় শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখার মতো কোনো কেন্দ্রীয় সরকার ছিল না। তাই মুহাম্মদ সা. মদিনায় ইসলাম প্রচার ও সুষ্ঠু সমাজব্যবস্থা কায়েম করার পর সেখানে সর্বপ্রথম ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। সেই সঙ্গে মদিনায় বসবাসরত বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে ঐক্য ও সদ্ভাব প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি সঙ্কল্প করেন। মহানবী সা. তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতা দ্বারা উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন যে, মদিনা ও এর আশপাশে বসবাসকারী মুসলিম, ইহুদি, খ্রিস্টান ও পৌত্তলিকদের মধ্যে সদ্ভাব ও সম্প্রীতি স্থাপন করতে না পারলে একটি সুসংহত রাষ্ট্র স্থাপন করা সম্ভব নয়। তাই হিজরতের অব্যবহিত পরেই তিনি মদিনায় অবস্থানকারী মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে সম্প্রীতি স্থাপন ও মদিনায় বিবদমান গোত্রগুলোর মধ্যকার বিরোধ মীমাংসা করে একটি ঐক্যবদ্ধ জাতিগঠনের প্রয়াস পান। এ উদ্দেশ্যে তিনি মদিনায় বসবাসরত সব জাতির জন্য ৬২২ খ্রিস্টাব্দে একটি সনদ প্রণয়ন করেন; যা ‘মদিনা সনদ’ নামে পরিচিত।

মদিনার সনদকে আরবিতে সাহিফাত আল-মাদিনাহ বা মিসাক্ক আল-মাদিনাহ বলা হয়। এটিকে দাস্তুর আল-মাদিনাহ বা মদিনার সংবিধানও বলা হয়ে থাকে। এটি বিশ্বের প্রথম লিখিত সংবিধান, পৃথিবীর তাবৎ সংবিধান রচিত হয়েছে এর আলোকেই। আর এর নীতিমালা প্রণীত হয়েছে কুরআন এবং সুন্নাহর আলোকে। মূলত এই সনদ হলো পরবর্তী যুগে পৃথিবীতে যেসব সংবিধান রচিত হয়েছে তারই পথপ্রদর্শক। সে প্রেক্ষাপটে রাসূল সা. হলেন সংবিধান রচনার উদ্ভাবক। ভাষার গাম্ভীর্য, সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম দিক সন্নিবেশকরণ, পক্ষ ও বিপক্ষ সকলের নিকট গ্রহণযোগ্য, সুশীলসমাজ ও আদর্শ রাষ্ট্র গঠনের নীতিমালা প্রভৃতি দিক দিয়ে এই সনদ বিশ্ব ইতিহাসে অনবদ্য হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। 


মদিনা সনদে রাষ্ট্র পরিচালনার ধারা বা শর্তাবলি

ড. হামিদুল্লাহ বিভিন্ন ইসলামিক দলিলপত্রের সাহায্যে মদিনা সনদকে ৪৭টি ধারায় ভাগ করেছিলেন। সাম্প্রতিককালে প্রখ্যাত ইসলামিক স্কলার এবং বিচারক ড. মুহম্মদ তাহির আল কাদরী এই সনদ নিয়ে বিশদ গবেষণা এবং বিশ্লেষণ করেছেন ‘মদিনা সনদের সাংবিধানিক বিশ্লেষণ’ গ্রন্থে। আধুনিক সংবিধানগুলোর মতো করে সনদের বিভিন্ন ভাগের বিভিন্ন শিরোনাম দিয়েছেন এবং সংবিধানটিকে ৬৩টি আর্টিকেলে ভাগ করেছেন তিনি। তবে ধারাসমূহের সারসংক্ষেপ প্রধান প্রধান ধারা বা শর্তাবলি হচ্ছে-

মদিনা সনদে স্বাক্ষরকারী মুসলমান, ইহুদি, খ্রিস্টান, পৌত্তলিকসহ সব সম্প্রদায় একটি সাধারণ জাতি গঠন করবে এবং সব সম্প্রদায় সমান নাগরিক অধিকার ভোগ করবে। মুহাম্মদ সা. নব গঠিত মদিনা প্রজাতন্ত্রের সভাপতি হবেন এবং পদাধিকার বলে তিনি মদিনার সর্বোচ্চ বিচারালয়ের সর্বময় কর্তা হবেন। সব নাগরিক পূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতা ভোগ করবে। কেউ কারো ধর্মে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। কেউ কুরাইশদের সঙ্গে বা অন্য কোনো বহিঃশত্রুর সঙ্গে কোনো প্রকার গোপন সন্ধি করতে পারবে না কিংবা মদিনাবাসীর বিরুদ্ধে কোনো ষড়যন্ত্রে কুরাইশদের সাহায্য করতে পারবে না। কোনো সম্প্রদায় মদিনা প্রজাতন্ত্রের স্বার্থের পরিপন্থী কোনো কাজে লিপ্ত হতে পারবে না। সনদে স্বাক্ষরকারী সম্প্রদায়ের কোনো ব্যক্তি অপরাধ করলে তা ব্যক্তিগত অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে। এ জন্য সম্প্রদায়কে দায়ী করা যাবে না। মদিনা নগরী আক্রান্ত হলে দেশের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য সবাই যুদ্ধ করবে এবং প্রতিটি সম্প্রদায় নিজ নিজ ব্যয়ভার বহন করবে। মদিনা নগরীকে পবিত্র বলে ঘোষণা করা হলো এবং এখানে রক্তপাত, হত্যা, বলাৎকার ও অপরাধমূলক কাজ নিষিদ্ধ করা হলো। দুর্বল ও অসহায়কে সর্বাত্মকভাবে সাহায্য ও রক্ষা করতে হবে। অপরাধীকে উপযুক্ত শাস্তি ভোগ করতে হবে এবং সব ধরনের পাপী ও অপরাধীকে ঘৃণার চোখে দেখতে হবে। মুহাম্মদ সা.-এর পূর্বানুমতি ছাড়া মদিনাবাসী কারো বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে পারবে না। নিজেদের মধ্যে বিরোধ দেখা দিলে মুহাম্মদ সা. আল্লাহর বিধান অনুযায়ী তা মীমাংসা করে দেবেন। এই সনদের শর্ত ভঙ্গকারীর ওপর আল্লাহর অভিসম্পাত বর্ষিত হবে। ইহুদিদের মিত্ররাও সমান নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা ভোগ করবে। 

উল্লেখ্য, মদিনা সনদের প্রথম ১০ ধারায় মুহাজির, বনু আউফ, বনু সাইদা, বনু হারিস, বনু জুশাম, বনু নাজ্জার, বনু আমর, বনু নবিত ও বনু আউস পূর্বহারে মুসলমানদের মধ্যে প্রচলিত নিয়মনীতি এবং ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে পণের মাধ্যমে বন্দিদের মুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। ১১ থেকে ২০ ধারায় মুসলমানদের পারস্পরিক সম্পর্ক সম্পর্কিত আইন বিধৃত হয়। ২১ থেকে ২৬ ধারায় হত্যাকারীর শাস্তি, কোনো মুসলমান কোনো অন্যায়কারীকে আশ্রয় দিলে তার শাস্তি, কোনো বিষয়ে মতবিরোধ দেখা দিলে তার মীমাংসাপদ্ধতি, ধর্মীয় স্বাধীনতা ইত্যাদি বিষয়ক আইন সন্নিবেশিত হয়। ২৭ থেকে ৩৬ ধারায় সন্নিবেশিত হয় বিভিন্ন গোত্রের স্বরূপ সম্পর্কিত বিধান। পরবর্তী ধারাসমূহে যুদ্ধনীতি, নাগরিকদের ক্ষতির ক্ষতিপূরণ, নিজ নিজ ব্যয় নির্বাহ, এ সনদে অংশগ্রহণকারীদের বিরুদ্ধে কেউ যুদ্ধে লিপ্ত হলে তার ব্যাপারে ব্যবস্থা, বন্ধুর দুষ্কর্ম, যুদ্ধের ব্যয় নির্বাহ, নাগরিকের অধিকার, আশ্রয়দানকারী ও আশ্রিতের সম্পর্ক, নারীর আশ্রয়, সনদের স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে শান্তিভঙ্গের আশঙ্কা দেখা দিলে করণীয়, কুরাইশদের ব্যাপারে ব্যবস্থা, মদিনার উপর অতর্কিত আক্রমণ হলে করণীয় ইত্যাদি সন্নিবেশিত হয়। বিশ্বের ইতিহাসে এটিই প্রথম লিখিত চুক্তি ও সংবিধান। 


সনদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও অনুকরণীয় বিষয়

রাসূলুল্লাহ সা. ছিলেন বিশ্বের অদ্বিতীয়, অপ্রতিদ্বন্দ্বী ও সর্বাপেক্ষা সফল রাষ্ট্রনীতিবিদ। তিনি ছিলেন শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অতুলনীয় ও অবিসংবাদিত রাষ্ট্রনায়ক। মদিনা সনদ প্রণীত হওয়ার পর হযরত মুহাম্মদ সা. মদিনার আশপাশের গোত্রসমূহকেও এ চুক্তিতে শামিল করতে প্রয়াসী হন- যাতে করে হত্যা, হানাহানি ও অশান্তির মূলোৎপাটন হয়ে যায়। এ উদ্দেশ্যে তিনি মক্কা ও মদিনার মধ্যবর্তী ‘উদ্দান’ নামক স্থান সফর করেন এবং বনি হামযা ইব্ন বকর ইব্ন আবদে মানাফ গোত্রকে এ চুক্তির মধ্যে শামিল করে তাদের সরদার আমর ইব্ন মাখশীর স্বাক্ষর তাতে আদায় করেন। বাওয়াত পার্বত্য অঞ্চলের বাসিন্দাদেরকেও তিনি এ চুক্তিতে শামিল করেন। ইয়াম্বুঈর দিকে অবস্থিত জিল-আশারা নামক স্থানেও তিনি গমন করেন এবং বনু মুদলিজ গোত্রকেও এতে স্বাক্ষর করান। মদিনা সনদ মদিনার রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও নাগরিক জীবনে বিরাট পরিবর্তন আনে। প্রথমত, এ সনদ রাজনৈতিক ঐক্য স্থাপনে সাহায্য করে। মুহাম্মদ সা.-এর নেতৃত্বে নিয়মিত যুদ্ধরত গোত্রগুলোর শহর শান্তিপূর্ণ প্রজাতন্ত্রে পরিণত হয়। দ্বিতীয়ত, আল্লাহর রাসূলের দেওয়া নতুন সংবিধান অনুযায়ী এটা গৃহযুদ্ধ ও অনৈক্যের স্থলে শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করে। নবী করিম সা. মদিনার প্রত্যেক মানুষের (মুসলমান বা ইহুদি) জানমালের নিরাপত্তা বিধান করেন। তৃতীয়ত, জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মদিনার সব নাগরিককে এ সনদ সমানাধিকার দান করে। চতুর্থত, এটা মদিনার মুসলমান ও অমুসলমানদের মধ্যে সম্প্রীতি গড়ে তোলে এবং মোহাজেরদের মদিনায় বসবাসের জীবিকা উপার্জনের ব্যবস্থা করে। পঞ্চমত, মদিনায় ইসলামের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ক্ষমতা বৃদ্ধি করে, এ সনদ প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করে।

মদিনার সনদ হজরত মুহাম্মদ সা.-এর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, কূটনৈতিক দূরদর্শিতা ও অসাধারণ প্রতিভার পরিচয় বহন করে। তার প্রণীত সনদ ‘দুনিয়ার ইতিহাসে সর্বপ্রথম লিখিত শাসনতন্ত্র’। এটা নাগরিক সাম্যের মহান নীতি, আইনের শাসন, ধর্মের স্বাধীনতা ও ধর্মীয় সহিষ্ণুতা ঘোষণা করে। তাই এটাকে ইসলামের মহাসনদ বলা হয়। মদিনার সনদে সব সম্প্রদায়ের শুভেচ্ছা ও সহযোগিতার প্রয়োজনকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। গোত্র প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিলুপ্ত না করে প্রত্যেকের ধর্মীয় স্বাধীনতাকে অক্ষুণœ রেখে এ সনদ উদারতার ভিত্তিতে একটি বৃহত্তর জাতিগঠনের পথ উন্মুক্ত করে। এ সনদের দ্বারা আল্লাহর সার্বভৌমত্বকে স্বীকার করা হয়। রাষ্ট্র ও ধর্মের সহাবস্থানের ফলে মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠিত হয়। বস্তুত, মদিনা সনদ ইসলামী প্রজাতন্ত্রের বীজ বপন করে। ঐতিহাসিক বার্নার্ড লুইসের মতে, এ সনদের ধর্ম ও রাজনীতি সংবলিত সমন্বয়নীতি তখন আরবে অপরিহার্য ছিল। সে সময়ে রাষ্ট্রব্যবস্থার মাধ্যম ছাড়া ধর্ম সংগঠিত হওয়ার উপায় ছিল না। রাজনৈতিক দিক থেকে পশ্চাৎপদ আরবদের কাছে ধর্ম ছাড়া রাষ্ট্রের মূলভিত্তি গ্রহণীয়ও হতো না। মদিনা সনদের দ্বারা হজরতের ওপর মদিনার শাসনতান্ত্রিক কর্তৃত্ব অর্পিত হয়। কুরাইশদের বিরুদ্ধে ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রে এটা তাঁর ক্ষমতা ও মর্যাদাকে যথেষ্ট বৃদ্ধি করে। এ সনদে সংঘর্ষ বিক্ষুব্ধ মদিনার পুনর্গঠনে মুহাম্মদ সা.-এর পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়েছে। যুদ্ধে ক্ষতবিক্ষত আরব জাহানকে একতাবদ্ধ করার একটি মহৎ পরিকল্পনাও এতে ছিল। মদিনার সনদ দ্বারা এটাও প্রমাণিত হয়- মুহাম্মদ সা. শুধু ধর্ম প্রচারকই ছিলেন না, তিনি পৃথিবীর একজন শ্রেষ্ঠ রাজনীতিজ্ঞও ছিলেন। উইলিয়াম মুরের মতে, রাসূল সা. এর বিরাট ব্যক্তিত্ব ও অপূর্ব মননশীলতা শুধু তৎকালীন যুগের নয়, বরং সর্বযুগের ও সর্বকালের মহামানবের জন্য শ্রেষ্ঠত্বের পরিচায়ক।

মদিনা সনদে যে জাতির শুভসূচনা হয়েছে, তা ধর্মের পার্থক্য অতিক্রম করে সম্প্রদায়ের উঁচু দেয়াল ডিঙিয়ে, ভৌগোলিক সীমারেখা ছাড়িয়ে, রীতিনীতি, সংস্কৃৃতি-ঐতিহ্যের সব বাধা-বন্ধনকে জয় করে বিশ্বময় উম্মাহর পথ প্রশস্ত করেছে। সনদ ঘোষণার পর বিভিন্ন সম্প্রদায়ের লোকেরা একই জাতি হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। ফলে যৌথ শক্তি সৃষ্টি হয় ও গোত্রপ্রথার বিলোপ সাধন করে। ইসলামী ভ্রাতৃত্ববোধের ভিত্তিতে নবী করিম সা.-এর ওপর সমাজ ও ধর্মীয় অনুশাসন পরিচালনার দায়িত্ব অর্পিত হয়। ঐতিহাসিক পি.কে. হিট্টির মতে- মদিনা প্রজাতন্ত্রই পরবর্তীকালে ইসলামী সাম্রাজ্যের ভিত্তিমূল স্থাপন করে। 

মহানবী সা. মাত্র ১০ বছর মদিনার জীবনে সনদের ভিত্তিতে যে সমাজ ও নীতি-আদর্শের ভিত রচনা করেছিলেন, তা শতধাবিভক্ত আরব জাতিকে শক্তিশালী ইমারতের ন্যায় একক সত্তায় পরিণত করেছিল এবং তাঁর ওফাতের এক শতকের মধ্যে ইসলামের জীবনদর্শন সমকালীন অর্ধগোলাকার বিজয়ের পতাকা উড্ডীন করেছিল। মদিনা সনদের এ সাফল্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বৃহত্তর সনদ স্বাক্ষরের সম্ভাবনার পথকে সুগম করে। এমনিভাবে মদিনা সনদের মাধ্যমে আন্তর্জাতিকতাবাদের সূচনা হয়। তাই বলা হয় যে বর্তমান জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার ধারণা মদিনার সম্প্রদায়সমূহের মধ্যকার ঘোষিত সনদের মধ্যে নিহিত। কোনো প্রকার সহিংসতা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড যাতে জনগণের ধ্বংস ডেকে আনতে না পারে, তার প্রতিবিধানের সূত্র বিশ্বনবী সা. প্রদত্ত মদিনা সনদে লিপিবদ্ধ আছে। মদিনা সনদ মানুষের মৌলিক অধিকারের পরিপূর্ণ নিশ্চয়তা বিধান করেছে। তবে মদিনা সনদে সব সম্প্রদায় স্বাক্ষর করলেও পরে কোনো সম্প্রদায় বিশ্বাসঘাতকতা করার জন্য নবী করিম সা. তাদের মদিনা থেকে বিতাড়িত করেন। বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে মদিনাকে রক্ষা করা জাতি-ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে প্রতিটি বসবাসকারী ব্যক্তির দায়িত্ব ও কর্তব্য। কেউ এ নবপ্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে শত্রুপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে ষড়যন্ত্র করলে তাকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা করা হবে মর্মে যে ধারা মদিনার সনদে ছিল, তা যথাযথভাবে প্রয়োগ করা হয়।

মহানবী সা. কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রই পৃথিবীতে প্রথম মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে এবং স্বীকৃতি দিয়েছে। পরবর্তী পর্যায়েও আমরা দেখতে পাই, মুসলমানরা নাগরিক অধিকার প্রয়োগ করে তাদের খলিফা নির্বাচন করেন। জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত হয়ে আবু বকর রা. তাঁর প্রথম ভাষণে বলেন, ‘আমি সৎপথে থাকলে আপনারা আমাকে সাহায্য করবেন এবং সমর্থন জোগাবেন, আর বিপথগামী হলে উপদেশ দিয়ে সঠিক পথে আনবেন।’ উমর রা. এর খেলাফতকালেও প্রত্যেক পুরুষ ও মহিলার পূর্ণ নাগরিক অধিকার নিশ্চিত ছিল। শাসন সংক্রান্ত ব্যাপারে তারা তাদের নিজস্ব অভিমত, অভিযোগ, বিকল্প প্রস্তাব ইত্যাদি পেশ করতে পারতেন। একদা একজন সাধারণ ব্যক্তি মসজিদে খুতবা পাঠের প্রাক্কালে কাপড় বণ্টনসংক্রান্ত বিষয়ে খলিফার কাছে কৈফিয়ত চেয়ে তাঁকে খুতবা পাঠ থেকে বিরত রেখেছিলেন। জনগণের নাগরিক অধিকার ভোগ করার এ ধারা আলী রা. এর শাসনামল পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। খোলাফায়ে রাশেদিনের পর ইসলামের স্বীকৃত মানবাধিকার কাগজে-কলমে ঠিক থাকলেও বাস্তবে এর প্রয়োগক্ষমতা ক্রমেই লোপ পেতে থাকে।

সারা ইউরোপে জনগণের অবস্থা ছিল খুবই করুণ। নানাভাবে নিপীড়িত ও নির্যাতিত হয়ে তাদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল। মানবাধিকার তখন ছিল ভূলুণ্ঠিত। এ অবস্থার বিরুদ্ধে ইংল্যান্ডে প্রথম প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। রাজা জন-এর নানাবিধ অত্যাচারের প্রতিকারের জন্য স্টিফেন ল্যাংটনের নেতৃত্বে তার সহযোগীরা তাদের অধিকারগুলো একটি দলিলে লিপিবদ্ধ করেন এবং ১২১৫ সালে রাজাকে এ দলিলে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করেন। এ দলিলই ইতিহাসে ম্যাগনাকার্টা বা মুক্তির মহাসনদ নামে বিখ্যাত। ল্যাটিন ভাষায় লিখিত ম্যাগনাকার্টায় ৬৩টি ধারা আছে। এ ধারাগুলোতে রাজার নিরঙ্কুশ ক্ষমতা সীমিত করা হয় এবং কিছু অধিকারের স্বীকৃতিদান করা হয়। ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর জাতিসংঘ কর্তৃক এ মানবাধিকার সনদ ঘোষিত হয়। ৬২৪ সালে রাষ্ট্রনায়ক মহানবী মুহাম্মদ সা. কর্তৃক ঘোষিত মদিনা সনদের ‘কনসেপ্ট’ বা ধারণাই আবার নতুন করে জাতিসংঘ কর্তৃক ঘোষিত হয় ১৯৪৮ সালে।

বর্তমান বিশ্বে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য বিভিন্ন তৎপরতা চলছে। জাতিসংঘ মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সনদ ঘোষণা করেছে, যাতে মানুষ তার পূর্ণ মৌলিক অধিকার নিয়ে বাঁচতে পারে। অথচ ৬২২ খ্রিস্টাব্দে ঘোষিত মদিনা সনদের শর্তাবলি যথাযথভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে মানবাধিকারের রক্ষাকবচ মদিনা সনদের মাধ্যমে মানুষ তার ন্যায্য অধিকার ঠিকমতো পেয়েছে। তাই মানুষের ব্যক্তিগত, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক জীবন সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য মদিনা সনদে যে আদর্শ নীতিমালা গৃহীত হয়েছে, তা সব সময়ই অনুসরণযোগ্য। যারা মদিনা সনদের সাথে আজকের পৃথিবীর ধর্মনিরপেক্ষতার মধ্য মিল পান তাঁরা আসলে ইসলামের সাথে বর্তমান বিশ্ব-রাজনৈতিক অবস্থানের সাথে আপস করে একটি ভিন্ন ধরনে ইসলামের সংস্করণ চালু করতে চাচ্ছেন। 

বিদায় হজের ভাষণেও মহানবী সা. মানবাধিকারের যে ঘোষণা দিয়েছেন তা কেয়ামত পর্যন্ত মানবাধিকার সুরক্ষার শ্রেষ্ঠ দলিল হয়ে থাকবে। সেখানে সবাই সমান, নেই মানুষে মানুষে কোনো ভেদাভেদ। একথা তিনি উচ্চারণ করেছেন অত্যন্ত শক্তভাবে। তিনি বলেন, ‘কোনো আরবের ওপর কোনো অনারবের প্রাধান্য নেই। সাদা মানুষের ওপর কালো মানুষের এবং কালো মানুষের ওপর সাদা মানুষের কোনোই শ্রেষ্ঠত্ব নেই। আল্লাহভীতি ও মানবকল্যাণ হলো মর্যাদার একমাত্র মানদণ্ড।’ (আল মুসনাদ : ২৩৪৮৯)। তাই বলা যায়, বিশ্ববাসী যদি মানবাধিকার রক্ষায় ইসলাম ও মদিনা সনদের চেতনাকে বুকে ধারণ করতে পারত তাহলে মানবাধিকার লঙ্ঘনের যাবতীয় শঙ্কা থেকে মুক্তি পেত বিশ্ব মানবতা।

লেখক : কবি ও গবেষক; প্রফেসর, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

আপনার মন্তব্য লিখুন

কপিরাইট © বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির