post

কিশোর অপরাধের ভয়াবহ পরিণতি

শাহাদত হোসেন

২২ সেপ্টেম্বর ২০২৩

‘ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা

সব শিশুরই অন্তরে’।

আজকের শিশু-কিশোর আগামী দিনের কর্ণধার। আর শিশু-কিশোররা সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে বেড়ে উঠলেই দেশ ও জাতির উন্নতি ও অগ্রগতি নিশ্চিত হয়। প্রকৃতপক্ষে তাদের এ বয়সটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ। এ বয়সে শিশু-কিশোররা রঙিন স্বপ্ন দেখে এবং অতিকৌতূহলী হয়। কিন্তু প্রতিকূল পরিবেশের কারণে তারা অনেক সময় আশাভঙ্গের বেদনায় ব্যথিত হয়ে অপরাধ জগতের অন্ধকারে পতিত হয়। যার ফলে সমাজে প্রায়ই নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের ঘটনা ঘটে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম অন্ধকারাচ্ছন্ন ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত হয়। কিশোর অপরাধের ভয়াবহ পরিণতি উপলব্ধি করতে পারেন কেবল ভুক্তভোগী পিতা-মাতাই। তাই সমাজের দায়িত্ববান সবার উচিত কিশোর অপরাধ প্রবণতা প্রতিরোধে সচেষ্ট হওয়া ও কিশোর অপরাধীদের অন্ধকার জগৎ থেকে আলোর দিকে ফিরিয়ে আনতে উদ্যমী হওয়া এবং যথাযথভাবে বেড়ে ওঠার জন্য সুষ্ঠু ও সুন্দর পরিবেশ নিশ্চিত করা। যদিও হতাশার বিশেষ দিক হলো এই কিশোর অপরাধীরা পাচ্ছে রাজনৈতিক আশ্রয়। এ বিষয়ে পত্রিকায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়-

“রাজধানীর দারুসসালাম থানার লালকুঠি এলাকার বসুপাড়ায় ২২ মে স্কুলছাত্র সিয়াম খানকে (১৪) প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। তার আগে ১০ মে দনিয়া কলেজের সামনে ‘জুনিয়র-সিনিয়র’ দ্বন্দ্বে খুন হয় মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী তাজুন ইসলাম ওরফে মুশফিক। দুটি হত্যাকাণ্ডের পেছনেই রয়েছে এলাকাভিত্তিক অপরাধী চক্রের তৎপরতা। এসব চক্র স্থানীয়ভাবে ‘কিশোর গ্যাং’ নামে পরিচিত।

 রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বখাটে কিশোর-তরুণদের নিয়ে এমন অপরাধী চক্র গড়ে উঠেছে। যারা মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, নারীর শ্লীলতাহানিসহ নানান অপকর্মে যুক্ত। এসব চক্রের সদস্যদের বড় অংশ কিশোর হলেও নেতাদের বয়স ১৯ থেকে ৩৮ বছর। তাঁদের ‘সিনিয়র’ বা ‘বড় ভাই’ বলে ডাকে চক্রের সদস্যরা। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এসব চক্রের নেতাদের বেশির ভাগই ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত অথবা স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের ছত্রচ্ছায়ায় থাকে বলে স্থানীয় সূত্রগুলো থেকে জানা গেছে।” (৯ জুন, ২০২৩, প্রথম আলো)।

  সংবাদটি থেকে আরো জানা যায়, ডিএমপির আটটি অপরাধ বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ‘কিশোর গ্যাং’ রয়েছে মিরপুর বিভাগে। এই বিভাগে ১৩টি কিশোর অপরাধী চক্রের ১৭২ সদস্য সক্রিয় বলে পুলিশের তালিকায় উল্লেখ রয়েছে।

রাজধানীতে সক্রিয় ‘কিশোর গ্যাংয়ের’ তালিকা করছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। এখন পর্যন্ত এই তালিকায় ৫২টি চক্রের নাম এসেছে। ডিএমপির আটটি অপরাধ বিভাগের অধীন ৩৩ থানা এলাকায় এসব চক্রের সদস্যসংখ্যা প্রায় ৬৮২। এটা গেলো রাজধানীর চিত্র। রাজধানীর বাইরের সক্রিয় এই কিশোর অপরাধীরা। 

মাত্র কয়েক মাসের চিত্র এতটা ভয়াবহ। ফলে আমাদের অনুমান করতে হয় না বর্তমানে কিশোর অপরাধ প্রবণতা অন্যতম একটি সামাজিক সমস্যা। বাংলাদেশের শিশু আইন ২০১৩ অনুযায়ী ১৮ বছরের কম বয়সী যে কোনো মানুষ যখন কোনো অপরাধে লিপ্ত হয়, তখন সেই অপরাধকে কিশোর অপরাধ বলে। প্রাপ্তবয়স্করা সাধারণত সুচিন্তিতভাবে ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থে অপরাধমূলক কাজ করে থাকে। পক্ষান্তরে, কিশোররা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কৃত অপরাধের পরিণাম চিন্তা না করে পরিবেশ ও আবেগের বশবর্তী হয়ে বিভিন্ন প্রকার অপরাধমূলক কার্যকলাপে জড়িয়ে পড়ে। কিশোর অপরাধীরা তাদের সঙ্গ সাথীদের নিয়ে সংঘবদ্ধ হয়ে বড় ধরনের অপরাধ কার্যক্রম করে থাকে, যা কিশোর গ্যাং নামে পরিচিত। তারা বিভিন্ন চমকপ্রদ নামে সমাজে পরিচিত হয়। ঢাকা মোহাম্মদপুরে ফিল্ম ঝির ঝির, আতঙ্ক, স্টার বন্ড, গ্রুপ টোয়েন্টি ফাইভ, লাড়া দে, লেভেল হাই, দেখে ল-চিনে ল এবং কোপাইয়া দে গ্যাং। তেজগাঁওয়ে মাঈনুদ্দিন গ্রুপ, উত্তরায় নাইন স্টার, ডিস্কো বয়েজ, পাওয়ার বয়েজ, বিগ বস, নাইন এম এম বয়েজ, সুজন ফাইটার, ক্যাসল বয়েজ, আলতাফ জিরো, ভাইপার, তুফান এবং ত্রি গোল গ্যাং। মিরপুরে সুমন গ্যাং, পিচ্চি বাবু, বিহারি রাসেল, বিচ্চু বাহিনী, সাইফুল গ্যাং, বাবু রাজন, রিপন গ্যাং, সাব্বির গ্যাং, নয়ন গ্যাং এবং মোবারক গ্যাং। বংশালে জুম্মন গ্যাং গ্রুপ, ধানমন্ডিতে রয়েছে একে ৪৭, নাইন এম এম ও ফাইভ স্টার বন্ড গ্যাং গ্রুপ। রাজধানীর মুগদায় চান জাদু (জমজ ভাই), ডেভিল কিং ফুল পার্টি, ভলিয়ম টু ও ভান্ডারি গ্যাং গ্রুপ। (যুগান্তর, তারিখ ২০ জুন ২০২১)। 

এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাং বিভিন্ন চমকপ্রদ নামে এলাকায় অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়িত হয়। সাম্প্রতিক ঘটে যাওয়া কিছু কিশোর অপরাধের লোমহর্ষক ঘটনা জনমনে চিন্তার উদ্বেগ করেছে। শরীয়তপুর সদর উপজেলার চরপাতানিধি এলাকায় শিশু গৃহকর্মীকে (১২) হত্যা করার দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছে ১৬ বছর বয়সী এক কিশোর। (প্রথম আলো, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৩)। মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলায় ছাত্রীদের উত্ত্যক্তের অভিযোগে অভিযান চালিয়ে ১৪ কিশোরকে আটক করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। পরে মুচলেকা নিয়ে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। (প্রথম আলো, ২৬ জুলাই, ২০২৩)। ফেনীতে কিশোর গ্যাংয়ের প্রধানসহ গ্রেফতার ৪, অস্ত্র উদ্ধার করে র‌্যাব। (প্রথম আলো, ১৬ জুন, ২০২৩)। প্রেমের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ২৬ জুন ২০১৯ তারিখ বরগুনা জেলার নয়ন বন্ড-০০৭ নামক কিশোর গ্যাং কর্তৃক প্রকাশ্যে জনসম্মুখে হত্যার শিকার হয় রিফাত শরীফ। তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ০৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯ তারিখ গাজীপুর সদর থানাধীন রাজদীঘিরপাড় এলাকায় ‘দীঘিরপাড় গ্রুপ’ এবং ‘ভাই-ব্রাদার্স গ্রুপ’-এর মধ্যে কোন্দলে দীঘিরপাড় গ্রুপের সদস্য নুরুল ইসলাম নামক এক কিশোরকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে গত ১০ আগস্ট ২০২০ তারিখ নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলায় কিশোর গ্যাং কর্তৃক খুন হয় মিনহাজুল ইসলাম নিহাদ ও জিসাদ আহমেদ। (যুগান্তর, তারিখ ১০ জুন ২০২১)। তাছাড়া গত ৩ সেপ্টেম্বর ২০২১ তারিখ পুরান ঢাকার লালবাগের ৪৭/১ ডুরি আঙ্গুলি লেনের পাঁচতলা একটি ভবনের ছাদে হাফিজ (১৩) নামক এক কিশোরকে গলা কেটে নৃশংসভাবে হত্যা করে কিশোর গ্যাং-এর সদস্যরা।

এ সব মর্মান্তিক কিশোর অপরাধগুলো জনমনে ব্যাপক আতঙ্ক সৃষ্টি করছে। কিশোর অপরাধ প্রবণতার কারণগুলো অনুসন্ধানে প্রথমেই যে বিষয়টি বিবেচনায় আসে তা হলো ঝুঁকিপূর্ণ সামাজিক অবস্থা। আমাদের দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩০-৩২ শতাংশ অর্থাৎ প্রায় ৪ কোটি শিশু-কিশোর। এর মধ্যে এক-তৃতীয়াংশের অধিক প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ শিশু-কিশোর বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত। (যুগান্তর, তারিখ ২৯ মে ২০২১)। ফলে অতি সহজেই তাদের যে কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি।

আধুনিক সমাজব্যবস্থায় দ্রুত শিল্পায়ন ও নগরায়ণের নেতিবাচক ফল হিসেবে ক্রমবর্ধমান হারে বেড়ে চলেছে কিশোর অপরাধ। শহর ও বস্তির ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ এবং সমাজজীবনে বিরাজমান বৈষম্য, নৈরাজ্য, বিশৃঙ্খলা, দরিদ্রতা ও হতাশা কিশোর অপরাধ বৃদ্ধির প্রধান কারণ। কিশোর অপরাধের ক্ষেত্রে পরিবার এবং সমাজের ভূমিকা অনেকাংশেই দায়ী। কেননা একটি শিশু পরিবারে জন্মগ্রহণ করে এবং পরিবারের মাধ্যমেই সমাজ তথা বাহ্যিক পরিবেশের সঙ্গে পরিচিত হয়। পরিবার থেকেই ধর্মীয় নীতি-নৈতিকতা ও সামাজিক প্রথার শিক্ষা গ্রহণ করে থাকে। এ জন্য পরিবার এবং সমাজই হলো সুনাগরিক হিসেবে বেড়ে ওঠার প্রধান ভিত্তি। পিতা-মাতার মধ্যে মনোমালিন্য ও কলহ বিবাদ থাকলে সন্তানের ওপর তার বিরূপ প্রভাব পড়ে। যার পরিণামে শিশু-কিশোরদের অপরাধপ্রবণ হতে বিশেষভাবে সাহায্য করে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রভাবও শিশু-কিশোরদের গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

বর্তমানে দ্রুত পরিবর্তনশীল সমাজে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য, ছাত্র-শিক্ষকের পারস্পরিক সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক, ছাত্রছাত্রীর নৈতিক ও সামাজিক মূল্যবোধের অনুশীলন ও শিক্ষার অভাব বিরাজমান। তাছাড়া শিক্ষার্থীদের জন্য গঠনমূলক সুষ্ঠু চিত্তবিনোদন, খেলাধুলার সুযোগ-সুবিধা ও সুষ্ঠু মেধা বিকাশের সুযোগের অভাবও প্রকট। বর্তমান সমাজে অনেক চাকরিজীবী পিতা-মাতার চাকরিজনিত কারণে ঘন ঘন বদলির ফলে বাচ্চাদের মধ্যে পারস্পরিক সংযোগ ও সংহতির অভাব পরিলক্ষিত হয়। নতুন পরিবেশে নতুন সামাজিক ও সংস্কৃতির সঙ্গে তারা নিজেদের খাপ খাওয়াতে হিমশিম অবস্থার সৃষ্টি হয়। ফলে এসব কিশোররা বিভিন্ন প্রকার অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়। 

‘সৎ সঙ্গে স্বর্গ বাস আর অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ’ কিশোর অপরাধের ক্ষেত্রে এ প্রবাদটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এই বয়সে কিশোর-কিশোরীরা পরিবারের প্রভাবমুক্ত হয়ে স্বাধীনভাবে চলতে চায়। এসময় তারা পাড়া-প্রতিবেশী, খেলার সাথি ও সমবয়সীদের সঙ্গে মিশে সঙ্গপ্রভাবে অত্যন্ত সহজে ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিভিন্ন শিক্ষা লাভ করে থাকে। এসময় অপরাধপ্রবণ বন্ধু এবং সমবয়সীদের সঙ্গে তাল মেলাতে অনেক সময় কিশোর-কিশোরীরা জঘন্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো কিশোর-কিশোরীদের দারুণভাবে প্রভাবিত করে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের ফলে কিশোর-কিশোরীদের কাছে পর্নোগ্রাফি সাইট উন্মুক্ত হয়ে পড়ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তারা সহজেই পর্নোগ্রাফি এবং অশ্লীল ভিডিও চিত্র অতি সহজেই পেয়ে যাচ্ছে। যার মাধ্যমে তাদের অপরিপক্ব মানসিকতায় বিরূপ প্রভাব ফেলছে। ফলস্বরূপ বুদ্ধির বন্ধ্যত্ব তৈরি হচ্ছে ও সুষ্ঠু মেধা বিকাশে বিঘ্নিত হচ্ছে। এর ফলে সমাজে বেড়ে যাচ্ছে ধর্ষণ, ইভটিজিং, যৌন হয়রানিসহ নানাবিধ কিশোর অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড।

পরিবারের দরিদ্রতা ও অর্থের প্রাচুর্যতা উভয়ই কিশোর অপরাধের জন্য দায়ী। দরিদ্রতার জন্য মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে না পারায় কিশোর-কিশোরীরা হতাশা ও মানবেতর জীবনযাপন করে। মৌলিক চাহিদা পূরণ এবং হতাশা থেকে বাঁচার প্রয়াসে এসব কিশোর-কিশোরীরা বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। পক্ষান্তরে, যেসব কিশোর-কিশোরীরা প্রয়োজনের তুলনায় বেশি অর্থ পায় এবং তা ব্যয় করতে অভিভাবকের নিকট তেমন কোনো জবাবদিহিতা করতে হয় না। সেসব কিশোর-কিশোরীরা অর্থের প্রাচুর্য থেকে মাদকাসক্ত ও ইভটিজিংসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কার্যক্রমে লিপ্ত হয়। কিশোর অপরাধ প্রবণতা প্রতিরোধে শিশু-কিশোরদের জন্য সুষ্ঠু বিনোদন ও খেলাধুলার সুব্যবস্থা থাকা খুবই দরকার।

১৮৭৮-১৮৮০ সালে ব্রিটেনের দায়িত্বশীল কতিপয় ব্যক্তি কিশোর অপরাধে অতিষ্ঠ জনগণের সুরক্ষায় এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তারা কিশোর অপরাধীদের মননশীল বিনোদনের জন্য ১৮৭৮ সালে ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টার শহরে নিউটন হিথ এল অ্যান্ড ওয়াই আর এফসি এবং ১৮৮০ সালে সেইন্ট মার্কস (ওয়েস্ট গর্টন) নামে দুটি ফুটবল ক্লাব গঠন করেন। খুব অল্প সময়ের মধ্যে এ ক্লাব দুটির মাধ্যমে কিশোর তরুণদের সমাজবিচ্যুতি মনোভাব পাল্টে দিয়ে সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে প্রচণ্ডভাবে উৎসাহিত করে। আর এ দুটি ক্লাবই হচ্ছে পরবর্তী এবং বর্তমান সময়ের সফল ও জনপ্রিয় ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ও ম্যানচেস্টার সিটি ফুটবল ক্লাব। 

কিশোর অপরাধ প্রতিরোধে ধর্মীয় অনুশাসনের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। ধর্ম মানবজীবনকে পরিপূর্ণ ও সৌন্দর্যমণ্ডিত করে। সব ধর্মই মানুষকে নীতি ও নৈতিকতার শিক্ষা দেয়। সব ধর্মই অন্যায়ের বিপক্ষে এবং ন্যায়ের পক্ষে কথা বলেছে। সব ধর্মই সব সময় সৎ পথে চলার, সুন্দরভাবে বাঁচার তাগিদ দিয়েছে। নিজ নিজ ধর্মের বিশুদ্ধ চর্চা ও যথাযথ অনুশীলনের মাধ্যমে কিশোর অপরাধস্পৃহা অবদমনসহ আত্মশুদ্ধির পথ উন্মুক্ত হয়। বাংলাদেশ সরকারও বিভিন্ন সময়ে শিশু ও কিশোরদের সুষ্ঠু মানসিক বিকাশের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য শিশু আইন-১৯৭৪ প্রণয়ন। 

জাতিসংঘ কর্তৃক বেঁধে দেওয়া বয়সসীমার পরিপ্রেক্ষিতে শিশুদের ক্ষেত্রে ১৩ বছর পর্যন্ত এবং কিশোরদের ক্ষেত্রে ১৩-১৮ বছর পর্যন্ত এই আইনের আওতায় পড়ে। কিশোর অপরাধীদের সংশোধনের মাধ্যমে সমাজের মূলধারায় ফিরিয়ে আনাসহ সমাজে কিশোর অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকারের যাবতীয় কার্যক্রম এ আইনে উল্লেখ রয়েছে। বাংলাদেশের প্রচলিত শিশু আইন অনুযায়ী দেশের সব থানায় শিশু কিশোরদের বিষয় নিয়ে একটি করে ডেস্ক রাখার কথা বলা হয়েছে। এই আইন অনুযায়ী কিশোর অপরাধ মামলার নিষ্পত্তি ও শুনানির জন্য শিশু আদালত প্রতিষ্ঠার বিধান রাখা হয়েছে। শিশু আদালত প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত কিশোর অপরাধ মামলার নিষ্পত্তি ও শুনানির জন্য নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালকে দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে। বর্তমানে সারাদেশে ১০১টি ট্রাইব্যুনাল নিয়মিতভাবে এই অর্পিত দায়িত্ব পালন করে আসছে।

১৯৭৬ সালে ঢাকার অদূরে গাজীপুর জেলার টঙ্গীতে প্রতিষ্ঠিত হয় কিশোর আদালত, কিশোর হাজত এবং সংশোধন প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে জাতীয় কিশোর অপরাধ সংশোধন ইনস্টিটিউট। শিশু-কিশোরদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে এবং অপরাধপ্রবণতা থেকে দূরে রাখতে বর্তমান সরকার সারাদেশব্যাপী বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো গড়ে তুলেছেন। এ সংক্রান্ত আইন-কানুন ও নীতি যুগোপযোগী করা হয়েছে। মাতা-পিতা ও অভিভাবকদের অনুপস্থিতিতে অনাথ শিশুদের দায়িত্ব সরকার সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে নিচ্ছেন। এসব শিশু-কিশোরদের খাদ্য, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ বিভিন্ন মৌলিক চাহিদা নিশ্চিত করে সরকারি শিশু পরিবার, সরকারি আশ্রয়কেন্দ্র, দুস্থ শিশু প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্র, কিশোর-কিশোরী উন্নয়ন কেন্দ্র, ছোটমণি নিবাস প্রভৃতি নানা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করা হচ্ছে। বাংলাদেশে কিশোর অপরাধপ্রবণতা কমাতে এবং শিশু-কিশোরদের সুষ্ঠু ও স্বাভাবিক মানসিক বিকাশের প্রয়াসে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে সারাদেশে ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রায় আট হাজার ক্লাব শিশু-কিশোরদের নিয়ে কাজ করছে। (Jagonews24.com, তারিখ ২৩ আগস্ট ২০২১)। কিশোর অপরাধ সংশোধনে এসব ক্লাব খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। 

কিশোর অপরাধ দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সদা তৎপর। ‘সবার হোক একটাই পণ, কিশোর অপরাধ করব দমন’ এই স্লোগানকে সামনে রেখে র‌্যাব ফোর্সেস লিড এজেন্সি হিসেবে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। গ্যাং কালচার ও কিশোর অপরাধ দমনে র‌্যাবের সাঁড়াশি অভিযান অব্যাহত আছে। র‌্যাব ফোর্সেস বিভিন্ন মিডিয়ার মাধ্যমে কিশোর অপরাধ প্রবণতা রোধকল্পে জনসচেতনতামূলক প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। তাছাড়া বিভিন্ন সভা-সেমিনার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীদের কিশোর অপরাধ প্রবণতা প্রতিরোধ ও তার কুফল সম্পর্কে নিয়মিত প্রেষণা প্রদান করছে। এই বাহিনীটির নিয়মিত প্রচার প্রচারণার পাশাপাশি কিশোর অপরাধমুক্ত সমাজ গঠন ও বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সার্বক্ষণিক গোয়েন্দা নজরদারি ও বিভিন্ন আভিযানিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে পরিস্থিতি উন্নয়নের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। আজকের কিশোররাই আগামীর উন্নত ও সমৃদ্ধশালী দেশের কর্ণধার। সুখী সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হলে শিশু-কিশোরদের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। কিশোর-কিশোরীদের সুপ্ত প্রতিভাকে বিকশিত করে দেশের উন্নয়নের স্বার্থে কাজে লাগাতে হবে। কিশোর অপরাধ দমনে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের সংশ্লিষ্ট সবাইকে সচেতন থাকতে হবে। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক শেখ তৌহীদুল ইসলাম বলেন, সাধারণত তিন কারণে কিশোররা অপরাধে জড়ায়। এর মধ্যে বস্তিবাসী ও নিম্ন আয়ের পরিবারের কিশোরেরা দারিদ্র্যের কারণে, মফস্বল থেকে বড় শহরে আসা কিশোরেরা সমাজে টিকে থাকার জন্য আর উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানেরা নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন- পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় সুস্থ পরিবেশ তৈরি করা গেলে কিশোর ও তরুণদের অপরাধ প্রবণতা কমবে। তাদের মতে, শিশু বয়স থেকে সুস্থ ও সুন্দর পরিবেশে বেড়ে উঠলে কিশোররা অপরাধ ও অসৎকাজে জড়াবে না। এয়াড়া পরিবার তথা বাবা-মা ও অন্যান্য স্বজনদের সন্তানদের বিষয়ে খোঁজ খবর রাখতে হবে। স্কুল-কলেজের পড়াশোনার বাইরে শিশু-কিশোরদের খেলাধুলার পাশাপাশি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। সমাজবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. আ স ম আমানুল্লাহ বলেন, শুধু বিত্তবান শিশু-কিশোরদের প্রতি নজর রাখলে হবে না। তাদের পাশাপাশি ছিন্নমূল শিশু-কিশোর ও তরুণদের অপরাধমুক্ত রাখতে পুনর্বাসন এবং অপরাধে জড়িতদের যথাযথ কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করলে তাদের অপরাধমুক্ত রাখা সম্ভব হবে।

শিশু-কিশোরদের জন্য খেলাধুলা, সুষ্ঠু বিনোদন ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের ব্যবস্থা করতে হবে। সুদৃঢ় পারিবারিক বন্ধন, সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ শিশু-কিশোরদের সব ধরনের অপরাধ থেকে দূরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। যে কোনো মূল্যেই কিশোর অপরাধমুক্ত সমাজ গড়তে হবে। বর্তমান শিশু-কিশোরদের নিরপরাধী ও প্রকৃত মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারলেই, আগামীর বাংলাদেশ হব সুখ সমৃদ্ধিপূর্ণ স্বপ্নের সোনার বাংলা।

লেখক : নির্বাহী পরিচালক, এবনে গোলাম সামাদ গবেষণা কেন্দ্র

আপনার মন্তব্য লিখুন

কপিরাইট © বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির