post

জাতির এই ক্রান্তিলগ্নে ছাত্র ঐক্য সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে

এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের

২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৩

বর্তমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ছাত্ররাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মাসিক প্রেরণার সাথে কথা হয়েছিল বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ, সমাজ সেবক, বিশিষ্ট আইনজীবী ও সাবেক ছাত্রনেতা এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়েরের সাথে। 

এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের। তিনি ১৯৬৬ সালের মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলার হিংগাজিয়া গ্রামের একটি সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। পিতা মরহুম এম শামসুর রহমান ছিলেন বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একজন কর্মকর্তা।

তিনি ১৯৮১ সালে হিংগাজিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে লেটার মার্কসহ এসএসসি, ১৯৮৩ সালে ঐতিহ্যবাহী সিলেট এমসি কলেজ থেকে কৃতিত্বের সাথে এইচএসসি পাশ করেন এবং সিলেট এমসি কলেজ থেকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ইসলামের ইতিহাস বিষয়ে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে ঢাকা ‘ল’ কলেজ থেকে এলএলবি পাস করে আইন পেশায় সিলেট জেলা বারে যোগদান করেন এবং এখন পর্যন্ত তিনি এই পেশায় নিয়োজিত রয়েছেন। একজন সিনিয়র আইনজীবী হিসেবে এই অঙ্গনেও রয়েছে তাঁর বেশ সুনাম। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ২০০০ সালে ছাত্র ঐক্য গঠনের সময় তিনি ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন। মাসিক প্রেরণাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারটি পাঠকদের জন্য প্রকাশ করা হলো।  


ছাত্রসংবাদ: আসসালামু আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহ- মুহতারাম, আপনি কেমন আছেন?

এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের: ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়ারাহমাতুল্লাহি ওবারাকাতুহ্। আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহতাআলার  মেহেরবানিতে ভালো আছি।


ছাত্রসংবাদ: মানুষের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতির ভূমিকা কেমন ছিল এবং কেমন আছে বলে মনে করেন?

এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের: বাংলাদেশের স্বাধীনতাপূর্ব ও স্বাধীনতা পরবর্তী ইতিহাস সব ক্ষেত্রেই আমাদের ছাত্রসমাজের একটি বর্ণাঢ্য ভূমিকা রয়েছে। বিশেষ করে ভাষা আন্দোলন, যেটি আমাদের ইতিহাসের অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি বিষয়। এক্ষেত্রে আমাদের ছাত্রসমাজ অত্যন্ত দায়িত্বশীল ভূমিকা রেখেছে। মূলত ছাত্রদের আন্দোলনের কারণেই বাংলা ভাষা রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সে আন্দোলনটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজসহ ঢাকা শহরেই প্রথম সূচনা হয়েছিল। সেটি পরবর্তীতে পুরো দেশেই ছড়িয়ে পড়েছিল। এ ছাড়াও ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরাচার আইয়ুবের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন, সেখানেও আমাদের ছাত্রসমাজের অত্যন্ত দায়িত্বশীল ভূমিকা ছিল। ৭১ সালে স্বাধীনতা আনার ক্ষেত্রেও ছাত্রসমাজের ভূমিকা ছিল। ৯০ এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনেও ছাত্রদের ঐতিহাসিক ভূমিকা ছিল। এভাবে বাংলাদেশের প্রতিটি মৌলিক গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলনে ছাত্রসমাজ দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেছে। এছাড়াও জাতির নেতৃত্ব প্রদানে, বিশেষ করে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন সময়ে ছাত্রসমাজ অত্যন্ত বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছে। আজকের জাতীয় নেতৃবৃন্দের মধ্যে যারা আছেন বা অতীতে যারা ছিলেন তাদের একটা বড় অংশই ছাত্র আন্দোলনের ফসল। একটি জাতি গড়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান যারা রাখেন তাদের মধ্যে ছাত্রসমাজ নিঃসন্দেহে অগ্রগণ্য হিসেবে বিবেচিত হন, দুনিয়ার ইতিহাসে আমরা সেটাই দেখি। বাংলাদেশের ইতিহাসেও বাংলাদেশের মানুষের অধিকার, দেশের মানুষের মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায়, দেশ পরিচালনায়, দেশের আর্থ-সামাজিক রাজনৈতিক বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে ছাত্রসমাজ, ছাত্র নেতৃত্ব অত্যন্ত বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছে।


ছাত্রসংবাদ: আপনি ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি থাকাকালীন দেশের রাজনৈতিক অবস্থা কেমন ছিল? 

এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের: গত শতাব্দীর শেষ দশকটা, বিশেষ করে শেষ দুই দশক বাংলাদেশের রাজনীতিতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন, স্বৈরাচার পতনের পর নির্বাচন হয়। কেয়ারটেকার সরকারের অধীনে ওই নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি বড় পরিবর্তন আসে। 

এ সময় বাংলাদেশের নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সেই নির্বাচন সারা বিশ্বে ব্যাপকভাবে প্রসংশিত হয়েছে এবং বিপুল সমাদৃত হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় পরবর্তী নির্বাচনগুলোও কেয়ারটেকার সরকারের অধীনেই হয়েছে। তখন দেশের রাজনীতিতে একটা গুণগত পরিবর্তন হয়েছিলো। রাজনৈতিক এই পরিবর্তনের পাশাপাশি আর্থসামাজিক উন্নয়নও ঘটেছিল। সার্বিকভাবে একটা স্থিতিশীলতা এসেছিল। সামগ্রিকভাবে সে সময় ছাত্ররাজনীতি ও গণরাজনীতি একটা সুশৃঙ্খল পরিবেশ ফিরে পেয়েছিল। বাংলাদেশের এমন একটা রাজনৈতিক কালচার গড়ে ওঠেছিল যে, ৫ বছরের জন্য জনগণ যাকে নির্বাচিত করবে ৫ বছর পরে তাকে আবার জবাবদিহি করতে হবে। নির্বাচনের পূর্বে কেয়ারটেকার সরকার আসবে। নির্বাচনের সুন্দর একটা পরিবেশ আসবে। ভোটাররা তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের একটা সুন্দর সুযোগ পাবে। যাকে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বলা হয়।

এ জন্য জাতীয় রাজনীতি যখন একটা স্থিতিশীলতা পায়, একটা পলিটিক্যাল কালচার যখন স্ট্যাবলিশ হয়, তখন ছাত্র সমাজও সেটা ভোগ করে। দেশের সর্বস্তরের মানুষ সেই সুবিধাটা পায়। এ জন্য এটা একটা ভালো বিষয় ছিল। তাছাড়া আওয়ামী লীগও দীর্ঘ ২১ বছর পর ক্ষমতায় আসে। তারা আসার পর পরই বাংলাদেশের আর্থসামাজিক ও রাজনীতিতে আবার একটা অস্থিরতা তৈরি করেছিল। তাদের অপশাসন, তাদের দুঃশাসনে আবার জনমানসে অস্থিরতা দেখা দেয়। তারই প্রেক্ষাপটে আমরা সে সময়কার বিরোধী দলীয় ছাত্র সংগঠনগুলো একটা প্ল্যাটফর্মে এসে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের সিদ্ধান্ত নিই। জাতীয় নেতৃবৃন্দের পাশাপাশি ছাত্র নেতৃবৃন্দও একটি প্ল্যাটফর্মে আসি। টার্গেট আমাদের এটিই ছিল যে, তখন সরকার দলীয় ছাত্র সংগঠন ছাত্ররাজনীতিতে যে অস্থিরতা তৈরি করেছিল, ক্যাম্পাসগুলোতে যে অস্থির পরিবেশ তৈরি করেছিল, তাতে আমরা ঘোর অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিলাম; আমাদের উদ্দেশ্য ছিল যে, ছাত্ররাজনীতিতে পরস্পরের প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধাবোধ, দায়িত্ববোধের রাজনীতি যাতে  আমরা দেখি। ক্যাম্পাসগুলো যাতে সব ছাত্রের মিলনমেলায় পরিণত হয়। 

আমরা আমাদের মেধা, যোগ্যতা, বিচক্ষণতা ও নেতৃত্বের গুণ দিয়ে ছাত্রসমাজকে আকৃষ্ট করবো। সেখানে পেশীশক্তির কোনো দৌরাত্ম থাকবে না। পাশাপাশি জাতীয় রাজনীতিতেও যাতে ছাত্ররা একটা সুশৃঙ্খল অবস্থান ফিরিয়ে আনার জন্য কার্যকর গণ আন্দোলন গড়ে তুলতে পারে। এটাই ছিল আমাদের উদ্দেশ্য। আলহামদুলিল্লাহ সে সময় কয়েক বছরের প্রচেষ্টায় আমরা সেই কাজটি করতে পেরেছি।


ছাত্রসংবাদ : ২০০১ সালের সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য গঠনের প্রেক্ষাপট জানতে চাই

এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের: মূলত আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে বাংলাদেশে আবার চরম অস্থিরতা বিরাজ করছিল। এই অস্থিরতা বিরাজ করার কয়েকটি কারণ হচ্ছে- এর আগে যে কেয়ারটেকার সরকারের অধীনে নির্বাচন হয়েছিল, সে কেয়ারটেকার সরকারটা তখনও সাংবিধানিকভাবে যুক্ত হয়নি। গণ আন্দোলনের মাধ্যমে বিএনপি সরকার সেই দাবি মেনে নেয়। মানে সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত করে। সেই কেয়ারটেকার সরকারের অধীনে নির্বাচনের কারণেই আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। দেশের রাজনীতিতে একটা বিভাজন রেখা তৈরি হয়। ক্ষমতায় আসার পূর্বে তারা যেসব কমিটমেন্ট দিয়েছিলো, যে ধরনের বক্তব্য তারা রেখেছিল, ক্ষমতায় এসেই পুরোপুরি ভিন্ন ভূমিকা তারা পালন করে। একদলীয় শাসনের মনমানসিকতা তাদের মাথায় ভুতের মতো চেপে বসেছিল। বিরোধী দলকে কোণঠাসা করা, রাজনীতিতে বিরোধী দলের অবস্থানকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া, ক্যাম্পাসগুলোতে একক আধিপত্য বিস্তার করা, দেশের অর্থনীতিকে লুটপাট করা; এ সমস্ত একটা ভয়াবহ পরিস্থিতিই আওয়ামী লীগ তার প্রথম টার্মের মতো তথা স্বাধীনতা পরবর্তীতে সাড়ে তিন বছরে যেমন আচরণ করেছে, যে ভূমিকা রেখেছে, যে নীতি ও পদ্ধতি অনুসরণ করেছিল; শেখ হাসিনার নেতৃত্বের ক্ষমতায় এসে তারা  অনেকটা সে পথেই চলে যায়। যার ফলশ্রুতিতে জাতীয় রাজনীতিতে দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গ, বৃহত্তর আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ ও দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সাথে আমাদের আলাপ আলোচনা হয় যে, এই পরিস্থিতি থেকে কীভাবে পরিত্রাণ লাভ করতে পারি! এর ধারাবাহিকতায় আমরা ছাত্র সংগঠনের নেতৃবৃন্দরাও অনেক দফা এ বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছি। এই আলোচনাগুলোতে আমাদের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের, ড. আ. জ. ম ওবায়দুল্লাহ, ব্যারিস্টার হামিদ হোসাইন আজাদ, রফিকুল ইসলাম খান, মোহাম্মদ শাহজাহান, মতিউর রহমান আকন্দসহ সে সময় আমরা যারা ছাত্রশিবিরের দায়িত্বে ছিলাম; আমাদের সাবেক যারা ছিলেন, ছাত্রদলের সাবেক নেতৃবৃন্দ- বিমেষ কওে আমান উল্লাহ আমান ভাই, শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী ভাইসহ আমরা একাধিকবার বসেছি। ৯৬-৯৭-৯৮-তে আমরা বসেছি। মতবিনিময় করেছি। আলোচনা করেছি যে, এ পরিস্থিতিতে কী করা যায়? এর পাশাপাশি বিভিন্ন কলেজগুলোতে তখন ছাত্র সংসদের নির্বাচন হয়েছিল। সেখানে আমরা ঐক্যবদ্ধ প্যানেল দিয়েছি। ঐক্যবদ্ধ প্যানেলের কারণে ছাত্রদল-ছাত্রশিবিরের প্যানেল বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছে। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে শুরু করে অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে এ বিজয় অর্জিত হয়েছে।

এভাবে একটি সহনশীল ছাত্ররাজনীতি, পরমতসহিষ্ণুতা, পরস্পরের প্রতি সম্মান ও ক্যাম্পাসে শ্রদ্ধাবোধের রাজনীতি আমরা প্রতিষ্ঠা করতে পারি। এর পাশাপাশি আওয়ামী লীগের এই দুঃশাসন থেকে জাতিকে যাতে মুক্তি দিতে পারি; এমন একটা প্রেক্ষাপট তৈরি হয়। তখন আমরা একটা ভূমিকা পালনের চেষ্টা করি। 

১৯৯৯ সালে শিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি মতিউর রহমান আকন্দ ভাই ঢাকা মহানগরের একটা সাংগঠনিক সফরে আমাদের পরামর্শে সে সময়কার সব বিরোধী দলীয় ছাত্র সংগঠনকে একটা মতবিনিময় সভার দাওয়াত দেয়। সে মতবিনিময়ে ছাত্রশিবির, ছাত্রদলসহ অন্যান্য ছাত্র সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকেন এবং সেখানে খুব হৃদ্যতাপূর্ণ খোলামেলা আলোচনা হয়। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি ছিল। 

২০০০ সালে আমরা একটা ইফতার মাহফিল করি। সেখানে আমরা সবাইকে দাওয়াত দিই। ছাত্রদলসহ প্রায় ১৪/১৫ টা ছাত্র সংগঠনের নেতৃবৃন্দ সেখানে উপস্থিত থাকেন। সে প্রোগ্রামে চিফ গেস্ট ছিলেন তৎকালীন জামায়াতের আমীর মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী। তিনি ছাত্ররাজনীতির অতীত, বর্তমান এবং ছাত্ররাজনীতির প্রেক্ষাপট নিয়ে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটা ঐতিহাসিক বক্তব্য রাখেন। বক্তব্যটি সেখানে উপস্থিত ছাত্রনেতাদের অত্যন্ত আবেগ আপ্লুত করে এবং সেখানে সবাই এটা ফিল করে যে, জাতি গঠনের ক্ষেত্রে, রাষ্ট্রের দিকনির্দেশনার ক্ষেত্রে, মানুষের মৌলিক অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে, স্থিতিশীল রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ছাত্র সমাজ অতীতে যে ভূমিকা পালন করেছেন, সে ভূমিকা বর্তমানেও পালন করা উচিৎ। এই উপলব্ধির পর একটা পর্যায়ে ছাত্রদল ছাত্র মজলিসসহ সবগুলো ছাত্র সংগঠনকে নিয়ে আমরা বসি। এরপর দশটি ছাত্র সংগঠনসহ জাতীয় প্রেসক্লাবে ২০০০ সালের প্রথম দিকেই প্রেস কনফারেন্সের মাধ্যমে ১০ দলীয় ছাত্র ঐক্য গঠন করা হয়। এর মাধ্যমে আমাদের আত্মপ্রকাশ হয়। 

সে সময় ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি ছিলেন হাবিব-উন-নবী খান সোহেল। সাধারণ সম্পাদক ছিলেন নাসিরুদ্দিন আহমদ পিন্টু। কিন্তু যখন আমরা প্রেস কনফারেন্স করি, এর ঠিক কয়েকদিন আগে তারা গ্রেফতার হওয়ার কারণে ছাত্রদলের পক্ষ থেকে তাদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও সেক্রেটারি যথাক্রমে মনজুরে এলাহী ও সাহাবুদ্দিন লালটু উপস্থিত ছিলেন। ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে আমি ছিলাম ও আমাদের সেক্রেটারি জেনারেল নূরুল ইসলাম বুলবুল ছিলেন এবং অন্যান্য সংগঠনের নেতৃবৃন্দও ছিলেন। আমরা সেখানে সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য গঠন ও তার উদ্দেশ্য লক্ষ্য; এ সমস্ত বিষয় নিয়ে বক্তব্য রেখে আনুষ্ঠানিকভাবে ছাত্র ঐক্যের যাত্রা শুরু হয়।

এই প্রেক্ষাপটে আমরা প্রথম পল্টনে সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের একটি ছাত্র সমাবেশের আয়োজন করি। শিবির, ছাত্রদলসহ সব ছাত্র সংগঠনের উপস্থিতিতে এটা ব্যাপক সাড়া জাগায়। ঐতিহাসিক সেই ছাত্র সমাবেশের আগেরদিন ছাত্রদলের সভাপতি হাবিব-উন-নবী খান সোহেল  ও সাধারণ সম্পাদক নাসিরুদ্দিন পিন্টু জেল থেকে বের হয়েছিলেন। আমরাও সেখানে ছিলাম। 

আমাদের ছাত্র ঐক্যের সেই সংবাদটি প্রায় সব মিডিয়া লিড নিউজ করেছিল। সরকারের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে ছাত্রদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে আমরা সেই ছাত্র সমাবেশ করেছিলাম। 

আমাদের সেই সমাবেশে আমরা বেসিক্যালি দুটি কথাই বলেছিলাম- আমাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে ছাত্রদের মধ্যে, ছাত্র নেতৃবৃন্দের মধ্যে এবং ক্যাম্পাসে একটি সহনশীল ছাত্ররাজনীতির পরিবেশ তৈরি করা। পরস্পরের প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধাবোধের ছাত্ররাজনীতি তৈরি করা। আমাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা থাকবে, তবে সেটা হবে মেধা-যোগ্যতা এবং বিচক্ষণতার ভিত্তিতে। আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে বাংলাদেশ শেখ হাসিনার নেতৃত্বে যে ফ্যাসিবাদের দিকে যাচ্ছে, এটা থেকে বাংলাদেশকে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে, বাংলাদেশের অস্তিত্বকে রক্ষা করা। আমরা ছাত্র সমাজ দেশের জনগণকে সাথে নিয়ে সব ধরনের আগ্রাসনকে প্রতিহত করারই শপথ করেছিলাম। 

সে সময় আমরা ধারাবাহিকভাবে অনেকগুলো কর্মসূচী হাতে নিয়েছিলাম। বেগম খালেদা জিয়ার সাথে সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের মতবিনিময় ও জামায়াতের আমীর মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী রহ. এর সাথে মতবিনিময় করা হয়। তখন আমাদের সাথে হোসাইন মোহাম্মদ এরশাদ এবং তাঁর ছাত্র সংগঠন জাতীয় ছাত্র সমাজও ছিলো। আমরা তাদের সাথেও মতবিনিময় করেছিলাম। মতবিনিময় করেছিলাম বেগম রওশন এরশাদেও সাথেও। শাইখুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক রহ. ছিলেন তখন খেলাফত মজলিসের আমীর, আমরা তাঁর সাথেও মতবিনিময়ের আয়োজন করেছিলাম। এভাবে জাতীয় সব নেতৃবৃন্দের সাথে আমরা মতবিনিময় করেছিলাম। আমাদের লক্ষ্য উদ্দেশ্য কর্মসূচী তাদের সাথে আলোচনা করেছি। তারা আমাদেরকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন। এছাড়াও জাতীয় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান- যেমন জাতীয় প্রেসক্লাব, সুপ্রিম কোর্ট বার এসোসিয়েশন, চেম্বার অব কমার্সসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ও জাতীয় দৈনিকের সম্পাদকের সাথে ধারাবাহিকভাবে আমরা মতবিনিময় করেছি।

পরবর্তীতে আমরা ঢাকার বাহিরে বিভিন্ন বিভাগীয় শহরগুলোতে ছাত্র ঐক্যের আহ্বানে ছাত্র সমাবেশ করেছিলাম। সেখানে ব্যাপকভাবে ছাত্র সমাজের অংশগ্রহণ ছিল। 

আমরা আমাদের লক্ষ্য উদ্দেশ্য সামনে রেখে সে সময় বক্তব্য দিয়েছি। সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেছি। আলহামদুলিল্লাহ, পুরো দেশে একটা ছাত্র জনতার ঐক্য এবং গণজাগরণের সৃষ্টি হয়েছিল। আমরা সরকারের বিভিন্ন অন্যায় পদক্ষেপের বিরুদ্ধে অত্যন্ত বলিষ্ঠ এবং শান্তিপূর্ণ সভা-সমাবেশ করেছি। আন্দোলন করেছি। 

চট্টগ্রামের বহদ্দারহাটের একটা দুঃখজনক ঘটনাকে কেন্দ্র করে সরকার আমাদের উপর ব্যাপক দমন-পীড়ন চালায়। বিশেষ করে ছাত্রশিবিরের ওপর। এটাকে কেন্দ্র ছাত্র ঐক্যকে বিনষ্ট করতে চেষ্টা করেছে। কিন্তু আলহামদুলিল্লাহ, ছাত্রশিবিরের নেতৃবৃন্দের প্রচেষ্টার কারণে সেটাতে সরকার সফল হয়নি।

পুলিশ বাহিনীর বিভিন্ন দমন-পীড়নকে উপেক্ষা করে আমরা ময়দানে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করি। ছাত্র ঐক্যও এক্ষেত্রে সাহসী ভূমিকা পালন করে। এভাবে ২০০০ সালে পুরো বছরজুড়ে এককভাবে একটা আন্দোলনে ছিল ছাত্র ঐক্য। মিডিয়ায়ও ব্যাপকভাবে আলোচিত ছিল। মানুষের আশার আলোক বর্তিকা ছিল। 

ইতোমধ্যে বিএনপি, জামায়াত, জাতীয় পার্টি ও ইসলামী ঐক্যজোট নিয়ে ৪ দলীয় ঐক্যজোট গঠন করা হয়েছিলো। সবার এই সম্মিলিত প্রচেষ্টায় পরবর্তীতে ২০০১ একটা বড় ধরনের অর্জন আমাদের হয়। আর সেটি হচ্ছে- বাংলাদেশের ইতিহাসে দুই তৃতীয়াংশের বেশি আসনে,  মানুষের ব্যাপকভাবে ভোটে জাতীয় সংসদে আমরা বিজয়ী হয়েছিলাম এবং একটি শক্তিশালী সরকার গঠিত হয়েছিল। এই যে বিজয়টা, এটা মূলত সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের আন্দোলন এবং তাদের ব্যাপক কর্মসূচী, ময়দানে তাদের অবস্থানের ফল।


ছাত্রসংবাদ : ২০০০ সালে আওয়ামীলীগ সরকারের শেষ সময়ে আপনারা যে সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য গঠন করেছিলেন,  এর প্রতিক্রিয়ায় সরকারের অবস্থান কেমন ছিল? 

এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের : ছাত্র ঐক্য গঠনের পরপরই সরকারের চরম দমন-পীড়নের মুখে পড়তে হয়। অবশ্য দমন-পীড়ন এর আগেও ছিল। বিশেষ করে ১৯৯৯ সালে আমাদের কেন্দ্রীয় সভাপতি মতিউর রহমান আকন্দ ভাই গিয়েছিলেন চট্টগ্রাম। সেখানে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে একটা অস্থিরতা ছিল। আকন্দ ভাই ওনাদের দাওয়াতেই সেখানে গিয়েছিলেন। অথচ সেখানে যাবার পর পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। ডেকে নিয়ে গ্রেফতার যেটাকে বলে। এর প্রতিবাদে আমরা তাৎক্ষণিকভাবে ঢাকার পল্টনে হাজার হাজার ছাত্রের সমাবেশ করেছিলাম এবং আল্টিমেটাম দিয়েছিলাম যে, অনতিবিলম্বে কেন্দ্রীয় সভাপতিকে যদি মুক্ত করা না হয়, তাহলে আমরা আমাদের সমাবেশটা কন্টিনিউ করবো। আলহামদুলিল্লাহ, এরপর কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানেই সরকার তাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়েছে।

সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য গঠনের পর পরই ছাত্রদলের সভাপতি ও সেক্রেটারির ওপর হামলা হয়েছে। আমাদের ওপরও একাধিকবার হামলা হয়েছে। জাতীয় ছাত্র সমাজ ছিল তখন, তাদের ওপরও হামলা হয়েছে। খেলাফত মজলিসের ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্র মজলিসের মুনতাসির আলী এবং জয়নুল আবেদিনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এক কথায় একাধিকবার ছাত্রদলের সভাপতি সেক্রেটারি, ছাত্র মজলিসের নেতৃবৃন্দ, জাতীয় ছাত্র সমাজের নেতৃবৃন্দ, শিবিরের নেতৃবৃন্দসহ সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের সবাই  বিভিন্ন সময় গ্রেফতার হয়েছেন।

পুলিশ আমাদের প্রতিটি কর্মসূচিতে বাধা দিয়েছে, কিন্তু আলহামদুলিল্লাহ এরপরেও আমরা সফলতা অর্জন করেছি। বাংলাদেশের ইতিহাসে ছাত্রদের যে ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা ও সফল আন্দোলনগুলো ছিল, এটা তার মধ্যে অন্যতম। আমি মনে করি এটা সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের যে অর্জন, তারচেয়েও বড় অর্জন ছিল। 

আমরা তখন প্রেসক্লাব, পল্টন মোড়, বাইতুল মোর্কারম উত্তর গেইট, দক্ষিণ গেইট এবং দৈনিক বাংলা মোড়সহ ঢাকার রাজপথে অত্যন্ত বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছি। পুলিশ আমাদেরকে আক্রমণ করেছে, নির্মম নিষ্ঠুরভাবে আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে কিন্তু ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের কারণে আলহামদুলিল্লাহ কখনও পুলিশ সফল হয়নি। আমরা গ্রেফতার হয়েছি বের হয়ে আবারও রাজপথে চলে এসেছি। বদ্দার হাটের কথা যেটা বললাম- এটাকে আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। অথচ এটার সাথে ছাত্রশিবিরের কোনো সংশ্লিষ্টতা ছিল না। সেখানে মূলত একদল সন্ত্রাসীর ওপর আরেকদল লোক হামলা করেছিল। কিন্তু এটাকে ছাত্র শিবিরের ওপর চাপানো হয়। এটাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে ছাত্রশিবিরের প্রায় সব জেলা-মহানগরগুলোতে হামলা করা হয়েছে, অফিস ভাঙচুর করা হয়েছে, জ্বালাও পোড়াও করা হয়েছে, লুটপাট করা হয়েছে। দুই থেকে আড়াই মাস পর্যন্ত একটা তা-বের রাজত্ব ছিল। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চট্টগ্রামে গিয়ে বলেছিল, “আওয়ামীলীগের নেতৃবৃন্দ কি চুড়ি পরে বসে আছে?” তাদেরকে উসকানি দিয়েছিল- যাতে তারা আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। কিন্তু আলহামদুলিল্লাহ ছাত্রজনতার ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা, দূর্বার আন্দোলন ও প্রতিরোধের কারণে তাদের সমস্ত আক্রমণকে আমরা নস্যাত করেছি। সমস্ত অত্যাচার নির্যাতনের মোকাবেলায় আমরা পর্বতের মত অটল আর অবিচল থেকে আমাদের ছাত্র ভাইয়েরা, ছাত্র নেতৃবৃন্দ কাজ করেছেন, কিন্তু আমরা মাথানত করিনি।

সমস্ত অত্যাচার-নির্যাতন বরং আমাদের অনুকূলে এসেছে। ছাত্রদের কাছে এটার একটা বিরাট আবেদন ছিল। আমরা যে ইউনিভার্সিটিতে গিয়েছি, যে কলেজে গিয়েছি, যে ক্যাম্পাসে গিয়েছি, যে শহরে আমরা প্রোগ্রাম করেছি, সব জায়গাতেই আমরা এক অভূতপূর্ব সাড়া পেয়েছি। অর্থাৎ এদেশের মানুষের চাওয়া ছিল, ছাত্র সমাজের বিপুল প্রত্যশা ছিল- আমরা যে মতেরই হই না কেন; ছাত্রদের অধিকার আদায়, জনতার অধিকার আদায়, দেশের রাজনীতির প্রয়োজনে ও দেশের প্রয়োজনে ছাত্রসমাজ এবং  নেতৃবৃন্দ ঐক্যবদ্ধ হয়ে ভূমিকা পালন করবে। আলহামদুলিল্লাহ আমরা সেই প্রতাশ্যা পূরণ করার চেষ্টা করেছি। 


ছাত্রসংবাদ : বাংলাদেশের রাজনীতি এখন কঠিন একটি বাস্তবতার মুখোমুখি, যে প্রেক্ষাপট তৈরি হচ্ছে- কিছু কিছু ক্ষেত্রে ছাত্রদলের নেতৃত্বে অথবা বিচ্ছিন্নভাবে আমরা দেখতে পাচ্ছি ছাত্র ঐক্যের চেষ্টা চলছে।  ইসলামী ছাত্র শিবিরকে বাদ দিয়েই তারা এই চেষ্টাটা করছে। তো বাংলাদেশের এই রাজনৈতিক বাস্তবতায় বর্তমানে সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য গঠনের প্রয়োজনীয়তা কতটুকু বলে মনে করেন?

এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের : বর্তমান যে পরিস্থিতি বিরাজ করছে আমাদের রাজনীতিতে বা সামগ্রিকভাবে আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক যে পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে, এই অবস্থায় আমাদের ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই। এই ঐক্যটা জাতীয় রাজনীতিতে আসতে হবে, ছাত্রদের মধ্যে আসতে হবে, শ্রমিকদের মধ্যে ঐক্য আাসতে হবে, পেশাজীবিদে মধ্যে ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা চালাতে হবে। দেশে যে বিভাজনের রাজনীতি, যে লুটপাটের রাজনীতি, যেকোনো মূল্যে ক্ষমতায় থাকার যে রাজনীতি, দেশের জনগণকে হত্যা, মামলা, গ্রেফতার, গুম, ক্রসফায়ারসহ ইত্যাদির মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে যে লুটেরাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে, ব্যাংকসহ আমাদের অর্থনীতির সব কিছু আজকে একটি ভয়ংকর সংকটে এবং চরম পরিস্থিতিতে পৌঁছে গেছে। এক্ষেত্রে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের কোনো বিকল্প নেই।

জামায়াতে ইসলামীর প্ল্যাটফর্ম থেকে জাতীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে আমরা বারবার আহ্বান জানিয়েছি। ছাত্রশিবিরের নেতৃবৃন্দকেও আমরা দেখেছি এই আহ্বান করছেন। এই ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের প্রয়োজন অন্যরাও ফিল করছেন। আলহামদুলিল্লাহ এখন সেটা যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে বলে আমি মনে করি। জাতীয় রাজনীতিতে যুগপৎ আন্দোলনে বিরোধী দলগুলো ভূমিকা পালন করছে। কিন্তু এই স্বৈরাচারী ও একদলীয় ফ্যাসিস্ট সরকার জনগণের দাবি-দাওয়া ও আন্দোলনগুলোর প্রতি কোনো তোয়াক্কায়ই করছে না! 

জনগণের সামনে এদের জবাবদিহিতার কোনো মানসিকতা-ই নেই। জাতীয় সবগুলো প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। আমাদের জাতীয় সংসদ, আমাদের নির্বাচনী ব্যবস্থা, আমাদের পার্লামেন্ট, আমাদের বিচারব্যবস্থা, আমাদের সবগুলো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান বলা যায় যে চরমভাবে বিতর্কিত এবং ভেঙ্গে পড়েছে, একেবারে শেষ করে দেওয়া হয়েছে সবকিছুকে। এই পরিস্থতিতে জাতীয় নেতৃবৃন্দের মধ্যে ঐক্য আরো সুদৃঢ় করতে হবে। ছাত্র সমাজকেও এক্ষত্রে এগিয়ে আসতে হবে। বিশেষ করে এক্ষেত্রে ছাত্রদল বৃহৎ সংগঠন হওয়ার কারণে তাদেরকেই অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। 

ছাত্রশিবির একটা বিরাট সংগঠন। ছাত্র সমাজের মধ্যে তাদের একটা বিরাট প্রভাব আছে। এরাসহ অন্যান্য ছাত্র সংগঠন যারা আছেন সবাই মিলে দলমত তথা সকল মতামতের ঊর্ধে ওঠে জাতীয় প্রয়োজনে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। সেটা ২০০০ সালে বা এর পূর্বে আমরা যেভাবে আলাপ আলোচনা করেছি ছাত্রদলের নেতৃবৃন্দের সাথে, তাদের সাবেক নেতৃবৃন্দের সাথে, বেগম খালেদা জিয়ার সাথে; সেভাবেই হতে হবে। সে সময়ে আমরা বেগম খালেদা জিয়ার সাথে দেখা করেছি, তাঁর সাথে মিটিং করেছি, তাঁর সাথে অনেকবার আমরা বসেছি। তিনি আমাদেরকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক-নির্দেশনা দিয়েছেন। বিএপির হাইকমান্ডের অনেকেই তখন আমাদেরকে গাইড করেছেন, আমি মনে করি এখনো বিএনপির নেতৃবৃন্দকে সেই দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

ছাত্রদল-ছাত্রশিবিরসহ সব ছাত্র সংগঠনকে এক প্ল্যাটফর্মে এনে দেশ-জাতির এই ক্রান্তিলগ্নে আরেকটি ঐক্যবদ্ধ প্লাটফর্ম তৈরি করা এবং জাতীয় রাজনীতিতে ভূমিকা রাখা ও ছাত্রদের কল্যাণে ভূমিকা রাখা আবশ্যক হয়ে পড়েছে। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা, আমাদের শিক্ষাঙ্গণ, আমাদের ক্যাম্পাসগুলোর যে ক্ষতি হয়েছে, এই ক্ষতি থেকে আমদের বাঁচতে হবে। আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে একটি সুন্দর, সুষ্ঠ, সুস্থ ক্যাম্পাস উপহার দিতে হবে। যাতে আবরারদের ভিন্নমতের কারণে তারা আর হত্যার শিকারে পরিণত না হয়, আর যাতে কোনো ছাত্রকে ক্যাম্পাসে রক্ত দিতে না হয়, কোনো বাবা-মায়ের বুক যাতে খালি না হয়, কোনো বোন যাতে তার ভাই থেকে বঞ্চিত না হয়- এর জন্য আমাদের সবাইকে দায়িত্বপালন করতে হবে। না হলে ভবিষ্যতে আমাদের সকলকে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে।

এক্ষেত্রে জাতীয় নেতৃবৃন্দ এবং ছাত্রসংগঠনের শীর্ষ পর্যায়ে যারা আছেন তাদেরকে আরো উদার হতে হবে, তাদেরকে আরো অনেক বেশি মানবিক হতে হবে, তাদেরকে যথেষ্ট ছাড় দেওয়ার মানসিকতা রাখতে হবে। ভিন্ন মত থাকার পরেও জাতীয় ও আমাদের সামগ্রিক প্রয়োজনে এক প্ল্যাটফর্মে এসে শেষ সময় হলেও আমাদেরকে ভূমিকা পালন করতে হবে।

আমি মনে করি এখনো সেই সময় আছে, এখনো আল্লাহর ইচ্ছায় আমাদের মধ্যে যেন সেই বোধদয় হয় এবং আমরা যাতে সবাই এগিয়ে আসি আমি সেই আহ্বান যানাচ্ছি, সেই প্রত্যাশা ব্যক্ত করছি। এই প্রত্যশা শুধু আমার ব্যক্তিগত না। আমি মনে করি এদেশের মানুষের এটা প্রত্যাশা। মুক্তিকামী মানুষের প্রত্যাশা। জাতির এই ক্রান্তিলগ্নে এধরনের একটি উদ্যোগ সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে।

আপনার মন্তব্য লিখুন

কপিরাইট © বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির