post

প্রহসনের নির্বাচন পরিত্যাগ করেছে জনগণ

অধ্যক্ষ ডা. মিজানুর রহমান

০১ জানুয়ারি ২০২৪

বিশ্বজুড়েই স্বেচ্ছাচারী স্বৈরাচারী অগণতান্ত্রিক শাসনের প্রভাব দিনদিন বেড়েই চলেছে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। যে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের দাবিতে ১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বিশ্বের মানচিত্রে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা লাভ করে খচিত চাঁদ-তারকার পরিবর্তে লাল-সবুজের পতাকা অর্জিত হয়েছিল, সে রাষ্ট্রটির বয়স দিন মাস বছর ও যুগ পেরিয়ে ৫৩ বছরে পা রেখেছে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন, রাজনৈতিক ডামাডোল আর ক্ষমতার পালাবদলে এ রাষ্ট্রের বর্তমান হাল-হকিকত আর আগের মতো নেই। কারণ, এদেশে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সমুন্নত ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি অদ্যাবধি মজবুত করা সম্ভব হয়নি। বৈশ্বিক কারণেই এদেশে গণতন্ত্রের ধারা ও গতির কক্ষচ্যুতি ঘটেছে। ফলে গণতন্ত্রের জন্য আহাজারি, আর্তনাদ দিনদিন আরো প্রকটাকার ধারণ করেছে বলে অনেক দেশী-বিদেশী রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা।

বাংলাদেশে নিয়ম রক্ষার নামে যে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন গত ৭ জানুয়ারি ২০২৪ অনুষ্ঠিত হয়ে গেল তা অবস্থাদৃষ্টে নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, এটি একটি প্রহসনের নির্বাচন। কারণ দেশের ছোট বড় প্রায় ৭৩টি রাজনৈতিক দল এ নির্বাচনে অংশগ্রহণ তো দূরে থাক বরং নির্বাচন প্রতিহত করার জন্য যারপরনাই বিরোধিতা করেছে। নির্বাচন বয়কটের জন্য জনগণকে সঙ্গত কারণেই ভোটদানে বিরত থাকার জন্য মিছিল, মিটিং, লিফলেট বিতরণ, মানববন্ধন, পথসভা, সাংবাদিক সম্মেলন, ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়াতে বিবৃতি প্রদান, মত-অভিমত, বিদেশী কূটনীতিকদের সাথে যোগাযোগ ও  বৈঠক এবং অতঃপর নানারকম কৌশল অবলম্বন করেও শেষ রক্ষা রক্ষা হয়নি। অবশেষে প্রশাসন ও নিরাপত্তা বাহিনীর সরাসরি সহায়তায় ‘দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন’ অনেকটা শান্তিপূর্ণভাবেই অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে অনেকের ধারণা।  

আমরা জানি এবং মানি, বর্তমান বিশ্বে ‘গণতন্ত্র একটি অতি নিরাপদ ও জনপ্রিয় শাসনপদ্ধতি’। যে কারণে ‘গণতন্ত্র’কে রাষ্ট্রব্যবস্থায় সবচেয়ে ইনসাফভিত্তিক কার্যকর শাসনপদ্ধতি বলে মনে করা হয়। বিখ্যাত দ্য ইকোনমিস্ট ম্যাগাজিনের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান দ্য ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের ২০২০ সালের শুরুতে প্রকাশিত গণতন্ত্র সূচকে বলা হয়েছে, বর্তমান বিশে^ গণতন্ত্রেও পশ্চাৎপসারণ ঘটেছে সারা বিশে^ই। ২০১৯ সালে বিভিন্ন দেশে বৈশ্বিক গণতন্ত্রে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটেছে। এতে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের বাস্তব অবস্থা আরও শোচনীয় বলে দাবি করা হয়। ১৬৭টি দেশের ওপর চালানো বার্ষিক জরিপের ফলাফলে বাংলাদেশের অবস্থান ৮০ নম্বরে ঠাঁই এসেছে।

চারটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়েছে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে। যেসব দেশে পূর্ণাঙ্গ গণতন্ত্র আছে তাদেরকে রাখা হয়েছে সর্বশীর্ষে। এই ক্যাটাগরির নাম দেয়া হয়েছে ‘ফুল ডেমোক্র্যাসি’। এরপরে রয়েছে ‘হাইব্রিড রেজিম’। তারপরে কর্তৃত্ববাদী শাসন চলছে, এমন দেশের তালিকা। একে আখ্যায়িত করা হয়েছে ‘অথরিটারিয়ান রেজিম’ হিসেবে। অবশ্য কোন কোন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে ‘হাইব্রিড রেজিম’ এ স্থান দিয়েছে।

গত পাঁচ বছর ধরে সুইডেনের গোথেনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয় এর ভি-ডেম ইনস্টিটিউট এর দেয়া প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল ‘অটোক্রাটাইজেশন গোজ ভাইরাল’ বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থা নিয়ে ঐ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উদার গণতান্ত্রিক সূচকে ১৭৯টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৫৪তম। লিবারেল ডেমোক্র্যাসি ইনডেস্ক স্কোর শূন্য দশমিক ১। নির্বাচনভিত্তিক গণতন্ত্রেও সূচকে (ইলেকটোরাল ডেমোক্র্যাসি ইডেক্স) বাংলাদেশের অবনমন ঘটে ১৩৮তম, স্কোর শূন্য দশমিক ২৭। এছাড়া লিবারেল কম্পোনেন্ট ইনডেস্কে বাংলাদেশের অবস্থান ১৬১তম।

বাংলাদেশ, ইগলিট্যারিয়ান কম্পোনেন্ট ইনডেস্কে ১৭৬তম, পার্টিসিপেটরি কম্পোনেন্ট ইনডেস্কে ১৪৩ এবং ডেলিবারেটিভ কম্পোনেন্ট ইনডেস্কে ১৫৮তম অবস্থানে আছে। এতে বলা হয় শাসনতান্ত্রিক দিক থেকে বাংলাদেশ আছে ‘নির্বাচনভিত্তিক সে¦চ্ছাতন্ত্র’ (ইলেকটোরাল অটোক্রেসি) বিভাগে। এর অর্থ হলো এদেশে গণতন্ত্র অপগ্রিয়মাণ। এটি আবার ধীরে ধীরে স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের দিকে ধাবিত হচ্ছে। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ইআইইউ এর ডেমোক্র্যাসি ইনডেস্ক-২০২০ এর প্রতিবেদনে ১৬৫টি দেশ দুটি অঞ্চলের মধ্যে ৭৬তম অবস্থানে উঠে এসেছে বাংলাদেশ। আর ২০০৬ সালে প্রকাশিত সূচকে বাংলাদশের স্কোর ছিল ৬.১১। ২০০৮ সালে সেনানিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় এ স্কোর নেমে আসে ৫.৫২-তে। 

লন্ডনভিত্তিক দ্য ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ) চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে ‘গণতন্ত্র সূচক ২০২২’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ^ব্যাপী দেশগুলোর গণতন্ত্রের অবস্থা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে ৫টি মূল বিষয়কে গুরুত্ব দেয়া হয়। যথা: রাজনৈতিক, সংস্কৃতি ও নাগরিক স্বাধীনতা নির্বাচনী প্রক্রিয়া ও বহুত্ববাদ, রজিনৈতিক অংশগ্রহণ ও সরকারের কার্যকারিতা। এতে ২০২১ সালের সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ৭৫তম। ২০২০ সালের সূচকের অবস্থান ছিল ৭৬তম, আর স্কোর ছিল একই। সংবিধান রক্ষার এ দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন গণতান্ত্রিক রীতি-নীতি আর বিবেক দিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ করে এটা জার দিয়েই বলা যায় যে, এদেশে গণতন্ত্র বলতে যেটুকু অবশিষ্ট ছিল তা বঙ্গোপসাগরের কিনারে পৌঁছে গেছে।

তবে ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী ও তার অনুসারীদের অন্তরে যে একটা অদৃশ্যমান ব্যথা সেটা হলো বঙ্গবন্ধুর হত্যার বদলা নেয়া এবং একটা আশার প্রদীপশিখা হলো বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত স্বপ্ন অর্থাৎ ‘বাকশাল’ কায়েম করা। সেটা স্বপ্ন এবারের সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে অনেকাংশে সহজ হয়েছে বলে বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনার বুকে ব্যথা থাকলেও ইদানীং মুখে হাসি ফুটে উঠেছে। বাংলাদেশের সংবিধানের ১১ অনুচ্ছেদে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে- “The Republic Shall be a democracy in which fundamental human rights and freedoms and respect for the dignity and worth of the human person shall be guaranteed, and in which effective participation by the people through their elected representatives in administration at all level shall be ensured-”অর্থাৎ ‘প্রজাতন্ত্র হবে একটি গণতন্ত্র যেখানে মৌলিক মানবাধিকার ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা থাকিবে, মানবসত্তার মর্যাদা ও মূল্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নিশ্চিত হইবে, এবং প্রশাসনের সকল পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত হইবে’।

আমাদের দেশের সরকারও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় বদ্ধপরিকর। কিন্তু সংবিধানের ধারায় বর্ণিত বিধান অনুযায়ী আমাদের দেশে বর্তমানে গণতন্ত্রের আবরণে চলছে একদলীয় স্বৈরতন্ত্র। ন্যায়বিচার, আইনের শাসন ও মানবাধিকারের কথা কিতাবে আছে বাস্তবে নেই। চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দেশব্যাপী ব্যাপকভাবে মানবাধিকার ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে। এক মেরুতে সরকার পক্ষ এবং আরেক মেরুতে বিরোধী দল দুয়ের মাঝে মনে প্রাণে বড় টান কিন্তু মাঝে বহু ব্যবধান। এই ব্যবধানই মানবাধিকার পৃষ্ঠিত হওয়ার প্রধান কারণ। সামাজিক ন্যায়বিচার, শৃঙ্খলাবোধ, সহনশীলতা, সহমর্মিতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, আইনের শাসন, শ্রমের মর্যাদা, সুশিক্ষা, নাগরিক সচেতনতা, কর্তব্যবোধ, সততা, ন্যায়পরায়ণতা, সভ্যতা, জননিরাপত্তা, খাদ্য নিরাপত্তা, নিরপেক্ষতা, মানবতাবোধ, মানবাধিকার, স্বাধীনতাসহ নানাবিধ বিষয়ে মূল্যবোধ সমুন্নত হলে বুঝতে হবে সে দেশের রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো সুদৃঢ়। এমন মজবুত রাষ্ট্রকেই গণতান্ত্রিক কল্যাণ রাষ্ট্র বলা যেতে পারে। একদিকে গণতন্ত্র অপরদিকে মানবাধিকার লঙ্ঘন একসাথে চলতে পারে না। উপরে উল্লিখিত বৈশিষ্ট্যহীন রাষ্ট্র যতই গণতন্ত্রের তর্জন-গর্জন করুক না কেন তা হবে বুমেরাং। কোথায় আছে গর্জনের চেয়ে অর্জন বড়। কাজেই গণতন্ত্রের তর্জন-গর্জনের চেয়ে মানবাধিকার অর্জনের বিষয়টি বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

মূলত সামাজিক মূল্যবোধ, আইন শৃঙ্খলার উন্নতি ও মানবাধিকার একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের রোল মডেল। এর ব্যত্যয় ঘটলে কাগুজে গণতন্ত্রের পক্ষাঘাত ঘটে রাষ্ট্রকে পঙ্গু করে দিতে পারে, সুশাসনের পরিবর্তে দুঃশাসনের চর্চা বৃদ্ধি পেতে পারে। বিশ^ব্যাংকের মতে, সুশাসন হলো- সরকারি কাজে দক্ষতা, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, বৈধ চুক্তির প্রয়োগ, জবাবদিহিতামূলক সুশাসন, স্বাধীন সরকারি নিরীক্ষক, আইন সভার কাছে জবাবদিহিতা, আইন ও মানবাধিকার সংরক্ষণ, বহুমুখী সাংগঠনিক কাঠামো এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতা। সুশাসনের মাধ্যমে জনগণ তাদের আশা আকাক্সক্ষার প্রতিফলন দেখতে পায়। তাদের চাহিদা ও ভোগাধিকার প্রাপ্ত হন। সুশাসনের ফলে সামাজিক সাম্য, নাগরিক অধিকার, গণতান্ত্রিক সমাজ এবং স্থিতিশীল কল্যাণ রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েম করা সম্ভব হয় এবং টেকসই হয়।

গণতন্ত্রের পূর্বশর্ত সুশাসন এক্ষেত্রে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অগ্রগতির প্রচার যতটা তুঙ্গে ততটা বাস্তবে নেই। দুর্নীতি, সুশাসন ও সরকারি ব্যয় এই তিনটি বিষয়ে এখনও বাংলাদেশের যথেষ্ট দুর্বলতা রয়েছে বলে মনে করেন প্রধান প্রধান দাতা সংস্থাগুলো। তারা বলছেন- বাংলাদেশের অগ্রগতি প্রশংসনীয়। কিন্তু এর পরের ধাপে বাংলাদেশকে যেতে হলে এবং সে উন্নয়ন টেকসই করতে হলে শক্ত হাতে দুর্নীতি দমন করাই হবে প্রথম কাজ। এজন্য বিভিন্ন খাতে সুশাসন ও সরকারি ব্যয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে আর্থিক খাতে সুশাসন খুবই জরুরি। এজন্য সবার আগে সরকার এদেশের রাজনৈতিক দলগুলো যৌথ প্রচেষ্টায় দুর্নীতি দমনসহ সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। দুর্নীতি দূর করে সুশাসন নিশ্চিত করা সম্ভব না হলে আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও মানবিক মূল্যবোধ মুখ থুবড়ে পড়বে।

বিশ্বদরবারে পূর্বের তুলনায় অনেক ক্ষেত্রে যথেষ্ট এগিয়ে যাওয়ার সামর্থ্য অর্জন করেছে বাংলাদেশ। দেশটি এখন বিশে^র অনেক দেশের জন্য অনুকরণীয়। উন্নয়নের পরবর্তী পর্যায়ে যেতে হলে বাংলাদেশকে সর্বক্ষেত্রে মান নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি এবং সুশীলসমাজ একযোগে দায়িত্বশীলতার পরিচয় বহন করে কাজ করতে হবে। এডিবির ভাইস প্রেসিডেন্ট ওয়েন চাই ঝাং বলেন- দুর্নীতি দমন, সরকারি ব্যয় ও সুশাসনে বাংলাদেশের এখনও যথেষ্ট দুর্বলতা আছে। টেকসই উন্নয়নের জন্য এসব দুর্বলতা দূর করতে হবে। বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর চিথিয়াও ফান বলেন- বাংলাদেশ দ্রুত এগুচ্ছে। তবে উদ্বেগের বিষয় বৈষম্য বাড়ছে। এছাড়া শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে আরও বিনিয়োগ দরকার। আমাদের উন্নয়ন এগিয়ে নিতে প্রয়োজন সুশাসন। গণতন্ত্রকে সসংহত করতে হলে সুশাসন নিশ্চিত করা জরুরি।

এদেশের গণতন্ত্রকামী মেহনতি মানুষ সুশাসন ও মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণেই পাকিস্তানি শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এবং সবশেষে ১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়ে ৯ মাস যুদ্ধ করে বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র কায়েম করতে সক্ষম হয়েছিল। তবে সুশাসন এবং গণতন্ত্র একে অপরের পরিপূরক হলেও এদেশে এ দুটি বিষয় এখন পর্যন্ত অনেকটা উপেক্ষিতই রয়ে গেছে। সুশাসন বলতে আমরা এও বুঝি যে, রাজনীতিতে জনগণের অংশগ্রহণ, সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ। স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, ন্যায়বিচার ও মানবিক মূল্যবোধ বজায় রেখে দেশের যেকোনো দুর্যোগে, সমন্বিতভাবে অংশগ্রহণের মানসিকতা বজায় রাখা ইত্যাদি।

বাংলাদেশের জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান ডয়চে ভেলের সাথে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, আমাদের দেশের সমাজের যেদিকেই তাকাই আইনের শাসন তো নাই? যেখানে মানুষকে তুলে নেয়া হয় আর খুঁজে পাওয়া যায় না, সেখানে মানবাধিকার কতটা আছে, তা নিয়ে তো প্রশ্ন করাই যায়? এটা যে খুব একটা উন্নত গণতান্ত্রিক সমাজ নয়, সেটা তো যে-কোনো সাধারণ মানুষই বলবে? মানুষের যে মর্যাদা, তা আইনের শাসন এবং মানবাধিকার রক্ষার মাধ্যমে সমুন্নত রাখতে হবে? সেই মর্যাদাই তো প্রশ্নের মুখে? মানুষের মৌলিক অধিকারের সামষ্টিক রূপ হলো মানবাধিকার।

অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা, নিরাপত্তা ও মর্যাদা লাভের পাশাপাশি ন্যায়বিচার, প্রাপ্তির অধিকার, নাগরিক সুবিধাপ্রাপ্তির অধিকার, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে রাষ্ট্র সমাজকে শাসন করার অধিকার একটি গণতান্ত্রিক ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের জনগণের। মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা ছাড়া মৌলিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা অসম্ভব। সেইসাথে নৈতিকতা, মূল্যবোধ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সুশাসন এবং মানবাধিকার একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য অপরিহার্য বিষয়। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত সাময়িকী ‘ফরেন পলিসি’ এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ধীরে ধীরে নিরাপত্তা রাষ্ট্রের গহ্বরে তলিয়ে যাচ্ছে। বিরোধী মতের মানুষ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে। গুম ও অপহরণের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী, সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রফিক-উল হক গত ১৫ অক্টোবর ২০১১ সালে আমার দেশ পত্রিকায় আয়োজিত মানবাধিকারের ৭ম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন- মানবাধিকার শুধু লিপিবদ্ধ কিছু অধিকার নয়, মানবাধিকার হচ্ছে মানুষে মানুষে বৈষম্যহীন জীবন। সর্বক্ষেত্রে, সর্ববিষয়ে, সর্বজনস্বীকৃত একে অপরের প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং ভ্রাতৃত্ববোধ সম্পন্ন আচরণ করাই হচ্ছে মানবাধিকার।

আদালতের কাজ হচ্ছে মানুষের ন্যায়সঙ্গত অধিকার সুরক্ষা করা। আদালত যদি কারও প্রতি ন্যায়বিচার করতে না পারে, সেটাও মানবাধিকারের লঙ্ঘন। আদালতের কাজই হচ্ছে মানুষের অধিকার রক্ষা করা। কিন্তু আজ আদালতেও মানবাধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে। রাজনৈতিক ব্যক্তিদের মামলা নিয়ে উচ্চ আদালতের ভূমিকায় নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিচারের ক্ষেত্রে সবাই সমান। কোন রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক ভেদাভেদ আইনে নেই। আদালতেও সেটা থাকার কথা নয়, কিন্তু দুর্ভাগ্য ইদানীং আমাদের দেশের আদালতে বিচারেও বৈষম্য দেখা যায়। রাষ্ট্র দার্শনিক ও ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যাপক ড. তালুকদার মনিরুজ্জামান ঐ একই সংখ্যায় উল্লেখ করেন- মানবাধিকার সব মানুষের জন্মগত অধিকার। মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার সর্বত্রই বিবেচ্য। এ সহজাত অধিকার সভ্য যুগে আইন দ্বারা স্বীকৃত হলেও সম্পদ এবং ক্ষমতাকে ঘিরে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। এ ক্ষমতা বা শক্তি প্রয়োগের ঘটনা কখনও রাজনৈতিক, গোষ্ঠী কিংবা ব্যক্তি পর্যায়ে ঘটছে।

মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা শুধু বাংলাদেশেই নয়, ইরাক, আফগানিস্তান বা ইসরাইলে মানবাধিকার লঙ্ঘনের চরম অবস্থা বিরাজ করছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার সনদের তোয়াক্কা না করে পৃথিবীর বহু দেশে সামাজিক নিরাপত্তা ও মানবাধিকার-এর বিপরীতে অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা একের পর এক ঘটিয়েই চলেছে। জাতিসংঘ দুঃখ প্রকাশ ও বিবৃতি দিয়ে দায়িত্ব এড়িয়ে যাচ্ছে। মোটকথা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মানবাধিকার পরিস্থিতি চরম উদ্বেগ ও আতঙ্কজনক অবস্থা বিরাজ করছে।

বাংলাদেশের বয়স ৫৩ বছর হলেও এদেশের উচ্চ আদালতে বিচারপতি নিয়োগ সংক্রান্ত সুস্পষ্ট আইন প্রণীত হয়নি বলে জানি। ১৯৭৮ সালে প্রথম আইন করার বিষয়টি সংবিধানে যুক্ত করা হয়। এরপর এ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে উচ্চ আদালতের পাশাপাশি সংসদ ও আইন কমিশন থেকে বিষয়টি চূড়ান্ত করার জন্য তাগিদ দিলেও তা কার্যকর করা হয়নি। উচ্চ আদালতে বিচারপতি নিয়োগের বিষয়ে সুস্পষ্ট আইন করার জন্য সাংবিধানিক নির্দেশনা থাকলেও বিগত ৪৬ বছরেও তা কার্যকর হয়নি।

২০১৪ সালে প্রথম আইন তৈরির উদ্যোগ নেয় সরকার, তবে বিগত ১০ বছরেও আইনটির খসড়া চূড়ান্ত হয়নি। এ অবস্থায় আইন ছাড়াই উচ্চ আদালতে বিচারপতি নিয়োগের কার্যক্রম চালাচ্ছে আইন মন্ত্রণালয়। বিচারপতি নিয়োগে আইন না করার জন্য রাজনৈতিক সরকারগুলোকেই দায়ী বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশের সংবিধানের রচয়িতা বিশিষ্ট আইনজীবী ড. কামাল হোসেন।

সাবেক বিচারপতি এম. আমীরুল ইসলাম বলেন- সরকারে যখন যে দলই থাকুক না কেন- তারা চায় তাদের প্রশাসনে যেন তাদের প্রাধান্য থাকে। কোন রাজনৈতিক সরকারই বিচার বিভাগের স্বাধীনতা চায় না। সে কারণেই বিচারপতি নিয়োগের নীতিমালা হচ্ছে না। তথ্য মতে জানা যায় স্বাধীনতার পর ২০১০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারিতে প্রথমবারের মতো বিচারপতি নিয়োগে গাইড লাইন দেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। তাও কালের বিবর্তনে চাপা পড়ে যায়।

এ থেকেই বুঝা যায় দেশের আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখনও স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়নি। কাজেই বলা যায় মানবাধিকার প্রশ্নে দেশের ক্ষমতাসীন সরকার কিংবা আমলা শ্রেণী যতই তর্জন গর্জন করুক না কেন শেষ কথা হলো গর্জনের চেয়ে অর্জন বড়। অতএব, গর্জনের মাত্রার চেয়ে অর্জনের মাত্রা বাড়ানোর জন্য আমাদের দেশই শুধু নয় সকল দেশের সুনাগরিকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা অতীব জরুরি বিষয়।

এবার দেশের বর্তমান গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক হাল-চাল নিয়ে আলোকপাত করার চেষ্টা করব। দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক সংগঠন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও জামায়াতসহ ছোট বড় প্রায় ৭০টি দল একাদশ ও দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে দাবি করলেও তা হালে পানি পায়নি। ফলে এ দুটি দলসহ অনেক গণতান্ত্রিক দল দুই টার্ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে সঙ্গত কারণেই বিরত থাকে।

এবারে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন ব্যাপক আলোচনা- সমালোচার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। নানা অনিয়ম, বেআইনি কর্মযজ্ঞের বিশেষ করে অগ্নিকাণ্ড, মারামারি, হত্যা, ভাঙচুর, হামলা, মামলা, সভা-সমাবেশ, মানববন্ধন, পথসভা, দেশী-বিদেশী বিবৃতি, সতর্কতা, হুমকি-ধমকিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে অবশেষে ক্ষমতায়ন ও কারচুপির দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত ঠিকই হয়ে গেল। দেশী-বিদেশী নির্বাচন পর্যবেক্ষক এ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করে নানা ধরনের মন্তব্য-বিবৃতি দিয়েছে বটে, কিন্তু কে শোনে কার কথা। বিচার মানি ঠিকই তাল গাছটা আমার, এমন ভাবধারায় চলছে বাংলাদেশের গণতন্ত্র। 

এবারের সংসদ নির্বাচনের কেন্দ্রগুলোতে ভোটার উপস্থিতি ছিল খুবই নগণ্য। মাত্র ২৭% ভোটার সারা দিনে ভোট প্রয়োগ করলেও শেষের দু’ ঘণ্টায় ৫৫% ভোট কাস্ট হয়েছে। এ নিয়ে নির্বাচন বর্জনকারী দলই শুধু নয় খোদ সরকারি দল তথা আওয়ামী লীগের জাঁদরেল নেতা ও নৌকা মার্কার পরাজিত প্রার্থীরাসহ আওয়ামী লীগের শরিকদলের বড় বড় নেতাদের অনেকেই এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পরাজয় বরণ করে এখন আবোল-তাবোল বক্ছেন। মন্তব্য ও বিবৃতি প্রদানে মোটেও ভয় কিংবা কুণ্ঠাবোধ করেননি। বিশেষ কর জাসদের সভাপতি ও সাবেক মন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক নৌকা প্রতীকের কাণ্ডারি ফজলে হোসেন বাদশা, পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত উপ-মহাপরিদর্শক আবদুল কাহহার আকন্দসহ বরগুনা-১ আসন থেকে ৫ বার নির্বাচিত এমপি ও সাবেক মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ সংসদীয় কমিটির সভাপতি ধীরেন্দ্র দেবনাথ (শম্ভু), দলের প্রচার সম্পাদক আবদুস সোবহান গোলাপ, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ও কৃষক লীগের সাবেক কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি আরিফুর রহমান দোলন। সাবেক সংসদ সদস্য বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী, সাবেক প্রতিমন্ত্রী ডা. মুরাদ হাসান, সাবেক সংসদ সদস্য শিল্পী মমতাজ বেগম, পাবনা-৩ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী চাটমোহর উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান এবং জেলা আওয়ামী লীগের নির্বাহী সদস্য আব্দুল হামিদ, কুমিল্লা-১ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ও আওয়ামী লীগের নেতা মিজানুর রহমান, চট্টগ্রাম -১ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের নির্বাহী কমিটির সদস্য মো: গিয়াস উদ্দিন, চট্টগ্রাম-৫ স্বতন্ত্র প্রার্থী ও চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি শাহজাহান চৌধুরী। জামালপুর-৫ স্বতন্ত্রপ্রার্থী রেজাউল করিম রেজনু, জামালপুর-৪ আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করা ইঞ্জিনিয়ার মাহবুবুর রহমান হেলাল, কক্সবাজার-১ স্বতন্ত্রপ্রার্থী চকরিয়া উপজেলার আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ও সদ্য সাবেক এমপি জাফর আলম, কক্সবাজার-৩ স্বতন্ত্র প্রার্থী হাইকোর্টের আওয়ামী আইনজীবী ফোরামের নেতা ব্যারিস্টার মিজান সাঈদ, কক্সবাজার-৪ স্বতন্ত্রপ্রার্থী টেকনাফ উপজেলার আওয়ামী লীগের সভাপতি নূরুল বশর, ঝিনাইদহ-১ স্বতন্ত্রপ্রার্থী ও কৃষকলীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক নূরে আলম সিদ্দিকী, ফরিদপুর-২ স্বতন্ত্রপ্রার্থী ও নগরকান্দা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জালাল হোসেন মিয়া। রাজশাহী-১ স্বতন্ত্রপ্রার্থী ও আওয়ামী লীগের নেতা গোলাম রব্বানী, রাজশাহী-৬ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী আওয়ামী লীগের নেতা রাহেনুল হক রায়হান, নাটোর-১ আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী শহিদুল ইসলাম প্রমুখ। লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টিও (এলডিপি) ও প্রেসিডেন্ট সাবেক কর্নেল অলি আহমদ বলেছেন, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পাতানো এবং ভাগাভাগির নির্বাচন, এ নির্বাচন বর্জনে আমরা ৯৫ ভাগ সফল হয়েছি।

জামানত হারিয়েছেন তৃণমূল বিএনপির চেয়ারম্যান শমসের মুবিন চৌধরী ও মহাসচিব তৈমূর আলম খন্দকার, কিংস পার্টি হিসেবে খ্যাত দলটির এই দুই নেতা নিজ নিজ আসনে প্রদত্ত ভোটের ৮ ভাগের ১ ভাগ ভোটও পাননি। উল্লেখ্য নির্বাচন সংক্রান্ত আইনে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হলে প্রতি প্রার্থীকে ২০ হাজার টাকা জামানত দিয়ে আবেদন করতে হয়। কোনো প্রার্থী তার নির্বাচনী আসনে প্রদত্ত ভোটের ৮ ভাগের একভাগ ভোট না পেলে তার জামানত বাজেয়াপ্ত হয়ে যায়। 

এবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে লড়তে ৫৯ জন জেলা ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এবং পৌরসভার মেয়র পদত্যাগ করে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়ে ছিলেন ৩৯ জন প্রার্থী। তাদের মধ্যে জয়ী হয়েছেন ১৬ জন মাত্র। বাকি হেরে যাওয়া ২৩ জন একূল-ওকূল দু’কূলই হারিয়েছেন, আর ১৫ জন প্রতিনিধি বিভিন্ন কারণে নির্বাচনে অংশগ্রহণই করতে পারেননি। সর্বোপরি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়া ২৮টি দলের মধ্যে ২৩টি দলের কোনো প্রার্থী এবার নির্বাচনে বিজয় লাভ করতে পারেননি।

এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির প্রার্থী ছিল সবচেয়ে বেশি। এরপর তৃতীয় সর্Ÿোচ্চ ১৩৫ জন প্রার্থী ছিল নতুন নিবন্ধিত দল তৃণমূল বিএনপির (সোনালি আঁশ প্রতীক)। চতুর্থ সর্বোচ্চ ১২২ জন প্রার্থী ছিল ন্যাশনাল পিপলস পার্টির (আম প্রতীক)। অন্যান্য দলের মধ্যে বাংলাদেশ কংগ্রেসের ৯৬, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির ৭৯, জাসদের ৬৬, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোটের ৬৩ এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলন (বিএনএম) ৫৬ জন প্রার্থী ছিলেন। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো এসব দলের কোনো প্রার্থী এ নির্বাচনে বিজয় অর্জন করতে পারেননি। অনেক প্রার্থী ১০০ ভোটের কম পেয়েছেন। যে কারণে এক সময়ের জননেতাদের অনেকেই ধরাশায়ী হয়ে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। 

১৯৯১ সাল থেকে ২০২৪ সাল নাগাদ বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী দল ও প্রতিনিধিত্বকারী দল সমূহের পরিসংখ্যান হলো- ১৯৯১ সালে পঞ্চম সংসদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী দল ছিল ৭৫ ও প্রতিনিধিত্বকারী দল ছিল ১৩টি। ষষ্ঠ সংসদ ছিল মাত্র ১১ দিন, সংসদে ছিল মাত্র দুটি দল বিএনপি ও ফ্রিডম পার্টি। ১৯৯৬ সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী দল ছিল ৮১টি ও প্রতিনিধিত্বকারী দল ছিল ৬টি, অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী দল ছিল ৫৪ট ও প্রতিনিধিত্বকারী দল ছিল ৮টি, নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী দল ছিল ৩৮টি ও প্রতিনিধিত্বকারী দল ছিল ৮টি, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী দল ছিল ১২টি ও প্রতিনিধিত্বকারী দল ছিল ৭টি, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী দল ছিল ৩৯টি ও প্রতিনিধিত্বকারী দল ছিল ৯টি, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী দল ২৮টি ও প্রতিনিধিত্বকারী দল ৫টি।

পত্রিকাটিতে আরো কিছু তথ্য জানা যায়, তা হলো- ১৯৯১- ২০২৪ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এবারই প্রথম সবচেয়ে কমসংখ্যক রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করেছে। যে কারণে এ নির্বাচনে অংশ নেয়া বেশির ভাগ দলের ভোটে জেতার মতো রাজনৈতিক ভিত্তি নেই। বলেছেন, লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ। ১৯৯১ থেকে ২০২৪ সাল নাগাদ প্রাপ্ত আসনের পরিসংখ্যানে আওয়ামী লীগ ১৯৯১ সালে পেয়েছিল ৮৮টি আসন। ১৯৯৬ সালে ১৪৬, ২০০১ সালে ৬২, ২০০৮ সালে ২৩০, ২০১৪ সালে ২৩৪, ২০১৮ সালে ২৫৮ ও সর্বশেষ এ রিপোর্ট লেখা অবধি ২০২৪ সালে আসন পেয়েছে ২২৩।

সম্প্রতি জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নানাজনে নানা মন্তব্য বক্তব্য ও বিবৃতি দিয়েছেন। তাদের প্রধান প্রধান অভিযোগের ধরন প্রায় অনেকটা একই ধরনের। ভোটে কারচুপি, প্রশাসনের হস্তক্ষেপ, হুমকি, হামলা, মামলা, অনিয়ম, জালভোট প্রদান, ভয়-ভীতি প্রদর্শন, আতঙ্ক। অস্ত্রের মহড়া, ভোটকেন্দ্র দখল, ভোটরদের ভোট কেন্দ্রে আসতে বাধাপ্রদান, ব্যালট পেপার নিয়ে জোর করে ভোট প্রদান, ককটেল মারা, এজেন্টদের জোড় করে বের করে দেয়া, বাড়িঘরে হামলা, অগ্নিসংযোগ করা, ট্রেনে, বাসে ও ছোট বড় যানবাহনে অগ্নিসংযোগ করা, সংশ্লিষ্ট ভোট কেন্দ্রের কর্মকর্তাদের উপর চাপ গ্রয়োগ করে জাল ভোট দেয়া, ভোটকেন্দ্রে কর্মকর্তাদের পক্ষপাতিত্ব ও বেআইনি কাজে সহায়তা করা ইত্যাদি।

দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বিএনপি যদিও এ পাতানো নির্বাচন বয়কট করেছে তথাপি এ দলটি এ নির্বাচন বন্ধের জন্য যারপরনাই চেষ্টা করেছে। তারা বলছে, বিরোধী দলবিহীন কথিত প্রহসনের এ সংসদ নির্বাচন দেশবাসী স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। দেশের অধিকাংশ ভোটার এবার ভোটকেন্দ্রে যায়নি। তারা মনে করে ক্ষমতাসীন সরকার একটি পাতানো নির্বাচন করে দেশকে গণতান্ত্রিক বিশ^ থেকে আলাদা করার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত ভাবে সম্পন্ন করেছে। সম্প্রতি বিএনপির মুখপাত্র রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, ‘দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারকে দেশের জনগণ এবং গণতান্ত্রিক বিশ^ চূড়ান্তভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে’, তিনি আওয়ামী লীগের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেছেন, ‘একদলীয় ফ্যাসিবাদীদের হুঙ্কারে আরেকটি কৃষ্ণতম মেকি সরকারের যাত্রা শুরু হয়েছে।’ 

বিভিন্ন দেশের বিবৃতি ও নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও কোন কিছুর তোয়াক্কা না করে সম্পূর্ণ একতরফা নির্বাচন করে দেশকে এক মহাসঙ্কটে ফেলে দিয়েছে, যা দেশবাসীর মোটেও কাম্য ছিল না। মূলত এ নির্বাচন সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ও অতীতের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করে ২৯৯ জন আওয়ামী সমর্থিত প্রার্থীকে বিজয়ী ঘোষণার নীলনকশার বাস্তবায়ন। দেশের আর একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বলেছে, এ নির্বাচন আওয়ামী লীগের একক এবং একতরফা নির্বাচন দেশবাসী এ নির্বাচন মনেপ্রাণে বয়কট ও প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা অবিলম্বে এ প্রহসনের নির্বাচন বাতিল করে কেয়ারটেকার সরকারের অধীনে নতুন করে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার দাবি করেছে। জামায়াতের শীর্ষনেতা অধ্যাপক মুজিবুর রহমান সম্প্রতি রাজশাহীতে এক সম্মেলনে বলেছেন, “যতদিন গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা না হবে ততদিন আন্দোলন চলবে।” তবে সরেজমিনে দেখা গেছে জামায়াত বর্তমানে গোপনে ও প্রকাশ্যে সাংগঠনিক কার্যক্রম এর পাশাপাশি দুর্যোগে-দুর্ভোগে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মানুষের সার্বিক সহায়তার ক্ষেত্রে বিরাট ভূমিকা পালন করছে।

সদ্য অনুষ্ঠিত বাংলাদেশের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কতটা অর্থবহ ও গ্রহণযোগ্য তা দেশের জনগণ ও গণমাধ্যম নির্ধারণ করবে, বলেছেন ১৬টি দেশের আমন্ত্রিত বেসরকারিভাবে নির্বাচন পর্যবেক্ষক দল। এদিকে ভয়েস অব আমেরিকার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে বাংলাদেশে একতরফা নির্বাচন একদলীয় শাসনের ভীতি বাড়িয়ে দিয়েছে। কানাডা যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘ অস্ট্রেলিয়া ইইউ সবাই এ ব্যাপারে বক্তব্য দিয়েছে। সাবেক রাষ্ট্রদূত উইলিয়াম বি মাইলাম বলেছেন, গণতান্ত্রিক মূলনীতি পূরণ হয়নি বাংলাদেশের এ নির্বাচনে। ভোটে অনিয়মের সময়োচিত তদন্ত চায় ইইউ। অপরদিকে বাংলাদেশের এ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে হতাশ কানাডা। আমেরিকা ও ব্রিটেন সরাসরি বলেছে, এ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হয়নি।

এবারের নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ অস্ট্রেলিয়া, ব্রিটেন ও খোদ জাতিসংঘ। অপরদিকে এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর পরই এ বিজয়কে অভিনন্দন জানিয়েছে, ভারত, চীন, রাশিয়া, সৌদিআরবসহ বিশে^র ৫০টির বেশি দেশ। যার ফলে সপ্তাহ পার না হতেই তিন দিনের মাথায় সংসদ সদস্যদের শপথগ্রহণ ও মন্ত্রিসভা গঠন করা সহজ হয়েছে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমি ফোরামের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৫ ঝুঁকিতে বাংলাদেশের অর্থনীতি, ভোটে অনিয়মের তদন্ত ও সংলাপ চায় ইইউ। ওইদিকে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ ইস্যুতে মার্কিননীতির কোনো পরিবর্তন হয়নি। দ্য ডিপ্লোম্যাটের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ঝুঁকিপূর্ণ নির্বাচন সহিংসতায় ঝুঁকি আরো বৃদ্ধি করবে। দ্য গার্ডিয়ান এর সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, দীর্ঘমেয়াদি গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতার পরিবর্তে স্বেচ্ছাচারকে বেছে নেয়া বোকামি হবে। এটি একটি ফাঁকা বিজয় ছিল কারণ প্রতি ১০ জনের মধ্যে মাত্র ৪ জন ভোট দিয়েছেন। এদিকে, লন্ডন ও ওয়াশিংটন জানিয়েছে, এই নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু ছিল না। অপরদিকে পশ্চিমা রাষ্ট্র, বিভিন্ন রাষ্ট্রের কূটনৈতিক ও মিডিয়ার চেখে বাংলাদেশের দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন একতরফা নির্বাচন, এ নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয়নি। তারা নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নতুন নির্বাচনের দাবি জানিয়েছেন।

অপরদিকে গত ৮ জানুয়ারিতে গণভবনে অনুষ্ঠিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশী-বিদেশী পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময় অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, “কেউ নির্বাচনে না এলে, মানে এটা নয় যে গণতন্ত্র নেই। বিএনপি মানুষকে ভোট না দিতে উৎসাহিত করার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু মানুষ তাদের কথা শুনেনি।” গত ১২ জানুয়ারিতে সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধ ও ধানমন্ডির বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে নতুন মন্ত্রিপরিষদের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা নিবেদনের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, “এই বিজয় জনগণের ও গণতন্ত্রের বিজয়।”

তবে সারা দিনের ভোটের চিত্রের সঙ্গে প্রদত্ত ভোটের হার মিল না পাওয়ায় দেশী-বিদেশী পর্যবেক্ষক, সংবাদকর্মীসহ রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও দেশের সাধারণ জনগণের মনে সন্দেহ দেখা দিয়েছে প্রকট ভাবে। ভোট গ্রহণের শেষ ঘণ্টাতেই যে ১৩% এর বেশি ভোট পড়েছে এতে নির্বাচনে অংশ নেয়া প্রার্থীদের অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করে ক্ষান্ত ছিলেন না বরং এখন পর্যন্ত নানা অভিযোগ, হামলা-মামলা অব্যাহত আছে। শেষ পর্যন্ত কী হবে? তা পরিবেশ পরিস্থিতি ও সময়ই বলে দেবে বলে এদেশের অভিজ্ঞ মহল, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, সচেতন নাগরিক ও সুশীলসমাজ নানা ভাষায় নানাভাবে তাদের মতামত পেশ করেছেন। আমার ধারণা এর বাইরে নয়।

লেখক : প্রাবন্ধিক, গবেষক, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

আপনার মন্তব্য লিখুন

কপিরাইট © বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির