post

মহানবীর সা. বিচারে প্রাচ্যতাত্ত্বিক অবিচারের ধারা

মুসা আল হাফিজ

২৫ আগস্ট ২০২৩

ওরিয়েন্টালিজম একটি অ্যাকাডেমিক শৃঙ্খলা হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার আগ থেকে পশ্চিমারা ইসলামকে অধ্যয়ন করে একটি প্রতিপক্ষ সভ্যতা হিসেবে। মুহাম্মদ সা. যেহেতু এর প্রবক্তা, ফলে তাঁর প্রতি তাদের  আগ্রহ ছিল তুঙ্গে। সাধারণভাবে কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া নেতিবাচক ও বিতর্কমূলক উদ্দেশ্য থেকে আগ্রহটি পরিচালিত হয়। বৈজ্ঞানিক গবেষণা বা সত্যের অনুসন্ধানের প্রচেষ্টার পরিবর্তে তা দাঁড়িয়েছিল নিন্দা ও অবজ্ঞার ভিত্তির ওপর। মহানবী সা. বিষয়ক মধ্যযুগীয় পশ্চিমা রচনাবলি সত্যের প্রতি মোটেও মনোযোগী ছিল না। ঘৃণা, বিদ্বেষ ও শত্রুতার আবেগ সেসব রচনাকে নিন্দা ও মিথ্যার এমন স্তূপে পরিণত করে, যার হিংস্র চরিত্র নিয়ে আক্ষেপ করেছেন ইসলামের সমালোচক বার্নার্ড লুইস (১৯১৬-২০১৮) এর মতো ব্যক্তিত্বও! কিন্তু এ আক্ষেপ যথেষ্ট নয়। পশ্চিমারা যদি সত্য ও সততার প্রতি নিজেদের দায়কে অস্বীকার না করে, তাহলে মহানবী সা. সম্পর্কে বিরতিহীন মিথ্যাচার পরিহার করা এবং অতীতের অনাচারের জন্য তাদের ক্ষমা প্রার্থনা করা উচিত ছিল। কিন্তু দেখা গেল ওরিয়েন্টালিজম যখন জ্ঞানশৃঙ্খলা হিসেবে দাঁড়ালো, তখন প্রাচ্যবিদগণ সাধারণভাবে পূর্ববর্তী এসব রচনাকে ব্যবহার করলেন সূত্র হিসেবে! এসব অবৈজ্ঞানিক নিন্দাপ্রধান রচনাকে অবলম্বন করে তারা অঙ্কন করতে লাগলেন ইসলামের ছবি। ঘৃণা ও শত্রুতার গর্ভ থেকে জন্ম নেওয়া পুরনো কুসংস্কারগুলোকে কাজে লাগানো হলো মুহাম্মদ সা.-এর ভাবকল্প নির্মাণে। মহানবীর সা. প্রশ্নে প্রাচ্যতত্ত্ব সাধারণভাবে অপবাদ ও ইতিহাসের মধ্যে পার্থক্য করতে ব্যর্থ হয়েছে। কিছু সম্মানজনক ব্যতিক্রম ছাড়া প্রাচ্যবিদগণ ইসলাম ও মহানবীকে দেখেছেন পক্ষপাতদুষ্ট চোখ দিয়ে, বিকৃতি প্রয়াসী ছিল তাদের ল্যান্স। মহানবীর মহান বৈশিষ্ট্য ও অবদানসমূহকে অবজ্ঞা, উপেক্ষা ও খণ্ডিত করার মধ্যে তারা তৃপ্তি তালাশ করেছেন। তাদের উদ্যম ও উত্তেজনা কাজ করেছে বিতর্ক তৈরি, ত্রুটির তালাশ এবং ব্যক্তিত্বের মহিমা হত্যার পেছনে। 

এটা সত্য যে, ইসলামের প্রসার খ্রিস্টবিশ্বের আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করে প্রবলভাবে। ফলে ইসলাম শুরু থেকেই রোমান রাজনীতিক, পাদ্রি ও প্রচারকদের জবানিতে বিবৃত হয়েছে একটি হুমকি হিসেবে, যাকে বরাবরই একটি ভ্রষ্টতা ও বিকৃতি হিসেবে দেখানো হয়েছে। ভিত্তিহীন বক্তব্যসমূহ তারা ছড়িয়েছেন বিপুলভাবে। যার প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল ইসলাম ও নবী মুহাম্মাদ সা. এর বিকৃত চিত্র তৈরি করে ইসলাম থেকে দূরে থাকার জন্য মানুষকে বিভ্রান্ত করা। সুতরাং তাদের জবানিতে মহানবী হয়ে উঠেছেন ‘মানসিকভাবে অসুস্থ’, একজন ‘মিথ্যাবাদী’, একজন ‘ভুয়া নবী’ এবং একজন ‘খ্রিস্ট-বিরোধী’, যার কোনোটিরই কোনো বাস্তব ঐতিহাসিক ভিত্তি ছিল না। এ ধরনের অবমাননাকর ছবি কয়েক শতাব্দী ধরে অব্যাহতভাবে তৈরি ও পুনঃউৎপাদিত হয়েছিল। এই ধারায় জন্ম লাভকারী সাহিত্যকর্মের সংখ্যা ও পরিধি ছিল বিপুল, বিস্তর এবং একরোখা চরিত্রে ক্রমবর্ধমান। খ্যাতিমান প্রাচ্যবিদ মন্টগোমারি ওয়াট (১৯০৯-২০০৬) স্বীকার না করে পারেননি যে,  ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ পুরুষদের মধ্যে,  মুহাম্মাদ সা. এর মতো কাউকে এতো বেশি অপমান করা হয়নি।  (মুহাম্মদ অ্যাট মদিনা,  পৃ. ৩২৪)। দীর্ঘকাল ধরে মহানবী সা.কে ম্যাফোমেট (Maphomet) বাফোমেট (Baphomet) এবং বাফুম (Bafum)  নামে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এসব নাম সবকটিই নেতিবাচক অর্থে ভরা। যা দানব, প্রতিপক্ষ, ভণ্ড এবং হিংস্র অভিব্যক্তি প্রকাশ করে। মুসলমানদেরকে বলা  হয়েছিল পৌত্তলিক, যারা পূজা করে  মাহোমেট এর প্রতিমার!

মহানবীর সা. লিখিত বিবরণে ভ্রষ্ট চিত্রায়ণ শুরু হয় John of Damascus (মৃত্যু-৭৫০) এর হাত দিয়ে। তিনি ছিলেন সিরিয়ার এক খ্রিস্টান ধর্মযাজক। তিনি তার  dialogue between a saracen and a christian গ্রন্থে মহানবী সা. সম্পর্কে আলোকপাত করেন। চারপাশের লোকদের প্রতারিত করেন, মিথ্যানবী, খ্রিস্টধর্মের নকলকারী ইত্যাদি অপবাদ দিয়ে তিনি মহানবীকে উপস্থাপন করেন, যিনি অ্যারিয়ান পুরোহিতদের সাহায্যে খ্রিস্টান উৎস ব্যবহার করে ইসলামকে তৈরি করেছেন! ভিত্তিহীন সমালোচনার ভিত তৈরি করে জনের এই বই। জন  ইসলামের যুদ্ধগুলোকে কলঙ্কিত করেন এবং ইসলামের মহিমাকে করেন অস্বীকার। বস্তুত মুসলিমদের বিপরীতে খ্রিস্টানরা কীভাবে তর্ক করবে, তার কৌশল শেখানোর জন্য বইটি রচিত হয়। শত্রুতার উত্তাপ বাড়ানো এবং এর চর্চাকে বিস্তৃত করার অভিপ্রায় থেকেই বইটির জন্ম। কিন্তু পরবর্তী প্রাচ্যবিদদের কাছে এটা হয়ে গেল মাতৃগ্রন্থ। এ গ্রন্থে যে শত্রুতার ভাষা তৈরি করেন জন অব দামেশক, সেই শত্রুতাকে ইসলামের ব্যাপারে জ্ঞানীয় সত্য হিসেবে উপস্থাপন করতে থাকলো পরবর্তী প্রাচ্যবাদ। মহানবীর জীবনী নিয়ে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যে বসবাসকারী পুরোহিত এবং অন্যান্যদের নানা কাজ শত্রুতামূলক উদ্বেগ ও প্রতিপক্ষীয় উত্তেজনায় ফেনায়িত ছিল। নবম শতকে Nicetas Byzantium কর্তৃক রচিত Refutatio Mohammedis,  থিওফেনেস দ্য কনফেসার (৭৫২-৮১৮),  কর্তৃক রচিত  Chronographia মহানবীর বিপরীতে বৈরী উত্তাপ তৈরিতে মনোযোগী ছিল। চার্চ অব রুমের প্রধান অর্কাইভিস্ট Anastasius Bibliothecarius  (৮১০-৮৭৮) কনফেসারের বইটিকে আবিষ্কার ও সম্পাদনা করেন এবং তিনি তার compiled বা Chronographia tripartita গ্রন্থে মহানবীর প্রশ্নে অপবাদের  চর্চা করেন।  

অন্যদিকে স্পেনে মুসলিম বিজয়ের দীর্ঘকাল পরে খ্রিস্টবাদী জাতীয়তাবাদের ভেতর থেকে এক ধরনের প্রান্তিক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। যা ইসলাম ও নবী মুহাম্মদ সা. সম্পর্কে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ও ভুল বোঝাবুঝি ছড়ানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এর পেছনে সক্রিয় চরমপন্থা শান্তিনাশের অন্ধ চেষ্টায় লিপ্ত ছিল। কর্ডোভার সেন্ট জুলিয়াস গির্জার যাজক ইউলোজিয়াস (৮১৯-৮৫৯) পারফেকটাস (৮৫০ খ্রি.)  এবং এলভারোর (৮৫৯ খ্রি.) নেতৃত্বে স্পেনে আনুষ্ঠানিকভাবে জিলট মুভমেন্ট বা ধর্মান্ধ আন্দোলন শুরু হয়। মুসলিমদের মসজিদ, সম্মেলন কিংবা বাজারের ভিড়ে ইসলাম ও হযরত মুহাম্মদ সা. এর অব্যাহত অপমানকে তারা কৌশল হিসেবে নিয়েছিল। সব ধরনের সামাজিক, অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়া সত্ত্বেও তাদের এ বিদ্রোহের সুনির্দিষ্ট কারণ পাওয়া না গেলেও ধারণা করা হয় মুসলিম শাসনে ঈর্ষান্বিত হয়ে তারা এ আন্দোলনের সূচনা ঘটায়। এন্টনি গোমেজের মধ্যস্থতায় খ্রিস্টান  বিশপগণ এই চরমপন্থাকে প্রত্যাখ্যান করলেও জিলট মুভমেন্ট কোনো নিয়ম বা যুক্তির ধার ধারতো না। জিলটরা মহানবী সা.  সম্পর্কে সঠিক তথ্য থেকে দূরে ছিল না এবং  ইসলামের সত্যতা সম্পর্কেও অন্ধকারে ছিল না। তারা মূলত চেয়েছিল নৈরাজ্য এবং বিদ্রোহ। যে কোনো উপায়ে সাম্প্রদায়িক রক্তপাতের মধ্য দিয়ে স্পেনের মুসলিম শাসনকে বিপদে ফেলার জন্য আত্মঘাতী উপায় অবলম্বনে উদ্যমী ছিল তারা। মহানবী সা. সম্পর্কে মিথ্যা, উদ্ভট ও বিকারগ্রস্ত গল্পসমূহ তারা তৈরি করে। শত্রুতামূলক নানা সাহিত্যও জন্ম নেয় তখন। সেন্ট ইউলোজিয়াস এর liber apologeticus martyrum ঘৃণার ওপর ভর করে রচিত ল্যাতিন গ্রন্থ। যা রচিত হয় ৮৫৭ থেকে ৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে। এ গ্রন্থে  মহানবী সা. এর প্রসঙ্গ আলোচিত হয় বারবার। যে আলোচনা জন্ম নিয়েছে রাসূল সা. এর প্রতি  সর্বোচ্চ মাত্রার বিদ্বেষের গর্ভ থেকে।   

এমনতরো ঘৃণার আরেকটি জ্বালামুখ তৈরি হয় ক্রুসেডের প্রেক্ষাপটে। সেকালে অগ্রসর মুসলিম দুনিয়ার প্রতি অনগ্রসর খ্রিস্টবিশ্বের ধ্বংসাত্মক অভিপ্রায়ের প্রতিফলিত রূপ হলো ক্রুসেড। ১০৯৫ সালে সূচিত ক্রুসেড ২০০ বছর ধরে ঘৃণা ও ক্রোধের ওপর সওয়ার হয়ে হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ নিয়ে অব্যাহতভাবে আপতিত হয়েছে ইউরোপ থেকে মুসলিম জাহানে। এ সময়ে শোনা যাবে Petrus Venerablis তথা Peter of Montboissier (১০৯২-১১৫৬) এর কণ্ঠস্বর। ইসলামচর্চায় তিনি নেতৃত্ব দিচ্ছেন পশ্চিমে। টলেডোর ক্লোনি গির্জা হয়ে ওঠেছিল ইসলাম অধ্যয়নের কেন্দ্র। অধ্যয়নের কেন্দ্রে ছিল শত্রুতার ঐতিহ্য। পিটারের গবেষণাসমূহ অধিকতরো পরিশীলিত উপায় সন্ধান করেছে ইসলামকে আক্রমণের জন্য। কারণ ততক্ষণে ইসলামী দুনিয়ার জ্ঞানজগতের সাথে প্রত্যক্ষ পরিচয় ঘটেছে স্পেনের পাশাপাশি সিরিয়ায়, ফিলিস্তিনে। পুরনো গালগল্প ও একরৈখিকতা সেভাবে কাজ দিচ্ছিলো না। কিন্তু পিটারের কাজগুলো পুরনো মিথ ও মিথ্যাসমূহের ভিত্তি প্রদানেরই চেষ্টা করেছে। সেই সব গবেষণা এখনো বিখ্যাত Toledo-Cluny collection নামে। এর মধ্যে আছে মহানবী সা. ও তাঁর শিক্ষা ও আদর্শ সম্পর্কে রচিত The Liber generationis Mahumet, Liber de doctrina Mahumet, The Summa totius haeresis Saracenorum ইত্যাদি গ্রন্থ। James Aloysius Kritzeck তার Peter the Venerable and Islam শীর্ষক বিখ্যাত সঙ্কলনে বইগুলো সম্পাদনা করেছেন। এই সঙ্কলনে আছে পিটারের The Epistola Saraceni and Rescriptum Christiani এর মতো গ্রন্থও। রবার্ট অব কেটনের (১১১০-১১৬০) মাধ্যমে ল্যাতিন ভাষায় আল কুরআনের অনুবাদ করান পিটার। যার নাম দেন Lex Mahumet pseudoprophete তথা মিথ্যানবী মুহাম্মদের সা. আইনগ্রন্থ। এর মানে পরিষ্কার, মহানবী সা. কীভাবে সঠিক নবী নন, সেটা দেখানোর চেষ্টা অনুবাদের সর্বত্র যেমন আছে, তেমনি নামের মধ্যেও সেই লক্ষ্যকে গোপন করেননি তারা। খ্রিস্টান সন্ন্যাসী আবুল মসিহ ইবনে ইসহাক আল কিন্দির কথাকথিত একটি চিঠি অনুবাদ করা হয়  Rescriptum Christiani নামে। যা খ্রিস্টধর্মকে রক্ষার জন্য ইসলামের সাথে বিতর্কের অংশ হিসেবে রচিত বলে দাবি করা হয়। যার ঐতিহাসিক ভিত্তি অপ্রমাণিত। ভিনসেন্ট ডি বেউভাইস (মৃত্যু ১২৬৪) Speculum Historiale  এর ২৩ খণ্ডে  এ পুস্তক সঙ্কলন করেন। এতে যুক্ত করেন মহানবী সা. সম্পর্কে আজগুবি যতো গল্প। এসব গল্প ছিল সংক্রামক। এর উত্তরাধিকার খ্রিস্টীয় জগৎ এখনো বহন করছে। সেই কথিত চিঠি The Apology of al Kindî নামে খ্যাতি ও সমাদর পেয়ে আসছে। স্যার উইলিয়াম ম্যুর তার The Life of Mahomet গ্রন্থে গল্পগুলোর পুনরাবৃত্তি করেন, যা প্রকাশিত হয় ১৮৬১ সালে। 

ত্রয়োদশ শতাব্দীর ল্যাতিন কিংবদন্তি Legenda aurea বা The Golden Legend এ মহানবীকে সা. মিথ্যা নবী এবং জাদুকর হিসেবে দেখানো হয়েছে। Jacobus de Voragine (১২৩০-১২৯৮) এর কাহিনীগুলো মাগুমেথ এর বৃত্তান্ত শুনিয়েছে। যিনি জাদুকর, প্রথম জীবনে রাখাল ছিলেন। বিবাহের মাধ্যমে হন ব্যবসায়ী, করেন ভ্রমণ। বিধবা খাদিজা তাঁর স্ত্রী। মৃগীরোগের ফলে তিনি নিজেকে নবী মনে করতেন। সের্গিয়াস নামক একজন ধর্মত্যাগী নেস্টোরিয়ান সন্ন্যাসীর হস্তক্ষেপের ফলে তিনি কুরআন রচনা করেন! এই কাহিনী ত্রয়োদশ-চতুর্দশ শতকে ইউরোপে প্রচণ্ড জনপ্রিয়তা পায়। তখনকার পশ্চিমা সাহিত্য মুসলিমদের বর্ণনা করেছে অবিশ্বাসী বা Infidel হিসেবে, pagans বা পৌত্তলিক হিসেবে। স্যারাসেন বলে বুঝানো হয়েছে মুসলিমদের এবং সাধারণভাবে তারা হচ্ছে শয়তান! প্যানিয়াফোর্টের র‌্যামন্ড (১১৭৫-১২৭৫) তার Summa de Poenitentia গ্রন্থে স্যারাসিনদের সংজ্ঞা উপস্থাপন করেন মুসলিমদের দিয়ে। পরে আনেন এমন সব জাতিকে, যারা ইহুদি বা খ্রিস্টান নন। 

 স্প্যানিশ picaresca উপন্যাস মুসলিমদের হাত দিয়ে বিকশিত হয়। ত্রয়োদশ শতকে এর চর্চায় খ্রিস্টীয় অগ্রগতি লক্ষ্য করা যায়। তখন থেকে পিকারেস্ক উপন্যাসগুলোতে মহানবীকে উপস্থাপন করা হয় শত্রু অবয়বে। Alexandre du Pont এর Roman de Mahom কিংবা লিয়ন ও ক্যাস্টাইলের Alfonso X এর গ্রন্থ the Escala de Mahoma মূলত মহানবীর মিরাজসহ নানা ইতিবৃত্তের আরবি বিবরণের অনুবাদ। কিন্তু এসব গ্রন্থেও প্রতিপক্ষ হিসেবে চিত্রিত করে দেখানো হয়েছে মহানবীর জীবনাদর্শ ও শিক্ষাসমূহ মিথ্যার ওপর দাঁড়ানো! 

ব্রিটেনের মধ্যযুগীয় সাহিত্যের (The Matter of Britain) প্রথম বই হচ্ছে Robert de Boron এর  ল্যান্সলট-গ্রেইল (The Lancelot-Grail)। এতে দেখানো হয় মধ্যপ্রাচ্যের বেশিরভাগ বাসিন্দাই মুহাম্মদের সা.  আগমন পর্যন্ত পৌত্তলিক ছিল। তার সম্পর্কে বলা হয়, যিশু খ্রিস্টের শিক্ষাকে জীবিত করার জন্য তিনি প্রেরিত হন। কিন্তু এই লক্ষ্য ব্যর্থ হয়। কারণ তাঁর অহঙ্কার তাকে ঈশ্বরের ইচ্ছার বিরুদ্ধে যেতে বাধ্য করে। যার ফলে তার অনুসারীরা প্রতারিত হয়। তবে তিনি যে ধর্ম প্রবর্তন করেন, তা অবশ্য পৌত্তলিকদের থেকে অনেক উন্নত।  

Chanson de Roland বা রোল্যান্ডের গান হলো ধর্মযাজক কনরাডের লেখা হাজার লাইনের দীর্ঘ কবিতা। ইউরোপে  রোল্যান্ড স্লাইড নামে বিখ্যাত এই গান রচিত হয় ৭৭৮ সালে। রাজা শার্লেমেনের শাসনামলে রনসেভক্স পাসের যুদ্ধে ফ্রাঙ্কিশ সামরিক নেতা রোল্যান্ডের কাল্পনিক বীরত্বের ওপর ভিত্তি করে রচিত এই গান ফরাসি সাহিত্যের টিকে থাকা প্রাচীনতম কাব্য। ইউরোপের ইতিহাসে এর গুরুত্ব বিপুল। এ গান ইসলামের সাথে শত্রুতায় উত্তপ্ত। মুসলমানদের প্রশ্নে নেতিবাদী অসত্যে কলঙ্কিত এই গানের বহু পঙক্তি। গানটি দাবি করে মুসলমানরা দেব-দেবির উপাসনা করেন। তাদের প্রধান দেবমূর্তি  তিনটি। সেগুলো হলো মুহাম্মদ, অ্যাপোলিন এবং টারভাগ্যান্ট। গানটি দেখায় কীভাবে রোল্যান্ডের একজন ঘনিষ্ঠ সহচর ৭৭৮ সালে আন্দালুসিয়ায় মুসলমানদের বিরুদ্ধে পরিচালিত যুদ্ধের সময় শার্লেমেনকে বিশ্বাসঘাতকতা করে হত্যা করেছিল। গানটির সূচনা একটি আকাক্সক্ষা দিয়ে, যাকে সংঘটিত ঘটনা হিসেবে দেখানো হয়েছে। আকাক্সক্ষাটি হলো খ্রিস্টান রাজা মুসলিম শাসিত স্পেন জয় করেছেন, কোনো পাহাড়, প্রাচীর বা দুর্গের কোথাও নেই কোনো মুসলমান। তাদের দেয়ালগুলো টুকরো টুকরো হয়ে গেছে, টাওয়ারগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে এবং অন্ধকার জঙ্গলে বৃষ্টিপাতের মতো ঝরে পড়ছে মুসলিমদের কাটামস্তক! গানটির শুরু হচ্ছে এই বার্তা দিয়ে:  

রাজা চার্লস, আমাদের মহান সম্রাট,

সাতটি বছর ধরে রয়েছেন স্পেনে- 

তার পদতলে সাগর অবধি সারা স্পেন, সব উঁচু ভূমি নেই কোনো দুর্গ বাধা দেবার

জয় করার বাকি, এমন কোনো প্রাচীর নেই, শহরও নেই! 

শুধু আছে সারাগোসা, পাহাড়ের মাথায়! 

মার্সিলির সুলতান একে পাহারা দেয়, সে তো ঈশ্বরের দুশমন!  

সে মুহাম্মদের সেবা করে আর শয়তানকে ডেকে পার করে দিন-রাত 

না, বিপর্যয় আসছে, সে ঠেকাতে পারবে না তাকে। 

দ্যাখো, দ্যাখো রাজা উচ্ছ্বসিত যেমন, তেমনি আহ্লাদিত

সে পাঠিয়েছে কর্ড্রেসকে, গুঁড়িয়ে দিয়েছে সব দেয়াল 

ছত্রখান হয়ে আছে সব, নাস্তানাবুদ! 

ধ্বংস করেছে শত্রুদের সমস্ত টাওয়ার। 

রাজার নাইটরা কী ভাগ্যবান, হাতে হাতে  লুঠের জিনিস 

কত সোনা-রুপা, কত দামি আসবাব।

না, শহরে জীবিত নেই  কোন পৌত্তলিক (মুসলমান) 

হয় তারা লাশ, নয় খ্রিস্টান! 

ইতালির বিখ্যাত কবি দান্তে আলি ঘিয়েরির (১২৬৫-১৩২১)  মহাকাব্য লা ডিভিনা কমিডিয়া (দ্য ডিভাইন কমেডি) রচিত হয় ১৩০৬ থেকে ১৩২১ খ্রিস্টাব্দে। 

ডিভাইন কমেডির প্রথম অংশে, মুহাম্মদকে সা. দেখানো হয় নরকের অষ্টম বৃত্ত; ম্যালেবোলজে। এই বৃত্ত তৈরি হয়েছে তাদেরকে শাস্তি দেবার জন্য, যারা প্রতারণা করতেন। মহানবীকে আবার দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে নরকের নবম বৃত্তে; বলজিয়ায়। এ বৃত্ত তৈরি করা হয়েছে তাদের জন্য, যারা বিবাদ ও বিভেদ বপন করেছেন। দান্তের প্রতিহিংসা মহানবীকে নরকে কল্পনা করেই খুশি হতে পারেনি। ২৮ নম্বর ইনফার্নোতে তার কলম নির্মম, দুর্বিষহ ও গুরুতর শাস্তির বিবরণ দিয়েছে, মহানবীর জন্য যে শাস্তি বরাদ্দ রাখতে চায় তার মন। সেটা কেমন? ভাষায় প্রকাশের যোগ্য নয়। ক্ষত-বিক্ষত পাপী হিসেবে দেখানো হয়েছে, যাকে চিবুক থেকে ছেঁড়া হচ্ছে, গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোকে প্রদর্শন করা হচ্ছে, পাশে আছে বিষ্ঠাময় জঘন্য বস্তা, তিনি বাঁকানো এবং ভাঙা, হাত দিয়ে বুক টেনে বের করছেন... এর মধ্যে উৎসব করছে দান্তের কল্পনা। 

মহানবীর প্রতি দান্তের বিদ্বেষ ও ক্ষোভ মূলত ইসলামের কারণে। কেন তিনি যিশুর অনুসারী নন? কেন তিনি স্বতন্ত্র ধর্ম প্রবর্তন করলেন? কেন তিনি নবী ও রাসূল? দান্তের বিশ্বাস যেহেতু নবী হিসেবে মুহাম্মদ সা.-কে স্বীকার করে না, অতএব তিনি মিথ্যা নবী, বিবাদ ও বিভেদের জন্মদাতা! অতএব মহানবীকে সা. নরকে পোড়াতে হবে, টুকরো টুকরো করতে হবে প্রতিনিয়ত। এই মানসিকতার মধ্যে যে হিংসা ও হিংস্র চেহারা, তাকে পশ্চিমা জগৎ  প্রত্যাখ্যান করতে পেরেছে? ইনফার্নো ৪ এ দান্তে ইবনে সিনা, ইবনে রুশদ ও সালাহুদ্দীনের প্রশংসা করে নিজের চেহারাকে আড়াল করতে চাইলেও তা সম্ভব হয়নি। কারণ দান্তের কলম ক্রুসেডে নিয়োজিত ছিল। দান্তের সময়কালে অষ্টম এবং নবম ক্রুসেড ছিল চলমান। তার চারপাশে ছিল মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের উত্তেজনা। দান্তের বিশ্বাস ছিল এই উত্তেজনা যথার্থ, এ যুদ্ধ ন্যায়সঙ্গত। মুসলমানরা ছিলেন তার বিচারে সাধারণ শত্রু। ফলে মুসলিম হত্যায় নিয়োজিত ক্রুসেডারদের প্রশংসায় মুখর তার ইনফার্নো, ক্রুসেডারদের দেখানো হয় প্যারাডিসোতে, মঙ্গলের স্বর্গে।  

এই উত্তরাধিকারের ওপর দাঁড়ায় রেনেসাঁর ইসলামদৃষ্টি। তখন উসমানী সালতানাতের সাথে নানামুখী সংঘাতে কম্পমান ইউরোপ। ইসলাম তখনো শত্রুমতাদর্শ। মহানবী সা. তাই শত্রুতার কেন্দ্রে। প্রোটেস্ট্যান্টবাদের প্রতিষ্ঠাতা মার্টিন লুথার অনেক বই লেখেন। তুর্কিদের সমালোচনা করেন তিনি এবং তাদেরকে তাদের বিশ্বাস সম্পর্কে  উপদেশ দেন। Eine Heerespredigt wider den Türken শীর্ষক রচনায় তুর্কিদেরকে তিনি ‘শয়তানের উপাসক’ বলে আখ্যা দেন। তার মতে- তারা এমন অভিশাপ, যাদেরকে ঈশ্বর পাঠিয়েছেন পোপকে শাস্তি দেবার জন্য। লুথার তার বিভিন্ন রচনায় মুহাম্মদ সা.-কে তুর্কিদের নবী এবং কুরআনের লেখক হিসেবে অভিহিত করেন। আল-কুরআন সম্পর্কে পরবর্তীতে তার গভীর উপলব্ধি তৈরি হয় এবং মহানবী সা. এর প্রশ্নে শ্রদ্ধাকে উচ্চারণ ও  অবলম্বন করেন লুথার। এমনটি ঘটে ভলতেয়ারের (১৬৯৪-১৭৭৮) ক্ষেত্রেও।

রেনেসাঁকালে ভলতেয়ার লেখেন মিথ্যাসর্বস্ব নাটক Le fanatisme, ou Mahomet leProphete তথা  ধর্মান্ধতা কিংবা মাহোমেট দ্য প্রফেট। ১৭৩৬ সালে পাঁচ অঙ্কের এই  ট্র্যাজেডি ১৭৪১ সালের ২৫ এপ্রিল লিলিতে  প্রথম পরিবেশিত হয়। ভলতেয়ারের বক্তব্য- নাটকটি ‘লেখা হয়েছে এক ভণ্ড ও বর্বর সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতার বিরুদ্ধে। পুরো কাল্পনিক কাহিনীর ওপর তৈরি নাটকে দেখানো হয় মক্কা বিজয়ের আগে মাহোমেদের আদেশে হত্যা করা হয়  মুক্তমনা জপিরকে, ১৫ বছর আগে তার ছেলে সেয়িড ও মেয়ে পালমিরাকে অপহরণ করা হয়। মাহোমেট পালমিরার প্রতি আকৃষ্ট হন। তার আদেশে ধর্মান্ধ সেয়িড জপিরকে হত্যা করে। পরে ফেনর তাদের সব খুলে বলে। জপিরকে হত্যার দায়ে সেয়িড গ্রেফতার হয় আর পালমিরা আত্মহত্যা করে। একেবারে ভিত্তিহীন এই নাটকে ধৃষ্ট আক্রমণ ও মিথ্যার ঔদ্ধত্য ছিল, যার কঠোর সমালোচনা করেন নেপোলিয়ন বোনাপার্ট। একে অনেকেই রূপক অর্থে ব্যাখ্যা করতে চেয়েছেন। ফরাসি ইতিহাসবিদ পিয়ের মিলজা লিখেন- হতে পারে ভলতেয়ারের লক্ষ্যবস্তু ছিল ‘ক্যাথলিক চার্চের অসহিষ্ণুতা এবং যিশুর নামে অপরাধ’। কিন্তু ভলতেয়ার এই নাটককে নিবেদন করেন ক্যাথলিক পোপ চতুর্দশ বেনেডিক্টের প্রতি শ্রদ্ধাস্বরূপ। তিনি সরাসরি আক্রমণ করছেন ইসলামকে, ক্যাথলিক পুরোহিতের পদযুগল চুম্বনের সুযোগ চেয়েছেন এর মাধ্যমে। ১৭৫৪ এর ১৭ আগস্ট পোপের প্রতি লেখা পত্রে ভলতেয়ারের ঘৃণ্য ও ঘৃণাভাষ্য- ‘ইয়োর হলিনেস, এক ভণ্ড ও বর্বর সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতার বিরুদ্ধে লিখিত এই কীর্তি সত্য ধর্মের প্রধানের কাছে সমর্পণের প্রগলভতার জন্য বিশ্বাসীদের মধ্যে এই অধম, সত্যের উপাসককে ক্ষমা করবেন। ন্যায় ও করুণার ধারক ঈশ্বরের প্রতিনিধি পোপ ব্যতীত কাকে আমি উৎসর্গ করতে পারতাম এক মিথ্যা নবীর নিষ্ঠুরতা এবং স্খলন নিয়ে এই প্রহসন? ইয়োর হলিনেস, তাই আমায় অনুমতি দিন আপনার চরণে এই গ্রন্থ এবং গ্রন্থাকারকে স্থান দিতে, বিনীতভাবে একটির সংরক্ষণ এবং অপরটির জন্য আশীর্বাদ কামনা করে, যার আশায় প্রগাঢ় শ্রদ্ধার সাথে আপনার পবিত্র পদযুগল চুম্বন করি।’ 

প্রাচ্যতাত্ত্বিকগণ এরকম নানাভাবেই মহানবী মুহাম¥াদ সা. এর বিচারে অবিচারের ধারা বইয়ে দিয়েছিল। তাদের নিষ্ঠুর অবিচারের প্রমাণে অমরা অজস্র প্রমাণ হাজির করতে পারি। তাদের এহেন নিষ্ঠুর অবিচারের ধারা আজো চলমান।

লেখক : কবি, দার্শনিক ও আলিমে দ্বীন

আপনার মন্তব্য লিখুন

কপিরাইট © বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির