সর্বশেষঃ
post

মে দিবস : শ্রমিকের অধিকার

মু. এনামুল হক

২৪ এপ্রিল ২০২২

নিজের সত্তার কথা চিন্তা না করে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে রক্তকে পানিতে পরিণত করে যারা জীবনের বাঁকে শ্রমের তরীর মাঝি হিসেবে তরীকে তার গন্তব্য নিয়ে যেতে অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন আজ সেই সকল মেহনতি মানুষের প্রতীক মে দিবস আমাদের সামনে উপস্থিত। সারাবিশ্বে প্রতি বছর যথাযথ মর্যাদা ও গুরুত্বের সাথে উদযাপিত হয়ে আসছে মে দিবস। পৃথিবীর কোটি কোটি শ্রমিক জনগোষ্ঠীর কাছে এ দিনটি একদিকে যেমন খুবই তাৎপর্যময় ও গুরুত্বপূর্ণ তেমনি অনেক বেশি আবেগ ও প্রেরণার। ১৮৮৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে শ্রমের ন্যায্য দাবি প্রতিষ্ঠিত করার আন্দোলনে আত্মাহুতি দান করেছিলেন শ্রমিকরা। তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ১৮৯০ সাল থেকে এই দিবসটি বিশ্বব্যাপী পালিত হয়ে আসছে। আমাদের দেশেও বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হয়।

সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা শ্রম দিয়েও শ্রমিকরা উপযুক্ত মজুরি পেত না। শ্রমিকরা এক প্রকার মানবেতর জীবন যাপন করত, দীর্ঘ সময় পরিশ্রম করার পরও তাদের নিয়মিত চাহিদা পূরণ হতো না। মালিক শ্রেণি নগণ্য পারিশ্রমিকের বিনিময়ে দরিদ্র মানুষের শ্রম কিনে নিতেন। মালিকরা তাদের অধীনস্থ শ্রমিকদের দাস-দাসীর মতো মনে করতেন। আর সুযোগ পেলেই মালিকরা শ্রমিকের উপর চালাতেন নানা শারীরিক ও মানসিক নিপীড়ন। একের পর এক লাঞ্ছনা বঞ্চনা নির্যাতনে যখন শ্রমিক সমাজের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেল তখন অধিকার আদায়ে ১৮৬০ সালে প্রথম রাস্তায় নামে শ্রমিক সমাজ। কিন্তু কোনো শ্রমিক সংগঠন ছিল না বলেই তখন দাবি জোরালো করা সম্ভব হয়নি। ১৮৮১ সালে শ্রমিকদের দাবি আদায়ের লক্ষ্যে আমেরিকা ও কানাডার গঠিত হয় দুটি শ্রমিক সংগঠন। এই দুটি সংগঠন বিভিন্নভাবে শ্রমিকদের ন্যায্য দাবিগুলো তুলে ধরে। আমেরিকা ফেডারেশন অব লেবার ১৮৮৪ সালের ৭ অক্টোবর প্রথমবারের মতো প্রতিদিন ৮ ঘণ্টা কাজের দাবি তুলেন। তবে এতে তেমন কোনো কাজ হলো না। মালিকপক্ষ শ্রমিকদের দাবি তো মানলই না, বরং তারা শক্ত অবস্থান নিলো। ফলে দীর্ঘদিনের শ্রমিকদের মনের ক্ষোভ বিস্ফোরণের আকার ধারণ করল। আর সেটা ঘটল আজকের তথাকথিত মানবাধিকার ও সভ্যতার অহঙ্কারী দেশ আমেরিকার শিকাগো শহরের হে মার্কেটে। কাজের সময় ৮ ঘণ্টা নির্ধারণ, মজুরির পরিমাণ বৃদ্ধি ও কাজের উন্নত পরিবেশ তৈরি করাসহ শ্রমজীবী মানুষের ন্যায্য অধিকার আদায়ে ১৮৮৬ সালের পহেলা মে, হে মার্কেটের শিল্পশ্রমিকরা ধর্মঘটের ডাক দিলে দাবি আদায়ে লক্ষ লক্ষ শ্রমিক কলকারখানায় বন্ধ রেখে রাজপথে নেমে আসে। কিন্তু শিল্প-কারখানা ও মালিকগণ দাবি না মানায় যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে হে মার্কেট চত্বরে ৪ মে সমাবেশে মিলিত হন শ্রমিকরা। সমাবেশে শ্রমিক নেতা আগস্ট স্পিজ বক্তব্য দানকালে মালিকপক্ষের সন্ত্রাসীরা সমাবেশস্থলে বোমা বিস্ফোরণ করলে ঘটনাস্থলে একজন পুলিশ সদস্য নিহত হয়। পুলিশ বাহিনী প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে শ্রমিকদের উপর হামলা শুরু করে এতে ১১ জন শ্রমিক নিহত হয়। এদিকে পুলিশ সদস্য হত্যার অভিযোগে শ্রমিক নেতা আগস্ট স্পিজসহ ৮ জনকে অভিযুক্ত করা হয়। বিচারের নামে প্রহসন করে এ ৮ জনের বিরুদ্ধে ফাঁসির রায় দেয়া হয়। ১৮৮৭ সালের ১১ নভেম্বর প্রকাশ্য জনসম্মুখে ৬ জনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। ফাঁসি কার্যকরের আগের দিন কারাগারে একজন আত্মহত্যা করে। অন্য একজনের ১৫ বছরের কারাদণ্ড হয়।

এতো কিছুর পরও শ্রমিক আন্দোলন দাবিয়ে রাখা যায়নি। বরং সারা দুনিয়ায় শিকাগোর রক্তাক্ত ঘটনার উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান ও ও কলকারখানায় ৮ ঘণ্টা কাজের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। শ্রমজীবী মানুষের আন্দোলনের ফসল হিসেবে দৈনিক ৮ ঘণ্টা কাজ করার দাবি অফিসিয়াল স্বীকৃতি পায়। ১৮৮৯ সালে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে মে দিবসকে আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন দেশে পালন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। ফলে ১৮৯০ সাল থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পহেলা মে দিবসটি পালন হয়ে আসছে। রাশিয়াসহ আরো কয়েকটি দেশে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সংঘটিত হবার পর মে দিবসের গুরুত্ব বেড়ে যায়। রাশিয়ায় প্রথম ১৮৯৬ সালে, চিনে ১৯২৪ সালে ও ভারতবর্ষে ১৯২১ সালে মে দিবস পালিত হয়। জাতিসংঘের একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক শাখা হিসেবে ১৯১৯ সালে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা বা (আইএলও) প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে শ্রমিকদের অধিকার স্বীকৃতি লাভ করে।

বাংলাদেশ (আইএলও) নীতিমালা স্বাক্ষরকারী দেশ। ১৮৭২ সাল থেকে বাংলাদেশে বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনার মাধ্যমে মে দিবস পালিত হয়। বাংলাদেশে মে দিবসে সরকারি ছুটি কার্যকর আছে। প্রতি বছর মে দিবস উদযাপনের মধ্য দিয়ে শ্রমিকরা একদিকে যেমন তাদের অধিকার আদায়ে রক্তাক্ত ইতিহাসকে স্মরণ করে যেমন স্বপ্ন দেখে তাদের ষোলআনা অধিকার প্রাপ্তির। বাংলাদেশের শ্রমিকরাও নিঃসন্দেহে এর বাইরে নয়। কিন্তু আজও বাংলাদেশের শ্রমিকদের সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন হয়নি। আমাদের দেশের শ্রমিকেরা বিভিন্ন সেক্টরে তাদের শ্রম দিয়ে দেশকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিচ্ছেন। শুধু দেশেই নয় দেশের বাইরে বিশাল সংখ্যক প্রবাসী শ্রমিক জনগোষ্ঠী অর্থ উপার্জনের মাধ্যমে দেশে অর্থ পাঠিয়ে দেশকে সমৃদ্ধ করছেন। দেশের রেমিট্যান্স বৃদ্ধিতে ভূমিকা পালনকারী প্রবাসী শ্রমিকেরা ভিটেমাটি বিক্রি করে সর্বস্ব দিয়ে জীবন জীবিকার সন্ধানে ভাগ্যোন্নয়নে প্রবাসে পাড়ি জমাতে গিয়ে অনেক সময় দালালের খপ্পরে পড়ে যখন বিদেশী দূতাবাসে আশ্রয় গ্রহণ করেন তখন তাদেরকে প্রয়োজনীয় তেমন কোনো সহযোগিতা করা হয় না। আমাদের দেশে বর্তমানে শিশুশ্রমের ব্যাপক ব্যবহার চলছে। ঘরে ঝিয়ের কাজ থেকে শুরু করে রিরোলিং ও ইস্পাত কারখানার মতো মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করানো হচ্ছে শিশুদের দিয়ে। আর এসব শিশু শ্রমিকেরা নানাভাবে বিভিন্ন সময় মালিক শ্রেণি ধারা নির্যাতিত হয়। বাংলাদেশে শতকরা ৮০ ভাগ কৃষকের বসবাস হলেও কৃষকের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়নি। দেশের রফতানি আয়ের এর ৭০% আয় হয় যে তৈরি পোশাক শিল্পে অথচ গুরুত্বপূর্ণ এ শিল্পের শ্রমিকদের মানবেতর জীবন যাপন করতে হয়। মালিক শ্রেণির শোষণের ফলে অসহায়ের মতো গার্মেন্ট শ্রমিকদের জীবন দিতে হয় বিভিন্ন সময়।

২০১৩ সালে সাভারের রানা প্লাজার স্মরণকালের ভয়াবহ ভবনধস, ২০১২ সালে আশুলিয়ায় তাজরীন ফ্যাশন গার্মেন্টসে আগুন, ২০১০ সালে হামিম গার্মেন্টসহ তিনটি গার্মেন্টসে হাজার হাজার শ্রমিকের প্রাণ যায়। এসব ঘটনাগুলো শুধুমাত্র মালিক শ্রেণির গাফিলতির কারণে ঘটেছে। শত শত বছর সংগ্রাম করার পরও শ্রমিকরা আজও তাদের ন্যায্য বেতন পাচ্ছে না। শ্রমিকরা ৮ ঘণ্টা কর্মদিবসের জন্য যে আত্মত্যাগ করেছিল আজও তা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এখনও বাংলাদেশের গার্মেন্টসসহ অনেক প্রতিষ্ঠানে ১২ ঘণ্টা কাজ করানো হয়। শ্রমিকদের কাজের ক্ষেত্রগুলো নিরাপদ নয়, মৃত্যুর ঝুঁকি মাথায় নিয়ে শুধুমাত্র পেটের দায়ে শ্রমিকদের কাজ করতে হয়। বাংলাদেশ লেবার ফোর্স সার্ভে অনুযায়ী দেশের মোট শ্রমিক সংখ্যা ৫ কোটির কাছাকাছি। বাংলাদেশের এই বিশাল সংখ্যক শ্রমিকের ভাগ্যোন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রতি বছরই আমাদের দেশে মে দিবস পালিত হলেও এদেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধিতে যারা সবচেয়ে বড় অংশীদার তাদের অধিকারের কথাগুলো সরকার থেকে শুরু করে আমরা সবাই ভুলে যাই। ফলে মে দিবস আসে মে দিবস চলে যায় কিন্তু শ্রমিকদের ভাগ্যের উন্নয়ন হয় না। একজন মানুষের জীবন ধারণের জন্য যা যা প্রয়োজন, অর্থাৎ অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা এসবই একজন শ্রমিকের প্রাপ্য।

মহান মে দিবসের গুরুত্ব¡ ও তাৎপর্য অনুধাবন করে শ্রমজীবী মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন প্রশাসন ও মালিক শ্রেণিকে অনেক বেশি আন্তরিক হতে হবে। মে দিবস পৃথিবীতে বঞ্চনা ও শোষণ থেকে শ্রমজীবী মানুষের মুক্তির বার্তা নিয়ে এসেছে তা তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে যখন শ্রমিক শ্রেণি তাদের মৌলিক অধিকার ফিরে পাবে। মালিকদের উপলব্ধি করতে হবে শ্রমিকদের ঠকিয়ে শিল্পের বিকাশ বা মুনাফা অর্জন করা যাবে না। শ্রমিকরা দেশের সম্পদ, তাদের কারণে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রয়েছে। এ কারণে তাদের অবহেলার চোখে দেখার কোনো সুযোগ নেই। আইনের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে তাদের কাজের ও জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও গবেষক

আপনার মন্তব্য লিখুন

কপিরাইট © বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির