post

সুন্দর ক্যারিয়ার গঠনের উপাদান

নূরুল ইসলাম

১৪ এপ্রিল ২০২৩

বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন বা পরিচিত কারো ভালো রেজাল্ট বা ভালো একটা চাকরির খবর শুনলেই মনে হয় আগামীকাল থেকে কোমর বেঁধে পড়ালেখায় নেমে পড়বো। টেবিলের সামনে জমপেশ একটা রুটিন রাখবো। সময়কে শতভাগ কাজে লাগাবো। অমুক এত ভালো করলে আমি কেন পারবো না! আমাকে পারতেই হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্য হলো আগামীকালটা আমাদের অনেকের জীবনে আসতেই যেন চায় না। হ্যাঁ, তবে উপলব্ধিটা যখন আসে, তখন পাছে অনেক সময় অতিবাহিত হয়ে যায়। এজন্য বলা হয় সময়ের এক ফোঁড় আর অসময়ের দশ ফোঁড়। তাই সময় থাকতে ছাত্রজীবনে সময়গুলোকে গুছিয়ে কাজে লাগানো জরুরি। আজকে আমরা এ বিষয়টি নিয়েই আলোচনা করবো, ইনশাআল্লাহ।

ক্যারিয়ার আসলে কী?

প্রথমত, সুন্দর ক্যারিয়ার বলতে আমরা আসলে কী বুঝি, সেটা ঠিক করা জরুরি। কারো কাছে সুন্দর ক্যারিয়ার বলতে বুঝায় অনেক টাকা-পয়সার মালিক হওয়া, গাড়ি-বাড়ি আর আয়েশি জীবন যাপন করা। আবার কারো কাছে ক্যারিয়ার বলতে বুঝায় সাফল্যের সর্বোচ্চ শেখরে আরোহন করা। সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে ক্যারিয়ার অনেকটা আপেক্ষিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমার মতে, সুন্দর ক্যারিয়ার বলতে বুঝায় নিজের দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে যাওয়া। তবে এই ক্যারিয়ার হতে হবে মানবতা এবং মুসলিম উম্মাহের কল্যাণে। কোনোভাবেই টাকা উপার্জনের হাতিয়ার হিসেবে নয়। আর যেকোনো মূল্যে কেবলই অর্থ-উপার্জন বা দুনিয়ার সমৃদ্ধির জন্যে যে ক্যারিয়ার, তা তো মুমিন জীবনের জন্য জায়েজই নেই। এখন আলোচনা করবো সুন্দর ক্যারিয়ারের জন্য করনীয় বিষয়সমূহ নিয়ে। ভালো একটি ক্যারিয়ার গঠনের জন্য আমাদের যা করণীয়-

জীবনের স্থির লক্ষ্য নির্ধারণ

সময়ের সঠিক ব্যবস্থাপনা

আত্মবিশ্বাসী ও কর্মঠ হওয়া

শেখার আগ্রহ ও বিনয়ী হওয়া

জীবনের স্থির লক্ষ্য নির্ধারণ 

সাধারণত দরিদ্র বা মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানেরা অনেক ক্ষেত্রে তদারকির অভাবে জীবনের লক্ষ্য স্থির করতে পারে না। আবার আমি দেখেছি কলেজ বা মাদ্রাসায় পড়ুয়া অনেক শিক্ষার্থী রয়েছে, যারা তাদের জীবনের লক্ষ্য স্থির করতে করতে অনার্স অনেক ক্ষেত্রে মাস্টার্সও শেষ করে ফেলে। বর্তমান বিশ্ব-ব্যবস্থাপনা বা বাংলাদেশের চাকরির বাজার সম্পর্কে তাদের কোনো ধারনাই জন্মায় না, অথবা তারা তাদের বোধের মধ্যে তা জাগ্রতও করতে পাওে না। ফলে ছাত্র বয়সে অবহেলা আর অবজ্ঞায় জীবনের সেই হীরকখণ্ডসম সময়কে কাজে লাগাতে পারে না। যার কারণে জীবনে নিষ্ঠুর সময় বয়ে চলে আর নিজে পতিত হয় অনেক বড় এক অন্ধ কুয়ায়। তাই প্রত্যেকের জীবনেই একটি লক্ষ্য স্থির হওয়া উচিত। তবে সে লক্ষ্য অবশ্যই কচু পাতার উপর থাকা পানির মত হবে না। আবার সকাল-বিকেল তা চোখের পলকে পরিবর্তনও হবেনা। আর মনে এটি বদ্ধমূল করে নিতে হবে যে, লক্ষ্যে পৌছানোর জন্য অবশ্যই কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। এবং অন্য অনেকের সফলতায় ঈর্ষান্বিত হয়ে নিজের জীবনের লক্ষ্যটাকে ক্ষণে ক্ষণে পরিবর্তন করাটা কখনোই বুদ্ধিমানের কাজ নয়। জীবনের লক্ষ্য যাই হোক না কেন, সেখানেই সফলতা পাওয়া সম্ভব। জীবনে দক্ষতা অর্জন করাকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া উচিত, অর্থ উপার্জনকে নয়। জীবনে মানবতাবোধ আর হালাল রুজিকেই প্রাধান্য দিতে হবে। তা না হলে জীবনের লক্ষ্য আমাকে পুঁজিবাতার দিকেই নিয়ে যাবে। জীবনের টার্গেট নির্ধারনের ক্ষেত্রে আমাদেরকে কিছু বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে। সেগুলো হচ্ছে :

নিজের ঝোঁক প্রবণতা ও দক্ষতা

পারিবারিক সক্ষমতা ও পারিপার্শি¦ক অবস্থা

বর্তমান সময়ের চাহিদা


সময় ব্যবস্থাপনা

ছাত্রসমাজের বর্তমান সময়ে বড় ধরনের সমস্যা হলো সময় অব্যবস্থাপনা ও অপব্যবহার। অনেককে পাওয়া যাবে যারা ডিভাইসে আসক্ত হয়ে দিব্বি মূল্যবান সময়গুলোকে কুরবান করে দিচ্ছে। আবার অনেকে নিজেদের জীবনের লক্ষ্য স্থির করতে না পারার কারনে লক্ষ্যহীনভাবে সময় পার করছেন। আবার অন্য একটা বড় অংশ ছাত্রদের ক্ষেত্রে সময় নষ্ট হয় ঘুমিয়ে। সকালে ফজর নামাজের পরে দ্বিতীয়বার ঘুম এবং দুপুরে খাওয়ার পরে কিছুক্ষণ বিশ্রাম করার নাম দিয়ে তৃতীয়বার ঘুম। অনেকেই ভেবে থাকেন সময়টি তাদের নিজস্ব সম্পদ (Personal Property)। প্রকৃতপক্ষে সময় আমাদের জন্য আমানত। সময় আল্লাহ রাব্বুল আ’লামিন আমাদেরকে দিয়েছেন পরীক্ষা গ্রহণের জন্যে। 


কীভাবে একটি সুন্দর রুটিন করবো?

অগোছালো সময় ব্যয় করার মতো বদ অভ্যাস আমাদের অনেকেরই রয়েছে। সময়কে যে পরিকল্পিত কাজে লাগাতে পারে, সে মূলত জীবনের প্রকৃত নিয়ামত ভোগ করতে পারে। নিজ কর্মগুণে যারা পৃথিবীতে অমর হয়ে আছেন তারা মূলত সময়কে নিজেদের অনুকূলে নিতে সক্ষম হয়েছিলেন। আসুন এবার জেনে নিই কীভাবে  একটি সুন্দর রুটিন করা সম্ভব। 

- আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে ৫ ওয়াক্ত নামাজের সাথে মিলিয়ে রুটিন করতে পারি। মহান আল্লাহ তাআলার বিধানের সাথে মানব দেহের অনবদ্য মিলন রয়েছে। আমরা যদি রাতে ইশার নামাজের পর খাদ্য গ্রহণ করে খুব দ্রুত ঘুমাতে পারি, তাহলে প্রকৃতি প্রদত্ত পুরো সময়টিই আমরা কাজে লাগাতে পারবো। কেননা আল্লাহ বলেছেন- “আর তোমাদের নিদ্রাকে বানাইনি তোমাদের জন্য বিশ্রাম? এবং রাতকে কি বানাইনি আবরণ? আর দিনকে কি বানাইনি তোমাদের জীবন সামগ্রী উপার্জনের সময়?” (সূরা নাবা : আয়াত ৯-১১)।

- খুব ভোরেই আমরা ঘুম থেকে উঠে পরবো। ফজরের আযানের আরো কিছু সময় পূর্বে যদি ঘুম থেকে উঠার অভ্যাস করি তাহলে তা আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য খুবই উপকার বয়ে আনবে। প্রফুল্ল আর নিবিষ্ট মনে মহান রবের প্রতি বিনয় প্রদর্শন করে আমরা নেয়ামতপূর্ন দিনটি শুরু করতে পারবো। 

- সকালে ফজরের পর ঘুমের অভ্যাস পরিত্যাগ করতে পারলে অনেক শারীরিক রোগ থেকে আমরা মুক্ত থাকতে পারবো (যেমন : গ্যাস্ট্রিক, আলসার, ডায়াবেটিক্স, হার্টের সমস্যা ইত্যাদি)। সকালে সামান্য শারীরিক ব্যায়াম করে দিনের রুটিন অনুযায়ী কাজ শুরু করবো।  

- আমাকে পূর্বেই নির্ধারণ করতে হবে যে, আমি দিনের কোন সময়টি কী কাজে ব্যয় করবো। সময় কোনোভাবেই যাতে অপব্যায় নায় হয় সে ব্যাপারে কড়া দৃষ্টি রাখতে হবে।


যেসকল বিষয় সময় ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বাঁধার সৃষ্টি করে

মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার। এর সাথে রসদায়ক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসমূহ আমাদের আরো অসামাজিক যান্ত্রিক-জীবে পরিণত করেছে। ফেসবুককে আমি বলি Time Killing Machine। এটির ফাঁদে পড়ে মুসলিম যুবকদের অত্যন্ত মূল্যবান সময়গুলো হারিয়ে যাচ্ছে। যারা প্রচুর পরিমাণে মোবাইল আসক্ত তারা এটিকে নিয়ন্ত্রণ করতে শিখুন। কিছু শক্ত সিদ্ধান্ত নিন। ফেসবুক বা ইউটিউব মোবাইল থেকে আন আনসটল করুন। একান্ত ব্যবহার করতে হলে কম্পিউটারে ব্যবহার করুন অনেক সময় বেঁচে যাবে।

জীবনের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য স্থির না থাকা। অথবা থাকলেও সে লক্ষ্য অর্জনে কী পরিমাণ পরিশ্রম আমাকে দিতে হবে সে ব্যাপারে ধারনার অভাব।

অলসতা বা আরামপ্রিয়তা


সময়কে সঠিকভাবে ব্যবহার করার ক্ষেত্রে কিছু পরামর্শ

১. আপনার সময় কীভাবে  নষ্ট হচ্ছে, প্রতিদিন তার একটা তালিকা তৈরি করুন।

২. সাধারণভাবে অব্যবহৃত এই সময়গুলোকে কাজে লাগানোর জন্যে একটা সুন্দর পরিকল্পনা গ্রহণ করুন। 

৩. আপনার ধারে-কাছে সব সময়েই কিছু না কিছু পাঠ্য-সামগ্রী রাখুন, যাতে করে সুযোগ পেলেই সেগুলোকে বের করতে পারেন এ ধরনের সময়কে কাজে লাগানোর জন্যে।

আপনার কাছে যদি সব সময়ই কিছু পাঠ্য-সামগ্রী রাখেন, তখন আপনি ভাবতেও পারবেন না এটি আপনাকে কী পরিমাণ সাহায্য করতে পারে! মনে করুন কোনো এক সময় আপনি কোনো এক স্থানে কারো জন্যে অপেক্ষা করছেন, অথবা কোনো মিটিংয়ে যোগদানের জন্যে আপনি সময় মত পৌঁছে গিয়েছেন অথচ মিটিং শুরু হচ্ছে না অন্যরা আসেনি বলে; সচরাচর আমরা সে সময়গুলোতে কী করি? অযথা বসে থাকি, অথবা মোবাইল স্ক্রলিং করে থাকি। কিন্তু আপনার কাছে যদি সে সময় বইপত্র থাকে, তাহলে সে সময় আপনি অযথা বসে না থেকে বা মোবাইল স্ক্রলিং না করে আপনি আপনার ব্যাগ থেকে বই বের করে পড়তে শুরু করে দিতে পারবেন। এর ফলে আপনার সে সময়গুলো অত্যধিক মূল্যবান হয়ে উঠবে, যে সময়গুলো আপনি হয়তো হেলায় হারিয়ে ফেলতেন। এর পাশাপাশি আরেকটা বিষয়ও কি আপনি কখনও ভেবে দেখেছেন; আপনার এই কাজ আপনার অধস্তনদের ওপর কেমন এবং কী ধরনের  প্রভাব ফেলতে পারে?

কল্পনা করুন তো দেখি এমন একটা সময়ের কথা, যখন আপনি একটা ট্রেনে বা লঞ্চে অন্য যাত্রীদের সাথে দূরের কোনো গন্তব্য স্থানে যাচ্ছেন। আপনারা কয়েকজন মিলে গল্প করেছেন, কেউ ঝিমাচ্ছেন, আর অন্য একজন ব্যক্তি বই পড়ছেন। তাহলে কার প্রতি আপনার শ্রদ্ধাবোধ বেশি হবে? এই শ্রদ্ধাবোধের খুবই প্রয়োজন বর্তমান এ সমাজের জন্য। আর একটি ঘটনা বলছি। যখন আপনি আপনার অফিসে যাওয়ার পথে অফিসের গাড়ির জন্যে অপেক্ষা করছেন কোথাও, আপনি দাঁড়িয়ে আছেন অথচ আপনার হাতে একটি পাঠ্যসামগ্রী। খুবই ভালো হয় এটি যদি ছোট আকারের কুরআনের কপি হয়। আপনি হয়তো ভাবছেন একা একা দাঁড়িয়ে আছেন সেখানে; অথচ প্রকৃতপক্ষে আপনার পাশে কয়েকজন ফেরেশতাও রয়েছেন যাদের রিপোর্ট অনুযায়ী আপনি ইতোমধ্যে বেশ কিছু সওয়াবের ভাগী হয়ে যেতে পেরেছেন। আমাদের জীবনটাতো এমনই। এভাবে প্রচুর সুযোগ রয়েছে সওয়াব অর্জনের; পক্ষান্তরে এখানে সম্ভাবনাও রয়েছে বিপুলভাবে এই সুযোগসমূহের সদ্ব্যবহার না করার কারণে গুনাহের ভাগিদার হওয়ার। অতএব সময় হচ্ছে সুযোগ। আর তা শেষ হওয়ার পরে মানুষের অবস্থা কেমন হবে সে সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে ব্যক্ত হয়েছে-

“প্রত্যেক ব্যক্তির নির্ধারিত সময় যখন উপস্থিত হবে তখন আল্লাহ কাউকে অবকাশ দেবেন না। তোমরা যা কর, আল্লাহ সে বিষয়ে খবর রাখেন।” (সূরা মুনাফিক : ১১)

“সেখানে তারা আর্তচিৎকার করে বলবে, হে আমাদের রব বের করুন আমাদেরকে। আমরা সৎ কাজ করব। পূর্বে যা করতাম তা করব না, তা করব না। (আল্লাহ বলেন) আমি কি তোমাদেরকে এতোটা বয়স দেইনি, যাতে যা চিন্তা করার বিষয় চিন্তা করতে পারতে? উপরন্তু তোমাদের কাছে সতর্ককারীও আগমন করেছিল। অতএব আস্বাদন কর। জালেমদের জন্য কোন সাহায্যকারী নাই।” (সূরা ফাতির : ৩)

জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান কিন্তু অনিশ্চিত বস্তুটি হচ্ছে “সময়”

হয়ত আপনারা এ কথাটি জানেন, “কোনটি ওই জিনিস, যা সবচেয়ে বেশি দীর্ঘস্থায়ী যদিও তা সবচেয়ে বেশি ক্ষণস্থায়ী, সবচেয়ে বেশি দ্রুতগামী যদিও তা সবচেয়ে বেশি শ্লথ? আমরা সকলেই তাকে অবজ্ঞা করি যদিও পরে সকলেই আবার অনুশোচনা করি। একে ছাড়া কিছুই করা যায় না, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সবকিছুকে এটা গ্রাস করে নেয়, অথচ যা কিছু মহৎ এবং বড় তা সে তৈরি করে।” কে সে? সে হচ্ছে সময়। এটি সবচেয়ে বড়, কারণ সময়ের যাত্রা এবং লয় সম্পর্কে কোনো কিছুই আমাদের জানা নেই। পক্ষান্তরে এই বাস্তব জীবনের সমস্ত বস্তু বা পরিমাপযোগ্য সবকিছুর একটা সীমা দৃশ্যমান বা কল্পনার মধ্যে সীমাবদ্ধ। এটি সবচেয়ে বেশি ক্ষণস্থায়ী, কেননা আমাদের জীবনের সকল কাজ সম্পন্ন করার জন্যে প্রয়োজনের তুলনায় প্রদত্ত সময় নিতান্তই অল্প। সময় দ্রুতগামী তাদের কাছে, যারা সুখের সাগরে ভাসছে। আর পক্ষান্তরে মৃত্যু যন্ত্রণা নিয়ে যে সময় গুনছে তার দৃষ্টিতে তো ২/৩ মিনিট সময়ও অবশ্যই শ্লথ-ই হবে। সে কারণেই তো মূল্যবান কোনো পরীক্ষা শুরু হওয়ার আগে প্রতিবারই ছাত্র-ছাত্রীরা অনুশোচনা করে থাকে তাদেও সময় অপচয়ের জন্য। পরে অনুশোচনার কথা ভুলে গিয়ে আবার সেই অপচয়ই করতে থাকে। পৃথিবীতে সময়ের ব্যবহার ছাড়া করা যায় এমন কি কোন কাজ আছে? আর এই সময়ই তো গিলে খেয়েছে অতীতের কত বিশাল সংখ্যক মানব-গোষ্ঠীকে, বিগত হয়েছে তারা সকলে খালি হাতে, সঙ্গত কারণেই ইতিহাস তাদেরকে গ্রহণ করেনি। করেছে মাত্র অল্প কিছু মহামানবকে। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই আমরা ১৪ ঘণ্টার একটি পূর্ণাঙ্গ দিন পাই। রাসূলে করীম (সা) বলেছেন- “দুজন ফেরেশতার নিম্নরূপ আহবান ব্যতীত একটি প্রভাতও আসে না- “হে আদম সন্তান! আমি একটি নতুন দিন এবং আমি তোমার কাজের সাক্ষী! সুতরাং আমার সর্বোত্তম ব্যবহার কর। শেষ বিচার দিনের আগে আমি আর কখনও ফিরে আসব না।”


সময় বলতে আমরা কী বুঝি?

 সময়ের মূলত দু’টি ধারণা রয়েছে। তা হলো-

১. সময় বলতে বুঝায় শুধুমাত্র সেকেন্ড, মিনিট, ঘণ্টা, মাস আর বছরের মাপকাঠি। এ ধারণা পোষণকারীদের সময়ের চিন্তা মাথায় আসতেই তারা তাকায় ঘড়ির কাঁটা বা ক্যালেন্ডারের পাতার দিকে। কার্যত এরূপ ধারণা পোষণকারীদের কারো দ্বারাই শ্রেষ্ঠ কিছু সৃষ্টি হয়নি। এ ধারণা যেকোনো উদ্যোগ গ্রহণকে ধ্বংস করে দেয়, সৃজনশীল অনুভূতিকে নিরুৎসাহিত করে এবং প্রাপ্ত সময় ব্যয়ের জন্য কোনো তাগিদ দেয় না। কোনো কাজ করার জন্য এক সপ্তাহ সময় দেয়া হলে এতে এক সপ্তাহ লাগবে, দশদিন সময় দিলে দশদিনই ব্যয় হবে।

২. সময় হচ্ছে ‘সুযোগ’। এই সুযোগ সব সময় একই নয়। যখন সে তার সর্বোচ্চ মানে অবস্থান করে তখনই সে সর্বাপেক্ষা গুরুত্ব¡ বহন করে থাকে। যারা সময়ের এই গুরুত্ব¡ অনুধাবন করতে পারেন তারা জীবনের সমস্যা সমূহকে অনেকাংশে সহজীকরণ করে নেন, ফলশ্রুতিতে আগ্রহ ও আত্মত্যাগের এক মহান স্পৃহা দ্বারা তাদের কার্যসম্পাদন নিয়ন্ত্রিত হয়। আর এর ফলশ্রুতিতে সমূহ সম্ভাবনার দ্বার তাদের জন্যই উন্মোচিত হয়ে থাকে।

সময়কে কাজে লাগানোর পদ্ধতি

১. প্রতিদিন সকালে উক্ত দিনের কাজের একটি রুটিন করে ফেলুন

২. মোবাইলে বা অন্য কোনোভাবে না জানিয়ে কারো সাথে দেখা করতে যাবেন না।

৩. কাগজ-কলম সব সময় পকেটে রাখুন, যাতে অবসর সময়ে আপনার চিন্তা বা পরিকল্পনা লিখে নিতে পারেন।

৪. বিশ্রামের সময়কে নামাজের সময়ের সাথে মিলিয়ে পরিকল্পনা করুন।

৫. লেখাপড়া করে, কোনো কিছু মুখস্থ করে বা গঠনমূলক কিছু করে অবসর সময়ের সদ্ব্যবহার করুন।

৬. দূরে যাওয়ার সময়ে সম্ভাব্য সময়ের চেয়ে বেশি সময় হাতে রাখবেন যাতে অভাবিত কিছু ঘটলেও যেন সময়মতো সেখানে যেয়ে পৌঁছাতে পারেন। আর বাড়তি সময়ে সম্পন্ন করার জন্য হাতে কিছু কাজও নিয়ে নিন।

৭. প্রবন্ধ লেখা, বা বক্তৃতা প্রস্তুত করা বা এ ধরনের যে কোনো কাজ করার সময় প্রয়োজনীয় সকল উপাদান হাতের কাছে নিয়ে কাজ শুরু করুন।

৮. আপনার সময়ক্ষেপণ করতে পারে এমন চিন্তাশূন্য লোক এড়িয়ে চলবেন। তবে এ ব্যাপারে অবশ্যই সতর্কতা অবলম্বন করবেন যেন লোকটি আবার আপনার আচরণে কষ্ট না পায়।

৯. ফোনে সেরে নেওয়া যায় এমন কোনো কাজের জন্য নিজে ব্যক্তিগতভাবে যাবেন না। এভাবে আপনার যাওয়া-আসার সময়কে বাঁচাতে পারবেন।

কোনো কাজ আগামীকালের জন্য ফেলে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। একজন বিখ্যাত কবির উক্তি কোড করছি-


If you have hard work to do,

Do it now.

Today the skies are clear and blue, 

Tomorrow clouds may come in view,

Yesterday is not for you:

Do it now.

-Anon

আত্মবিশ্বাসী ও কর্মঠ হওয়া 

আত্মবিশ্বাস একজন মানুষের সবচেয়ে বড় পুঁজি। আত্মবিশ্বাসী মানুষেরাই জীবনকে উপভোগ করতে পারে। শত প্রতিকূলতাকে তারা চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করে থাকে। ফলে কোনো না কোনো স্তরে গিয়ে অবশ্যই তারা সফল হবে। মনে রাখতে হবে যা মানুষের পক্ষে করা সম্ভব তা আমার পক্ষেও সম্ভব। আত্মবিশ্বাসের ফলেই নেপোলিয়ন হয়ে ওঠেছিলেন তার সময়ের শ্রেষ্ঠ সেনাপতি। মোহাম্মদ আলী ক্লে অগাধ আত্মবিশ্বাসের ফলেই সকল খেলা শুরুর পূর্বেই জয়ের নিশ্চয়তা দিতেন। অপরাহ উইনসফ্রে, এডলফ হিটলার, টমাস আলভা এডিসন, স্টিফেন্স হকিংস, ড. মোহাম্মদ শহিদুল্লাহ, কাজী নজরুল ইসলাম, বান কি মুন, আরো এমন অনেক মানুষদের জীবনী আমরা জানি যাদেরকে নিজ নিজ অবস্থানে শ্রেষ্ঠ করেছিলো তাদের আত্মবিশ^াস। দারিদ্রতা তাদের সাহস যুগিয়েছে হতাশ করেনি, শক্তি যুগিয়েছে বিমর্ষ করেনি। মহানবী মুহাম্মদ (স.) তাঁর সাথীদের পারস্য, রোমান আর কনস্টান্টিনোপল বিজয়ের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। আর সেই স্বপ্নই প্রবল আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছিলো সাহাবাদের। ফলে বিজয়ও তাদের মহান রব দান করেছিলেন। ইসলামের ইতিহাসে প্রত্যেকটি অসম যুদ্ধের জয়ই মহান আল্লাহ ঈমান আর আত্মবিশ্বাসের কারণে মুমিনদের দান করেছিলেন। তাই আমাদের বিশ্বাস করতে হবে যে, আমার দ্বারাই এই লক্ষ অর্জন করা সম্ভব। 


শেখার আগ্রহ ও বিনয়ী হওয়া 

আমাদের একটি কমন প্রবণতা হলো আমি শ্রেষ্ঠ হবো কিন্তু অতিরিক্ত কোনো পরিশ্রম  করবোনা। আমি উচ্চ আসন আর মর্যাদা চাই কিন্তু দক্ষতা অর্জনের ক্ষেত্রে ব্যাপক কার্পণ্যতা রয়েছে। কোনোকিছু পরিচালনার দক্ষতা অর্জনের জন্য আপনাকে অবশ্যই শেখার আগ্রহ বৃদ্ধি আর হীনমন্যতা পরিহার করতে হবে। এই কাজটি আমার না, ওই কাজটি কেন করবো? এটি শিখে কী লাভ? ইত্যাদি বিভিন্ন প্রশ্ন আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। আমার এক বড় ভাইয়ের কাছে তাঁর বাস্তব জীবনের একটি অভিজ্ঞতা শুনেছিলাম। সে বলল, “আমি একবার আমার প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি মেশিন কিনতে চীনের একটি কোম্পানিতে গিয়েছিলাম। কোম্পানিতে যাবার পরে সেখানকার এক কর্মকর্তা আমাকে তাদের বিভিন্ন মেশিনারি ঘুরে ঘুরে দেখাচ্ছিলো। আরেকজন ব্যক্তি আমাকে মেশিনের বিভিন্ন পার্টস খুলে দেখাচ্ছিলো। তার পরনের গেঞ্জিটা মেশিনের কালো তেলে বেশ অপরিস্কার ছিলো। যাই হোক, আমি যখন মেশিন ক্রয়ের জন্য প্রতিষ্ঠানের এমডির সাথে কথা বলতে চাইলাম তখন প্রথম যে ব্যক্তিটি আমাকে ঘুরিয়ে দেখাচ্ছিলো সে এমডির রুমে নিয়ে গেলো আর কিছু সময় অপেক্ষা করতে বলল। অল্প সময় পরেই আমি দেখতে পেলাম, কক্ষটিতে ঐ ব্যক্তি প্রবেশ করছে যাকে মেশিনের পার্টস খুলে আমাকে দেখাতে দেখেছিলাম। আমি খুশি হলাম আর একটি ম্যাসেজও পেলাম।”

সুতরাং আমাদের নকোনো দক্ষতামূলক কাজ- যা আমার লক্ষ অর্জনের জন্য প্রয়োজন, তা যতই ছোট হোক শিখতে কার্পন্য করবোনা। আর সর্বদা মনে এটি ধারন করবো- “আমি যতই দক্ষ হইনা কেন তা যেন আমাকে অহংকারী না করে। অবশ্যই আমি মানুষকে কাজ শেখানোর জন্য বিনয়ী হবে।” আর আমি বিশ্বাস করি সফলতা এ জাতীয় মানুষদের পদলেহন করে থাকে।

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, ছাত্র সংবাদ

আপনার মন্তব্য লিখুন

Monjur

- 7 months ago

Its a really good work for youth. ALLAH Bless you.

Md golam mostofs.

- 6 months ago

Go ahead dear chhatrasangbad.

কপিরাইট © বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির