post

সেক্যুলারদের পশুপ্রেম

মুহাম্মদ নূরে আলম

১৭ জুলাই ২০২৩

ধর্মনিরপেক্ষতার মোড়কে বাংলাদেশে একদল তথাকথিত সেক্যুলাররা কুরবানির ঈদের সময় পশুপ্রেমের জিগির তোলে। এই যে গত ২৯ জুন কুরবানির ঈদ গেল, সে ঈদেও তাদের পশুপ্রেম যেন উথলে উঠেছে। এটা পরিষ্কার ইসলামবিদ্বেষ। তারা তাদের এ ইসলামবিদ্বেষী মনোভাব কুরবানির ঈদের সময় আর গোপন রাখতে পারে না। কথিত এসব সেক্যুলাররা অন্য ধর্মের প্রতি সংবেদনশীল হলেও ইসলাম ধর্মের বিষয়ে রয়েছে তাদের মাঝে রাজ্যের সঙ্কীর্ণতা। কুরবানি যে মুসলমানদের একটি ধর্মীয় উৎসব এবং এটার যে একটি ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক ভিত্তি আছে, তারা এটা মানতে নারাজ। ইসলামোফোবিয়া (ইসলামভীতি বা ইসলামবিদ্বেষ বা মুসলিম-বিরোধী মনোভাব) (ইংরেজি: Islamophobia বা anti-Muslim sentiment) হলো নিন্দার্থে বা ব্যঙ্গার্থে ব্যবহৃত একটি রাজনৈতিক শব্দ, যার অর্থ ইসলামকে ভয় করা। এর দ্বারা ইসলাম ও মুসলিমদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করাকেও বোঝানো হয়। বাংলাদেশের সেক্যুলার গোষ্ঠী ক্রমাগতভাবে ইসলামবিদ্বেষী মনোভাব প্রকাশ করতে থাকে। বাংলাদেশের সেক্যুলারদের যে অংশ রাজনীতি করেন, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক তৎপরতায় যুক্ত আছেন, তাদের মধ্যে কুরবানি নিয়ে বেশি আপত্তি দেখা যায়। তারা ভারতের মদদে মুসলমানদের কুরবানির সময় পশুপ্রেমে বুদ হয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মায়াকান্না শুরু করেন। আবার পাল্টা দৃশ্যও দেখা যায়। যেমন সেক্যুলার ও সেক্যুলার প্রভাবিত সবচেয়ে বড় অংশে কুরবানি রীতিমতো ‘উৎসব’ এর মতো। কুরবানি এলে তাদের বাজারও চাঙ্গা হয়ে যায়। তাদের মধ্যে কুরবানির গোশত বেশিদিন রেখে ‘ভোগ’ করার জন্য ফ্রিজ কেনার ধুম পড়ে যায়। শুধু সেক্যুলারই নয়, উচ্চবিত্ত-মধ্যবিত্ত নির্বিশেষ একেবারে সাধারণ মুসলমানদের মধ্যেও এমন আলামত দেখা যায়। এ ছাড়া সম্পদশালী সেক্যুলারদের পাশাপাশি সমাজে ক্ষমতাবান ও কর্তৃত্বপরায়ণরা তো আছেই। তারা তো যথারীতি কুরবানিকে নিজেদের রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক কারবারের স্বার্থে কাজে লাগায়। গ্রামেগঞ্জে গরিব মানুষদের মধ্যে কুরবানির গোশত বিলি করে তারা প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা শুরু করে। মোটকথা কুরবানি নিয়ে বিচিত্ররকম নেতিবাচক চর্চা দেখা যায়।

এদিকে ভারতে চরম সাম্প্রদায়িক ও প্রতিক্রিয়াশীল বিজেপি সরকার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত। বিজেপির মোদি-সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে মুসলমান ও দলিত সম্প্রদায়ের ওপরে হামলার ঘটনা প্রায় প্রতিদিনই ঘটছে। এখন ভারতে সবরকম ধর্মীয় কুসংস্কার শুধু জিইয়ে রাখা নয় বরং আরো বিস্তৃত ও শক্তিশালী করার নীতিই কার্যকর করছে বিজেপির সন্ত্রাসী সংগঠন আরএসএস ও শিব সেনা। মুসলমান, খ্রিস্টান, নিম্নবর্ণের হিন্দুদের গো- গোশত খাওয়ার বিরুদ্ধে ধর্মের জিগির তোলা তাদের নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ উদ্ধারের হীন প্রচেষ্টারই অন্যতম দৃষ্টান্ত। সাম্প্রতিককালে গো-রক্ষা সমিতির অপতৎপরতা, হামলা, সহিংসতা বেড়ে যাওয়ার পেছনেও রাজনীতিটাই রয়েছে মুখ্য ভূমিকায়। বিজেপি যেমন আরএসএসের ভাবধারাপুষ্ট রাজনৈতিক সংগঠন তেমনি গো-রক্ষা সমিতিও। বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর গো-রক্ষা সমিতি নতুন করে গো-রক্ষা আন্দোলন জোরদার করেছে। গো-রক্ষা সমিতির আন্দোলনের মুখেই বিজেপি প্রভাবিত বা বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোতে গরু জবাই ও গরুর গোশত খাওয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বিজেপি যে এই আন্দোলনের পেছনে আছে এবং প্রবলভাবে সমর্থন করছে তা বিশদ তথ্য-প্রমাণের অপেক্ষা রাখে না। সরকারি দল ও সরকারের সমর্থন ও পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েই গো-রক্ষা সমিতি আন্দোলন করে যাচ্ছে এবং ক্রমাগত তার সন্ত্রাসী চরিত্রের উন্মোচন ঘটাচ্ছে। শুরুতে গো-রক্ষা আন্দোলনের কর্মীদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু ছিল মুসলমানরা, এখন তা অন্যান্য ধর্মীয় সম্প্রদায় এমনকি স্ব-ধর্মীয় দলিতদের ওপরও সম্প্রসারিত হয়ে পড়েছে।

কিন্তু কুরবানির এসব চর্চার দিক থেকে যারা খোদ কুরবানিকে নিছক পশু হত্যা বলে চালিয়ে দেন তাতে যেমন কুরবানি নাকচ হয়ে যায় না, আবার যেসব সেক্যুলাররা ‘বনের পশু নয়, মনের পশুকে হত্যা করো’ বলে প্রচার করেন তাতে কুরবানির অর্থ নিয়ে যথেষ্ট সংশয় তৈরি হয়। এই বক্তব্যের মাধ্যমে দৃশ্যত কুরবানির আমল বা প্রথার বিলুপ্তি হবে কিনা তা পরিষ্কার না। তবে এভাবে ইঙ্গিতে যে কথিত পশুপ্রেমী সেক্যুলার গোষ্ঠী কুরবানির চলমান জাহিরি আমলের বিলুপ্তি কামনা করা হয় তা অনেকটাই বোঝা যায়। পশু হত্যা, উৎসব, বনের পশু নয় মনের পশু ইত্যাদি প্রত্যয় ও প্রচারণাগুলো কুরবানির আলোচনার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেক্যুলাররা যে বিভ্রান্তিকর বয়ান দেয় “মনের পশুকে কুরবানি দাও” কথাটি বেশ ঘোরালো। জগতে ধ্বংস এবং সৃষ্টি যুগপৎভাবে ঘটছে। এ ধ্বংস আমরাই করছি। আমরা মানে সৃষ্টি জগতের প্রতিটি বস্তু। প্রতিটি প্রকৃতি। প্রতিটি প্রাণ। প্রতিটি সৃষ্টি। প্রত্যেকেই অপরকে ভোগ করেই নিজের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা নিশ্চিত করে। প্রাণীরা অন্য একটা প্রাণকে খেয়েই নিজের জীবন ধারণ করে। তিমি, হাঙ্গর আরেকটা প্রাণীকে খেয়েই বাঁচে। বোয়াল তারচেয়ে কম শক্তিশালী মাছ ও অন্যান্য জিনিস খেয়ে বাঁচে। পুঁটিও আরেকটা প্রাণ হত্যা করে বাঁচে। বৃক্ষ ও উদ্ভিদরাজির ক্ষেত্রেও তাই। তাহলে মুসলমানদের কুরবানি বা ঈদ উৎসব নিয়ে কেন প্রশ্ন আসবে? অথচ সারা বিশ্বে মুসলমানদের থেকে গরুর গোশত বেশি খায় খ্রিস্টানরা। কিন্তু কেন তারা খ্রিস্টানদের গরুর গোশত খাওয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলে না? আসলে তারা ভণ্ড এবং মুসলিমবিদ্বেষী আত্মপ্রতারক। হিন্দু ধর্মে গরুকে ‘পবিত্র গোমাতা’ বলা হয়ে থাকে। গরু নানাভাবে মানুষের উপকার করে বলে হিন্দু ধর্মে গো-হত্যা নিষিদ্ধ। তবে আজব হলেও সত্য- গরুর চামড়া দিয়ে যে জুতো তৈরি করে তা ব্যবহার করা কিন্তু হিন্দু ধর্মে নিষিদ্ধ নয়! তাহলে ভারতের সব মানুষকে খালি পায়ে চলতে হবে। গোমাতার চামড়ায় তৈরি জুতো পরেই কি পূজা করছে বা গোমাতার পূজা করে না হিন্দুরা? হিন্দুরা যে ঢোল দিয়ে পূজা করে সেই ঢোলও কিন্তু গরুর চামড়াতেই তৈরি। গরুর চামড়ার তৈরি যত জিনিস আছে তা সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করে হিন্দুরাই। অনুরূপ মায়াকান্না করা সেক্যুলাররা কিন্তু গরুর চামড়ার তৈরি কোনো জিনিস বাদ দেয় না, বরং খুঁজে খুঁজে গরুর চামড়ার জিনিসই ব্যবহার করে! প্রশ্ন হলো তখন তাদের পশু প্রেম কোথায় থাকে?

কথিত সেক্যুলারদের কুরবানির পশুপ্রেম দেখে আরো একটি প্রশ্ন করতে মন চায়। তা হলো নেপালের ‘গাধিমাই উৎসব’ ‘বিশ্বের সবচেয়ে বড় রক্তাক্ত’ উৎসব (নির্মম পশুবলি) বলে পরিচিত। ২০১৪ সালের সর্বশেষ উৎসবে প্রায় দুই লাখ প্রাণী হত্যা করা হয়েছিল। এই প্রথার শুরু হয় প্রায় আড়াইশো বছর আগ থেকে। তখন একজন পুরোহিত বলেছিলেন- তিনি স্বপ্নে দেখতে পেয়েছেন, শক্তির দেবি গাধিমাই তাকে বলেছেন যে, কারাগার থেকে তাকে মুক্ত করতে হলে রক্ত ঝরাতে হবে (কী কুসংস্কারমূলক বক্তব্য!)। লাখ-লাখ ভক্ত ভারত ও নেপাল থেকে নেপালের বারিয়ারপুরে গাধিমাই দেবির মন্দিরে যান কেবল নির্মমভাবে পশু বলিদান করার জন্য।


লড়াই করে কুরবানি করার অধিকার আদায় 

বাংলায় তথা বর্তমান বাংলাদেশে গরু কুরবানি করার অধিকার আদায় করতে লড়াই করেছেন বাবা আদাম শহীদ ও শাহ জালালদের মতো মহান ব্যক্তিরা। পলাশীর বিপর্যয়ের পর হিন্দু জমিদাররা গরু কুরবানি করার অধিকার কেড়ে নেয়। বৃটিশ শাসিত পূর্ব বাংলার ঢাকা ছাড়া আর কোথায়ও গরু কুরবানি করা সহজ ছিল না। ঢাকার নবাবদের কারণে ঢাকায় গরু কুরবানি করা যেত। সাতচল্লিশের পরপরই সারা বাংলায় গরু কুরবানি করা শুরু হয়। সাতচল্লিশের পর জমিদারি উচ্ছেদের মাধ্যমে বাঙালি মুসলমান আবার গরু কুরবানি করার অধিকার ফিরে পায়। ভারত ভাগ তথা পাকিস্তানের জন্মের ভেতর দিয়ে বাঙালি মুসলমান গরু কুরবানি অধিকার প্রতিষ্ঠা করেন এবং এতে করে বর্ণহিন্দু জমিদারদের শোষণের অবসান হয় ও পূর্ব বাংলার মুসলমানদের মাথা তুলে দাঁড়াবার ও তাদের বৈষয়িক সমৃদ্ধি লাভের সুযোগও তৈরি হয়। পাকিস্তান না হলে বাঙালি মুসলমানের পক্ষে এটি কখনোই সম্ভব ছিল না বা হতো কিনা যথেষ্ট সন্দেহ ছিল। এর মস্তবড় প্রমাণ হচ্ছে পশ্চিম বঙ্গের মুসলমানরা। তারা সেখানে জনসংখ্যার দিক দিয়ে শতকরা ত্রিশ ভাগ হলেও সামাজিকভাবে তাদের কোনো জায়গা নেই বললেই চলে।  

গবেষক ও ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুন লিখেছেন, “আজকে আমরা ঈদ-উল-আজহায় অনায়াসে গরু (বা অন্য কিছু) কিনে এনে সহজেই কুরবানি দিয়ে ফেলি। আশি একশো দূরে থাকুক পঞ্চাশ বছর আগেও তা তেমন সহজসাধ্য ছিল না। আজকের প্রজন্ম হয়তো অবাক হবে যে, এ নিয়ে সুদীর্ঘ পঞ্চাশ বছর বিতর্ক চলেছে এবং কুরবানি বিশেষ করে গরু কুরবানি দেওয়ার অধিকার আমাদের বাপ দাদাদের লড়াই করে আদায় করতে হয়েছিল।”

ঔপনিবেশিক বাংলায় গরু জবাই নিয়ে হিন্দু-মুসলমান বিরোধ তীব্রতর ছিল। পাকিস্তান হওয়ার পরও গরু কুরবানি নিয়ে কম ঝামেলা হয়নি। প্রভাবশালী হিন্দুদের এলাকায় মুসলমানরা গরু কুরবানি দিতেন না এবং ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ আমলের ব্যবস্থাটাকেই তারা একরকম মেনে নিয়েছিলেন। ১৯৫০-এর দশকে নাটোরের এসডিও পি এ নাজিরের স্মৃতির পাতা থেকে গ্রন্থে এ নিয়ে বিস্তারিত জানা যাবে। সিলেট রেফারেন্ডামের সময় কংগ্রেসের নেতারা স্লোগান তুলেছিলেন, “হিন্দু-মুসলমান ভাই ভাই”। তখন মুসলিম লীগ নেতারা মিছিলে স্লোগান দিয়েছিলেন ‘হিন্দু-মুসলমান ভাই ভাই/চলো দুয়ে মিলে গরু খাই’। জানা যায় তখন মুসলিম লীগ রীতিমতো গরু জবাই দিয়েছিলেন এবং তারা  স্থানীয় কংগ্রেসের হিন্দু নেতাদের সেখানে দাওয়াতও দিয়েছিলেন। (আত্মজীবনী-দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ, উৎস প্রকাশন, ঢাকা, ২০০৭।)।


আর্য ধর্ম বা ব্রাহ্মণ্য ধর্ম বা হিন্দু ধর্মে

গরুর গোশত খাওয়া বৈধ 

হিন্দু ধর্মগ্রন্থে বলা আছে- বেদজ্ঞান লাভ করতে হলে, স্বাস্থ্যবান সন্তান লাভ করতে হলে ষাঁড়ের মাংস খাওয়া জরুরি। (বেদ : ২য় প্রকাশ, পৃ: ১৩, ৬৭; হরফ প্রকাশনী, কলিকাতা)। বহিরাগত আর্যরা কৃষিজীবী ছিলো। কৃষির হালচাষের জন্য অন্যতম উপকরণ ছিলো গরু। এ জন্য আর্য সাহিত্যে গরুকে গো ধন বলা হয়েছে। গো-সম্পদের যত্ন নেওয়ারও তাগিদ রয়েছে আর্য সাহিত্যে। ভারতের গো-বলয়ে আর্যদেরই প্রাধান্য বেশি। আর্য-সমাজে  চারস্তরের বিভাজন মূলত এই আর্যরা বা ব্রাহ্মণ্য দর্শনের অনুসরণকারীরাই তৈরি করেছে। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র ইত্যাদিতে সমগ্র ভারতে জাতপ্রথা ও সমাজে শ্রেণি বৈষম্য তৈরি করেছে এরাই। আর্যরা বহিরাগত। মধ্য-এশিয়া থেকে তারা ভারতবর্ষে এসেছিল। পাঞ্জাব, মধ্যপ্রদেশ, উত্তর প্রদেশ, গুজরাট, মহারাষ্ট্র, হরিয়ানা, দিল্লি ও বিহার; এ এলাকাটাই গো-বলয়। এখানেই আর্যরা বসতি স্থাপন করেছিল। আর্য হিন্দুদের ধর্মগ্রন্থগুলোর মধ্যে বেদ হচ্ছে প্রধান ধর্মগ্রন্থ। আসুন, দেখি আর্য সাহিত্যের প্রধান গ্রন্থ কী বলে; হিন্দুদের ধর্মে গরুর মাংস খাওয়ার বৈধ বলা হয়েছে।  এ বিষয়ে প্রমাণ এখানে তুলে ধরা হলো :

ক. মনুষমৃত্রী অধ্যায় ৫ শ্লোক নম্বর যথাক্রমে ৩০; ৩১; ৩৯; ৪০, খ. ঋগ্ববেদ অধ্যায় ৮৫ শ্লোক নম্বর ১৩, গ. মহাভারত আনুষাণ পর্ব শ্লোক নম্বর ৮৮, ঘ. গরু-বৃষের মাংস [বেদ:১/১৬৪/৪৩], ঙ. মহিষের মাংস [বেদ: ৫/২৯/৮], চ. অজের মাংস [বেদ:১/১৬২/৩] খাওয়া হতো। আরও বলা হয়েছে পরস্বিনী গাভী মানুষের ভজনীয় [বেদ:৪/১/৬]। গো-হত্যা স্থানে গাভীগণ হত্যা হত [বেদ:১০/৮৯/১৪]। ইন্দ্রের জন্য গোবৎস উৎসর্গ করা হয়েছে। [ঋগ্ববেদ: ১০: ৮৬: ১৪]। এমনকি উপনিষদ বলছে: ‘বেদজ্ঞান লাভ করতে হলে, স্বাস্থ্যবান সন্তান লাভ করতে হলে ষাঁড়ের মাংস খাওয়া জরুরি।” [সূত্র: বেদ; ২য় প্রকাশ, পৃ: ১৩, ৬৭; হরফ প্রকাশনী, কলিকাতা]


ভারতে মরা গরু টানা ও চামড়া ছাড়ানোর দুরূহ কাজটি করেন দলিতরা। এজন্য তাদের খুব সামান্য পারিশ্রমিক দেওয়া হয়। দেশটির ২০ কোটি দলিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে গুজরাটে বাস করে ২.৩ শতাংশ। কেবল ২০১৫ সালেই দলিত নির্যাতনের এক হাজারেরও বেশি মামলা হয়েছে। ১৯৯০-২০১৫ সাল সময়ে গুজরাটে ৫৩৬ দলিত হত্যা এবং ৭৫০ দলিত নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। দলিতেরা মুচির কাজ করে। গৃহস্তকে কিছু টাকা দিয়ে খসানো চামড়া নিয়ে যায়। স্থানীয়ভাবে ট্রেনিং করে তারা এ চামড়া মুচির কাজে ব্যবহার করে। চার যুবক যখন মৃত গরুর থেকে চামড়া খসানোর কাজ করছিল তখন গো-রক্ষা সমিতির লোকজন এসে চার দলিত যুবককে ধরে নিয়ে যায় সোমনাথ জেলার উনা শহরে। এখানে গোরক্ষা সমিতির লোকেরা চার যুবকের ওপর নির্মম অত্যাচার চালায়। অনেক লোক এ নির্যাতনের দৃশ্য দেখে এবং মোবাইল ফোনে ধারণ করে তা ইন্টারনেটে ছেড়ে দেয়। এ নিয়ে সারা গুজরাটে এখন দলিতেরা ঐক্যবদ্ধ। 

যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি সংস্থা (ইউএসডিএ) প্রকাশিত পরিসংখ্যানে বলা হয়, এ বছরও ব্রাজিলকে দ্বিতীয় স্থানে রেখে গরুর মাংস রফতানিতে শীর্ষ স্থানটি নিজের জন্যই রেখে দিলো ভারত। তবে যুক্তরাষ্ট্রের এ জরিপে মহিষের মাংসকেও গরুর মাংস হিসেবে ধরা হয়েছে। প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০১৫ অর্থবছরে ভারত ২৪ লাখ টন গরুর মাংস রফতানি করেছে। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা ব্রাজিল রফতানি করেছে ২০ লাখ টন এবং তৃতীয় স্থানে থাকা অস্ট্রেলিয়া রফতানি করেছে ১৫ লাখ টন। বিশ্বের গোমাংস রফতানির ৫৮.৭ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে এ তিন দেশ। এর মধ্যে একা ভারত নিয়ন্ত্রণ করে মোট বৈশ্বিক রফতানির ২৩.৫ শতাংশ, যা গত বছর ছিল ২০.৮ শতাংশ। সেন্টার ফর মনিটরিং ইন্ডিয়ান ইকোনমি (সিএমআইই) কর্তৃক প্রকাশিত আরেক পরিসংখ্যানে বলা হয়, ভারতের বেশিরভাগ গরুর মাংস রফতানি হয় এশিয়ার দেশগুলোতে। দেশটির রফতানি মাংসের ৮০ শতাংশ যায় এশিয়ার দেশগুলোতে, আফ্রিকায় যায় ১৫ শতাংশ। এর মধ্যে এশিয়ার ভিয়েতনামেই যায় মোট রফতানির ৪৫ শতাংশ। ২০১১ সাল থেকেই ১৪ শতাংশ হারে বাড়ছে ভারতের গরুর মাংস রফতানি। ২০১৪ সালে দেশটির এ বাজার ছিল ৪.৮ বিলিয়ন ডলারের। গত বছর দেশটি বাসমতি চাল রফতানি করে যে আয় করে তার চেয়ে বেশি আয় করে গরুর মাংস রফতানি থেকে। বাংলাদেশে যদি গরু পাচার পুরোপুরি বন্ধ করে দেয় ভারত, তাহলে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হবে দেশটি। যার পরিমাণ ৩১ হাজার কোটি রুপি বা ৩৯ হাজার কোটি টাকা। টাইমস অব ইন্ডিয়ার এক প্রতিবেদনে এমনই তথ্য দেওয়া আছে। 

গরু মানুষের অনেক উপকারে আসে এটা অস্বীকার করার কিছুই নেই। কিন্তু গরুই একমাত্র প্রাণী নয় যা মানুষের উপকারে আসে। প্রশ্ন ওঠে- গরু কি গাছের চেয়েও বেশি উপকারী? গাছ মানুষের কী কী উপকারে আসে তা বর্ণনা করার প্রয়োজন পড়ে না। গরু না থাকলেও মানুষের জীবন ধারণে কোনো অসুবিধা হবে না। কিন্তু গাছ না থাকলে ১ মিনিট বেঁচে থাকা দুরূহ। সে গাছ কাটতে হিন্দুদের কোনো আপত্তি নেই। অথচ শুধু গরুর বেলাতেই তাদের যত আপত্তি। আসলে এই ধর্মটির যত নিয়ম কানুন, রীতিনীতি আছে তার সবই সংস্কার থেকে সৃষ্ট।


বৌদ্ধ যুগের আগে গো মাংস খেতো হিন্দুরা 

জেনে রাখা ভালো- বৌদ্ধ যুগের আগ পর্যন্ত হিন্দুরা প্রচুর গোমাংস ভক্ষণ করতো। ব্যাসঋষী স্বয়ং বলেছেন, ‘রন্তিদেবির যজ্ঞে একদিন পাচক ব্রাহ্মণগণ চিৎকার করে ভোজনকারীদেরকে সতর্ক করে দিয়ে বললেন, “মহাশয়গণ! অদ্য অধিক মাংস ভক্ষণ করবেন না, কারণ অদ্য অতি অল্পই গো-হত্যা করা হয়েছে; কেবলমাত্র ২১ হাজার গোহত্যা করা হয়েছে”। (সাহিত্য সংহিতা : ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা-৪৭৬)

বৌদ্ধযুগের পূর্ব পর্যন্ত হিন্দুরা যে প্রচুর গরু গোশত খেতেন ডাঃ রাজেন্দ্র প্রসাদ প্রণীত Beef in Ancient India গ্রন্থে, স্বামী ভূমানন্দ প্রণীত ‘সোহংগীত’, ‘সোহং সংহিতা, ‘সোহং স্বামী’ গ্রন্থগুলোতে, আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের ‘জাতি গঠনে বাধা’ গ্রন্থে উল্লেখ আছে। এসব গ্রন্থ থেকে জানা যায়, বৌদ্ধযুগের আগ পর্যন্ত গো-হত্যা, গো-ভক্ষণ মোটেই নিষিদ্ধ ছিল না। ভারতবর্ষে বেদিক ধর্মের অনুসরণকারীদের বৌদ্ধ পূর্ব যুগে রেওয়াজ ছিল, মধু ও গো-মাংস না খাওয়ালে তখন অতিথি আপ্যায়নই অপূর্ণ থেকে যেত। এখন প্রশ্ন হলো- ধর্মগ্রন্থে গো-গোশত ভক্ষণের প্রমাণাদি থাকার পরও হিন্দুরা গো-গোশত ভক্ষণ করে না কেন? কেবল মুসলমানরা গরুর গোশত খায় বলে? নাকি শুধুমাত্র বিরোধিতা করার খাতিরে বিরোধিতা করা। আসলে মূল কারণ আমি আগেই বলেছি- কুসংস্কার। কারণ, তারা নিজেরা নিজেদের ধর্মগ্রন্থ না পড়ে ব্রাহ্মণ পুরোহিতদের কথা শুনে। তাহলে প্রশ্ন হলো বিশ্বের এক নম্বর গরুর মাংস রফতানিকারক দেশ হয়েও কেন মুসলমানদের ধর্মীয় বিধান গরু কুরবানি করা নিষিদ্ধ করছে? তবে কেন তারা ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র দাবি করে? আবার মুসলমানদের সাথে বা ইসলামের সাথে কেন এই স্ববিরোধী আচরণ? যেখানে তাদের ধর্মগ্রন্থে গো-গোশত খাওয়ার কথা বলা হয়েছে? তাই সেক্যুলারদের উদ্দেশ্যে বলে শেষ করি জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কোরবানি কবিতার লাইন দিয়ে “ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’, শক্তির উদ্বোধন। দুর্বল! ভীরু! চুপ রহো, ওহো খাম্খা ক্ষুব্ধ মন!” 

লেখক : সাংবাদিক

আপনার মন্তব্য লিখুন

কপিরাইট © বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির