post

সৌদি ইরান সুসম্পর্ক বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হবে

জালাল উদ্দিন ওমর

৩০ মে ২০২৩

গত ১০ মার্চ মুসলিম বিশ্বের দুই শক্তিশালী দেশ সৌদি আরব এবং ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠার খবর বের হয়। চীনের উদ্যোগ এবং মধ্যস্থতায় রাজধানী বেইজিংয়ে দেশ দু’টির মধ্যে অনুষ্ঠিত দীর্ঘ আলোচনা শেষে এ ঘোষণা দেওয়া হয়। এ আলোচনায় সৌদি আরবের প্রতিনিধিত্ব করেন সৌদি আরবের জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের উপদেষ্টা মুসাদ বিন মুহাম্মদ আল আইবান এবং ইরানের প্রতিনিধিত্ব করেন ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব আলি শামখানি। দুই পক্ষের মধ্যে মধ্যস্থতা করেন চীনের শীর্ষ কূটনীতিক ওয়ান ই। প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী সৌদি আরব এবং ইরান তাদের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃ প্রতিষ্ঠা করবে এবং এর অংশ হিসেবে দেশ দুটি আগামী  দুই মাসের মধ্যে পর¯পরের রাজধানীতে দূতাবাস খোলার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন। অর্থাৎ সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে ইরান দূতাবাস খুলবে এবং ইরানের রাজধানী তেহরানে সৌদি আরব দূতাবাস খুলবে। এই সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠায় ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে গত ৬ এপ্রিল চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান এবং ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসেইন আমির আবদুল্লাহিয়ান বৈঠকে মিলিত হন। ইতোমধ্যেই দেশ দু’টির মধ্যে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার কাজও শুরু হয়েছে। চীনের উদ্যোগে সৌদি আরব এবং ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার এই খবর বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মধ্যপ্রাচ্যে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং চীনের মধ্যস্থতায় সৌদি আরব ও ইরানের মধ্য কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃ প্রতিষ্ঠার খবর যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বিব্রতকর একটি বিষয়। অপরদিকে ইসরাইলের চিরশত্রু ইরানের সাথে সৌদির সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা ইসরাইলের জন্য একটি বিপর্যয়। তবে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইল এ ঘটনাকে যেভাবেই মূল্যায়ন করুক না কেন, সৌদি আরব এবং ইরানের মধ্যকার সুসম্পর্ক মধ্যপ্রাচ্য এবং মুসলিম বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একই সাথে এটা বিশ্বব্যাপী শান্তি প্রতিষ্ঠায়ও বিরাট ভূমিকা রাখবে। 

সৌদি আরব এবং ইরানের মধ্যকার দ্বন্দ্ব বেশ পুরনো। তবে ২০১৬ সালের ২রা জানুয়ারি সৌদি সরকার কর্তৃক আয়াতুল্লাহ শেখ নিমর আল নিমরের ফাঁসি কার্যকর করায় এ দ্বন্দ্ব তীব্র আকার ধারণ করে। শেখ নিমর ছিলেন সৌদি সরকারের একজন সমালোচক এবং তার প্রতি ছিল ইরানের সমর্থন। সৌদি সরকার শেখ নিমরের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ আনে এবং তাকে গ্রেফতার করে বিচারের মুখোমুখি করে। সৌদি সরকারের অভিযোগ, ২০১১ সালে সৌদি আরবে যে সরকার বিরোধী আন্দোলন হয় তাতে শেখ নিমরের ইন্ধন ছিল। আদালত শেখ নিমরকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করে এবং সৌদি সরকার শেখ নিমরের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে। তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার সাথে সাথে ইরান তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। ইরানের অভিযোগ শুধুমাত্র রাজনৈতিক কারণেই শেখ নিমরকে সৌদি আরব ফাঁসি দিয়েছে। ইরান এজন্য সৌদি আরবের তীব্র সমালোচনা করে এবং সৌদি আরবকে কড়া মূল্য দিতে হবে বলে হুঁশিয়ারিও উচ্চারণ করে। শেখ নিমরের ফাঁসি কার্যকর করার প্রতিবাদে ইরানে বিক্ষোভ হয় এবং বিক্ষোভকারীরা তেহরানে অবস্থিত সৌদি দূতাবাসে হামলা করে। এর প্রতিবাদে সৌদি আরব ইরানের সাথে সকল ধরনের কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে। তখন থেকে আজ পর্যন্ত সাত বছরেরও বেশি সময় ধরে দেশ দুটির মধ্যে কোনো ধরনের সম্পর্ক নেই। এভাবে সৌদি আরব এবং ইরানের মধ্যকার দ্বন্দ্ব আবারো মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে এবং তারা দেশে দেশে বিভিন্ন পক্ষে পক্ষাবলম্বন করে অশান্তি সৃষ্টি করেছে। শক্তিশালী রাষ্ট্রসমূহ বিভক্ত হয়ে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হলে  তার প্রভাবে অন্যান্য রাষ্ট্রসমূহও বিভক্ত হয়ে পড়ে এবং দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়। দুটি রাষ্ট্র কূটনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন থাকলে দেশ দু’টির মধ্যে ব্যবসা বাণিজ্যও বন্ধ হয়ে যায়। ফলে রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি দেশ দু’টি অর্থনৈতিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সৌদি আরব এবং ইরানের বেলায়ও তাই হয়েছে। ফলে মুসলিম দেশগুলোর মাঝে বিদ্যমান অনৈক্য আরো জোরালো হয় এবং মুসলিম বিশ্ব কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অপরদিকে শক্তিশালী রাষ্ট্রসমূহ ঐক্যবদ্ধ হলে তার প্রভাবে অন্যান্য রাষ্ট্রসমূহ ঐক্যবদ্ধ হয় এবং তখন শান্তি প্রতিষ্ঠা হয়। সৌদি-ইরানের সুসম্পর্ক আগামীতে মুসলিম বিশ্বসহ পুরো বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হবে।

সৌদি আরব এবং ইরানের মধ্যে দীর্ঘদিনের বৈরিতার কারণে মুসলিম বিশ্ব বছরের পর বছর ধরে ক্ষতিগ্রস্ত  হয়েছে। এ দ্বন্দ্বের কারণে ওআইসি কখনো গঠনমূলক কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি। যুগের পর যুগ ধরে ফিলিস্তিনিরা ইসরাইলের হাতে নির্যাতিত হয়ে আসছে। কয়েক লক্ষ ফিলিস্তিনি বছরের পর বছর ধরে বিভিন্ন দেশের শরণার্থী শিবিরে জীবন যাপন করছেন। অনেক ফিলিস্তিনি শরণার্থী শিবিরেই জন্মগ্রহণ করেছেন, শরণার্থী শিবিরেই বড় হয়েছেন এবং শরণার্থী শিবিরেই মৃত্যুবরণ করেছেন। এখানকার রাজনীতি ও সৌদি-ইরান দুই মেরুতে বিভক্ত। ইসলামিক জিহাদ ও হামাসকে সমর্থন দিচ্ছে ইরান আর পিএলওকে সমর্থন দিচ্ছে সৌদি আরব। ফলে ফিলিস্তিনিরা কখনোই ইসরাইলের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে পারেনি এবং বিজয় অর্জন করেনি। ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ চলছে। সেখানকার রাজনীতিও সৌদি-ইরান দ্বন্দ্বে বিভক্ত। প্রেসিডেন্ট আসাদের পক্ষে আছে ইরান, আর আসাদ বিরোধী পক্ষকে সমর্থন করেছে সৌদি আরব। যুদ্ধে যুদ্ধে সিরিয়া আজ শেষ। ইতোমধ্যেই পাঁচ লক্ষ সিরিয়ান মারা গেছে আর পঞ্চাশ লক্ষ সিরিয়ান শরণার্থী হয়েছে। ইয়েমেনেও দীর্ঘদিন ধরে গৃহযুদ্ধ চলছে। সেখানেও একপক্ষে সৌদি আরব আর অপরপক্ষে ইরান। গৃহযুদ্ধে ইতোমধ্যেই ইয়েমেনও ধ্বংস হয়েছে এবং ৬০ হাজার ইয়েমেনি মারা গেছে। মিসরের বর্তমান শাসক সিসিকে সর্বাত্মক সহযোগিতা দিচ্ছে সৌদি আরব। ব্রাদারহুডকে ক্ষমতাচ্যুত করতে সৌদি আরব ব্যাপক তৎপরতা চালায়। অপরদিকে ব্রাদারহুডকে সমর্থন করে ইরান। সৌদি আরব এবং ইরানের মধ্যকার দ্বন্দ্বে মুসলিম দেশসমূহ যখন বহুদা বিভক্ত, তখন সাম্রাজ্যবাদীরা কৌশলে মুসলিম দেশসমূহকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। সিরিয়া, লিবিয়া ও ইয়েমেন তার সর্বোৎকৃষ্ট উদাহরণ। মিয়ানমারের শাসকেরা আরাকানের মুসলমানদের ওপর বছরের পর বছর ধরে নির্যাতন চালাচ্ছে এবং প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা মুসলিম ঘরবাড়ি ছেড়ে বাংলাদেশে এসে শরণার্থী হিসেবে বসবাস করছে। কিন্তু দুর্ভাগ্য তাদের সাহায্য করার সময় এবং শক্তি আজ মুসলিম দেশগুলোর নেই। কারণ তারা নিজেরা নিজেরাই ঝগড়া বিবাদে ব্যস্ত।

মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে ভ্রাতৃত্ব, ঐক্য এবং সংহতি সবচেয়ে বেশি থাকার কথা থাকলেও তারা আজ বহুধাবিভক্ত। বৃহত্তর স্বার্থকে বাদ দিয়ে তারা আজ ক্ষুদ্র স্বার্থের দ্বন্দ্বে জড়িত। এই দ্বন্দ্বে মুসলিম দেশসমূহ আজ বিপর্যস্ত। সিরিয়া, লিবিয়া, ইয়েমেন সবদেশেই যুদ্ধরত পক্ষগুলো মুসলিম। এই যুদ্ধে যারা মরছে তারা সবাই মুসলিম। যা কিছুই ধ্বংস হচ্ছে সবই মুসলমানদের সম্পদ। এই সুযোগে সাম্রাজ্যবাদীরা দেদারছে অস্ত্র বিক্রি করছে। একদিকে মুসলমানদের টাকায় অস্ত্র ব্যবসায়ীরা লাভবান, অপরদিকে সেই অস্ত্রের আঘাতে মারা যাচ্ছে মুসলমানরাই এবং মুসলমানদেরই ঘরবাড়ি সব ধ্বংস হচ্ছে। বিশ্বের শক্তিশালী রাষ্ট্রসমূহ যুদ্ধরত দুই পক্ষকেই অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সামরিক সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে। মুসলিম দেশ সমূহ হয়ে উঠেছে পশ্চিমা বিশ্বের দাবার খেলার স্থান। মুসলিম দেশসমূহে পশ্চিমারা যুদ্ধের নতুন নতুন ফ্রন্ট লাইন খুলছে। ফলে আত্মঘাতী এ যুদ্ধ বন্ধ না হয়ে অবিরাম গতিতে এগিয়ে চলে। এ আত্মঘাতী যুদ্ধই মুসলমানদেরকে ধ্বংস করেছে এবং এ যুদ্ধে কিন্তু কেউই জিতবে না। এ কারণেই মুসলমানরা শক্তিশালী না হয়ে দিন দিন দুর্বল হচ্ছে এবং বহিঃবিশ্বে মুসলমানদের প্রভাব প্রতিপত্তি বৃদ্ধি না পেয়ে বরং কমছে। অন্যের সমস্যা সমাধানের সুযোগ, ক্ষমতা এবং দক্ষতা আজ মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশের শাসকদের নেই। তারা কিভাবে ক্ষমতায় টিকে থাকবে সে প্রচেষ্টাতেই সবসময় ব্যস্ত এবং নিজেদের ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করার কাজে ভিনদেশের সহযোগিতা চায়। এ কারণে ফিলিস্তিন এবং মিয়ানমারের নিপীড়িত নির্যাতিত মুসলমানদেরকে পক্ষে দাঁড়ানোর সময় এবং ক্ষমতা আজ মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশের রাজা বাদশাহদের নাই। আর মুসলমানদের এই অনৈক্যই পশ্চিমাদের শক্তি। এ সুযোগে পশ্চিমারা নিজেদেরকে শক্তিশালী করেছে এবং মুসলিম দেশসমূহের ওপর প্রভাব বিস্তার করেছে এবং মুসলিম দেশসমূহের নিয়ন্ত্রক হয়ে বসে আছে।

মুসলিম দেশসমূহের মাঝে বিদ্যমান দ্বন্দ্ব  নিজেদেরকেই দূর করতে হবে। আজকের বিশ্বে যত গৃহযুদ্ধ সব মুসলিম দেশেই। যত উদ্বাস্তু এবং শরণার্থী সবাই মুসলিম। এমনকি আমাদের দেশে আটকে পড়া পাকিস্তানিরাও মুসলিম। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর থেকেই এসব পাকিস্তানিরা বাংলাদেশের রিফিউজি ক্যাম্পে মানবেতর জীবনযাপন করছে। এই সমস্যাটিও এখনো সমাধান হয়নি এবং তারা পাকিস্তানে ফেরত যেতে পারেনি। প্রকৃতপক্ষে মুসলিম দেশসমূহের সমস্যার  সমাধান মুসলিম দেশসমূহকেই  করতে হবে। তার জন্য মুসলমানদেরকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। ক্ষুদ্র স্বার্থ বাদ দিয়ে বৃহত্তর স্বার্থের জন্য মুসলমানদেরকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। আল্লাহ, রাসূল সা., কুরআন, নামাজ, রোজা, হজ, যাকাত, কোরবানি- সবই এক হওয়া সত্ত্বেও মুসলমানরা আজ এক নয়। মুসলিম সমাজ আজ হাজারো গ্রুপে বিভক্ত। চলছে হিংসা, হানাহানি, মারামারি, যুদ্ধ এবং বিগ্রহ। অথচ ঐক্য, ভ্রাতৃত্ব, সাম্য এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করা ইসলামের মৌলিক শিক্ষা। মানবকল্যাণ ইসলামের প্রধান শিক্ষা হলেও মুসলমানদেরই কারণে মুসলমানরা আজ ঘরবাড়ি ছাড়া, দেশ ছাড়া এবং তারা আজ শরণার্থী। অনেকে বলে সৌদি আরব এবং ইরানের মধ্যকার দ্বন্দ্বের জন্য পশ্চিমারা দায়ী। একইভাবে ফিলিস্তিন, সিরিয়া, লিবিয়া, ইয়েমেনসহ মুসলিম দেশগুলোর সমস্যার জন্য পশ্চিমারা দায়ী এবং পশ্চিমারাই এসব সংকট সৃষ্টি করেছে। কিন্তু এ কথার সাথে আমি একমত নই। কারণ মুসলিম দেশের শাসক এবং রাজনীতিবিদরা যদি ঐক্যবদ্ধ থাকত এবং নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব সংঘাতে লিপ্ত না হতো, তাহলে পশ্চিমারা সাত সমুদ্র তেরো নদী পার হয়ে মুসলিম দেশে এসে তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারত না। ইসরাইল এবং পশ্চিমাদের সাথে মিলে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আসাদকে ক্ষমতাচ্যুত করার কোনো দরকার তো সৌদি আরব এবং তুরস্কের নেই। আর গাদ্দাফিকে ক্ষমতাচ্যুত এবং হত্যা করার পর তো লিবিয়ায় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পায়নি। বরং দেশটি ধ্বংস হয়েছে। বিভিন্ন উপদলীয় গ্রুপে বিভক্ত হয়েছে এবং তাদের মধ্যে যুদ্ধ চলছে, যাতে কেবল মুসলমানরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে মুসলিম দেশসমূহের মাঝে ঐক্য এবং সংহতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। নিজেদের মধ্যে যেসব সমস্যা আছে তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে হবে। সৌদি আরব এবং ইরানের মধ্যে সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠা মুসলিম দেশসমূহে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য অপরিহার্য। কারণ বৃহৎ শক্তিসমূহ বিভক্ত হলে, ছোট ছোট দেশ সমূহও বৃহৎশক্তির পক্ষে বিপক্ষে বিভক্ত হয়ে পড়ে। ফলে সমস্যা বাড়ে, অশান্তি বাড়ে। অপরদিকে বৃহৎ শক্তিসমূহ ঐক্যবদ্ধ থাকলে ছোট ছোট দেশসমূহও ঐক্যবদ্ধ হয়। ফলে সমস্যা কমে, অশান্তিও কমে।

মুসলিম দেশসমূহের মাঝে যে দূরত্ব রয়েছে তা আলোচনায় বসলে অবশ্যই দূর হবে। কারণ ধর্মীয় এবং ঐতিহ্যগতভাবে দেশগুলোর মধ্যে হাজারো মিল রয়েছে। মুসলিম বিশ্বের পণ্ডিত ব্যক্তিগণকে আজ মুসলিম দেশগুলোর ঐক্যের জন্য উদ্যোগ নিতে হবে। পবিত্র কাবা শরিফের ইমামের নেতৃত্বে উচ্চ পর্যায়ের ইসলামিক পণ্ডিতগণকে আজ এগিয়ে আসতে হবে। সারাবিশ্বের ইসলামিক পণ্ডিতগণকে নিয়ে মুসলিম দেশগুলোর মধ্যকার বিভেদ দূর করার জন্য একটি বিশেষজ্ঞ পরিষদ গঠন করুন। মুসলিম দেশগুলোর সংগঠন ওআইসিকে আজ এই উদ্যোগ নিতে হবে। কাবা শরিফের ইমামের পিছনে সৌদি আরব এবং ইরানসহ সকল মুসলিম দেশের রাজা বাদশাহ এবং সকল দেশের মুসলমানরা নামাজ পড়ে। আর সৌদি আরব এবং ইরানের মাঝে দূরত্ব বাড়লে সেই দূরত্ব অন্যান্য মুসলিম দেশেও ছড়িয়ে পড়ে। দেশ দুটির মধ্যকার দ্বন্দ্বের কারণে ইতোমধ্যেই বিশ্ব মুসলিমের অনেক ক্ষতি হয়েছে। সুতরাং সৌদি আরব এবং ইরানের মধ্যে সুম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী করতে হবে। সৌদি আরব এবং ইরানের মধ্যকার সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার খবরে ইতোমধ্যেই মুসলিম দেশসমূহের মাঝে ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে। এক যুগ বিচ্ছিন্ন থাকার পর সিরিয়ার সাথে সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠায় সৌদি আরব আগ্রহ ব্যক্ত করেছে। ইতোমধ্যেই উভয় দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা একে অপরের দেশ সফর করেছেন। ইয়েমেনে বিদ্যমান যুদ্ধ অবসানেও সৌদি আরব সম্মত হয়েছে এবং এ লক্ষ্যে সৌদি আরবের একটি প্রতিনিধিদল ইয়েমেন সফর করেছেন। ফিলিস্তিনের  হামাসের সাথে সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠায়ও সৌদি আরব ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। ইতোমধ্যেই দীর্ঘদিন পর হামাসের শীর্ষ নেতারা সৌদি আরব সফর করেছেন এবং সৌদি আরব তার কারাগারে বন্দি হামাসপন্থী অনেক নেতাকে মুক্তি দিয়েছে। এভাবে সম্পর্ক পুনঃস্থাপনে ইতোমধ্যেই কাজ শুরু হয়েছে এবং বিবদমান পক্ষসমূহ একে অপরের সাথে যোগাযোগ শুরু করেছে। এর মধ্যে কাতারের সাথে আরব আমিরাতের সম্পর্কও পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। চলমান এই পরিবর্তন মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে বিদ্যমান অনৈক্য দূর করে একটি ঐক্যবদ্ধ মধ্যপ্রাচ্য গড়তে ভূমিকা রাখবে। দুটি দেশ রাজনৈতিকভাবে ভালো সম্পর্কে থাকলে তাদের মধ্যে ব্যবসা বাণিজ্যও চাঙ্গা হয়। ফলে দেশ দুটি রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী হওয়ার সাথে সাথে অর্থনৈতিকভাবেও লাভবান হবে। সুতরাং মুসলিম দেশসমূহকে আজ একে অপরের প্রতিপক্ষ না হয়ে, একে অপরের সহযোগী হতে হবে। একের কল্যাণে অপরকে এগিয়ে আসতে হবে। মনে রাখতে হবে ঐক্যেই শক্তি এবং ঐক্যেই শান্তি ও সমৃদ্ধি। তা না হলে মুসলিম দেশে দেশে চলমান গৃহযুদ্ধ চলতেই থাকবে। মুসলমানরা প্রতিনিয়ত ধ্বংস হতেই থাকবে, যা কারো কাম্য নয়। আশা করব সৌদি-ইরান সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী হবে এবং এর ফলে ফিলিস্তিন সমস্যার সমাধান হবে, সিরিয়া, লিবিয়া এবং ইয়েমেনের যুদ্ধ বন্ধ হবে এবং রোহিঙ্গা সমস্যারও  সমাধান হবে। এভাবে সৌদি আরব এবং ইরানের মধ্যকার সুসম্পর্ক মুসলিম বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি মুসলিম দেশসমূহকে উন্নতি, সংহতি এবং সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যাবে। একইভাবে তা বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং অগ্রগতিতেও ভূমিকা রাখবে। 


লেখক : প্রকৌশলী এবং উন্নয়ন গবেষক

আপনার মন্তব্য লিখুন

কপিরাইট © বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির