post

কারবালা ও মুসলিম মানসসংকট

লাবিব আহসান

০২ নভেম্বর ২০২৩

উপমহাদেশের যে দুজন প্রখ্যাত কবি মুসলমানদের রাজনৈতিক জাগরণের জন্য কলম চালিয়ে একদম সাধারণ্যে পৌঁছাতে পেরেছিলেন, তাঁদের একজন হলেন আল্লামা ইকবাল এবং অপরজন কাজী নজরুল ইসলাম। দুজনের মধ্যকার বয়সগত ব্যবধান ২২ বছর। একজন জন্মেছিলেন তৎকালীন অবিভক্ত ভারতবর্ষের পশ্চিমে, অপরজন পূর্বে। একজন উর্দু এবং ফার্সি ভাষা মিলিয়ে কবিতা লিখেছেন, অপরজনের উর্দু এবং ফার্সিতে গভীর পঠন-পাঠন থাকলেও লিখেছেন মূলত বাংলায়। দুজনের জীবনধারায় ব্যাপক পার্থক্য পরিলক্ষিত হলেও একটি জায়গায় মিল ছিল। তাঁরা ইসলামকে নিছক তসবী-তাহলীল, নামাজ-রোজার ধর্ম হিসেবে দেখেননি; দেখেছেন একটি বিশ্ববিজয়ী জীবনব্যবস্থা হিসেবে।

সাধারণত ‘কবি’ বলতেই আমাদের কল্পনায় যে ছবিটি ভেসে ওঠে, তা হলো- তারা ফুল-পাখি, লতা-পাতা নিয়ে কবিতা লেখেন। তাদের লেখার একটি বড়ো অংশজুড়ে থাকে নারীর প্রণয় আর রূপের বর্ণনা। নজরুল-সাহিত্যের একটি অংশ সেই আঁধারঘেরা গলিতে উঁকি-ঝুঁকি দিলেও অপর অংশটি মুসলমানদের রাজনৈতিক জাগরণের প্রশ্নে ছিল দারুণ প্রজ্জ্বল। তাঁর লেখা ইসলামী চেতনার গান-কবিতাগুলোর ওপর চোখ রাখলেই প্রাজ্ঞ পাঠক সহজে বুঝে ফেলতে পারার কথা- তিনি ইসলামকে কেবল ধর্মের মোড়কে দেখেননি, দেখেছেন আরও বিস্তৃত দৃষ্টি নিয়ে। ‘মোরা আল্লার রাজ্য চাই’ চরণটিই নজরুলের দর্শন বোঝার জন্য যথেষ্ট হবে। 

অন্যদিকে আল্লামা ইকবালের কবিতার অভীষ্ট লক্ষ্যই ছিল মুসলমানদের রাজনৈতিক জাগরণ। তিনি কেবল একজন শক্তিমান কবিই ছিলেন না, একই সঙ্গে ছিলেন একজন দুনিয়া কাঁপানো দার্শনিক। আজকের ‘পাকিস্তান’ রাষ্ট্রটির প্রতিষ্ঠাতাদের তিনি একজন। মুসলমানদের স্বাধীনভাবে মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকবার কথা চিন্তা করেই তিনি আলাদা একটি রাষ্ট্রের কথা ভেবেছিলেন। তাঁর কবিতায় মুসলিম জাগরণের চেতনা এতটা প্রবল যে, ইরানের ইসলামী বিপ্লবেও তা ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়েছিল। মুসলমানদের রাজনৈতিক বিজয়ের ব্যাপারে আশাবাদী করে তুলতে তিনি তাঁর সমগ্র জীবন ব্যয় করেছেন; বিনিয়োগ করেছেন মেধা, যোগ্যতা, প্রতিভা।

বিগত দেড়শ বছরে বাংলা ভাষার বহুলপঠিত উপন্যাসগুলোর তালিকা যদি তৈরি করা হয়, তাহলে সেখানে একদম শীর্ষে হয়তো ‘বিষাধ সিন্ধু’ উপন্যাসটি থাকবে। কারবালার প্রান্তরে হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহুর মর্মান্তিক শাহাদাতের ঘটনাকে উপজীব্য করে এটি লিখেছিলেন মীর মশাররফ হোসেন। একসময় বাংলাদেশে এই উপন্যাসটির আবেদন এত বেশি ছিল যে, খুব কম ঘর পাওয়া যেত, যেখানে কুরআন শরীফের সাথে একটি ‘বিষাদ সিন্ধু’ থাকত না। মুসলমানদের কাছে কারবালা এক গভীর আবেগের নাম। শীতকালে রাতের বেলা পুঁথি পাঠের আসর বসিয়ে ‘বিষাদ সিন্ধু’ থেকে কারবালার কাহিনী পাঠ করা হতো। আবেগে দাড়ি ভেজাতেন বয়স্করা, ঘরের কোণে দাঁড়িয়ে মেয়েরা আঁচলে মুছতো চোখ।

কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়! যে মুসলমানরা ‘বিষাদ সিন্ধু’ পড়ে আবেগে অশ্রুপাত করে, নবি-দৌহিত্র হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহুর মর্মান্তিক শাহাদাতের ঘটনার বয়ান শুনে কেঁদে ভাসায় বুক; সেই তারাই প্রবল বিস্ময় নিয়ে বলে বসে-‘আরে ভাই! ধর্মের সাথে আবার রাজনীতির কী সম্পর্ক? ধর্ম থাকবে ধর্মের জায়গায়, রাজনীতি রাজনীতির জায়গায়!’ তখন ইকবাল এবং নজরুলের জন্য গভীর মমতা অনুভব করি কেবল! ১৯০ বছরের শাসনের মাধ্যমে ব্রিটিশরা এত প্রগাঢ়ভাবে উপমহাদেশীয় মুসলমানদের মন-মস্তিষ্কের দখল নিয়ে ফেলেছে যে, আল্লামা ইকবাল-কাজী নজরুল ইসলামদের লেখা অযুত শব্দাবলীও তা আর ঘষে-মেজে তুলতে পারছে না।

২.

যে মুসলমানরা ইসলামকে নিছক একটি ধর্ম মনে করে নামাজ-রোজা, তসবী-তাহলীল আর মসজিদ-মাদরাসার চার দেয়ালের মধ্যে আবদ্ধ করে ফেলেছে অথচ কারবালার প্রশ্নে কেঁদে আকুল হয়; স্বয়ং কারবালাই তাদের গণ্ডদেশে এক প্রবল চপেটাঘাতের নাম। তারা হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহুর জন্য কেঁদে বুক ভাসায় ঠিকই, কিন্তু তাঁর আদর্শ অনুসরণ করে জালিমশাহীর চোখে চোখ রেখে কথা বলার সাহস করে না কখনো। তারা নামাজ, তসবী-তাহলীল শেষ করে মসজিদ থেকে বেরিয়ে সত্যের বিজয়ের লক্ষ্যে শাহাদাতের প্রস্তুতি নিতে পারে না। তাদের জন্যই নজরুলের কবিতা- ‘উহারা চাহুক দাসের জীবন, আমরা শহিদি দর্জা চাই/ নিত্য মৃত্যু-ভীত ওরা, মোরা মৃত্যু কোথায় খুঁজে বেড়াই।’

হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন নবিজির অতি আদরের দৌহিত্র। তাঁর গালে আদর করে অসংখ্যবার চুমু খেয়েছেন তিনি। নাতিদের প্রতি তাঁর ভালোবাসা এতটাই সুতীব্র ছিল যে, তিনি বলতেন- ‘যে ব্যক্তি হাসান-হুসাইনকে ভালোবাসলো, সে আমাকে ভালোবাসলো।’ তাঁরা দুজন সমস্ত বেহেশতী যুবকের সর্দার হবেন বলে ঘোষণা করেছেন নবিজি। স্বয়ং আল্লাহর রাসূলের নাতি হিসেবে লোকদের মাঝে একটি আলাদা সম্মানের আসন ছিল তাঁর জন্য। তিনি চাইলেই মদিনার মসজিদে নামাজ-কালাম, তসবী-তাহলীলে ব্যাপৃত থাকার জীবন বেছে নিতে পারতেন। কিন্তু কেন তিনি শাহাদাতের রক্তমাখা পথকে বেছে নিলেন? 

রাসূল সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দেখিয়ে যাওয়া পদ্ধতিকে উপেক্ষা করে ইয়াজিদ ভিন্নভাবে ক্ষমতা দখলের নীতি অবলম্বন করেছিল। আল্লাহ প্রদত্ত বিধানমতে- নিজেই নিজেকে খলিফা ঘোষণা করবার কোনো সুযোগ নেই। খোলাফায়ে রাশেদিনের জীবনী পর্যালোচনা করলেও আমরা তেমনটিই দেখতে পাই। তাঁদের কেউ-ই নিজেই নিজেকে খলিফা হিসেবে ঘোষণা করে খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেননি। কেবল একজন ব্যক্তির কথায় খলিফা মনোনীত করা হয়নি কাউকে। কোনো খলিফাই তাঁর সন্তানকে নিযুক্ত করে যাননি পরবর্তী খলিফা। স্বয়ং রাসূল সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুকে খলিফা হিসেবে মনোনীত করে যাননি।

কাজেই হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহু যখন দেখলেন- ইয়াজিদ খিলাফতের নবিজি প্রদর্শিত পদ্ধতিকে নিয়ে রীতিমতো খেল-তামাশায় মত্ত হয়েছে, তখন তিনি আর কিছুতেই বসে থাকতে পারলেন না। এমতাবস্থায় কোনো সত্যিকার মুমিনের নফল নামাজ, তসবী-তাহলীল নিয়ে ব্যস্ত থাকা শোভা পায় না। শাহাদাতের রক্তাক্ত ময়দান বেছে নেওয়াই তখন তার জন্য ইসলাম কর্তৃক নির্দেশিত কর্তব্য। হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহু মদিনা থেকে ছুটে চললেন কুফার দিকে, ইয়াজিদ তার অবৈধ রাজত্ব যেখানে কায়েম করেছে। তাঁকে পথিমধ্যে আটকে দেওয়া হলো। কিন্তু সত্য পথের সিপাহসালার কখনো পিছু হটতে জানেন না; হয় বিজয়, নয় শাহাদাত। ইমাম এগিয়ে গেলেন শাহাদাতের দিকে। 

৩.

হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর আন্দোলন ছিল পুরোপুরি রাজনৈতিক এবং আধ্যাত্মিক। তিনি শাহাদাতের পূর্বে এক ঐতিহাসিক বক্তব্য দিয়েছিলেন।  সেই বক্তব্যে বলেন,  ‘জেনে রাখ! এ শাসকদল (বনি উমাইয়া) শয়তানের আদেশ মেনে চলছে, আল্লাহর আদেশ অমান্য করছে এবং দুর্নীতিকে বানিয়েছে প্রতিদিনকার নিয়ম। তারা অধিকারসমূহকে এক জায়গায় জমা করেছে। মুসলমানদের সম্পদের ভান্ডারকে (বাইতুল মাল) তাদের নিজেদের জন্য নির্দিষ্ট করে নিয়েছে, আল্লাহর হারামকে অনুমতি দিয়েছে এবং তাঁর হালালকে নিষেধ করেছে। আমিই সবচেয়ে যোগ্য তাদের বিরোধীতা করাতে।’ [তথ্যসূত্র : তাবারী] অতঃপর ইমাম তাঁর কথাকে কাজে পরিণত করেন। শুরু করেন বাতিলের বিরুদ্ধে তীব্র সংগ্রাম।

এরও আগে ৬০ হিজরির জিলহাজ্জ মাসে মিনায় একটি ভাষণ দিয়েছিলেন নবি-দৌহিত্র। সেই ভাষণে তিনি তাঁর বিপ্লব ও সংগ্রামের উদ্দেশ্য সবিস্তারে তুলে ধরেছিলেন। ভাষণটি তিনি দিয়েছিলেন মক্কায় থাকাকালীন। মুয়াবিয়া রাদিআল্লাহু আনহুর ইন্তেকালের পর যখন ইয়াজিদের পক্ষে বাইয়াত করার জন্য তাঁর ওপর জোর-জবরদস্তি শুরু হয়, তখন তিনি মদিনা ত্যাগ করে মক্কার উদ্দেশে রওয়ানা দেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল একাধারে হজ পালন করা এবং হজের জন্যে আগত মুসলিম বিশ্বের মানুষদের উদ্দেশে ইয়াজিদের ব্যাপারে সতর্কবাণী পৌঁছে দেওয়া। সেই ভাষণে তিনি বলেছিলেন, ‘আল্লাহ সৎকাজের নির্দেশ এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করাকে ফরজ করেছেন। কারণ তিনি জানতেন- যদি এই ফরজটি পালন করা হয় বা প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে সহজ-কঠিন সব ফরজই পালন করা হবে।’

আজকের ইসলামি রাজনীতির বাস্তবতায় কারবালাকে সামনে রাখা, ইমাম হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর শাহাদাতের নজরানাকে নিয়ে বারংবার আলোকপাত করা ভীষণ জরুরি। মুসলিমদের মধ্যে যে গোলামীর মানস তৈরি হয়েছে, ইসলামকে কেবল মসজিদের চার দেয়ালের মধ্যে আটকে ফেলার যে সংকীর্ণ এবং আত্মঘাতী মনোবৃত্তি তৈরি হয়েছে; তা থেকে বের করে উন্মুক্ত কারবালায় দাঁড় করিয়ে দিতে হবে তাদের। আল্লামা ইকবালের দৃপ্ত কণ্ঠের ঘোষণা পৌঁছে দিতে হবে কর্ণকুহরে- ‘প্রতিটি কারবালার পরেই ইসলাম আবার জিন্দা হয়।’ আমাদের প্রস্তুতি নিতে হবে। ওই তো দাঁড়িয়ে হাতছানি দেয় কারবালার রক্তভেজা মাঠ!

লেখক : সহকারী সম্পাদক, ছাত্র সংবাদ
Email : [email protected]

আপনার মন্তব্য লিখুন

কপিরাইট © বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির