post

তত্ত্বাবধায়ক বিলোপ ও গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে ‘কালো অধ্যায়’

সরদার আবদুর রহমান

২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৩

এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের সফল সমাপ্তি বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে ইতিবাচক আবহ তৈরি হয়েছিল তা পূর্ণতা পায় মূলত সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংযুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে। এটি যেমন তাত্ত্বিকভাবে সত্য তেমনই তা বাস্তবেও রূপ লাভ করে। কিছু ‘বিচ্যুতি’ স্বীকার করেও এই পদ্ধতিটি এদেশের রাজনীতির আচরণগত দিক বিবেচনা করেই জনগণ মেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু দলীয় স্বার্থান্ধ ও স্বার্থান্বেষী মহল সেটি টিকে থাকতে দেয়নি। গত দেড় দশকজুড়ে এই সর্বসম্মত ব্যবস্থাটি সংবিধান থেকে বিলোপের পর থেকেই গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে ‘কালো অধ্যায়’ ছায়া ফেলতে থাকে। 

এই বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে বিচার-বিশ্লেষণ অব্যাহত রয়েছে। তাতে মোটা দাগে দেখা যায়, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধান থেকে বিলুপ্ত করার বিষয়টি সাধারণ মানুষ মেনে নিতে পারেনি। দেখা যায়, জনগণের ম্যান্ডেট বা সম্মতির কোনো পরোয়া না করেই সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলোপ করা হয়েছে। এ বিষয়ে উচ্চ আদালতের রায়ে প্রদত্ত নির্দেশনাও উপেক্ষা করা হয়েছে। অন্যদিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলোপ করা সংক্রান্ত সংবিধান সংশোধনে সরকারের নির্বাচনী কোনো ওয়াদাও ছিল না। ছিল না কোনো দলীয় ইশতেহারও। কেবলই দলীয় সুবিধা হাসিলে সংসদে একতরফা সংখ্যাগরিষ্ঠতার সুযোগে পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করা হয় বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন। অভিযোগ উঠেছে, বর্তমানে চলমান বিরোধীদলীয় আন্দোলন মূলত মানুষের ভোটের হারানো অধিকার ফিরিয়ে আনার জন্য হলেও একে সরকার ও বিরোধীদের মধ্যে নিছক ‘ক্ষমতার দ্বন্দ্ব’ হিসেবে তুলে আনার চেষ্টা করছে সরকার সমর্থক মহল। সাম্প্রতিক সময়সহ বর্তমান সরকারের আমলের বিভিন্ন পর্যায়ের নির্বাচনগুলো নিছক ভোটারবিহীন রুটিন ওয়ার্কের রূপ নিয়েছে। বিশে^র গণতন্ত্রকামী দেশগুলোর নজরদারির মধ্যেও এই অবস্থা অব্যাহত রয়েছে। 


জনগণের সম্মতি উপেক্ষা

বিশ্লেষকরা তাঁদের পর্যালোচনায় দুটি আন্তর্জাতিক মানের গবেষণার উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে একজন গবেষক তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলোপকারী পঞ্চদশ সংশোধনীকে ‘অসাংবিধানিক’ আখ্যা দেন। তিনি সংশোধনী প্রণয়নের প্রক্রিয়া ও ঘটনাক্রম তুলে ধরে বলেন, আওয়ামী লীগ ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জয়ী হলেও তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিলোপের কোনো প্রস্তাব ছিল না। ফলে তা ছিল ম্যান্ডেটের বাইরে সম্পাদিত কাজ। অর্থাৎ এক্ষেত্রে ‘জনগণের সম্মতি’র বিষয়টি উপেক্ষা করা হয়েছে। এছাড়াও সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন প্রশ্নে একটি রাজনৈতিক সঙ্কটের পরিপ্রেক্ষিতে আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণে প্রণীত ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার প্রবর্তন হয়েছিল। আর ত্রয়োদশ সংশোধনী অনুমোদনে সব দলের ভোটের সুযোগ না থাকলেও সংশোধনীটির নেপথ্যে ছিল সর্বদলীয় সমঝোতা বা মতৈক্য। আবার, তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বিলোপের সময়ে প্রধান দলগুলোর নেতৃত্বে এর বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রতিবাদ হয়েছে। ফলে এটি প্রতিষ্ঠিত যে, ওই সংশোধনীর প্রতি জনসমর্থন ছিল না।

একই গবেষক তাঁর বিশ্লেষণে বলেন, ত্রয়োদশ সংশোধনীকে হাইকোর্ট বৈধ বলে ঘোষণার পর আপিল পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে পড়ে থাকলেও আপিল বিভাগ তা হঠাৎ করে শুনানি করার উদ্যোগ নেয় ক্ষমতাসীন দল সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ গ্রহণের পর। এরপর স্বল্পতম সময়ে তার শুনানি সম্পন্ন করা হয়, যাতে অধিকাংশ অ্যামিকাস কিউরির মতামত উপেক্ষিত হয় এবং আপিল বিভাগের ৪-৩ ব্যবধানে সংক্ষিপ্ত আদেশ দেওয়া হয়। এতে আদালতের সিদ্ধান্তের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণের সুযোগ দেওয়া হয়নি। এছাড়াও পূর্ণাঙ্গ রায়টি এক বছরের বেশি সময় পর প্রকাশ করায় সংখ্যালঘুর মতামত আলোচিত হওয়ার কোনো সুযোগই মেলেনি। অথচ সংক্ষিপ্ত আদেশের দোহাই দিয়ে পঞ্চদশ সংশোধনী পাস হয়ে যায়। গবেষক উল্লেখ করেন, আদালত রাজনৈতিক অস্থিরতা এড়াতে পরবর্তী দুটি নির্বাচনের জন্য তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বহাল রাখার জন্য যে অভিমত দিয়েছিলেন, তা উপেক্ষিত হওয়াও সংশোধনীটির বৈধতা ক্ষুণœ করে।


সংশোধনী রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে?

অপর একটি গবেষণায় সংবিধানের ১৭টি সংশোধনীর পর্যালোচনা করে গবেষক উপসংহারে বলেন, এসব সংশোধনী আনা হয়েছে রাজনীতির প্রকৃতি পরিবর্তন এবং শাসক ও ক্ষমতাসীন দলের স্বার্থে। পঞ্চদশ সংশোধনীর প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করে তিনি দেখিয়েছেন, সংবিধান সংশোধনের জন্য কীভাবে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করা হয়েছে। এই গবেষক পঞ্চদশ সংশোধনী বিষয়ে গঠিত সংসদীয় বিশেষ কমিটির ২৯ মার্চ ২০১১-এ অনুষ্ঠিত চতুর্দশ সভার কার্যবিবরণী উদ্ধৃত করে বলেন যে, কমিটির একমাত্র আলোচ্যসূচি ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা এবং বিষয়টিতে উঁচু মানের বিতর্ক হয়। বিতর্কের পর সব সদস্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার রাখার প্রশ্নে সম্মত হন, কিন্তু তিন মাস পর সংসদ অধিবেশনে কমিটির যে প্রতিবেদন পেশ করা হয়, তাতে ওই সিদ্ধান্ত অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এতে নির্বাহী বিভাগের নেপথ্য প্রভাবের ইঙ্গিত মেলে। ক্ষমতাসীন দল ও জোটের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সংসদে বিষয়টিতে আর কোনো অর্থবহ বিতর্ক হয়নি।

সংবিধান নিয়ে অপকৌশল

সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা তুলে দেওয়ার জন্য প্রায়ই উচ্চ আদালতের রায়ের অজুহাত দেওয়া হয়ে থাকে। কিন্তু একই রায়ের একাংশ মানা এবং আরেক অংশ না মানার অপকৌশল গ্রহণ করা হয়। রায়ে দ্বিতীয় বিকল্প হিসেবে ‘আগামী দুই মেয়াদে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন করা যেতে পারে’ বলে উল্লেখ করা হয়। অথচ দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন করার উগ্র বাসনা থেকেই এই বিকল্পকে আমল নেওয়া হয়নি। রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা একেবারে বাতিল করে দেওয়ার কথাও বলা হয়নি। উচ্চ আদালত অপর একটি মামলায় এরশাদের সামরিক শাসনকেও অবৈধ বলে রায় দেন। এরশাদের আমলের কর্মকাণ্ডকে মার্জনা করা হলেও ‘অবৈধ ক্ষমতা দখলকারী’ হিসেবে এরশাদ তার দায় এড়াতে পারেন না বলে উল্লেখ করা হয়। রায় অনুযায়ী, এই ধরনের অবৈধ ক্ষমতা দখলকারীকে যথাযথভাবে শাস্তি (সুইটেবল পানিশ) দেওয়া যেতে পারে। তবে সংসদ এ বিষেয় আইন প্রণয়ন করতে পারে বলেও রায় দেওয়া হয়। কিন্তু মহাজোটের সংসদে এরশাদকে শাস্তি দিতে কোনো আইনপ্রণয়ন করা হয়নি। বরং মহাজোটের শরিক হিসেবে তাদের সকল রকম সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়েছে। একে ‘দ্বিচারিতা’ বলেও মনে করেন বিশ্লেষকরা।


সমাধান-সূত্র

বিশ্লেষকগণ মনে করেন, আদালতের পর্যবেক্ষণ ও মতামত উপেক্ষিত হওয়ায় রাজনৈতিক বিরোধ যে তুঙ্গে উঠেছে এবং জনজীবন ও রাষ্ট্রের নিরাপত্তা গুরুতর বিপদে নিপতিত হয়েছে, তা অনস্বীকার্য। তাঁরা প্রশ্ন তোলেন, তাহলে সমাধানের জন্য কেন আদালতের ওই অভিমতকে এখনো প্রাসঙ্গিক গণ্য করা ও তা অনুসরণের পথ অনুসন্ধান করা যাবে না? দুই মেয়াদে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বহাল রাখার পরামর্শ দশম ও একাদশ সংসদের গণ্ডিতে না ভাবলেই তো সেটা সম্ভব। তা ছাড়া বিচারপতি খায়রুল হকের উত্তরসূরি একজন সাবেক প্রধান বিচারপতি অবসর গ্রহণের পর রায় লেখায় তা আইন ও সংবিধান পরিপন্থী বলে গণ্য করা হয়। অথচ খায়রুল হকের অবসরের প্রায় ১৬ মাস পরে লেখা ত্রয়োদশ সংশোধনীর রায় সংবিধান-পরিপন্থী হবে না কেন পর্যবেক্ষকগণ সে প্রশ্নও তুলছেন। 


২০১৪ সালে সূচিত হয় ‘কালো অধ্যায়’ 

দেশে ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা’ বাতিলের পর প্রথম অনুষ্ঠিত ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে জাতীয় রাজনীতিতে এক ‘কালো অধ্যায়’ সূচিত হয়। একতরফাভাবে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে গিয়ে গ্রহণ করা হয় পোড়ামাটি নীতি। ভোটারবিহীন নির্বাচনে ছিল না জনমতের কোনো তোয়াক্কা। নির্বাচন কমিশনসহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে অপব্যবহারের নয়া রেকর্ডসৃষ্টি হয়। ফিরে দেখা সেই সময়ের পর্যালোচনা করতে গিয়ে এই পরিস্থিতি লক্ষ করা যায়।

বিচারপতি খায়রুল হকের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে মূলত দলীয় সরকারের অধীনেই জাতীয় নির্বাচনের পথ প্রশস্ত করা হয়। এর ফলে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নিজেদের অধীনে নির্বাচন করে পুনরায় ক্ষমতায় আসীন হবার সুযোগ পায়। প্রসঙ্গত, দেশের শীর্ষ আইনজ্ঞদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই দেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার বহাল রাখার পক্ষে বরাবর মত প্রকাশ করে আসছিলেন। এর মধ্যে হাইকোর্টের তিন বিচারপতি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বৈধতার পক্ষে রায় দেন। আবার আপিল বিভাগের ৭ জন বিচারপতির মধ্যে ৪ জন এর বিপক্ষে রায় দেন এবং দু’জন পক্ষে ও একজন কোনো পক্ষেই মত না দিয়ে বিষয়টি সংসদের উপরে ছেড়ে দেন। যোগফলে দেখা যায়, দুই কোর্টের ১০ বিচারপতির মধ্যে ৫ জন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বৈধতার পক্ষে, চারজন বিপক্ষে ও একজন মাঝামাঝি অবস্থান নেন। আর, আপিল বিভাগে শুনানির সময় আদালতের পক্ষ থেকে অ্যামিকাস কিউরি (আদালতের আইনি সহায়তাকারী) হিসেবে শীর্ষস্থানীয় ৮ জন আইনজীবীকে বক্তব্য প্রদানের সুযোগ দেওয়া হয়। এদের মধ্যে ৭ জনই তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বহাল রাখার পক্ষে মত দেন। এমনকি শুনানিকালে সরকারের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমও তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বহাল রাখার পক্ষে বক্তব্য প্রদান করেন।


অনৈতিকতা আর শঠতার ছড়াছড়ি

তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের পর অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনকে প্রহসনের রেকর্ড সৃষ্টিকারী, চরম বিতর্কিত, দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মতের বিরুদ্ধে এবং দেশ-বিদেশে প্রবল নিন্দা কুড়ানোর একটি আয়োজন ছিল বলে পর্যবেক্ষকগণ মনে করেন। যে কোনো আড্ডায়-জটলায় সর্বস্তরের মানুষের ভেতরে একই আলোচনা ছিল- নির্বাচনের নামে কেবল ‘শঠতা ও অনৈতিকতা’র অনুশীলন হয়েছিল মাত্র। এর মধ্য দিয়ে তিল তিল করে গড়ে তোলা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অপমৃত্যু ঘটানো হয়।

পর্যালোচনায় দেখা যায়, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার নামে প্রহসনের এক নয়া বিশ্ব রেকর্ড সৃষ্টি হয়। এছাড়া অতীতের নির্বাচনের তুলনায় এই নির্বাচনে প্রার্থীর বিপুল সঙ্কট দেখা যায়। বিরোধীদের হাত-পা বেঁধে একতরফা নির্বাচন আয়োজন করার উদাহরণ তৈরি হয়। এই প্রথম একটি জাতীয় নির্বাচনে শীর্ষ নেতাদের প্রায় কারোরই ভোট দেবার সুযোগ হয়নি। জাতীয় পার্টি ও এরশাদকে নিয়ে এক চরম অনৈতিকতার আশ্রয় নিতে দেখা যায়। একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নির্বাচন কমিশনকে অপব্যবহারের নয়া রেকর্ডও স্থাপিত হয়। নির্বাচনে ভোটারের কোনো প্রয়োজন না হওয়ায় জনমতেরও কোনো তোয়াক্কা করার দরকার পড়েনি।


কলঙ্কজনক অধ্যায় রচনা

২০১৪ সালের সেই নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রে অগ্নিসংযোগ, সর্বনিম্ন ভোটার উপস্থিতি, জাল ভোটের মহোৎসব ও ব্যালট পেপার ছিনিয়ে নিয়ে সেগুলো পূরণ করা, একেকজন শত শত ভোট দিয়ে উল্লাস প্রকাশ, সর্বাধিক সংখ্যক কেন্দ্রে ভোট স্থগিত হওয়া, বহুসংখ্যক প্রার্থীর ভোট বয়কটের ঘোষণা দেওয়া- প্রভৃতি ঘটনা দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থাকে চরমভাবে কলঙ্কিত করে। অন্তত ৪১টি কেন্দ্রে আদৌ কোনো ভোট পড়েনি- এমন ঘটনাও ঘটে। আবার বেলা ১টার মধ্যে মাত্র ৩ শতাংশ ভোট কাস্টিং হলেও বিকেল ৪টায় তা হয়ে যায় ৭০ ভাগের ওপরে। অনেক স্থানে পুরো একটি পরিবারের ভোট অন্যরা দিয়ে দেয়। বিভিন্ন কারণে সারা দেশে প্রায় সাড়ে ৫শ’ কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ স্থগিত করতে হয়। তিন শ’ আসনের মধ্যে অর্ধেকেরও কম আসনে ভোট করতে গিয়েও এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন অভিযোগ এনে ভোট গ্রহণের দিনে অন্তত ২০ জন প্রার্থী নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন। তাদের মধ্যে মহাজোটের শরিক জাতীয় পার্টি, জাসদ ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ছিলেন। এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রাণহানির ঘটনাও একটি রেকর্ড। শুধু নির্বাচনের দিনই ২১ জনের মতো লোক নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। বিশ্লেষকদের মতে, এ নির্বাচনকে ঘিরে যে সহিংসতা ঘটে তা অতীতের কোনো নির্বাচনে দেখেননি দেশবাসী। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২৫ নভেম্বর নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে জুন পর্যন্ত প্রায় দেড় শ’ লোকের প্রাণহানি ঘটে। ব্যয়ের দিক থেকেও রেকর্ড গড়ে এই নির্বাচন। ২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনে ব্যয় হয় ১৬৫ কোটি টাকার কিছু বেশি। ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্যয় হয়েছিল ৭২ কোটি ৭১ লাখ টাকা। এর আগের নির্বাচনগুলোর ব্যয় ছিল আরো অনেক কম। আর ২০১৪ সালের নির্বাচনে অর্ধেকেরও বেশি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রার্থীরা নির্বাচিত হয়ে যাওয়ার পরেও ব্যয় ২৯১ কোটি টাকা পুনর্নির্ধারণ করা হয়।


বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার রেকর্ড

এবারের নির্বাচনকে কোনো কোনো ভাষ্যকার ‘শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ তামাশা’ বলে আখ্যায়িত করেন। কোনো নির্বাচন ছাড়াই ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫৩ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতিয়ে দেওয়া হয় প্রার্থীদের। এসব আসনে কাউকে ভোট দেয়ার জন্য ভোট কেন্দ্রে যেতে হয়নি। বাকি ১৪৭ আসনে কেবল নির্বাচনের মহড়া দেওয়া হয় ৫ জানুয়ারি। এগুলো শুধু তাদের জোটের শরিকদের মধ্যে বণ্টন করে দেওয়া হয়। একজন বিশ্লেষকের মতে, একদিকে ১৫৩টি আসনের জন্য ৪ কোটি ৬৮ লক্ষ ৬৯ হাজার ভোটারকে ভোট দেওয়া তো দূরের কথা, ভোট কেন্দ্রে যেতেও হয়নি। আর বাকি ১৪৩টিতে ভোটের নামে কী করা হয় দেশবাসী তা প্রত্যক্ষ করে। এই নির্বাচনে প্রার্থীর সংখ্যাও ছিল ইতিহাসের সর্বনিম্নতম। ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫৩টি আসনের বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ও ১৪৭টি আসনের প্রার্থীসহ মোট প্রার্থীর সংখ্যা দাঁড়ায় ৬৮৬ জন। 


পর্যবেক্ষক পাঠায়নি ৭৮টি রাষ্ট্র

অতীতের জাতীয় নির্বাচনগুলোতে বিদেশি পর্যবেক্ষক ও গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের ব্যাপক উপস্থিতি থাকলেও ওই নির্বাচনের চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। নির্বাচন একতরফা হওয়া, প্রায় ৫ কোটি ভোটারকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করে ১৫৩ আসনে ভাগাভাগির ভিত্তিতে সরকার সমর্থক প্রার্থীদের নির্বাচিত ঘোষণা এবং নির্বাচন পর্যবেক্ষণের কাক্সিক্ষত পরিবেশ না থাকায় ২৮ রাষ্ট্রের জোট ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ৫৩ স্বাধীন রাষ্ট্র নিয়ে গঠিত কমনওয়েলথ এবং যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া নির্বাচন পর্যবেক্ষণ না করার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেয়। এর মধ্যে কেবল ভারত ও ভুটানের ৪ পর্যবেক্ষক ঢাকায় আসেন বলে জানা যায়।

অন্যদিকে, জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রভৃতিসহ অসংখ্য দেশ প্রধান বিরোধী দলসহ সকল দলের অংশগ্রহণে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানে সকল ব্যবস্থা নিতে সরকারের প্রতি অনুরোধ জানায়। কিন্তু সবকিছুকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে একতরফা নির্বাচন সম্পন্ন করা হয়। এমন পরিস্থিতি বাংলাদেশের ইতিহাসে আর কখনো ঘটেনি বলে অভিজ্ঞমহল মনে করেন।


বিদেশি হস্তক্ষেপের ধুয়া 

এদিকে দেশে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য যে আন্দোলন চলমান তাকে ‘বিদেশি হস্তক্ষেপ’ নামের পাল্টা ইস্যু জিইয়ে রেখে সেই আন্দোলনকে চাপা দিতে চেষ্টা করছে সরকারি জোটের নেতৃবৃন্দ। তারা নির্বাচন পক্ষপাতমুক্ত হওয়ার পক্ষে কথা না বলে কথিত বিদেশি হস্তক্ষেপের ধুয়া তুলছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সাম্প্রতিক মার্কিন ভিসানীতি ঘোষণার বহু আগে থেকেই সরকার-বিরোধীরা একটি নিরপেক্ষ সরকার প্রতিষ্ঠা করে তার মাধ্যমে আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি করে আসছে। সেই প্রত্যাশিত সরকারের নাম তত্ত্বাবধায়ক হোক বা নির্দলীয় অথবা নিরপেক্ষ- যে নামেই হোক সেটি প্রতিষ্ঠার জন্য সেই ২০১২-১৩ সাল থেকেই বিভিন্নভাবে কর্মসূচি পালিত হয়ে আসছে। সর্বশেষ, আগামী সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এই কর্মসূচি নতুন মাত্রা পেয়েছে। এর মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের নির্বাচন ও মানবাধিকারকে কেন্দ্র করে একটি নতুন ভিসানীতি ঘোষণা করে। তার কিছু রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া হলেও সেটি আগামী নির্বাচনে কতটা প্রভাব ফেলতে পারবে তা নিশ্চিত নয়। তবে নির্বাচনী ইস্যুতে বিরোধীপক্ষের দাবি জনমনে ব্যাপক আলোড়ন তুলতে সমর্থ হয়। এমতাবস্থায় সরকারি জোটের নেতৃবৃন্দ একে পাশ কাটাতে ‘বিদেশি হস্তক্ষেপ’ ইস্যু সৃষ্টি করে তার পক্ষে মাঠ গরমের চেষ্টা করছেন বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করেন।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বিরোধীদের এতদিনের ‘নিরপেক্ষ নির্বাচন’ দাবির বিরুদ্ধে মহাজোটের শরিকেরা কোনো বক্তব্য দেননি। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিগত নির্বাচন যে একতরফা ও পক্ষপাতমূলক হয়েছে তার সাক্ষ্যও দিয়েছেন। কিন্তু নির্বাচন এগিয়ে আসায় এবং দেশে-বিদেশে নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবি উচ্চকিত হওয়ায় এই শরিকদের ক্ষমতা হারানোর আতঙ্ক পেয়ে বসেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশসমূহ। তাদের বিভিন্ন উদ্যোগ সরকারকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। তবে বামপন্থী শরিকরা এতোদিন পর্যবেক্ষণে থাকলেও একদা তাদের আন্তর্জাতিক পৃষ্ঠপোষক চীন ও রাশিয়া বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের অবস্থানের পক্ষে থাকার ঘোষণা দেওয়ার পর তারা চাঙ্গা হয়ে ওঠেছেন বলে মনে বিশ্লেষকরা মনে করেন। 


পর্যবেক্ষকদের অভিমত

একজন পর্যবেক্ষক অভিমত প্রকাশ করেছেন, প্রথমে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসানীতি, এরপর কংগ্রেসম্যান ও ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্যদের চিঠি- এসব ঘটনায় সরকারের ওপর একধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক পদক্ষেপের কঠোর সমালোচনা করেছে চীন। দেশটি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন সরকারকে সমর্থন জানিয়ে প্রকাশ্যে বক্তব্য দিয়েছে। চীনের এমন অবস্থানে দেশটির প্রতি বাংলাদেশ আরো বেশি ঝুঁকে পড়ছে কি না- এমন আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে সরকারকে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হচ্ছে। চীন ও ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করেই পরিস্থিতি সামলাতে চাচ্ছে সরকার। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ কমানোর লক্ষ্যে সরকার নিজে থেকেও নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের চাপ কমাতে আওয়ামী লীগ সরকার কংগ্রেসম্যানদের চিঠির অভিযোগের জবাব দেওয়াসহ বিভিন্ন তৎপরতা চালাচ্ছে। এই তৎপরতার পাশাপাশি ভারতের ওপরও নির্ভর করছে সরকার।

অপর একজন সাবেক কূটনীতিক ও বিশ্লেষক মন্তব্য করেন, বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন দলের নেতারা অবিরাম বলে যাচ্ছেন যে, বর্তমান সরকারের অধীন আগামী নির্বাচন হবে অবাধ ও স্বচ্ছ এবং জনগণ স্বাধীনভাবে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। প্রধানমন্ত্রীও বলেছেন, অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশে যেভাবে নির্বাচন হয়, বাংলাদেশেও সেভাবেই হবে। কিন্তু সমস্যা হলো, সাধারণ জনগণ এবং প্রকৃত বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর কেউই আশ্বস্ত হতে পারছে না যে আগামী নির্বাচন ২০১৪ বা ২০১৮ সালের মতো হবে না। আলোচনা বা আইন পরিবর্তন- যেভাবেই হোক এ বিশ্বাসটা ফিরিয়ে আনতে পারলেই সমস্যার সমাধান হতে পারতো। কিন্তু নির্বাচনে ‘নিশ্চিত বিজয়’ অর্জনের একটি ব্যবস্থা বিদ্যমান থাকা অবস্থায় সরকারই বা কেন তা করতে যাবে?

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও গ্রন্থকার

আপনার মন্তব্য লিখুন

কপিরাইট © বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির