post

‘গোপন পাপ গোপনই রাখুন’

রেদওয়ান রাওয়াহা

৩০ জানুয়ারি ২০২৩

ভুল-শুদ্ধ, পাপ-পুণ্য, ন্যায়-অন্যায় মিলিয়েই মানুষ। মানুষ ভুল করবেই। ভুল করাটাই মানুষের বৈশিষ্ট্য। প্রথম মানব আদম আলাইহিস সালাম থেকে শুরু করে পৃথিবীর সব ক’জন মানুষের দ্বারাই ভুলচুক হয়েছে। পাপের পথে জীবনে কখনো না কখনো সব মানুষেরই পা গিয়েছে। মানুষকে আল্লাহ ইচ্ছের স্বাধীনতা দিয়েছেন। সেই স্বাধীনতা দিয়ে মানুষ পাপের পথে গিয়েছে, যায়; যায় পুণ্যের পথেও।

মানুষকে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইচ্ছের যে স্বাধীনতা দিয়েছেন, ফেরেশতাদের তা দেননি বা ফেরেশতাদের ইচ্ছের সেই স্বাধীনতাটুকুন নেই। মানুষের সাথে ফেরেশতার পার্থক্য কেবল এটুকুই। আবার মানুষের সাথে ইবলিসেরও একটি মৌলিক পার্থক্য বিদ্যমান রয়েছে। সেটা হচ্ছে- পাপের পর, ভুলের পর অনুতপ্ত হওয়া। রাব্বুল আলামিনের দরবারে নতশিরে ক্ষমাপ্রার্থনা করা। 

ইবলিস ভুল করে না, সে জেনে-বুঝেই অন্যায় করে। পাপের পাহাড় গড়ে। ভুল আর অন্যায়ের মধ্যে একটা সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে। ইবলিস ইচ্ছে করেই আল্লাহর আদেশ অহঙ্কারবশত অমান্য করেছে, এখনো করে যাচ্ছে। তার কৃত অন্যায়ের পরে সে অনুতপ্ত হয়নি। বরঞ্চ সে নিজের অন্যায়ের পক্ষে আল্লাহর সামনে একটি ব্যাখ্যা ও যুক্তি দাঁড় করায়। সেই থেকে যে তার শুরু, কিয়ামত অবধি তার অন্যায়, পাপাচার চলতেই থাকবে। পক্ষান্তরে মানুষ তার নফসের তাড়নায় পড়ে ভুল করে ফেললেও সে অনুতপ্ত হয়ে ফিরে আসে। তাওবা করে। আল্লাহ মানুষের জন্য মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত তাওবার দরজা খোলা রেখেছেন। তাই মানুষ যখনই তার ভুল বুঝতে পারে, তখনই সে ভুল থেকে ফিরে আসে। আল্লাহ তার জন্য ফিরে আসার সুযোগ দিয়ে রেখেছেন। ইবলিস আর আদমের পার্থক্যই এটা যে, মানুষ ভুল করে আবার ক্ষমাও চায়। অনুতপ্ত হয়। কিন্তু ইবলিস তা করে না। এই কথাগুলোই কিন্তু আমরা হাদিস থেকেই জানতে পারি। রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, ‘মানুষ মাত্রই গুনাহগার। আর গুনাহগারদের মধ্যে তাওবাহকারীরাই হচ্ছে উত্তম।’ (তিরমিজি-২৪৯৯)

এখন উপর্যুক্ত কথাগুলো থেকে বুঝা গেলো যে, ভুলচুক করে ফেললে, পাপ হয়ে গেলে আমাদের করণীয় হচ্ছে সেই ভুল থেকে অনুতপ্ত হৃদয়ে রাব্বুল আলামিনের দরবারে ক্ষমাপ্রার্থনা করা। তাওবা করা। উক্ত ভুল আর জীবনে দ্বিতীয়বার না করার ওয়াদা করা। এইটুকু আমরা অনেকেই করি, সাথে আরেকটা ভুলও করি। সেটা হচ্ছে আমরা যে এতোদিন ভুল করে এসেছি, পাপ করে এসেছি, সেই ভুল বা পাপকে প্রকাশ করে বেড়ানো। বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়ার এই যুগে আমরা অনেকেই নিজের পূর্ব জীবনের কৃত ভুলকে বা পাপকে খুব রসিয়ে রসিয়ে প্রচার করে বেড়াই! পূর্ব জীবনে কী করেছি, কোথায় করেছি বা কিভাবে করেছি ইত্যাদি। আর অনেকেই এগুলো করে “দ্বীনে ফেরা” নামক বয়ানের মাধ্যমে! আবার নানাবিধ রেডিওতে জীবনের গল্প নামেও এসব ঘটা করে প্রকাশ ও প্রচার করা হয়। অথচ এটা ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি বিরোধী কাজ। আমরা পূর্ব জীবনে ভুল করেছি মানে তো সে ভুলের জন্য রাব্বুল আলামিনের দরবারে অনুতপ্ত থাকবো। পাপ প্রকাশ করা মানে সেটার ব্যাপারে মানুষকে সাক্ষী বানিয়ে নেওয়া। মানুষ যখন পাপের সাক্ষী হয়ে যায়, তখন সেই পাপ কিন্তু সহজে ক্ষমাযোগ্য হয় না। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কুরআনে তার বান্দাদের উদ্দেশ্যে ঘোষণা দিয়েছেন, ‘তোমরা প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য গুনাহ পরিত্যাগ করো।’ (সূরা আনআম : ১২০)।

এখন আপনি পাপ প্রকাশের মাধ্যমে আল্লাহর দুটো আদেশ অমান্য করেছেন। একটা হচ্ছে পাপ করেছেন, তা এখন করেছেন অথবা পূর্বে করেছেন, সেটা গোপনে বা প্রকাশ্যে। তো পাপ করার মাধ্যমে আল্লাহর আদেশ অমান্য করে একটা ভুল করেছেন। আবার সেটাকে প্রকাশ করে আরেকটা অন্যায় করেছেন। আপনি এটা প্রকাশের আগে এতো মানুষ জানতো না, যা এখন জানে। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কুরআনে বলেন, ‘আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কোনো মন্দ বিষয় প্রকাশ করা পছন্দ করেন না।’ (সূরা নিসা : ১৪৮)

এখন যেখানে আল্লাহ নিজেই মন্দ বিষয় প্রকাশ পছন্দ করেন না, সেখানে আপনি কী জন্য মন্দের প্রকাশ ঘটান? পাপ করে সেটা প্রকাশ ও প্রচার করা অনেক বড়ো একটি গুনাহ। আপনার আগের কৃত গুনাহটি যদি ছোটো গুনাহ হয়, প্রকাশ করার ফলে এটি বড়ো গুনাহে রূপান্তরিত হয়ে যায়। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কিন্তু এই ধরনের ব্যক্তিকে ক্ষমা করবেন না। রাসূল সা. বলেছেন, ‘আমার সব উম্মতকে মাফ করা হবে, তবে প্রকাশকারী এর ব্যতিক্রম। আর নিশ্চয়ই এটা বড়ো অন্যায় যে, কোনো লোক রাতের বেলা অপরাধ করলো, যা আল্লাহ তায়ালা গোপন রেখেছেন। কিন্তু সে সকালে মানুষের কাছে বলে বেড়াতে লাগলো, হে অমুক! আমি আজ রাতে এই এই কাজ করেছি। অথচ সে এমন অবস্থায় রাত কাটালো যে আল্লাহ তার পাপকর্ম লুকিয়ে রেখেছিলেন, আর সে ভোরে উঠে তার ওপর আল্লাহর দেওয়া আবরণ খুলে ফেললো।’ (বুখারি-৬০৬৯)

মহান আল্লাহ পাপ প্রকাশকারীর ব্যাপারে এতো কঠোর কেন? কেন তিনি প্রকাশকারীকে ক্ষমা না করার ঘোষণা দিয়েছেন? এর কারণ হচ্ছে, একেতো আপনি গুনাহ করেছেন, আবার মুমিনদের মাঝে প্রকাশ বা প্রচারও করছেন সেই গুনাহকে। হয়তো এর মাধ্যমে আপনি নিজেকে ফুটিয়ে তোলা বা নিজেকে প্রচারের সুপ্ত ইচ্ছে পোষণ করে আছেন, বা একটুখানি ভাইরাল হওয়ার আকাক্সক্ষাতেই তা করছেন। আর নিজেকে প্রকাশ করার এই অনাকাক্সিক্ষত আকাক্সক্ষাটা হলো এক প্রকার প্রদর্শনেচ্ছা। অথচ পাপের মাধ্যমে নিজেকে প্রদর্শন করা, প্রচার করা তো ভদ্রতা বিনয়হীনতার প্রমাণ। আমরা দুনিয়ায়ও যদি আমাদের বড়োদের আদেশ অমান্য করি, তখন কি আমাদের ভেতর অনুসূচনা আর অনুতাপ আসে না? আমরা লজ্জিত থাকি না সেটা নিয়ে? অথচ মানুষের চেয়ে আল্লাহর গায়রত বা আত্মমর্যাদাবোধ অনেকগুণ বেশি। সে কারণেই তিনি সর্বপ্রকার অশ্লীল ও পাপ কাজ হারাম করেছেন। (মুসলিম-২৭৬০)

এখন আপনি পাপ করে, আল্লাহর আত্মমর্যাদায় আঘাত হানার অপরাধে লজ্জিত থাকবেন যেখানে, সেটা না করে যখন সদম্ভে তা প্রচার-প্রকাশ করে বেড়ান, প্রকাশ্যে বলে বেড়ান, তখন কিন্তু আপনি এর মাধ্যমে আল্লাহর সাথে এক প্রকার তাচ্ছিল্য প্রদর্শনের কাজই করেন বা বিদ্রোহ-ই করেন। এটা ঈমান হারানোরও একটা কারণ হতে পারে। 

দ্বিতীয়ত, আপনার এই গুনাহ প্রচারের ফলে সেই গুনাহের দিকে অন্যরাও প্রভাবিত হয়। গুনাহ বা পাপের চিন্তাটা মুমিনদের মধ্যেও ছড়িয়ে যায়। আর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার তাঁর কালামে পাকে বলছেন, ‘যেসব লোক চায়, ঈমানদারদের মধ্যে নির্লজ্জতা- বেহায়াপনা বিস্তার লাভ করুক, তারা দুনিয়া ও আখেরাতে কঠিন শাস্তি পাওয়ার যোগ্য।” (সূরা নূর : ১৯)

সহিহ বুখারিতে একটা হাদিস আছে। এরকম, “এক ব্যক্তি ইবনে উমার রা.-কে জিজ্ঞেস করলো, আপনি কিয়ামতের দিন আল্লাহ ও তাঁর মুমিন বান্দার মধ্যে গোপন আলোচনার ব্যাপারে রাসূল সা.-কে কী বলতে শুনেছেন? তিনি বলেছেন, তোমাদের এক ব্যক্তি তার প্রতিপালকের এত কাছাকাছি হবে যে, তিনি তার ওপর তাঁর নিজস্ব আবরণ টেনে দিয়ে দু’বার জিজ্ঞেস করবেন, তুমি কি এই এই (গুনাহের) কাজ করেছিলে? সে বলবে, হ্যাঁ। পুনরায় তিনি একই কথা জিজ্ঞেস করবেন। তখন উক্ত ব্যক্তি বলবে, হ্যাঁ। এভাবে তিনি তার স্বীকারোক্তি গ্রহণ করবেন। এরপর বলবেন, আমি দুনিয়াতে তোমার এই পাপগুলো লুকিয়ে রেখেছিলাম। আজ আমি তোমার এসব গুনাহ মাফ করে দিলাম। 

অতএব মানুষ হিসেবে কোনো মুমিন যদি গুনাহ করে ফেলে, তাহলে মানুষের কর্তব্য হলো গুনাহকে ঢেকে রাখা, গোপন রাখা, এবং আল্লাহর কাছে তওবা করা। আবার কিছু গুনাহ কিন্তু এমন, যা প্রকাশিত হলে দুনিয়াবি আদালতে শাস্তি অবধারিত হয়ে যায়। কারণ, তখন সাজা না দিলে আইন শৃঙ্খলার অবনতি হওয়ার সমূহ আশঙ্কা রয়েছে। মানুষের কাছে পাপ বা অপরাধটা স্বাভাবিক মনে হয়। তবে সাজা না দিলেও কোনো একটা পাপের বিষয় অন্যকে জানালে তারা ভাবতে পারে যে, “তাহলে এই কাজটাও হয়। এটাও করা যায়।” এই যে ভাবনাটা, এটার থেকেই তখন নফসের তাড়নায়-শয়তানের ধোঁকায় পড়ে মানুষ ভুল, পাপ বা অন্যায় করে ফেলে।

এবার আসুন, আল্লাহর রাসূল সা.-এর বাস্তব জীবনের আমলের দিকে তাকাই, জীবনের দিকে দেখি। রাসূলে কারিম সা.-এর কাছে এসে মানুষ জিনার গুনাহের স্বীকৃতি দিলেও তিনি মুখ ফিরিয়ে নিতেন। একবার একজন এসে বললো, হে আল্লাহর রাসূল! আমি জিনা করেছি। তিনি একে একে একবার না দুইবার না, চারবার মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন তার কাছ থেকে! (বুখারি-১৬৯১, ১৬৯২)  

এরপর যখন সেই লোক পীড়াপীড়ি শুরু করলো, রাসূলুল্লাহ সা. তখন তাকে বলছেন; নাহ, তুমি হয়তো স্পর্শ করেছো। সে লোক বললেন নাহ, আমি ব্যভিচার করেছি। তখন রাসূল সা. বললেন নাহ, হয়তো তুমি শুধু চুমো খেয়েছো। (মুসলিম-৪২৭৫)

দেখুন, কেন এমন করেছেন আল্লাহর রাসূল সা.? এই জন্যই করেছেন যে, আল্লাহর রাসূল সা.  তাকে নিষ্কৃতি দিতে চেয়েছেন, তার পাপটা যেনো সে গোপন রেখে দেয়, তা চেয়েছেন। তিনি চাইতেন মানুষের পাপ গোপন থাকুক। তারা আল্লাহর কাছে নীরবেই অনুতপ্ত হয়ে নিক। গোপনেই মাফ চেয়ে নিক। আমাদের নবী কিন্তু টেনে-হিঁচড়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে দোষ বের করতেন না মানুষের।

ইসলামের প্রথম দু’জন সম্মানিত খলিফা, আমিরুল মুমিন আবু বকর-উমর রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমাও কিন্তু তা-ই করতেন। তাদেরকেও কেউ এসে পাপের কথা প্রকাশ করলে তাঁরা বলতেন, এটা গোপন রেখে তাওবা করে নাও। মানে মানুষের দোষ প্রকাশিত হোক তা তাঁরাও চাইতেন না। তাঁদের কাছেও যখন কোনো ব্যক্তি জিনার গুনাহ স্বীকৃতি দিতো, তখন তাঁরা বলতেন, এটা আল্লাহ গোপন রেখেছেন, তুমি প্রকাশ করছো কেন? আল্লাহর পর্দায় তুমি তা গোপন রেখে তাওবা করো। আল্লাহ তাঁর বান্দাদের তাওবা কবুল করেন। (মুয়াত্তা মালিক-১৫৪৭)। তাঁদের এই কথার সমর্থনে কুরআনুল হাকিমেও একটি আয়াত আছে। যেখানে শর্ত হিসেবে বলা আছে, গুনাহের পর সেটি গোপন রেখে অনুতপ্ত হৃদয়ে আল্লাহর কাছে তাওবা করা। “তোমাদের মধ্যে যারা অজ্ঞতাবশত মন্দ কর্ম সম্পাদন করবে, অতঃপর তাওবা করবে এবং  নিজেদের শুধরে নেবে, তাহলে তো তিনি ক্ষমাপরায়ণ, দয়াশীল।” (সূরা আনআম : ৫৪)

এই হচ্ছে রাসূল সা. ও তাঁর আসহাবদের চিন্তা ও কর্ম। তাঁরা কী করেছেন, আর এখন আমরা কী করি? কারো দোষ, কারো ভুল কিভাবে পাওয়া যায় তার জন্য আমরা মাইক্রোস্কপ যন্ত্র লাগিয়ে খুঁজি। গর্ত থেকে টেনে হিঁচড়ে অন্যের দোষ বের করি। পাপ প্রকাশ করি। কেউ কেউ তো এমনও আছেন যে, নিজেই নিজের পাপ প্রকাশ করে গর্ববোধ করে, যেটা আমরা পূর্বে আলোচনা করে এসেছি। কেউ কেউ আবার অন্যের সেই দোষের প্রকাশক হয়ে গর্ববোধ করে। কী আশ্চর্য আমরা। আমাদের শিক্ষা ও চিন্তাটা। তাই না? অথচ আল্লাহর রাসূল সা. কী করেছেন? আল্লাহ কী চান?

আল্লাহ তো চান ওনার বান্দারা তাদের দোষটা ঢেকে রাখুক। নিজেরটাও রাখুক, রাখুক অন্যেরটাও। গোপনে ক্ষমা চেয়ে সংশোধন হয়ে নিক। অন্যকে গোপনে সংশোধন করে দিক। কোনো মুমিন অপর মুমিনের দোষ পেলে তা যদি ঢেকে দেয়, সেটার বিনিময়ে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালাও কিন্তু তাঁর দোষ গোপন রাখার ওয়াদা দিয়েছেন। রাসূলে আকরাম সা. বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইয়ের ত্রুটি-বিচ্যুতি গোপন রাখবে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার কৃত অপরাধও গোপন রাখবেন। (বুখারি-২৪৪২) পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইয়ের গোপন বিষয় ফাঁস করে দেবে, আল্লাহ তার গোপন বিষয় ফাঁস করে দেবেন, এমনকি এ কারণে তাকে তার ঘরে পর্যন্ত অপদস্থ করবেন।’ (আবু দাউদ-৪৮৮০)। ইমাম নববি (রহ.) উক্ত হাদিসের ব্যাখ্যায় লিখেছেন, ‘এই হাদিস থেকে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, কেবল মুনাফিক আর দুর্বল ঈমানের লোকেরাই মানুষের দোষ খুঁজে বেড়ায় এবং তা প্রকাশ করে বেড়ায়। আমরা যদি পবিত্র কুরআনুল কারিমের দিকেও দেখি, তাহলে দেখবো যে, পবিত্র কুরআনেও অন্যের দোষ খোঁজা বা গোয়েন্দাগিরি করতে নিষেধ করা হয়েছে। (সূরা হুজুরাত : ১২) 

উল্লেখ্য, সেটা ব্যক্তিগত দোষ বা পাপ আরকি। তবে যেটা সামগ্রিকভাবে প্রকাশ্যে হয়, সেটার জন্য প্রকাশ্যেই বিরোধিতা করতে হবে। আবার কেউ যদি গোপনে কারো প্রতি জুলুম করে, নিষ্কৃতির স্বার্থে বা জালিমের জুলুম বন্ধের স্বার্থে সেটাও প্রকাশ করা যায়। কুরআনুল কারিমে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন জানাচ্ছেন, “খারাপ কথার প্রচার প্রপাগান্ডা আল্লাহ পছন্দ করেন না, তবে যার প্রতি অন্যায় করা হয়েছে তার কথা আলাদা। (সূরা নিসা : ১৪৮)

আল্লাহর পক্ষ থেকে ইসলামী রাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় আইনের যে সাজা, সেটা প্রকাশ্য পাপের জন্যই। গোপনীয়ভাবে ব্যক্তিগত জীবনে আড়ালে কে কী করে সেটার জন্য নয়। বরঞ্চ অন্যের গোপনীয়তা অনুসন্ধান করে প্রকাশ করাটাই অন্যায়। সেটাও একটা পাপ। (যেটা উপরে আলোচনা করে এসেছি আমরা) এ ছাড়া কেউ যদি প্রকাশ্যে গুনাহ-পাপ-অপরাধকে প্রমোট করে, দ্বীনের বিকৃতি করে, বিরোধিতা করে, বা উক্ত ব্যক্তির পাপ সমাজের এবং মুসলমানদের ক্ষতির কারণ হয়, সেটা প্রকাশ করা যায়। প্রকাশ্যে সেটা বিরোধিতাও করা যায়। বরঞ্চ তখন জাতিকে সতর্ক করার জন্য তা করাটা আবশ্যকও বটে। কিন্তু আমরা করি উল্টোটা, প্রকাশ্য পাপের বিরুদ্ধে মজবুত অবস্থান না নিয়ে বরঞ্চ অন্যের গোপনীয় পাপ প্রকাশের জন্য হুড়োহুড়ি শুরু করি। যেটা মোটেও উচিত নয়।

উমর রা-এর সময়ে একবার এক ব্যক্তির গোপনীয় পাপ, যেটা ওই ব্যক্তি নিজের ঘরে করছিলো, সেটা দেখে তিনি ওই ব্যক্তিকে শাসিয়ে উঠলেন, তখন ওই ব্যক্তি উল্টো উমর রা.কে গোপনীয় পাপ অনুসন্ধানের দায়ে অভিযুক্ত করলেন। এবং উমর তখন নিজের ভুল বুঝতে পেরে সেখান থেকে সরেও আসছেন। শুধু কি তাই? উমর রা. ইসলামপূর্ব জাহিলি জীবনে যে পাপগুলো করেছেন, (যেমন, ইসলাম গ্রহণ করার দায়ে তাঁর বোন-ভগ্নিপতিকে প্রহার, রাসূল সা.-কে হত্যা করতে উদ্যত হওয়া) সেটাও তিনি কখনো প্রকাশ করে রগরগে বর্ণনা দেননি, বা গর্বের সঙ্গে বলেননি। যেটা আমাদের এই প্রজন্মের অনেকেই ‘দ্বীনে ফেরা’ নামক পরিভাষা দিয়ে করে যাচ্ছে নিয়মিত !

আজকে পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রের কিছু টিভি-চ্যানেল এবং আমাদের দেশেরও কিছু চ্যানেল তাদের প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে, অপরাধ-সচেতনতার মুখরোচক কথা বলে সেগুলো দিয়ে নাটক-সিনেমা-সিরিয়াল বানায়। এতে নাকি অপরাধ হ্রাস পায়। অথচ এগুলো দেখে, এগুলো থেকে উৎসাহ-উদ্দীপনা-কৌশল নিয়ে মানুষ আরো বেশি অন্যায় করে। মানব-সভ্যতা বিধ্বংসী যেসব ঘৃণিত পাপ-অপরাধ সম্পর্কে মানুষ কখনো জানতোও না, এসব দেখে মানুষ এখন সেসব জানছে। এই তো, এই বছরেরই সেপ্টেম্বরে নোয়াখালীর এক কিশোরী ছাত্রীকে তারই এক লম্পট শিক্ষক ধর্ষণ করে খুন করে। এরপর সে লম্পট শিক্ষক আদালতে স্বীকারোক্তি প্রদান করে যে, সে এটা ইন্ডিয়ান একটা সিরিয়াল দেখেই শিখেছে। (চ্যানেল ২৪, ঢাকা পোস্ট, ২৪/০৯/২২  রাত - ০৯ : ১৪) এটা তো একটা উদাহরণ কেবল। এরকম বা এরচেয়েও ভয়াবহ ও জঘন্য কিছু এসব সিরিয়াল দেখে মানুষ শিখে এবং বাস্তব জীবনে প্রয়োগও করে। এই তো কয়েক দিন আগের চট্টগ্রামের আলোচিত শিশু আয়াত হত্যাকাণ্ডটাও কিন্তু এরকম ইন্ডিয়ান সিরিয়াল আর চ্যানেলগুলো দেখেই শিখেছে খুনি। আল্লাহ আমাদেরকে এসব থেকে হেফাজত করুন। আমিন।

আসুন, সমাজ-সভ্যতা, ঈমান-আকিদাকে ধ্বংসের হাত থেকে হেফাজত করতে, আল্লাহর কাছে নিষ্কৃতি পেতে, দু’জাহানে মুক্তি পেতে, আমরা পাপের পথ ছেড়ে দিই। গোপনে কোনো পাপ হয়ে গেলে সেই গোপন পাপ গোপনই রাখি। পাপ হলে আল্লাহর নিকট ক্ষমা চাই। কারো পাপ দেখলে-ভুল দেখলে সংশোধন করার জন্য নসিহা করি। আর প্রকাশ্য পাপাচারের জন্য, অন্যায়ের জন্য প্রকাশ্যেই বাধা প্রদান করি। 

লেখক : গবেষক, ব্লগার ও কলামিস্ট

আপনার মন্তব্য লিখুন

কপিরাইট © বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির