সর্বশেষঃ
post

আগামীর রাজনীতিতে ইসলামপন্থীদের অবস্থান

আমীর হামযা

২২ জুলাই ২০২২

এক সময়ের ‘পূর্ব পাকিস্তান’ই স্বাধীন বাংলাদেশ। গত শতকের ষাটের দশকে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানি ধনীদের শোষণ-বঞ্চনায় পূর্ববাংলার কৃষকসমাজে ক্ষুব্ধতা দানা বাঁধতে শুরু করে। সেই  ক্ষোভ ধূমায়িত হয়ে তীব্র গণ-আন্দোলনে রূপ নেয়। আকণ্ঠ জুলুম বৈষম্যের অবসানে ১৯৭১-এ মুক্তির ডাক আসে। স্বাধীনতাই ছিল সবার লক্ষ্য; একমাত্র চাওয়া। এর পরিসমাপ্তি ঘটে সশস্ত্র সংগ্রামের ভেতর দিয়ে। অর্জিত হয় স্বাধীনতা। মুক্তির সুফল সবার মধ্যে সমভাবে বণ্টিত হয়ে ইনসাফভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠাই ছিল মানুষের কাম্য। কিন্তু স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে গুটিকয় ব্যক্তি রাতারাতি বিপুল অর্থবিত্তের মালিক হন। পাকিস্তান আমলে ২২ পরিবারের কথা সবার জানা। তাদের হাতে কুক্ষিগত ছিল বেশির ভাগ সম্পদ। ব্রিটিশ আমল-পরবর্তী পাকিস্তানে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় তাদের সম্পদ ফুলে-ফেঁপে ওঠে। স্বাধীনতা-উত্তরকালে অবাক বিস্ময়ে দেশবাসী দেখে- লুণ্ঠন অর্থনীতির স্বরূপ; যে বণ্টনব্যবস্থায় অধিকাংশ থাকে বঞ্চিত। বেশির ভাগের অর্থনৈতিক অবস্থা যেমন ছিল, সেই তিমিরেই রয়ে যায়। দুর্ভাগ্য জেঁকে বসেছে জনজীবনে। দৃশ্যত মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতার সুফল আমজনতার ‘হাতছাড়া’ হয়ে যায়। মুষ্টিমেয় সুবিধাভোগী যেনতেনভাবে নিজেদের ভাগ্যের চাকা ঘোরাতে মরিয়া হয়ে ওঠে।

সাধারণ মানুষ ২২ পরিবারের দুষ্টচক্রের যে বৃত্ত ভাঙতে বদ্ধপরিকর, স্বাধীনতার অর্ধশত বছরের বেশি সময় পরেও সেই আশা মরীচিকা হয়ে দুরাশায় পরিণত হয়েছে। সমতা প্রতিষ্ঠার বদলে রাষ্ট্রযন্ত্র পরিচালনাকারীরা পক্ষপাতহীন না হয়ে ঝুঁকে পড়েছেন গোষ্ঠীস্বার্থে। এ ধারাবাহিকতা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে দেশবাসীকে। তা না হলে ১৮ কোটি মানুষের দেশে কিভাবে মাত্র ২৫৫ ব্যক্তির কাছে বেশির ভাগ সম্পদ পুঞ্জীভূত হয়? 

বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে তাও ৫১ বছর। বিগত ৫১ বছরে সাধারণ মানুষ যে জীবনমান ও সামগ্রিক উন্নয়ন চেয়েছিল; অর্ধশতাব্দী পরও কাক্সিক্ষত সে লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। দেশের মোট জনসংখ্যার ২৫ শতাংশের ভাগ্যের বদল ঘটলেও বাকি ৭৫ ভাগ যে অভাব-অনটনে ছিল, সেখানে রয়ে গেছে। সৌভাগ্যের সোনার পাথর বাটি তাদের কাছে এখনো অধরা। আটপৌরে জীবনই যেন তাদের কপালের লিখন। ফলে দেশে ধনী-গরিবের বৈষম্য দিন দিন তীব্রভাবে বাড়ছে। অসহনীয় হয়ে উঠছে। কিন্তু কেন, কাক্সিক্ষত অগ্রগতি কেন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে? মোটাদাগে বলা যায়, দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের দুর্বলতায় জনতার কাক্সিক্ষত লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। এর দায় সাধারণ নাগরিকের নয়, শাসকশ্রেণির। 

৫০ বছরের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের রাজনীতির নিয়ামক শক্তি ধর্মনিরপেক্ষ সেক্যুলারপন্থীরা। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের গোড়াপত্তনের পর থেকে আজো তারা ক্ষমতায় আসীন, মানে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে আছে, তারা যে পদে পদে ব্যর্র্থতার পরিচয় দিচ্ছে; বিষয়টি দৃশ্যমান। এ নিয়ে মুখে কুলুপ এঁটে রাখা-ই প্রগতিশীলরা শ্রেয় মনে করে। শাসকশ্রেণির দুর্বৃত্তায়নে দেশ এখনো নাগরিকবান্ধব হয়ে ওঠেনি, এতো শতভাগ সত্যি। যার কারণে আমাদের সমসাময়িক সময়ে স্বাধীনতা অর্জনকারী দেশ সিঙ্গাপুর তো দূরে থাক, মালয়েশিয়ার কাতারেও যেতে পারিনি আমরা। 

এখানে বুঝতে হবে, আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় দেশ শাসন করে রাজনৈতিক নেতৃত্ব, আমলাতন্ত্র এবং তাদের সুবিধাভোগীরা। সুশীলসমাজ, ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এবং রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীসহ সবাই এককাতারে একাকার হয়ে স্বার্থরক্ষায় একাট্টা। এমন বাস্তবতায় দেশের সিংহভাগ জনগোষ্ঠী আক্ষরিক অর্থে যারা মজলুম; তাদের কাছে সেক্যুলারদের অবস্থান দিন দিন অপ্রাসঙ্গিক হয়ে আসছে, এটি বুঝতে পাণ্ডিত্য লাগে না। একটু আক্কেল-জ্ঞান থাকলেই চলে। সাদা চোখেই ধরা পড়ে।

এখন মিলিয়ন ডলার প্রশ্ন- কায়েমি স্বার্থবাদী সেক্যুলারদের ব্যর্থতায় যে শূন্যতা তৈরি হবে, সেখানে স্থলাভিষিক্ত হবেন কারা। দেশ চালানোর ভার কাদের হাতে অর্পিত হতে পারে। এর বিশ্লেষণ জটিল। তবে সমীকরণ মেলানো অসম্ভব নয়। এ জন্য কয়েকটি বিষয়ে নজর দেওয়া যেতে পারে। প্রথমত, সেক্যুলাররা শুধু গোষ্ঠীস্বার্থ রক্ষা করাই তাদের কর্তব্যকাজ বলে সাব্যস্ত করেছেন। কূটকৌশলে আঞ্জাম দিয়েছে। ফলে অধিকাংশের ভাগ্য বদল হয়নি। স্মরণযোগ্য যে, সেক্যুলাররা দেশের বেশির ভাগ মানুষের অর্থাৎ জনমানস পাঠে অক্ষম। তাই সাধারণ মানুষের সাথে তাদের বিরোধ তুঙ্গে উঠছে। গণমানুষ তাদের আর শাসনক্ষমতায় দেখতে নারাজ। 

দেশের ক্ষমতা কাঠামোতে আসন্ন যে বাঁকবদল স্পষ্ট, তাতে দুটি রাজনৈতিক শক্তি- বামঘেঁষা আর ইসলামী ভাবধারার রাজনীতির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। এখানে কথা হলো- বাংলাদেশে বামধারা গণমানুষের কাছে কোনো সময়ই হালে পানি পায়নি। তাদের জনসমর্থন অতীতেও যেমন ছিল না এখনো নেই। দ্বিতীয়ত, যে কারণে বামপন্থীদের ক্ষমতার রাজনীতিতে শক্ত অবস্থানে যাওয়া খুব কঠিন, তাহলো ৯০ ভাগ মুসলমানের ধর্মীয় আবেগ অনুভূতি বাম ধারার রাজনীতিতে গুরুত্বহীন। দেশের ভূমিব্যবস্থাপনাও বামদের প্রসারের অন্তরায়। যার কারণে এদেশে বাম আন্দোলন তেমন জোরদার হয়নি কখনো। এ বাস্তবতায় বলা যায় বামধারার রাজনীতি এদেশে হালে পানি না পাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। 

অন্য দিকে ৯০ শতাংশ মুসলমানের দেশে অল্প কিছু বাদ দিলে সবার ধর্মের প্রতি অনুরাগ প্রবল। জাতীয় সংসদেও দেখা যায়, সেক্যুলারপন্থী দলের সংসদ সদস্যরাও ইসলামের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ আল-কুরআনের উদ্ধৃতি দিয়ে থাকেন। এ থেকে সহজে অনুমেয়, সেক্যুলারপন্থীরাও আমাদের সমাজে ধর্মের মানে, ইসলামের প্রভাব কবুল করে নিয়েছেন। এ বাস্তবতায় ইসলামপন্থীরা সহজে রাজনীতির ময়দানে তাদের অবস্থান দৃঢ় করতে পারেন। কিভাবে নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিতে বাংলাদেশে ইসলামপন্থীরা শক্তিশালী হতে পারেন এ নিবন্ধে সেই আলোচনা করার চেষ্টা করবো আমরা।  

প্রথমে আসা যাক, কেন সেক্যুলাররা ব্যর্থ। তাদের দুর্বলতাই বা কী? স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সীমিত থাকায় সেক্যুলারদের অর্থলিপ্সার বাসনা ছিল সুপ্ত। কিন্তু দুরবস্থা কাটিয়ে দেশে পুঁজিপ্রবাহ বাড়তে থাকলে তাদের স্বার্থপরতা লাগামছাড়া হয়ে পড়ে। ধর্মপন্থীদের অধিকারবঞ্চিত করে, ঠকিয়ে স্বার্থ হাসিল করেছেন তারা। অবশ্য, ধর্মপন্থীদের বঞ্চনার ইতিহাসের শুরু পরাধীন বাংলায় ইংরেজ আমলে। স্বাধীন বাংলাদেশের একান্ন বছরেও তাদের বঞ্চনায় ইতি টানতে পারেনি রাষ্ট্র। এখানেই গোলবেধেছে। একসময়ের অধিকারহারা ধর্মপন্থীরা ঠকতে ঠকতে নিজেদের অধিকার বুঝে পেতে চান। তাই তারা এখন রাষ্ট্রীয় আইন-কানুনের মধ্যে থেকে নিজেদের ন্যায্য অধিকার পেতে চান। 

সেক্যুলার এবং ধর্মপন্থীদের সঙ্ঘাত বর্তমান সমাজ বাস্তবতায় দৃশ্যমান। সেক্যুলাররা এখনো আমাদের দেশে শক্তি-সামর্থ্যে এগিয়ে। বলে রাখা ভালো, সেক্যুলার বলতে সমাজে এগিয়ে থাকা শহুরে মানুষ যারা সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি এবং উচ্চবিত্তের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা জনগোষ্ঠীকে বুঝতে হবে। জানা প্রয়োজন, দেশে ধর্মনিরপেক্ষ সেক্যুলারদের কাক্সিক্ষত পরম চাওয়া কী। এ দেশে সেক্যুলারদের একান্ত চাওয়ার প্রথমটি হচ্ছে- তাদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে রাষ্ট্র। সামাজিক নিরাপত্তা সেক্যুলার ধর্মপন্থী নির্বিশেষে সবারই চাওয়া। এক্ষেত্রে সেক্যুলারদের চাওয়ার ভিন্নতা হলো- সামাজিক নিরাপত্তার নামে যাপিত জীবন নিয়ে প্রশ্ন তোলা যাবে না। কিভাবে বিত্তের মালিক হলেন; এ নিয়ে কারো কোনো কথা চলবে না। ব্যক্তিস্বাধীনতার দোহাই দিয়ে অর্জিত অর্থ কিভাবে ব্যয় করবেন; তা নিয়েও টুঁ শব্দ করা যাবে না। চাই তা নৈতিকতার মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হোক বা না হোক। দেখতে হবে আইনি কাঠামোয়। এখানে ধর্মীয় বিধিবিধানের বাদ সাধা বারণ। দ্বিতীয় যে বিষয়টির নিশ্চয়তা সেক্যুলাররা চান, তাদের আয়ের পথে নৈতিকতার বিধিনিষেধের বেড়াজাল তুলে উপার্জনের পথ রুদ্ধ করা যাবে না। আয়ের ক্ষেত্রে ধর্মীয় অনুশাসন, মানে ইসলামী বিধিবিধান মানতে নারাজ তারা।

বাংলাদেশে সেক্যুলারদের বড় সঙ্কট; তারা নিজেদের অধিকার সংবিধানের আলোকে শতভাগ সংরক্ষণ করতে যত না মরিয়া; ধর্মপন্থীদের সে অধিকার রক্ষায় ততটাই অনীহা। এ নিয়ে সেক্যুলারদের চিন্তা কাঠামো বড়ই অদ্ভুত। যেন ধার্মিকদের জীবনে বিনোদন থাকতে নেই। হোক তা বৈধ। তারা শুধু অপার্থিব কাজে জীবন ব্যয় করবে। পার্থিব সব বিষয়-আশয় শুধু সেক্যুলারদের একচ্ছত্র অধিকারে থাকবে। এ অধিকার তাদের একচেটিয়া।

দেশে সাম্প্রতিক সময়ের কিছু ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মনে হওয়া অসঙ্গত নয়, সেক্যুলার জনগোষ্ঠী মনে করে ইসলামপন্থীদের আবার কিসের ব্যক্তি-মতপ্রকাশের স্বাধীনতা! সেক্যুলারদের নিয়ন্ত্রণাধীন মূলধারার প্রায় সব গণমাধ্যমের বয়ানও একই ধরনের। একপেশে। দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া সব গণমাধ্যমই সেক্যুলারদের প্রতিনিধিত্ব করে। দেশের গণমাধ্যমের ভাবখানা এই, ইসলামপন্থীদের ব্যক্তিস্বাধীনতা থাকতে নেই। সেক্যুলারদের সম্পর্কে শেষ কথা হলো- তারা এদেশে ইসলামের কোনো উপযোগিতা খুঁজে পান না। কৌতূহলোদ্দীপক হলো- তারা নিজেদের সম্পর্কেও মূল্যায়ন করতে অপারগ। নিজেদের ভোগের জন্য যে ব্যবস্থাটি টিকিয়ে রাখতে চান; সেটি আসলে পাশ্চাত্যের সেক্যুলারিজম নয়। সেখানে আমাদের এখানে সেটি কল্পনাবিলাস মাত্র। দরিদ্র ইসলামপন্থীদের অধিকার সংরক্ষণের কোনো দায় সেক্যুলারদের চিন্তায় স্থান পায় না। যেহেতু রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদের একচ্ছত্র প্রবেশাধিকার, রাষ্ট্রও প্রতিপালনে গরজবোধ করে না।

অধিকার আদায়ে রাজনীতির চর্চা স্বীকৃত এবং আবশ্যকীয় একটি পন্থা। ইসলামপন্থীরা এখন দেশের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করছেন। প্রবণতাটি স্পষ্ট হওয়ায় সেক্যুলারপন্থীরা ভীতসন্ত্রস্ত। ফলে ধর্মপন্থীদের মোকাবেলায় সব রকমের কৌশল প্রয়োগে দ্বিধাহীন। যাতে ধার্মিকদের অগ্রযাত্রা রুখে দেয়া যায়। তবে এ সত্য এখন কবুল না করে উপায় নেই যে, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের রক্ষাকবচ ইসলাম। এটিই হচ্ছে এখনকার বাস্তবতা। তা না হলে আলাদা স্বাতন্ত্র্য নিয়ে এ ভূখণ্ডের টিকে থাকা কঠিন। কিন্তু এ জন্য ইসলামপন্থীদের যতটুকু ঐশী জ্ঞান জানা থাকা অত্যাবশক, তা অর্জনে অবশ্য সচেষ্ট হতে হবে তাদের। 

অবস্থা দৃষ্টে একথা বলা যায়, সেক্যুলারদের অর্ধশতাব্দীর কীর্তিকলাপ দেখে মনে হওয়া স্বাভাবিক, তাদের দিন শেষের পথে। তবে ইসলামপন্থীরা রাজনীতিতে সাফল্য পেতে চাইলে গুণগত পরিবর্তন আনতে হবে। আধুনিক জমানার মানুষ শুধু আদর্শিক কথায় সমর্থক হবেন; এমন নয়। তাদের ইহজাগতিক সমস্যার সমাধানও দিতে হবে। সে জন্য প্রয়োজন রাষ্ট্রে বসবাসকারী ধর্ম, বর্ণ-গোত্র অর্থাৎ সব নাগরিকের সম-অধিকার সংরক্ষণ। কিভাবে নাগরিক পরিষেবা নিশ্চিত করা যায়; বলতে হবে। সেক্যুলারদের ব্যর্থতার ওপরে ইসলামপন্থীদের সাফল্য নির্ভরশীল। এক্ষেত্রে তুরস্ক মডেল বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে সবার আগে মনোজগতে পরিবর্তন আনতে কার্যকর একটি শিক্ষা আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। এক্ষেত্রেও তুরস্কের গুলেন মুভমেন্ট নামে যে শিক্ষা আন্দোলনের কথা আমরা জানি; ওই আদলে বাংলাদেশে ইসলামপন্থীরা কাজ করলে সুফল পাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। দেশে প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা মানবসম্পদ হিসেবে শিক্ষার্থীদের গড়ে তুলতে যে দুর্বলতার পরিচয় দিচ্ছে, এর সমান্তরালে দ্রুত শিক্ষার্থীদের মাঝে একটি আদর্শিক ও সময়োপযোগী শিক্ষার বিস্তার ঘটানোর বিকল্প নেই। এতে সমাজে ইসলামপন্থীদের ইতিবাচক ভাবমর্যাদা তৈরি হবে। সামাজিক প্রভাববলয় সৃষ্টি হবে।

মনে রাখা আবশ্যক, শুধু জনপ্রিয়তায় হালজমানায় রাজনৈতিক সাফল্য আসে না। রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়া সম্ভব নয়। তা না হলে আলজেরিয়ায় ইসলামপন্থীদের নির্বাচনে বিপুল বিজয়ের পরও ক্ষমতায় যাওয়া সম্ভব হয়নি। আরো উদাহরণ মিসর এবং তিউনিসিয়া। ফলে বিদেশী বন্ধুরাষ্ট্রের সাথেও কার্যকর কূটনৈতিক সম্পর্ক তৈরি করতে হবে। এ কথা বলা যায়, রাজনীতির পাশাপাশি ইসলামপন্থীদের যে বিপুল শিক্ষিত জনশক্তি রয়েছে তাদের জনসেবার মানসিকতা নিয়ে পূর্ণোদ্যমে কাজ করতে হবে। এ বিষয়ে তাদের সুবিধা হলো, ইসলামী ভাবধারার চিকিৎসক রয়েছেন বহু। তাদের দিয়ে স্বাস্থ্যসেবা এবং আইনজীবীদের দিয়ে অধিকারবঞ্চিতদের আইনি সহায়তা দিলে জনভিত্তি গড়ে উঠতে পারে। এর ফসল বুদ্ধিমত্তার সাথে ঘরে তুলতে হবে। আর বুদ্ধিবৃত্তিক ময়দানে বাংলাদেশের নিজস্ব স্বকীয়তার একটি বয়ান দাঁড় করাতে হবে। 

এত সব সম্ভাবনার কথা বলা হলেও ইসলামপন্থীদের দুর্বলতা কিছু রয়েছে বৈকি। যেমন তাদের মূলধারার শক্তিশালী গণমাধ্যম নেই। অথচ আধুনিককালে গণমাধ্যমের ভূমিকা সর্বব্যাপী। দ্বিতীয়ত, শিক্ষিত জনগোষ্ঠী থাকলেও সমাজের অপরাপর মানুষের সাথে তুলনা করলে তাদের পেশাগত অবস্থান দুর্বল। মানে, কার্যকর জনগোষ্ঠী এখনো গড়ে ওঠেনি। তৃতীয়ত, যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ তা হলো- তাদের ঐশী জ্ঞানের দুর্বলতা। ফলে ইসলামপন্থীদের মাঝেও ভোগের মানসিকতা দেখা দিচ্ছে। যদিও এখনো এ বিষবৃক্ষ ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়েনি; তবু লক্ষণ দেখা দিয়েছে। এছাড়া তাদের আরো একটি বড় দুর্বলতা, কী ঘটছে বোঝার অক্ষমতা। তারা যে দেরিতে বুঝেন, এটা অনুধাবন করতে সময় লাগে। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে দেশের রাজনীতিতে কী ঘটতে যাচ্ছে, সে সম্পর্কে তাদের ধারণা সীমিত। শীর্ষ রাজনৈতিক দল তো দূরের কথা, নিজেদের মধ্যে যথাযথ মতবিনিময়ের অভাবে এমন অবস্থা তৈরি হয়েছে। তাদের মধ্যে গণতান্ত্রিক চর্চাও দুর্বল। দেশের বড় বড় রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা সবসময় অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে শীর্ষ পর্যায়ে ওঠে আসেন। এর মাধ্যমে তারা পারিপার্শ্বিক অবস্থা সম্পর্কে জানতে পারেন। ইসলামপন্থীরা এ ধরনের লড়াইয়ে অভ্যস্ত নন। ফলে ময়দানে সহজাত নেতৃত্ব দেয়ার ক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছেন। এমনিতে একটি শক্ত অবস্থান দেখা গেলেও বাস্তবতা ভিন্ন। শুধু সৎ হলে চলবে না, দক্ষ-যোগ্যও হতে হবে। থাকতে হবে বাস্তব জ্ঞান।

পরিশেষে বলা যায়, আগামী দিনে বাংলাদেশে ইসলামী ধারার রাজনীতির সমূহ সম্ভাবনা যেমন প্রবল, তেমনি মৌলিক দু-একটি দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে না পারলে সে সম্ভাবনা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। এক্ষেত্রে ইসলামী নেতৃত্বকে আধুনিক সময়োপযোগী কর্মপন্থা প্রণয়ন করে এগোতে হবে। তাহলেই সম্ভব মনজিলে মাকসুদে পৌঁছানো।  

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট

আপনার মন্তব্য লিখুন

কপিরাইট © বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির