post

পাথরচাপা জীবনের উপাখ্যান

আমীর হামযা

০৬ জুলাই ২০২৩

মানবসভ্যতার ভিত্তিভূমি শ্রমিকের শ্রম-ঘামের ইতিহাস। তারাই গড়ে তোলেন প্রতিটি সভ্যতা। এখানে অভিজাতদের কোনো স্থান নেই। তারা শুধু সুবিধাভোগী। আসলে সভ্যতা মানে শ্রমিকের পাথরচাপা জীবনের শোকগাথা। করুণ উপাখ্যান। সুদূর অতীত থেকে বর্তমান সময়েও একই চিত্র বিদ্যমান। সভ্যতা বিনির্মাণে সেকালে ‘দাস’ আর একালে ‘শ্রমিক’ দু’টি শব্দই সমার্থক। তাদের পরিণতিও একই সূত্রে গাঁথা।

আমাদের রাজনীতিকরা দেশে গণতন্ত্র রইল কী রইল না, ক্ষমতায় কে থাকল, কে ছিটকে পড়ল— সেসব নিয়ে হাজারো শব্দবাণ ছুড়ে থাকেন প্রতিদিন। ক্রমাগত নানা দুর্ঘটনা আর মৃত্যুর মিছিল নিয়ে সামান্য কিছু কথাও অবশিষ্ট রাখেন না তাদের। নানা ঘটনা-দুর্ঘটনায় বেঘোরে প্রাণ হারাচ্ছে সাধারণ মানুষ। দায়িত্বশীল সবার ভাবখানা এমন, চেয়ে চেয়ে দেখাই তাদের একমাত্র কাজ। এছাড়া কারো যেন কিছু করার নেই। যেমন চলছে, তেমনি চলবে। এমন এক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে সাধারণ মানুষ। এ দেশে তাদের জীবন সত্যিই মূল্যহীন। রূঢ় বাস্তবতায় অর্জিত অভিজ্ঞতায় সাধারণের মনে হতাশার সাথে এ বিশ্বাসও জন্মেছে যে, কোনো ধরনের দুর্ঘটনার কারণ শনাক্ত করে তা দূর করার পদক্ষেপ নেওয়া এ দেশে কখন-ই হয়তো সম্ভব নয়। দুর্ঘটনা ঘটলে প্রথামাফিক সংবাদপত্রে নতুন উদ্দীপনায় প্রতিবেদন আর কলাম ছাপা হবে। টিভি চ্যানেলগুলো এ বিষয়ে টকশো সম্প্রচার করবে। বিশেষজ্ঞরা মতামত দিতে থাকবেন। তবে তা আমলে নেয়ার কর্তৃপক্ষ খুঁজে পাওয়া যাবে না। এটিই এখন দেশের চালচিত্র। দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতদের মতো শ্রমিকদের জীবনও  মূল্যহীন। এর মধ্যে নির্মাণশ্রমিক যারা, তাদের জীবন আরো তুচ্ছ। তাদের ‘কানাকড়িও যেন দাম নেই’। খেটে খাওয়া মানুষ কে কীভাবে মারা গেলেন তাতে কারো কোনো মাথাব্যাথা নেই। সবাই কেমন দায়মুক্ত। 

এ দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে বোঝা যায়, স্থাপত্য শিল্পে শ্রমজীবীদের জীবন এতই মূল্যহীন যে, উন্নয়নের বিচিত্র সাফল্যগাথার কথা শুনে মনে যে পুলক জাগে; তা সবই ফিকে। বাড়িয়ে বলা হবে না, আমাদের হতাশার খণ্ডচিত্রের অভাব নেই। মানবসভ্যতার অগ্রগতিতে শ্রমিকের যতই অবদান থাকুক না কেন, তাদের জীবন বর্ণহীন। এসব হতভাগার কান্না পাথরচাপা পড়াই যেন অমোঘ নিয়তি। এ বিষয়ে একটি পরিসংখ্যান দিলে বিষয়টি একটু পরিস্কার হতে পারে। কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় ২০২২ সালে ১ হাজার ৩৪ জন শ্রমিক নিহত এবং ১ হাজার ৩৭ জন শ্রমিক আহত হয়েছেন। নির্যাতনের শিকার হয়ে ১৩৫ জন নিহত ও ১৫৫ জন আহত হয়েছেন। অথচ পৃথিবীর তাবৎ শিল্পের অন্যতম ‘কাঁচামাল’ শ্রমিক; মানে তাদের শ্রম-ঘাম। ইতিহাস সে কথার-ই সাক্ষ্যই দেয়।

দেশে প্রতি বছর বহু নির্মাণ-শ্রমিক বেঘোরে প্রাণ হারচ্ছেন। তাদের সেই করুণ উপাখ্যান থেকে যায় অজানা। সূদূর অতীত থেকে হাল আমলেও একই চিত্র। একটুও বদলায়নি। অতি বিস্ময়কর পিরামিডের কথাই ধরা যাক, পৃথিবীর সপ্ত আশ্চর্যের একটি হচ্ছে মিসরের পিরামিড। ফেরাউ বংশের শাসনামলে এসব পিরামিড নির্মিত হয়। আধুনিক স্থাপত্যকলার স্থপতিদের কাছে পিরামিডের নির্মাণশৈলী আজো রহস্যাবৃত এক দুর্ভেদ্য জগৎ। পিরামিড প্রযুক্তি এখনো অপার এক রহস্য। কীভাবে, কোন কৌশলে এত উঁচুতে দানবাকৃতির এক একটি পাথর তোলা হতো, তা বড় জিজ্ঞাসা। ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, পিরামিড নির্মাণে নির্মাণশ্রমিক ছিল বনী ইসরাঈল। তারা ছিল দাস। পিরামিড নির্মাণে তাদের বাধ্যতামূলক শ্রমে নিয়োজিত করা হতো। পিরামিড নির্মাণকালে বিরাট বিরাট পাথর উত্তোলনের সময় চাপা পড়ে জীবন গেছে হাজারো অসহায় বনী ইসরাঈলের। তাদের সেই করুণ ইতিহাস জানতে পিরামিড দেখতে যাওয়া পর্যটকদের থাকে না কোনো আগ্রহ। শুধু পিরামিডের সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। অপার বিস্ময়ে দেখে এর নির্মাণশৈলী। 

সুদূর অতীতের দাস থেকে সমকালে নির্মাণশ্রমিকের জীবনের ভেদরেখা টানা সত্যিই কষ্টসাধ্য। তখনো তাদের জীবনে ছিল না কোনো রঙের ছটা। এখনো বিবর্ণ। নেই কোনো তফাৎ। তখনো তাদের জীবনের ছিল না মূল্য। একালেও খুব সস্তা। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশে। আমাদের দেশেও নির্মাণশ্রমিকের জীবনের তেমন মূল্য আছে বলে মনে হয় না। না হলে কীভাবে ন্যূনতম নিরাপত্তার ব্যবস্থার আঞ্জাম না দিয়ে কর্মক্ষেত্রে তাদের কাজ করানো হয়? রাজধানীসহ দেশের বড় বড় শহরজুড়ে অট্টালিকার পর অট্টালিকা। এসব সুরম্য অট্টালিকায় নিরাপদে বসবাস করছে লাখ লাখ মানুষ। তবে যারা ইমারত গড়ে তুলছেন, সেই নির্মাণশ্রমিকের জীবন কতটুকু নিরাপদ? পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার পর সবচেয়ে বেশি অপমৃত্যুর শিকার নির্মাণশ্রমিক। নিহত শ্রমিকের কতজনের পরিবার ক্ষতিপূরণ পাচ্ছে; সে সংখ্যাও হাতে গোনা। 

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিআইএলএস) তথ্যমতে, ২০০২ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ১৫ বছরে নিহত হয়েছেন ১ হাজার ৬৭৭ জন নির্মাণশ্রমিক। এসব দুর্ঘটনার কার্যকারণ অনুসন্ধানে কয়েকটি বিষয় জানা যায়। যদিও এসব মৃত্যুর পেছনে শ্রমিকদেরও এক ধরনের দায় আছে। তারা অনেক সময় নিরাপত্তাব্যবস্থা না নিয়েও বহুতল ভবনের ওপরে কাজ করেন। আর তদারকিতে যারা নিয়োজিত, তারা এগুলো দেখেও না দেখার ভান করেন। সবচেয়ে বেশি সমস্যা হলো, আইনের সঠিক প্রয়োগ না থাকা। যার ফলে নির্মাণাধীন বেশিরভাগ ভবনে যথাযথ নিরাপত্তাব্যবস্থা নেয়া হয় না। একই সংস্থার তথ্য, ঝুঁকিপূর্ণ এ পেশায় বাংলাদেশে কাজ করছেন লাখ লাখ শ্রমিক। প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার শিকার হওয়া বেশিরভাগ নির্মাণশ্রমিকের কাজের সময়ে থাকে না হেলমেট, গামবুট, বেল্টসহ প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা। মারাত্মক ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে হয় তাদের। সড়কের পাশে নির্মাণাধীন ভবনেও নেয়া হয় না পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা। ফলে সেখান থেকে নির্মাণসামগ্রী পড়ে দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন পথচারীরাও। কিন্তু কেউই পাচ্ছেন না পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ।

এ খাতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা কত দুর্বল এর প্রমাণ মেলে রিয়েল এস্টেট হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব) গত ছয় বছরে মাত্র কয়েক হাজার শ্রমিককে প্রশিক্ষণ দেয়ার তথ্যে। প্রশিক্ষণের সময় তাদের ভাতা দেয়া হয় মাত্র চার হাজার টাকা করে। লাখ লাখ শ্রমিকের মধ্যে ছয় বছরে মাত্র কয়েক হাজার শ্রমিককে প্রশিক্ষণ দেয়া সাগরে একফোটা শিশির বিন্দু ঢালার শামিল। রিহ্যাবের বাইরে বহু নির্মাতা প্রতিষ্ঠান আছে, যাদের প্রতিষ্ঠানে দুর্ঘটনা ঘটলে শ্রমিকরা ঠিকমতো ক্ষতিপূরণ পান না। তবে রিহ্যাবের সদস্য প্রতিষ্ঠানে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে প্রত্যেক শ্রমিককে দুই লাখ টাকার মতো ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান থেকেও কিছু টাকা নিয়ে দেয়া হয়। বিআইএলএসের তথ্য হলো, ক্ষতিপূরণ খুব বেশি মানুষ পাচ্ছেন না। যারাও বা পাচ্ছেন, অর্থের পরিমাণ খুব কম। বহু শ্রমিকের মৃত্যুর কারণ থাকে অজানা। প্রশ্ন হচ্ছে— তাহলে দুর্ঘটনার শিকার শ্রমিকরা কীভাবে ক্ষতিপূরণ পাবেন? আর কোন উপায়ে নির্মাণশ্রমিকদের দুর্ঘটনায় মৃত্যু কমিয়ে আনা যেতে পারে? জবাবে বলা যায়, নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত না করে ভবন নির্মাণের প্রবণতা বন্ধ করা না গেলে নির্মাণশ্রমিকদের যখন-তখন দুর্ঘটনার শিকার হয়ে মৃত্যু থামানো যাবে না। পাশাপাশি শ্রমিকদের সচেতন করতে ব্যাপকভিত্তিক কর্মসূচি হাতে নিতে হবে। আর দুর্ঘটনায় হতাহতদের পরিবারকে দিতে হবে ন্যায়সঙ্গত ক্ষতিপূরণ।

বাংলাদেশ ইমারত নির্মাণশ্রমিক ইউনিয়নের সূত্রমতে, যেসব নির্মাণশ্রমিকের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়, তাদের পরিবারের সাথে যোগাযোগ করে ক্ষতিপূরণ আদায়ের চেষ্টা করে সংগঠনটি। শ্রম মন্ত্রণালয় থেকেও ক্ষতিপূরণ আদায় করে দেয়ার চেষ্টা চালানো হয়। তবে সেটি পর্যাপ্ত নয়। বেশিরভাগ শ্রমিকের মৃত্যুর খবর জানা যায় না। ফলে তাদের পরিবার ক্ষতিপূরণের অর্থপ্রাপ্তি থেকে থাকছে বঞ্চিত। মূলত সরকার আইন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কঠোর থাকলে মালিকরা সচেতন হতেন। কর্মক্ষেত্রে নির্মাণশ্রমিকদের নিরাপত্তা আরো বৃদ্ধি করতে পদক্ষেপ নিতেন। এতে কমে আসতো দুর্ঘটনায় নিহত নির্মাণশ্রমিকের সংখ্যা। বাস্তবতা হলো— মালিকরা যদি সচেতন না হন, তাহলে কাজের কাজ কিছু হবে না। কারণ, শ্রমিকরা সচেতন হলেও অভাবের তাড়নায় বাধ্য হয়ে ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে হয় তাদের।

অবস্থাদৃষ্টে একথা বলা যায়, স্থাপত্য শিল্পে আইন মেনে না চলাতে নির্মম সব দুর্ঘটনা ঘটছে। হচ্ছে প্রাণের অপচয়। তাই দুর্ঘটনা কমিয়ে আনতে হলে প্রথমে দরকার সঙ্কট থেকে বেরিয়ে আসার পথ কী, তা নিয়ে ভাবা। কেবল তখনই এ সমস্যার টেকসই সমাধান আসতে পারে। শুধু সচেতনতার দোহাই দেয়া নিরর্থক। প্রকৃতপক্ষে নির্মাণশ্রমিকদের সাথে সভ্য আচরণ করতে হবে। তাদের মানবাধিকার সংরক্ষণে উদ্যোগী হওয়া প্রয়োজন। এ ব্যাপারে রাষ্ট্রকে সবার আগে এগিয়ে আসতে হবে। কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে আইন। করতে হবে নির্মাণশ্রমিকের জীবনের উপযুক্ত মূল্যায়ন। এভাবে আমরা সবাই পেতে পারি দায়মুক্তি। 

লেখক : সাংবাদিক

আপনার মন্তব্য লিখুন

কপিরাইট © বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির