post

আন্দোলনের সাথিদেরকে রাসূল সা. যেভাবে অনুপ্রেরণা জোগাতেন

ড. মুহাম্মদ রেজাউল করিম

০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৩

পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে কম উপকরণ, কমসংখ্যক মানুষ, সবচেয়ে স্বল্পসময়ে দুনিয়ার সফল বিপ্লব সম্পন্ন করেছেন মানবতার বন্ধু আদর্শ শিক্ষক, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব মুহাম্মদ সা.। তিনি আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে বিশ্বমানবতার জন্য রহমতস্বরূপ আবির্ভূত হয়েছেন। মহাগ্রন্থ আল-কুরআনে বলা হয়েছে- “আমি তোমাকে বিশ্ববাসীর জন্য পাঠিয়েছি কেবল রহমত হিসেবে।” (সূরা আম্বিয়া : ১০৭)। তাই তিনি তাঁর সঙ্গী-সাথিদের চিন্তাচেতনা, কাজ-কর্মে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন বিভিন্নভাবে। আল্লাহ তাআলা বলেন-  “তোমরা যা করো না, তা বলা আল্লাহর কাছে খুবই অসন্তোষজনক।” (সূরা আস-সফ : ০২)। মুহাম্মাদ সা. ছিলেন এই আয়াতের বাস্তব প্রতিচ্ছবি। তিনি যা বলতেন তা কর্মে পরিণত করতেন। তিনি ছিলেন জীবনের সকল ক্ষেত্রে সবার জন্য অনুকরণীয় আদর্শ।

প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মাদ সা. তাঁর সঙ্গী-সাথিদের অসম্ভব রকম ভালোবাসতেন। তিনি কারও প্রতি ঘৃণা রাখতেন না। যেকোনো জাতির বা গোত্রের গণ্যমান্য ব্যক্তিদেরও তিনি সম্মান করতেন। তিনি প্রত্যেক সাহাবিকেই অনেক বেশি সম্মান করতেন। ফলে প্রত্যেক সাহাবিই মনে করতেন, রাসূলুল্লাহ বোধ হয় তাকেই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসেন। তাঁর সংস্পর্শে কেউ এলে তিনি তাকে ধৈর্যশীল হওয়ার পরামর্শ দিতেন। কেউ তাঁর কাছ থেকে কিছু চাইলে তাকে সেটা দিয়ে দিতেন আর দিতে না পারলে এত মোলায়েমভাবে তার সাথে কথা বলতেন যে, সে ব্যক্তি সন্তুষ্ট হয়ে যেত। নবীজির দয়ার দরিয়া যেন প্রত্যেককেই স্পর্শ করত। সাহাবিদের জন্য তিনি ছিলেন একজন উত্তম অভিভাবক। তাঁর কাছে সকলেই ছিল সমান। রাসূলুল্লাহ দেখতে ছিলেন সুদর্শন, মার্জিত, বিনম্র এবং নরম হৃদয়ের মানুষ। তিনি মানসিকভাবে মোটেও কঠোর বা সঙ্কীর্ণমনা ছিলেন না। তিনি কখনো কারও সাথে ঝগড়ায় লিপ্ত হতেন না। তাঁর মুখে কেউ কখনো অশ্লীল শব্দ শোনেনি। কারও গিবত করা, নিন্দা করা কিংবা কারও মাত্রাতিরিক্ত প্রশংসা করা ছিল তাঁর স্বভাববিরোধী। তিনি অপ্রয়োজনীয় বিষয়ে মাথা ঘামাতেন না। হতাশা বা নৈরাশ্যবাদও তাঁকে কখনো গ্রাস করত না।

আয়েশা রা. বলেছেন- ‘পৃথিবীতে আর কেউ নেই, কখনো আসবে না, যার চরিত্র নবীজির চরিত্রের চেয়ে উত্তম। যখনই কেউ তাঁকে ডাকত, তিনি সাথে সাথেই সাড়া দিতেন। জাবির বিন আবদুল্লাহ বলেন, ‘আমাকে কখনোই তাঁর কাছে যেতে নিষেধ করেননি। যখনই তিনি আমার দিকে তাকাতেন, মুচকি হাসি দিয়েই ডাকাতেন।’ তিনি তাঁর সঙ্গীদের সাথে কথা বলতে, ভাবনা শেয়ার করতে পছন্দ করতেন। তাদের সাথে বন্ধুত্বসুলভ আচরণ করতেন। তাদের কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করতেন। সমাজের যে স্তরের মানুষই তাঁকে দাওয়াত করত, তিনি তা কবুল করতেন। তিনি মদিনার আনাচে-কানাচে গিয়ে অসুস্থ ও পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগীদের দেখে আসতেন। আনাস রা. বলেন- যদি তাঁর কানে কেউ কিছু বলতে আসত, তাহলে যতক্ষণ না সেই ব্যক্তি মুখ সরিয়ে না নিতো, তিনি ততক্ষণ পর্যন্ত কান পেতেই রাখতেন। যখন তাঁর হাত কেউ ধরত বা হাত মেলাত, সেই ব্যক্তি হাত না সরিয়ে ফেলা পর্যন্ত তিনি হাত ধরেই রাখতেন। তিনি সবার আগে সালাম দিতেন। সালাম দেওয়ার প্রতিযোগিতায় তাঁকে কেউ হারাতে পারত না। বাসায় মেহমান আসলে হয়তো তাঁকে ভালো কুশন বা ভালো জামাটি দিয়ে নিজে মাটিতে শুতেন। সাহাবিদের সুন্দর সুন্দর নামে অভিহিত করে সেই নামেই তাদের ডাকতেন। কেউ কথা বলতে শুরু করলে তার কথা শেষ না হওয়া পর্যন্ত তিনি কথা বলতেন না। নবীজি কারও কথার মাঝখানে কখনো তাকে থামিয়ে দেননি। 

আমাদের প্রিয়নবী মুহাম্মাদ সা. নিজেই ছিলেন উত্তম চরিত্রের জীবন্ত উদাহরণ। তিনি তাঁর সঙ্গী-সাথিদের কোনো উপদেশ দেওয়ার আগে নিজের জীবনে তার অনুশীলন নিশ্চিত করতেন। আবদুল্লাহ বিন আমর রা. বর্ণিত একটি হাদিস থেকে জানা যায়, রাসূলুল্লাহ সা.-এর আচরণে কখনোই দুর্ব্যবহার পাওয়া যেত না। তিনি মোটেও কঠোর বা রুক্ষ ছিলেন না। রাসূল সা. সবসময়ই বলতেন- ‘তোমাদের মধ্যে উত্তম সে ব্যক্তি, যার চরিত্র উত্তম।’ (বুখারি : ৩৫৫)। আনাস রা. বলেন- ‘আমি আল্লাহর রাসূলের কাছাকাছি ১০ বছর থাকার সুযোগ পেয়েছি। আমি এ সময়ের মধ্যে তাঁকে বিরক্তি বা রাগের কারণে একবারও উফ শব্দটা উচ্চারণ করতে শুনিনি। এমনকি আমি কী করেছি বা কেন করেছি; এমন ধরনের প্রশ্নও তিনি করতেন না।’ (মুসনাদে আহমদ : ১১৯৭৪)।

 আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত। যদি কখনো কোনো কাজে দুটো উপায় বা অপশন থাকত, তাহলে রাসূল সা. সবসময় সহজটাকেই বেছে নিতেন; যদি না তাতে কোনো পাপের সম্ভাবনা থাকে। যদি সহজ কাজটিতে গুনাহর কোনো সম্ভাবনা থাকত, তাহলে তিনি ভুলেও সেটা করার কথা ভাবতেন না। রাসূল কখনো কারো ওপর ব্যক্তিগত প্রতিশোধ নিতেন না। আল্লাহ যদি কাউকে অমান্য করার কথা বলতেন, তাহলেই শুধু রাসূল তাকে অমান্য করতেন; তবে সেক্ষেত্রেও তাঁর আচরণ ছিল বিনম্র। রাসূল নিজে কখনোই কাউকে সরাসরি তাঁর হাত দিয়ে প্রহার করেননি। তাঁর দাসদের গায়েও তিনি হাত তোলেননি। তবে তিনি আল্লাহর হুকুমে দ্বীনের স্বার্থে যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন।’ (মুসলিম : ২৩২৭)। আনাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন- একদিন আমি রাসূল সা.-এর সাথে হাঁটছিলাম। তাঁর শরীরে সে সময় একটি মোটা চাদর পেঁচানো ছিল। এমন সময় একজন আরব এত জোরে তাঁর চাদরটি টান দিলো যে তাঁর কাঁধের একটি অংশ অনাবৃত হয়ে গেল। আমি এভাবে চাদরটি টানার দৃশ্য দেখে হতবিহ্বল হয়ে পড়লাম। আরব লোকটি রাসূল সা.-কে বলল- ‘ও মুহাম্মাদ! আল্লাহ তোমায় যে সম্পত্তি দিয়েছেন, তার থেকে আমাকে কিছু ভাগ দাও।’ রাসূল তার দিকে ঘুরে তাকিয়ে হাসলেন আর এই আরবকে কিছু দান করে দিতে বললেন।’ (বুখারি : ৩১৪৯)। 

 ৬২৬ ঈসায়ী সনের ডিসেম্বর মাস। আরবে তখন প্রচণ্ড শীত। কাফিররা মুসলমানদেরকে সমূলে নিশ্চিহ্ন করার এক নীলনকশা তৈরি করে। এ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তারা মদিনায় আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছে- এ খবর পাওয়ার পর প্রবীণতম সাহাবি সালমান ফারসি রা.-এর পরামর্শে রাসূল সা. মদিনার তিন দিকে পরিখা খনন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। আধুনিক ড্রেজিং মেশিনের যুগে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা মোটেও কঠিন কাজ নয়। কিন্তু ১৪শত বছর আগে হাতে হাত রেখে গুটিকয়েক মুজাহিদ তাদের শাবল-কোদাল আর ঝুড়ি নিয়ে কঠিন পাথুরে জমিন খুঁড়ে মদিনার তিন দিকে মাত্র ৬ দিনে পরিখা খনন করার যে সাহস দেখিয়েছেন তা একজন দুঃসাহসী কমান্ডারের নেতৃত্ব ও অনুপ্রেরণা ছাড়া অসম্ভব ছিল। নবীজি সা. তাঁর সাথিদের সাথে একই সারিতে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ঝুড়িতে করে মাটি বহন করেছেন। পৃথিবীর ইতিহাসে এরকম দৃষ্টান্ত সত্যিই বিরল। সাহাবিরা বললেন আমরা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওসাল্লামের বগলের নিচ কখনো দেখিনি, কিন্তু তিনি যখন মাটি খনন করে মাথায় তুলে নিয়ে রওয়ানা হলেন তখন আমরা হাতের নিচের বগলটি পর্যন্ত সেদিন দেখেছি।

এসময় তিনি এবং তাঁর সাহাবিরা কাজে উৎসাহ-উদ্দীপনা তৈরির জন্য গান গেয়েছেন। রাসূল সা. নবুওয়াতি জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে তাঁর সাথিদের জন্য অনুপ্রেরণার এক অনুপম উৎস ছিলেন। তাঁর উপস্থিতিই সাহাবাগণের অনুপ্রেরণা জোগানোর জন্য যথেষ্ট ছিল।


নিজে আমল করে দেখানো (leading by example)

তিনি তাঁর উম্মতের জন্য এক অনুপম আদর্শ জীবন রেখে গেছেন। আয়েশা রা.-কে রাসূলের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য কেমন ছিল তা জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি উত্তর দিয়েছিলেন- ‘তোমরা কি কুরআন পড় না? তাঁর চরিত্রই ছিল কুরআনের চরিত্র।’ তিনি তাঁর সততা, একনিষ্ঠতা, দয়া, এবং একাগ্রতার মাধ্যমে মানুষের উপকার ও সেবা করতেন। তাঁর এই মহান চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সাথিদের জন্য powerful motivation হিসেবে কাজ করতো। তাঁর সাথিগণ অনুপ্রাণিত হয়ে নবীজির পদাঙ্ক অনুসরণ ও অনুকরণ করার আপ্রাণ চেষ্টা করতেন। 


যোগাযোগ ক্ষমতা (Communication skill)

তাঁর যোগাযোগ ক্ষমতা ছিল অসাধারণ। অতি জটিল ও কঠিন বিষয়কেও তিনি অল্প কথায় অতি সহজে বুঝিয়ে বলতে পারতেন। তিনি বিভিন্ন সত্য ঘটনা এবং উপমা উপস্থাপন করে তাঁর বক্তব্য আকর্ষণীয় ও হৃদয়গ্রাহী করে তুলতেন (His speeches and sermons were powerful and moving, leaving a lasting impact on those who heard him.)।


সরাসরি অংশগ্রহণ

মহানবী সা. তাঁর সাথিদেরকে অনুপ্রেরণা জোগানোর জন্য বেশিরভাগ কাজে সরাসরি অংশগ্রহণ করতেন। দুনিয়ার সাধারণ নেতাদের মতো আদেশ দিয়ে নিজে আরামে ছায়ায় বসে প্রকৃতি উপভোগ করতেন না। ছোট বড় যেকোনো সামষ্টিক কাজে তাঁকে নিজ থেকেই হাত লাগাতে দেখা যেত। যাতে বাকিরা কাজে উৎসাহ পায়। পাশাপাশি কারো মনে এমন ধারণার সৃষ্টি যেন না হয় যে- নেতৃত্বের আসনে থাকলে শুধু হুকুম দেয়াই যথেষ্ট। এমনটি হলে ওই নেতৃত্ব পাওয়ার জন্য মুসলমানদের মধ্যে হুড়োহুড়ি পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। এজন্যই তিনি ইরশাদ করেছেন ‘সাইয়িদুল কাওমি খাদিমুহুম’- “The master or leader of the people (nation) is the one who serves them.”

একবার তিনি সাহাবিদের সাথে সফর করছিলেন। পথিমধ্যে বিশ্রাম ও খাবারের বিরতি দেওয়া হলে সবাই কাজে লেগে গেলেন। নবী সা. তখন বললেন- তোমরা এদিকে কাজ করো, আমি কিছু জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করে আনি। সাহাবিরা তাঁকে কিছুতেই কাজ করতে দিতে রাজি না। তিনি বললেন, আদম সন্তান হিসেবে আমরা সবাই সমান। তোমাদের নেতা হিসেবে আমি হাত-পা গুটিয়ে আরাম করবো এটা ঠিক নয়। বদর, উহুদ, খন্দক, তাবুক, হুনায়নসহ নবীজি সা. ছোটো বড় ২৮টি যুদ্ধে সরাসরি ময়দানে থেকে সেনাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। বদর ও উহুদের যুদ্ধে তিনি এতটাই আহত হন যে তাঁর ২টি দাঁত উঠে যায়। এবং কাফিররা তাঁর শাহাদতের খবর প্রচার করা শুরু করে। তিনি নির্দেশ দিয়ে নিজে নিরাপদ স্থানে বসে থাকলেও তাঁর সাথিগণ জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করতো। কিন্তু তিনি তা করেননি। বরং ময়দানে সক্রিয়ভাবে উপস্থিত থেকে মুজাহিদগণের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে কাজ করেছেন। খন্দকের যুদ্ধে গর্ত তৈরি করার জন্য সাহাবাগণের সাথে তিনি কাঁধে কাঁধ রেখে মাটি বহন করছিলেন। এমনকি তাঁর কাঁধের চুলে মাটি লেগে যাচ্ছিলো। 


বক্তৃতার মাধ্যমে উদ্দীপনা তৈরি 

রাসূল সা. মুসলমানদেরকে সৎকাজে অনুপ্রাণিত করার জন্য বিভিন্ন উপলক্ষে বক্তৃতা দিতেন। জুমার দিনে মসজিদের মিম্বারে দাঁড়িয়ে যে খুতবা দিতেন তা মুসলমানদেরকে ভালো কাজে অনুপ্রাণিত করতো। তিনি যখন পরকালের ভয়াবহতা সম্পর্কে বর্ণনা করতেন তখন তাঁর চেহারায় এমন ভয়ের ছাপ ফুটে উঠতো যে উপস্থিত সাহাবিরা ভাবতেন তিনি মনে হয় জাহান্নাম দেখতে পাচ্ছেন। ফলে সাহাবিদের মধ্যে জাহান্নামের আজাবের ভয়ে কান্নার রোল পড়ে যেতে। আবার যখন তিনি জান্নাতের বর্ণনা করতেন তখন তাঁর চেহারায় আনন্দের ছাপ লক্ষ করা যেত। তিনি যখন কোনো যুদ্ধের পূর্বে বক্তৃতা দিতেন তখন তাঁর চেহারা লাল হয়ে যেত। 


গান-কবিতা

রাসূল সা. যুদ্ধের ময়দানে সাহাবাগণকে উৎসাহিত করার জন্য কবিতা আবৃত্তি করে শুনিয়েছেন। হুনায়নের যুদ্ধে মুসলমানদের সংখ্যাধিক্য সত্ত্বেও প্রাথমিক বিপর্যয় দেখা দিলে মহানবী সা. সাথিদেরকে উদ্বুদ্ধ করার জন্য কবিতা আবৃত্তি করেছেন-

“নিঃসন্দেহে আমি নবী, আর আমি আবদুল মুত্তালিবের পুত্র”...

খন্দকের যুদ্ধে গর্ত খননের সময় তিনি আবৃত্তি করছিলেন 

“হে আল্লাহ আখিরাতের জীবনই আসল জীবন,

আপনি মুহাজির ও আনসারদেরকে ক্ষমা করুন।”


তাবশীর (সুসংবাদ দান)

মুমিনদেরকে তিনি সুসংবাদ দানের মাধ্যমে অনুপ্রাণিত করেছেন। খন্দক যুদ্ধে গর্ত খননের সময় পাথরের গায়ে শাবল লেগে আগুন দেখা গেলে তিনি মুসলমানদেরকে তৎকালীন দুনিয়ার অন্যতম পরাশক্তি রোম সাম্রাজ্য মুসলমানদের কাছে পরাজিত হওয়ার সুসংবাদ দেন। এছাড়াও তিনি জান্নাতে মুমিনদের জন্য যেসব নিয়ামত আল্লাহ সাজিয়ে রেখেছেন সেটার বর্ণনা দিয়েও তিনি তাদেরকে ভালো কাজে এবং জিহাদে উৎসাহ দিতেন। আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, রাসূল সা. ইরশাদ করেছেন, আমি আমার সালিহ বান্দাদের জন্য এমন কিছু (জান্নাত) তৈরি করে রেখেছি যা কোনো চোখ দেখেনি, কোনো কান শোনেনি এবং যা কোনো মানুষের অন্তরেও কল্পনা করা সম্ভব না। (বুখারি : ৪৭৭৯)।


তাহজির ওয়া তানবিহ (ভীতি প্রদর্শন)

রাসূল সা. তার সাথিগণকে একদিকে সুসংবাদ দিয়ে অনুপ্রাণিত করেছেন, অপরদিকে তিনি তাদেরকে আল্লাহর নাফরমানির শাস্তি হতে সতর্ক করে কিভাবে তা থেকে মুক্তি পাওয়া যায় সে রাস্তাও বলে দিয়েছেন। 


সাম্য ও অংশগ্রহণমূলক ব্যবস্থা (Inclusivity and equality)

ইসলামের ইতিহাসে দেখা যায় রাসূল সা. তার দাওয়াতি কাজ সর্বস্তরের মানুষের কাছে পৌঁছাতে সচেষ্ট ছিলেন। তার সাহাবিদের মধ্যে সামাজিক ভেদাভেদ ছিলো না। আর এ কারণে সমাজের সব শ্রেণীর মানুষ ইসলাম গ্রহণ করে। আরবের সবচেয়ে ধনী এবং নিঃস্ব গরিব মানুষদের মধ্যে এক দ্বীনি ভ্রাতৃত্বের বন্ধন তৈরি করতে তিনি সক্ষম হয়েছিলেন। এতে দেখা যায় যাদেরকে তৎকালীন সমাজে মানুষই মনে করা হতো না তারা রাসূল সা. এর এই সাম্য ব্যবস্থা দেখে দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করেন। 


ব্যক্তিগত সম্পর্ক

রাসূল সা.-এর ব্যক্তিত্বের অন্যতম আকর্ষণীয় বিষয় ছিল তিনি প্রত্যেকেরই আপনজন হয়ে যেতেন। তার সাথে প্রতিটি সাহাবিদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল। এ কারণে একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়েও তারা রাসূল সা.-এর সাথে শেয়ার করে পরামর্শ গ্রহণ করতেন। এতে প্রতিটি ব্যক্তিই রাসূল সা.-এর আনিত দ্বীনকে বাস্তবায়নে অনুপ্রাণিত হতো। রাসূল সা. যখন কোনো আদেশ-নির্দেশ দিতেন তখন তারা প্রত্যেকেই নিজের দায়িত্ব মনে করেই তা পালন করতেন।


পরিশেষে এই ক্ষুদ্র লেখায় পৃথিবীর সর্ববৃহৎ দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী ব্যক্তির জীবন থেকে বলা যায়- রাসূল সা.-এর চরিত্র এত উন্নত ছিল, কোনো উচ্চতাই তাঁর সমতুল্য নয়, হতে পারারও নয়। অর্থ ও মর্মগতভাবে তিনি সত্যিকারার্থে মানুষ শব্দের পূর্ণ ধারক। বস্তুত আল্লাহ তাআলা তাঁর নবুওয়্যাত ও রিসালাতের জন্য এমন মানুষকে নির্বাচন করেন, যাঁরা খাইরুল বাশার মানব, যারা জ্ঞানের দিকে সবচেয়ে পরিপূর্ণ, প্রাণে সবচেয়ে ঐশ্বর্যশালী; আত্মায় সবচেয়ে জ্যোতির্ময় আর দায়িত্বভার বহনে সবচেয়ে সততাবান। নবীগণ সকল মানুষের জন্য অনুকরণীয় আদর্শ হিসেবে নির্বাচিত। সে মতে আমাদের নবী মুহাম্মাদ সা. আদর্শের অনন্য এক উচ্চ মিনার, জাহিলিয়াতের তিমির তমসায় উদ্ভ্রান্ত প্রতিটি মানুষ যা দেখে পথ খুঁজে পায়। তিনি সত্যিই এক অনুকরণীয় আদর্শ। তার প্রতিটি কর্মই আমাদেরকে অনুপ্রেরণা জোগায়।

লেখক : সহকারী সম্পাদক, সাপ্তাহিক সোনার বাংলা

আপনার মন্তব্য লিখুন

কপিরাইট © বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির