post

কারবালা ও আজকের ইসলামী আন্দোলন

ড. মুহাম্মদ রেজাউল করিম

২৪ জুন ২০২৩

ইসলামের ইতিহাসে একটি নির্মম ও বিয়োগান্ত ঘটনার নাম কারবালা। কারবালা মানে ত্যাগ, কুরবানি আর শাহাদাতের অমীয় সুধার ভাস্কর। কারবালা যেমনই বেদনা বিধূর তেমনই ত্যাগের বিনিময়ে বিজয় গাঁথা। কারবালা মানে অন্যায়ের সামনে মাথা নত না করার ইতিহাস। কারবালা মানে জীবনের বিনিময়ে খেলাফতের ধারাবাহিকতার লালন। অন্যায় অবিচার ও জনগনের সমর্থন ছাড়া ক্ষমতার দাপটকে রুখে দেয়ার প্রেরণা।

‘কারবালা’ ফোরাত নদীর তীরে অবস্থিত একটি প্রান্তর, বাষট্টি হিজরি সনের মহরম মাসের ১০ তারিখ শুক্রবার ইমাম হোসাইন (রা.) অত্যন্ত করুণভাবে শাহাদাতবরণ করেন। কারবালা যেন আরবি ‘কারব’ মানে সংকট,‘বালা’ মানে মুসিবত। কারবালার এ হৃদয়বিদারক ঘটনা মহিমাময় মহরম মাসের ঐতিহাসিক মহান আশুরার দিনে সংঘটিত হওয়ায় এতে ভিন্ন মাত্রা যোগ হয়েছে। এতে এ শাহাদাতের মাহাত্ম্য যেমন বহুগুণ বেড়েছে, তেমনি আশুরা পেয়েছে ইতিহাসে নতুন পরিচিতি। আরবি হিজরি সনের প্রথম মাস মহররম। ‘মহররম’ শব্দের অর্থ অলঙ্ঘনীয় পবিত্র। ইসলামের ইতিহাসে তাৎপর্যপূর্ণ মাসগুলোর মধ্যে মহররম অন্যতম। প্রত্যেক মুসলমানদের জন্য এই মাসটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন :

নিশ্চয়ই আসমানসমূহ ও পৃথিবী সৃষ্টির দিন থেকে আল্লাহর বিধান ও গণনায় মাস বারটি। তন্মধ্যে চারটি সম্মানিত। এটিই সুপ্রতিষ্ঠিত বিধান; সুতরাং এর মধ্যে তোমরা নিজেদের প্রতি অত্যাচার করো না। আর মুশরিকদের সঙ্গে তোমরা যুদ্ধ করো সমবেতভাবে, যেমন তারাও তোমাদের সঙ্গে যুদ্ধ করে যাচ্ছে সমবেতভাবে। আর মনে রেখো, আল্লাহ মুত্তাকিদের সঙ্গে রয়েছেন।’ (সূরা তাওবাহ : আয়াত ৩৬)

এই আয়াতে আল্লাহ তায়ালা ১২ মাসের মাঝে চার মাসকে সম্মানিত বলেছেন। এর মধ্যে মহররম অন্যতম। বিশেষ করে এ মাসের দশ তারিখ ইসলামী শরিয়তে ঐতিহাসিকভাবে একটি গুরুত্ব ও তাৎপর্যপূর্ণ দিন। এ দিনটি ইসলামী ইতিহাসে ‘আশুরা’ নামে পরিচিত। ‘আশুরা’ আরবি শব্দ। এর অর্থ, দশম। দশ-ই মহররম ইসলামের ইতিহাসে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে কারবালার ঘটনাটি অন্যতম। রাসূল (সা.)-এর ওফাতের প্রায় ৫০ বছর পর ৬১ হিজরির মহররম মাসের ১০ তারিখ কারবালার প্রান্তরে তাঁরই প্রাণপ্রিয় নাতি ইমাম হুসাইন (রা.) বর্বর ইয়াজিদ বাহিনীর হাতে নির্মমভাবে শাহাদতবরণ করেন। সেই থেকে এই দিনটি তাঁর শাহাদাতের দিন হিসেবে মুসলিম উম্মাহ স্মরণ করে আসছে। মুসলিম উম্মাহর হৃদয়ে ফোরাত বেদনা বিদুর স্মৃতির নির্মম স্বাক্ষী হয়ে আছে। মূলত ‘ফোরাত’ কুফার একটি সুপ্রাচীন নদী। এ নদীর কূলে অবস্থিত কারবালার প্রান্তর। ইমাম হোসাইন কাফেলা যখন কারবালায় অবস্থান করছেন, তখন তাদের পানির একমাত্র উৎস এই ফোরাত নদী, যা উবায়দুল্লাহ ইবনে জিয়াদের বাহিনী ঘিরে রাখে, অবরুদ্ধ করে রাখে নিরস্ত্র অসহায় আহলে বাইতকে। এ নদী থেকে পানি সংগ্রহ করতে গেলে ফুলের মতো নিষ্পাপ দুগ্ধপোষ্য শিশু আলী আসগর এক ফোঁটা পানির জন্য পাপিষ্ঠ ও অভিশপ্ত সীমার বাহিনীর তিরের আঘাতে শহীদ হয়। সেদিন ফোরাতকূলে ‘পানি! পানি!’ বলে অবর্ণনীয় মাতম ওঠেছিল।

প্রিয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তার মোর্হ‌রম কবিতায় স্মৃতি এঁকেছেন এভাবে-

 “মা’র থনে দুধ নাই, বাচ্চারা তড়পায়!

জিভ চুষে কচি জান থাকে কিরে ধড়টায়?

দাউদাউ জ্বলে শিরে কারবালা-ভাস্কর,

কাঁদে বানু-’পানি দাও, মরে জাদু আস্‌গর!’

কলিজা কাবাব সম ভুনে মরু-রোদ্দুর,

খাঁ খাঁ করে র্কা‌বালা, নাই পানি খর্জুর,

পেল না তো পানি শিশু পিয়ে গেল কাঁচা খুন,

ডাকে মাতা, -পানি দেবো ফিরে আয় বাছা শুন্!”

‘কুফা’ ইরাকের একটি বিখ্যাত শহর। পরবর্তীকালে আমীরুল মুমিনীন আলী (রা.)-এর শাসনামলে খেলাফতের রাজধানী। আখেরি নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর সময় মুসলিম শাসনের প্রাণকেন্দ্র ছিল মদিনা মুনাওয়ারা। নবী করিম (সা.)-এর ওফাতের পর প্রথম খলিফা আবু বকর সিদ্দিক (রা.) প্রায় আড়াই বছর খেলাফত পরিচালনা করে ইন্তেকাল করেন। এরপর দ্বিতীয় খলিফা উমর ফারুক (রা.) ১০ বছর খেলাফতের দায়িত্ব পালন করে শহীদ হন। তৃতীয় খলিফা হজরত উসমান গনি (রা.) ১২ বছর খেলাফত পরিচালনা করে শাহাদাতবরণ করেন। এ সময় পর্যন্ত ইসলামী খেলাফতের রাজধানী ছিল মদিনা। চতুর্থ খলিফা আলী (রা.) দুই বছরের শাসনামলে বিভিন্ন জটিলতা সৃষ্টি হলে প্রশাসনিক সুবিধা বিবেচনায় তিনি খেলাফতের রাজধানী ইরাকের কুফায় স্থানান্তর করেন। এ সময় কুফা ছিল একটি প্রদেশ এবং কুফার গভর্নর ছিলেন উবায়দুল্লাহ ইবনে জিয়াদ। তাঁরই নেতৃত্বে কারবালার নির্মম ঘটনা সংঘটিত হয়। এই কুফাই পরবর্তীকালে ইসলামের ইতিহাসে ‘কুফা’তে পরিণত হয়েছে। কুফাবাসী ইয়াজিদের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য হোসাইন ইবনে আলী (রা.)-কে শত শত পত্রের মাধ্যমে আমন্ত্রণ জানায়। তাদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে তিনি সেখানে আগমন করলে তারা তাঁকে একাকী বিপদের মুখে ফেলে রেখে নিজেরা নীরব ও নিষ্ক্রিয় থাকে। 

‘দামেস্ক’ বর্তমানে সিরিয়ার রাজধানী। চতুর্থ খলিফা আলী (রা.)-এর শাহাদাতের পর ইমাম হাসান (রা.) তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন এবং ছয় মাস খেলাফতের দায়িত্ব পালন করে সিরিয়ার গভর্নর মুয়াবিয়া (রা.)-এর কাছে খেলাফতের ভার অর্পণ করেন। মুয়াবিয়া (রা.) প্রশাসনিক সুবিধার্থে রাজধানী দামেস্কে স্থানান্তরিত করেন। সে সূত্রে ইয়াজিদ ক্ষমতাসীন হলে তার রাজধানী দামেস্কেই রয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে কালক্রমে ইসলামী খেলাফতের রাজধানী তুরস্ক ও মিসরে স্থানান্তরিত হয়। মিসর থেকেই ১৯২৪ সালে ইসলামী খেলাফতের আনুষ্ঠানিক পরিসমাপ্তি ও যবনিকাপাত ঘটে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হচ্ছে সারা বিশ্বে কোটি কোটি মুসলমান ইমাম হোসাইনের (রা.) শাহাদাতের ঘটনায় আন্তরিক দুঃখ ও বেদনা প্রকাশ করে থাকেন কিন্তু ইমাম হোসাইন অন্যায়ের সাথে আপোষ করবেন না বলে নিশ্চিত শাহাদাতের যে পথ বেছে নিয়েছিলেন, ছোট ছোট শিশুদেরকেও কুরবান করে দিয়েছিলেন; সে শিক্ষা থেকে মুসলিম উম্মাহ অনেক দূরে। ইমাম হোসাইনের উদ্দেশ্যের প্রতি একদিনের জন্য শ্রদ্ধা জানিয়ে এবং শোক প্রকাশ করেই মোটামুটি দায় শেষ করেন অধিকাংশ মুসলমান। কিন্তু জাতি হিসেবে, তাঁর উত্তরসুরী হিসেবে তাঁর উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য যে ত্যাগ-কুরবানির নজরানা পেশ করা প্রয়োজন সেটা থেকে আমরা অনেক দূরে।

অন্যায়, অবিচার ও স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে ইমাম হোসাইন (রা.) ন্যায় ও সত্যের ইজ্জত সমুন্নত রাখার জন্য রণাঙ্গনে নিশ্চিত পরাজয় জেনেও অকুতোভয় হয়ে লড়াই করে শাহাদাতবরণ করেছিলেন কারবালায়; কিন্তু তিনি অসত্য, ও অন্যায়ের কাছে মাথানত করেননি। ইনসাফ প্রতিষ্ঠার জন্য, অবিচারের বিরুদ্ধে অধিকার আদায়ের জন্য, ইসলামের সুমহান আদর্শকে সমুন্নত রাখার জন্য জীবন বাজি রেখে সপরিবারে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন। তাঁর এই বিশাল আত্মত্যাগ ইতিহাসে সমুজ্জ্বল হয়ে আছে আজ অবধি। সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারের যে উদাহরণ কারবালার মাঠে সেদিন ঘটেছিলো, তা মুসলিম উম্মাহর জন্য এক উজ্জ্বল ও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। 

কারবালার ঘটনা থেকে মুসলিম উম্মাহর কল্যাণে আজকের প্রেক্ষাপটে যেসব শিক্ষা রয়েছে, তারমধ্যে প্রধান হচ্ছে ইমাম হোসাইন (রা.) নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন, তবু ক্ষমতার লোভে ন্যায়নীতির প্রশ্নে আপোষ করেননি। মেনে নেননি অবিচার বা অন্যায় শাসনকে। খিলাফতকে ব্যক্তিতন্ত্র ও স্বৈরতন্ত্রে রূপান্তরকারী স্বৈরশাসক ইয়াজিদের

বলপ্রয়োগে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের চক্রান্তের প্রতি আনুগত্য স্বীকার না করে তিনি প্রত্যক্ষ সংগ্রামে লিপ্ত হন এবং শাহাদাতের নজরানা পেশ করেন। সারা পৃথিবীর কাছে তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও ন্যায়ের পক্ষে প্রতিরোধ সংগ্রামের এক জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন। কারবালা প্রান্তরে সত্য ও ন্যায়কে চির উন্নত ও সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্য তিনি সর্বোচ্চ ত্যাগের অতুলনীয় আদর্শ স্থাপন করেছেন। চিরকাল বিশ্বের নির্যাতিত, অবহেলিত এবং বঞ্চিত মানুষের অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার দিকনির্দেশনা ও অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে কারবালার ঘটনা। ব্যক্তিস্বার্থ, ক্ষমতালিপ্সা ও মসনদের লোভ-মোহের ঊর্ধ্বে ওঠে ইমাম হোসাইন (রা.) বুকের তাজা রক্ত প্রবাহিত করে ইসলামের শাশ্বত নীতি ও আদর্শকে সমুন্নত করেছিলেন। কারবালার সেই চেতনাকে যুগযুগ ধরে লালন করে গেছেন মুসলিম উম্মহার মর্দে মুজাহিদেরা। ইসলামের সুমহান মর্যাদা সমুন্নত রাখতে যুগে যুগে প্রাণ দিয়েছেন, হাসিমুখে শাহাদাতের নজরানা পেশ করেছেন অসংখ্য মহামানব। আমাদের এই উপমহাদেশে সৈয়দ আহমদ বেরলভী (রহ.) থেকে শুরু করে মাওলানা মওদুদী (রহ.), এবং মিশরের শাইখ হাসান আল বান্না (রহ.), সাইয়্যেদ কুতুব (রহ.), ড. শহীদ মুরসী (রহ.) সকলের আদর্শের ভিত এক জায়গায়। তাঁরা সবাই অন্যায়ের সামনে মাথা নুইয়ে ক্ষমতা নিয়ে দুনিয়ার জীবন শান-শওকতে কাটিয়ে দিতে পারতেন অতি সহজেই, কিন্তু ইসলামের ন্যায়ের মানদণ্ড সমুন্নত রাখতে ঈমানকে বিলিয়ে দেননি। একই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হয়েছে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশেও। আপোষ করে মন্ত্রীত্ব নিয়ে দুনিয়ার জীবনে সুখী হতে চাননি শহীদ নিজামী (রহ.), শহীদ মুজাহিদ (রহ.)। শহীদ কামারুজ্জামান (রহ.), শহীদ আব্দুর কাদের মোল্লা (রহ.), শহীদ মীর কাসেম আলীগণ (রহ.) জীবন দিয়েছেন, কারা প্রকোষ্ঠের অন্ধ ঘরে জীবনের অধিকাংশ সময় পার করেছেন কিন্তু জালিমের সাথে আপোষ তো দূরের কথা দেশ ছেড়ে প্রাণ বাঁচানোর অবারিত সুযোগ থাকার পরেও সেদিকে পা দেননি এসব মহামানবেরা। 

সত্য ও মিথ্যার দ্বন্দ্ব চিরন্তন। উভয়ের মধ্যে আপোষের কোন সুযোগ নেই। সত্য বিজয়ী ও মিথ্যা পরাভূত হয়। সময় ও আল্লাহর সাহায্যের অপেক্ষাই মুমিনের কর্মপন্থা। সত্যবাদীদের পক্ষে আল্লাহ থাকেন। যখন তিনি তাদের দুনিয়াবী বিজয় দান করতে ইচ্ছা করেন, তখন তার জন্য তিনি কারণ সৃষ্টি করে দেন এবং বিজয় দেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘কিন্তু আমি সত্য দিয়ে আঘাত করি মিথ্যার ওপর, ফলে তা মিথ্যাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয় এবং মিথ্যা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়, তোমাদের জন্য দুর্ভোগ তোমরা যা বলছ তার জন্য। ’ (সূরা আম্বিয়া, আয়াত : ১৮) মুসাকে (আ.) নদীতে ভাসিয়ে দেওয়ার জন্যে তাঁর মাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল; ইউসুফকে (আ.) মেরে ফেলার জন্যে কূপে নিক্ষেপ করা হয়েছিল, কিংবা হুদায়বিয়ার সন্ধির শর্ত দেখে অনেকে অবস্থাদৃষ্টে পরাজয় মনে করলেও আল্লাহর ফর্মুলাই বিজয় এনে দিয়েছে; সুতরাং মুমিনের জন্য করনীয় হলো আল্লাহর আইন মেনে চলা বা আল্লাহর সিদ্ধান্ত মেনে চলা। তাতে যদি নিশ্চিত পরাজয়ও দৃশ্যমান হয়, তবুও আল্লাহর বিধানকে আঁকড়ে ধরা। কারবালার মাঠে ইমাম হোসাইন রাদ্বিয়াল্লাহ বাহ্যিক পরাজয় হয়েছিল ঠিক, কিন্তু ঠিকই নৈতিকভাবে বিজয়ী। কারবালার আজ সহস্র বছর অতিক্রম হলেও তিনি মুমিনের শক্তি এবং অত্যাচারী শাসক ইয়াজিদ ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে। 

কারবালা আমাদের শিক্ষা দেয় নিজেদের শক্তির ওপর ভরসা না করে, নিজেদের সংখ্যার ওপর নির্ভর না করে ঈমানের তেজে বলিয়ান হয়ে সত্যের পক্ষে অবস্থান নেয়ার। বর্তমান প্রেক্ষাপটে সঙ্ঘবদ্ধ অমুসলিম শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে মুসলমানদের তুচ্ছ মনে হয়। আমাদের মাঝে অনেকে আশা হারিয়ে ফেলি এই ভেবে যে, আমাদের পক্ষে কোনোদিনও ওদের বিরুদ্ধে জেতা সম্ভব নয়। বিশাল বাহিনী, সেরা অস্ত্র, সর্বাধুনিক প্রযুক্তি এবং সারা পৃথিবীর অর্থনীতি ওদের দখলে। এদিকে মুসলিমরা বড়ই একা, বিভক্ত, প্রযুক্তিতে একেবারেই পিছিয়ে, অর্থনীতিতে দুর্বল, সারা পৃথিবীতে অপমানিত, ঘৃণিত। এ কারণে আজ বহু মুসলিমদের ঈমানও দুর্বল হয়ে গেছে। ঈমানের এই দুর্বলতা থেকেই তারা নিজেদের উপর অন্যায় হলে, এমনকি আক্রমণ হলেও প্রতিবাদ, প্রতিরোধ করা অনেকক্ষেত্রে আত্মহত্যার সামিল বলে মনে হয় তাদের কাছে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করাটা সময় নষ্ট মনে হয়। অথচ আল্লাহ বলেছেন, “আল্লাহর হুকুমে বহু ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র দল বৃহৎ দলের উপর জয়যুক্ত হয়েছে’। আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন। ” (সূরা বাকারা ২৪৯) 

মনে রাখা উচিৎ, কারবালার প্রান্তরে ইমাম হোসাইন কুরআনের ওপর, আল্লাহর সাহায্যের ওপর ভরসা রেখেছিলেন, পরিণতিতে নয়। আমাদেও জন্য কারবালা থেকে শিক্ষণীয় ও করণীয় বিষয় হলো, অন্যায় ও অসত্যের বিরুদ্ধে সংগ্রামীদের সামনে প্রতিপক্ষের তরফ থেকে কোনো সময় অর্থ, বিত্ত ও সম্মানের লোভনীয় প্রস্তাব এলেও ঘৃণাভরে তা প্রত্যাখ্যান করে আপোষহীন মনোভাবের মাধ্যমে ত্যাগের চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করা। যা করে গিয়ে এই বাংলাদেশের জমিনেই দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন আমাদের শহীদ নেতৃবৃন্দ। গত ১০ জুনের সমাবেশ প্রমান করে তাঁরা শহীদ হয়ে ভুল করেননি বরং এই জমিনে তাদের রক্ত প্রশস্ত করেছে ইসলামী আন্দোলনের ভিত্তিকে। সত্য ও ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত কারবালার প্রান্তরে প্রতারিত, নির্মম নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হোসাইনি কাফেলা চিরস্মরণীয় ও বরণীয়। প্রতিটি মহররম ও প্রতিটি আশুরা আমাদের সত্য ও ন্যায়ের ওপর দৃঢ়পদ থাকার মাহাত্ম্য স্মরণ করিয়ে দেয়। জীবনের ব্রত, ত্যাগের শিক্ষা, আত্মমর্যাদাবোধ জাগ্রত করে; ভয়কে জয় করে, নিজের জীবন উৎসর্গ করে, পরবর্তী প্রজন্মের জন্য সহজ পথ ও সুন্দর সমাজ বিনির্মানের প্রেরণা যোগায়। আসলে কারবালার ময়দান আমাদের এ মহান শিক্ষা দিয়েছে যে সত্যের শির কখনো অবনত হতে জানে না।

বস্তুত, কারবালা ছিল মিথ্যার বিরুদ্ধে সত্যের সংগ্রাম, স্বৈরতন্ত্র ও এক নায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে সাধারণতন্ত্রের লড়াই। ন্যায্য অধিকার ছিনিয়ে নেয়ার সংগ্রাম। ইসলামের আপোষহীন সুমহান আদর্শকে সমুন্নত রাখার প্রত্যয়ে জীবন বিসর্জন দিয়েছিলেন হযরত ইমাম হোসাইন (রা.); কিন্তু আপোষ করেননি স্বৈরতন্ত্রের সঙ্গে। নিজের জীবনের চেয়ে সত্যের শ্রেষ্ঠত্ব রক্ষার জন্য নবী-দৌহিত্রের জীবন দেয়ার এই ঘটনা পৃথিবীর ইতিহাসে বেঁচে থেকে আজো অমলিন হয়ে আছে। সত্যের চিরবিজয় ও মিথ্যার চির পরাজয়ের দিন কারবালার মহিমান্বিত এই দিন, তাই এদিন আমাদেও মুসলিম উম্মাহর শুধু শোকের নয়, বরং তা শক্তির দিনও বটে। এর মধ্যে সুপ্ত রয়েছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর জন্য কঠিন শপথ নেওয়ার সুদৃঢ় আকাক্সক্ষা। স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে, অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের সংগ্রামী চেতনা নিয়ে হোক ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য আজীবন লড়াই। প্রয়োজনে ইমাম হোসাইনের (রা.) মত আত্মত্যাগ, এটাই মহররমের অন্তর্নিহিত শিক্ষা। আল্লাহ আমাদের সে শিক্ষা অর্জনের মাধ্যমে দ্বীন-দুনিয়ায় কামিয়াবি দিন। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের মোহররম কবিতার কয়েকটি লাইন দিয়ে লেখাটির ইতি টানছি-

“কত মোর্হ‌রম্ এল্ গেল চলে বহু কাল-

ভুলিনি গো আজো সেই শহীদের লোহু লাল!

মুস্‌লিম্! তোরা আজ জয়নাল আবেদিন,

‘ওয়া হোসেনা-ওয়া হোসেনা’ কেঁদে তাই যাবে দিন!

ফিরে এল আজ সেই মোর্হ‌রম মাহিনা,-

ত্যাগ চাই, মর্সিয়া-ক্রন্দন চাহি না!

উষ্ণীষ কোরানের, হাতে তেগ্ আরবির,

দুনিয়াতে নত নয় মুস্‌লিম কারো শির;-

তবে শোনো ঐ শোনো বাজে কোথা দামামা,

শম্‌শের হাতে নাও, বাঁধো শিরে আমামা!

বেজেছে নাকাড়া, হাঁকে নকিবের তূর্য,

হুশিয়ার ইস্‌লাম, ডুবে তব সূর্য!

জাগো ওঠো মুস্‌লিম, হাঁকো হাইদরি হাঁক।

শহীদের দিনে সব-লালে-লাল হয়ে যাক!”


লেখক: সহকারী সম্পাদক, সপ্তাহিক সোনার বাংলা

আপনার মন্তব্য লিখুন

কপিরাইট © বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির