জিহবা ও ভাষার নিয়ন্ত্রণ -আব্দুদ্দাইয়ান মুহাম্মদ ইউনুছ

(গত সংখ্যার পর)

জবানের হেফাজতে কতিপয় করণীয়

বাকসংযম করা ও কথা বলার সময় সাবধানতা অবলম্বন করা: হযরত বেলাল বিন হারেস রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, মানুষ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এমন কথা বলে যার কল্যাণের কথা সে ধারণাই করতে পারে না অথচ কিয়ামত পর্যন্ত তার দরুন তার সন্তুষ্টি লিপিবদ্ধ করে দেন। আবার মানুষ আল্লাহর অসন্তুষ্টির এমনও কথা বলে যার অকল্যাণের কথা সে ধারণাই করতে পারে না। অথচ তার দরুন কিয়ামত পর্যন্ত তার অসন্তুষ্টি লিপিবদ্ধ করে দেন- মুয়াত্তা মালেক।

মিষ্টভাষী হওয়া : হযরত আলী রা. রাসূল সা. থেকে বর্ণনা করেন যে আল্লাহর রাসূল বলেছেন নিশ্চয়ই জান্নাতে বালাখানা থাকবে যার ভিতরের সব কিছু বাহির থেকে দেখা যাবে। একজন বেদুঈন দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করল ঐ বালাখানা কাদের জন্য হবে? আল্লাহর রাসূল জবাবে বললেন যারা মিষ্টভাষী হবে, অভাবীদের আহার দেবে ও রাতের গভীরে নামায পড়বে- তিরমিজি। আমাদের সকলের সাথে মিষ্টি ভাষায় কথা বলতে হবে। স্বামী-স্ত্রী, ভাই-বোন, ছেলে-মেয়ে, আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী, পরিচিত অপরিচিত, নেতা-কর্মী, শাসক-শাসিত সকলেই পরস্পরের সাথে মিষ্টি ভাষায় কথা বলে আমরা সদকার সাওয়াব অর্জন করতে পারি। আবু হুরাইরা রা. বলেন, নবী করিম সা. বলেছেন, মানুষের প্রত্যেক সংযোগস্থলের উপর প্রত্যেক দিন সদকা ওয়াজিব হয়। তবে দুজনের মধ্যে ইনসাফ করা দরকার। কোনো ব্যক্তিকে তার সওয়ারির উপর উঠিয়ে দেয়া কিংবা তার মালপত্র তুলে দেয়ার ক্ষেত্রে সাহায্য করা সদকা। ভালো কথা বলা সদকা। নামাযের জন্য যত কদম চলবে প্রত্যেক কদমে সদকা। আর রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেয়াও সদকা- বুখারি।
সর্বদা সত্য কথা বলা : আল্লাহর রাসূল বলেন, সদা সত্য বল। কেননা সত্য ভালো কাজের পথে পরিচালিত করে। আর ভালো কাজ জান্নাতে নিয়ে যায়। যে ব্যক্তি সত্য বলতে থাকে এবং সত্যবাদিতার চেষ্টায় থাকে একপর্যায়ে আল্লাহর খাতায় সিদ্দিক (চির সত্যবাদী) নামে লিপিবদ্ধ হয়ে যায়- মুসলিম।

জিহবাকে আল্লাহর যিকিরে ব্যস্ত রাখা : এক সাহাবা রাসূল সা.-এর কাছে জিজ্ঞাসা করলেন ইসলামের বিধানতো অনেক। আমাকে এমন একটি আমলের কথা বলে দিন যা আমি গুরুত্বের সাথে পালন করব। আল্লাহর রাসূল বললেন তোমার জবান যেন সদা আল্লাহর যিকির দ্বারা সতেজ থাকে- তিরমিজি।

ভালো কথা বলা অথবা চুপ থাকা : হযরত আবু হুরায়রা রা. বলেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিবসের প্রতি ঈমান রাখে সে যেন ভালো কথা বলে অথবা চুপ থাকে- বুখারি ও মুসলিম। চুপ থাকাতে অনেক ফজিলত রয়েছে। চুপ থাকলে মেজাজ সংযত থাকে; অন্তরে আল্লাহর ভয়-ভীতি থাকে; যিকির ও ইবাদতের জন্য সময় মিলে। আর বেশি কথা বলার মাঝে নানা রকম বিপদ রয়েছে: কথা বেশি বলার কারণে ভুল বেশি হয়। মিথ্যা, গিবত, চোগলখুরি, পরনিন্দা, রিয়া, কপটতা, নির্লজ্জতা, কথা-কাটাকাটি, বাড়িয়ে কথা বলা, অপরকে কষ্ট দেয়া, অন্যের গোপন কথা ফাঁস করে দেয়ার অপরাধ সংঘটিত হয়। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে দুটো কান আর একটি মুখ দিয়েছেন। এর অর্থ হচ্ছে আমরা বেশি শুনতে হবে। আর বলতে হবে কম। অনেক মানুষ সব সময় বেশি কথা বলতে অভ্যস্ত। কিন্তু প্রয়োজনের আলোকে কথা বলা দোষণীয় নয়। আমাদেরকে তিন অবস্থার যে কোনো এক অবস্থায় জিহবাকে রাখতে হবে: ১. সৎ কাজের আদেশ বা অসৎ কাজের নিষেধ ২. আল্লাহর যিকির ৩. চুপ থাকা।

কথা বলার ক্ষেত্রে ন¤্রতা বজায় রাখা : জিহবা একটি নরম গোস্তের টুকরা। কথা বলার সময় ন¤্রভাবে বলা উচিত। হযরত আয়েশা রা. বলেন, একবার একদল ইয়াহুদি আল্লাহর রাসূলের কাছে এসে বলল ‘আসসামু আলাইকুম’ অর্থাৎ তোমার মরণ হোক। আয়েশা রা. বললেন, তোমাদের উপর আল্লাহর লানত ও গজব পড়–ক। তখন নবী করিম সা. বললেন হে আয়েশা একটু থাম। ন¤্রতা অবলম্বন করা তোমাদের কর্তব্য। রুঢ়তা ও অশালীনতা বর্জন কর। আয়েশা বললেন তারা যা বলেছে আপনি কি তা শোনেননি। তিনি বললেন আমি যা বললাম তুমি কি তা শোননি। কথাটি তাদের উপরই ফিরিয়ে দিয়েছি। সুতরাং তাদের ব্যাপারে আমার কথা কবুল হবে। আর আমার সম্পর্কে তাদের কথা কবুল হবে না- বুখারি।

সান্ত¡নার বাণী শোনানো : আমাদের সমাজে অনেক মানুষ আছে নানা সমস্যায় জর্জরিত। যেমন বর্তমানে কোভিড-১৯ এই বৈশ্বিক মহামারী চলছে। অনেক মানুষ অসহায় অবস্থায় রয়েছে। তাদের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করা দরকার। শুধু হতাশা নয় মানুষের মাঝে সান্ত¡নার বাণী ছড়িয়ে দেয়া নেকির কাজ। রাসূল সা. বলেছেন যদি কোনো ব্যক্তি এমন নারীকে সান্ত¡নার বাক্য বলে যার ছেলে নিখোঁজ হয়ে গেছে বা মারা গেছে তাহলে আল্লাহ তায়ালা ঐ সান্ত¡নাদানকারীকে জান্নাতে মূল্যবান জামাজোড়া পরিধান করাবেন। কোনো ব্যক্তি পথ চিনছে না আমরা যদি তাকে পথ দেখাতে সাহায্য করি এটাও নেকির কাজ। কোন ব্যক্তি দুঃখ কষ্টের মাঝে থাকলে তাকে সান্ত¡না দিলে বা তার পেরেশানি দূর করার জন্য পরামর্শ দিলে সাওয়াব মিলে।

জিহবা দ্বারা দ্বীনি শিক্ষা দেয়া : জবান দ্বারা কাউকে যদি দ্বীনি শিক্ষা দেয়া হয় তাহলে অনেক নেকি অর্জন হবে। যেমন কেউ কুরআন পড়তে পারে না। তাকে কুরআন শিক্ষা দেয়া। কেউ ভুলভাবে নামায পড়ে। তাকে নামাযের সঠিক নিয়ম শিক্ষা দেয়া। জিহবার সামান্য নড়াচড়ায় যদি কারো নামায সহিহ হয়ে যায় এর চেয়ে আনন্দের আর কী আছে?

আল্লাহ অসন্তুষ্ট এমন কথা না বলা : হযরত আবু হুরাইরা বলেন রাসূল সা. বলেছেন, যদি তোমার কোনো বিপদ আসে তাহলে এরূপ বলোনা যদি আমি এরূপ করতাম তাহলে এরূপ হতো। বরং তুমি বল আল্লাহই তাকদিরে লিখেছেন। আর তিনি যা চান তা করেন। কারণ যদি শব্দটি শয়তানের কাজ চালু করে দেয়া- মুসলিম।

বৈরী পরিবেশেও ইনসাফের কথা বলা: আবু সাঈদ খুদরী রা. বলেন, আল্লাহর রাসূল সা. বলেছেন, স্বৈরাচারী শাসকের সামনে ন্যায় ও ইনসাফের কথা বলা উত্তম জিহাদ- তিরমিজি।

অধীনস্থ বা চাকরের সাথে ব্যবহার : আনাস রা. বলেন, কোনো পশমি ও রেশমি কাপড়কেও আমি রাসূল সা. এর হাতের তালুর চেয়ে অধিকতর নরম ও মোলায়েম মনে করি না। কোন সুগন্ধিকেও আমি রাসূল সা.-এর শরীরের সুগন্ধির চেয়ে অধিকতর সুগন্ধি পাইনি। আমি দীর্ঘ দশ বছর তাঁর খেদমতে ছিলাম। কিন্তু কখনও তিনি আমার প্রতি উহ শব্দ উচ্চারণ করেননি। আমার কৃত কোনো কাজের জন্য বলেননি যে, কেন তুমি এটা করলে? আর কোনো কাজ না করার জন্য বলেননি কেন তুমি করলে না?- বুখারি।

সুসংবাদ ও মুবারকবাদ দেয়া মুস্তাহাব: আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, অতএব সুসংবাদ দাও আমার বান্দাদের যারা মনোযোগ সহকারে কথা শোনে এবং যা ভালো তা গ্রহণ করে- (সূরা যুমার : ১৭-১৮)। কেউ কোন ভালো কাজ করলে তার জন্য তাকে মুবারকবাদ দেয়া বা কাউকে কোনো সুসংবাদ পৌঁছানো মুস্তাহাব।

অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে গিয়ে দুআ করা : হযরত আয়েশা রা. বলেন, নবী করিম সা. নিজের পরিবারের কোনো রোগীকে দেখতে গেলে তার উপর ডান হাত বুলিয়ে বলতেন হে আল্লাহ মানুষের প্রভু। রোগ দূরকারী রোগমুক্তি দান কর। তুমিই রোগমুক্তি দানকারী। তোমার রোগমুক্তি ছাড়া কোনো রোগমুক্তি কার্যকর নয় যা কোনো রোগকে ছাড়ে- বুখারি। সাদ ইবন আবি ওয়াক্কাস বলেন, যখন আমি অসুস্থ ছিলাম তখন আল্লাহর রাসূল আমাকে দেখতে এলেন এবং বললেন হে আল্লাহ সাদকে রোগ মুক্তি দান কর। হে আল্লাহ সাদকে রোগমুক্তি দান কর। হে আল্লাহ সাদকে রোগমুক্তি দান কর- মুসলিম।

কথা বলা প্রসঙ্গে আল কুরআনে বর্ণিত
কতিপয় পরিভাষা

সঠিক কথা বলা (কাওলান সাদিদা) : আল্লাহ তায়ালা কুরআনে সঠিক কথা বলতে নির্দেশ দিয়ে ইরশাদ করেন, হে মুমিনগণ তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সঠিক কথা বল। তাহলে আল্লাহ তোমাদের কার্যক্রমসমূহ সংশোধন করবেন এবং তোমাদের অপরাধসমূহ ক্ষমা করবেন। আর যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে তারা অবশ্যই মহাসফলতা লাভ করবে। (সূরা আহযাব : ৭০-৭১)

শিষ্টাচারপুর্ণ কথা বলা (কাওলান কারিমা) : আল্লাহ বলেন, তোমার পালনকর্তা আদেশ করেছেন যে, তাঁকে ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করোনা এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার কর। তাদের মধ্যে কেউ অথবা উভয়েই যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হয় তবে তাদের উহ শব্দটিও বলোনা এবং তাদেরকে ধমক দিওনা। তাদেরকে শিষ্টাচারপূর্ণ কথা বল। (সূরা বনি ইসরাঈল : ২৩)

সহজভাবে কথা বলা (কাওলান মায়সুরা) : আল্লাহ বলেন, তোমার পালনকর্তার করুণার প্রত্যাশায় অপেক্ষমাণ থাকাকালে যদি কোন সময় তাদেরকে বিমুখ করতে হয় তাদের সাথে ন¤্রভাবে কথা বল। (সূরা বনি ইসরাঈল : ২৮)

ন¤্রভাবে কথা বলা (কাওলান লায়্যিনা) : আল্লাহ বলেন, তোমরা উভয়েই ফেরাউনের কাছে যাও সে উদ্ধত হয়েছে। অতঃপর তোমরা তাকে ন¤্র কথা বল। হয়ত সে চিন্তা ভাবনা করবে অথবা ভীত হবে। (সূরা ত্বাহা : ৪৩-৪৪)

শরিয়তসম্মত কথা বলা (কাওলান মারুফা) : আর যদি তোমরা আকার ইঙ্গিতে সেই নারীর বিবাহের পয়গাম দাও কিংবা নিজেদের মনে গোপন রাখ তবে তাতেও তোমাদের কোনো দোষ নাই আল্লাহ জানেন যে তোমরা অবশ্যই সেই নারীদের কথা উল্লেখ করবে। কিন্তু তাদের সাথে বিয়ে করার গোপন প্রতিশ্রুতি দিয়ে রেখো না। অবশ্য শরিয়ত নির্ধারিত প্রথা অনুযায়ী কোনো কথা সাব্যস্ত করে নিবে। (সূরা বাকারা : ২৩৫) আর যে সম্পদ আল্লাহ তায়ালা তোমাদের জীবন যাত্রার অবলম্বন করেছেন তা অর্বাচীনদের হাতে তুলে দিওনা। বরং তা থেকে তাদেরকে খাওয়াও পরাও এবং তাদেরকে সান্ত¡Íনার বাণী শোনাও। (সূরা নিসা : ৫) অন্যত্র বলেন, এবং সম্পত্তি বণ্টনের সময় আত্মীয় স্বজন, ইয়াতিম ও মিসকিন উপস্থিত হয় তখন তা থেকে তাদের কিছুই খাইয়ে দাও এবং তাদের সাথে কিছু সদালাপ কর। (সূরা নিসা : ৮)

উপদেশপূর্ণ কল্যাণকর কথা বলা (কাওলান বালিগা) : এরা হল সেই সমস্ত লোক যাদের মনের গোপন বিষয় সম্পর্কেও আল্লাহ তায়ালা অবগত। অতএব আপনি তাদেরকে উপেক্ষা করুন এবং ওদেরকে সদুপদেশ দিয়ে এমন কোন কথা বলুন যা তাদের জন্য কল্যাণকর। (সূরা নিসা : ৬৩)।

গুরুতর কথা (কাওলান আযিমা) : তোমাদের পালনকর্তা কি তোমাদের জন্য পুত্রসন্তান নির্ধারিত করেছেন এবং নিজের জন্য ফেরেশতাদেরকে কন্যারূপে গ্রহণ করেছেন। নিশ্চয়ই তোমরা গুরুতর গর্হিত কথা বলছ। (সূরা বনি ইসরাঈল : ৪০)।

গুরুত্বপূর্ণ বাণী (কাওলান সাকিলা) : আমি আপনার প্রতি অবতীর্ণ করেছি গুরুত্বপূর্ণ বাণী। (সূরা মুযযাম্মিল : ৫) এই আয়াতে ভারী কালাম বলে কুরআন বুঝানো হয়েছে। কেননা কুরআন বর্ণিত হালাল হারাম, জায়েয-নাজায়েয এর সীমা স্থায়ীভাবে মেনে চলা স্বাভাবিকভাবে ভারী ও কঠিন। তবে যার জন্য আল্লাহ তায়ালা সহজ করে দেন তার কথা স্বতন্ত্র। কুরআনকে ভারী বলার আরেক কারণ এই যে, কুরআন নাযিল হওয়ার সময় রাসূল সা. বিশেষ ওজন অনুভব করতেন ফলে প্রচণ্ড শীতেও তাঁর মস্তক ঘর্মাক্ত হয়ে যেতো। তিনি তখন কোনো উটের উপর সওয়ার থাকলে বোঝার কারণে উট নুয়ে পড়ত। বুখারি।

কুরআনে কথা বলার কতিপয় নির্দেশনা
– কথাবার্তায় কর্কশ হবেন না- ০৩.১৫৯
– লোকদের সাথে ধীরস্থিরভাবে শান্তভাবে কথা বলুন- ২০:৪৪
– উচ্চস্বরে কথা বলবেন না- ৩১:১৯
– অন্যকে উপহাস করবেন না- ৪৯:১১
– পিতা-মাতার প্রতি সম্মানজনক কথা বলুন-১৭:২৩
– সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশ্রিত করবেন না- ২:৪২
– কাউকে খোঁটা দিয়ে কথা বলবেন না-২:২৬৪
– কাউকে গালাগাল করবেন না- ২:৬০
– বিভক্তি উসকে দিবেন না- ৩:১০৩
– প্রতারণার পক্ষে ওকালতি করবেন না- ৪:১০৫
– অন্য ধর্মের দেব-দেবীর প্রতি অবমাননা করবেন না- ৬:১০৮
– মানুষকে আল্লাহর পথে আহবান করুন হিকমা ও উত্তমভাবে- ১৬:১২৫

জিহবা সংরক্ষণে কতিপয় পরামর্শ
যখন কোনো কথা বলার প্রয়োজন হবে তখন চিন্তা করতে হবে এই কথাতে দ্বীনের কোনো উপকার ও কল্যাণ আশা করা যায় কিনা? এই কথাতে তার জাগতিক কোনো ফায়দা আছে কিনা?
কথা বলার আগে ভাবা তারপর বলা। কারণ না ভেবে কথা বলার কারণে অনেক সময় লজ্জিত হতে হয়। অনেক সময় পারিবারিক বা সামাজিক সম্পর্ক নষ্ট হয়।
আমরা জীবনের অনেক বছর পার করেছি। অতীতে হয়ত জবানের হেফাজত সঠিকভাবে করতে পারি নাই। আজ থেকে জবানের হেফাজত করব এই ধরনের দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
মিথ্যা প্রপাগান্ডা না ছড়ানো। বিশেষভাবে ফেসবুকে বা পত্রিকায় কিছু দেখেই অনেকে যাছাই বাছাই না করা তা অন্যকে বলা শুরু করে দেন।
আমরা যা বলি তা আমল লেখক সম্মানিত ফেরেশতাগণ রেকর্ড করেন। (সূরা ইনফিতার : ১০-১১) হযরত হাসান বসরী ও কাতাদাহ বলেন ফেরেশতাগণ মানুষের প্রতিটি বাক্য রেকর্ড করেন। আর আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস বলেন কেবল সেই সব বাক্য লিখিত হয় যেগুলো সাওয়াব বা শাস্তিযোগ্য।
তরবারির আঘাতে কারো শরীরে ক্ষত হলে তা শুকিয়ে যায়। কিন্তু জিহবার আঘাতের ক্ষত সহজে শুকায়না। কারণ তরবারির আঘাত লাগে দেহে আর জিহবার আঘাত লাগে কলিজায়। তাই এমনভাবে কোনো কথা বলা উচিত নয় যা কারো হৃদয়ে আঘাত করে। কবি বলেন, বর্শার যখম শুকিয়ে যায় কিন্তু জবানের যখম শুকায়না। অতএব আমাদেরকে ভাবা দরকার আমি আমার মুখের ভাষা দ্বারা কাউকে কষ্ট দিয়েছি কিনা। যদি তা করে থাকি তার কাছে ক্ষমা চাওয়া প্রয়োজন। আর অনুমাননির্ভর কোনো কথা না বলে তথ্য যাচাই বাছাই করে কথা বলা বা তথ্য দেয়া দরকার। এই প্রসংগে আল্লাহ বলেন, যে বিষয়ে তোমার কোন জ্ঞান নাই সে বিষয়ে অনুমান করে কথা বলো না। কেননা কর্ণ চক্ষু হৃদয় ওদের প্রত্যেকের বিষয় কৈফিয়ত তলব করা হবে। (সূরা বনি ইসরাঈল : ৩৬)
জবানের সাথে সংশ্লিষ্ট সকল গুনাহ থেকে আমাদের সকলকে বিরত থাকার চেষ্টা করতে হবে। কারো নাম ব্যঙ্গ করা, বিদ্রƒপ করা, অশ্লীল কথা বলা, গালি দেয়া, পরনিন্দা করা, মিথ্যা অপবাদ দেয়া, চোগলখুরি করা, বিনাপ্রয়োজনে গোপনীয়তা ফাঁস করা, মুনাফেকি করা, হারাম বা নাজায়েজ জিনিস নিয়ে আলোচনা করে আনন্দ পাওয়া, গিবত করা, খারাপ উপনামে ডাকা, অভিশাপ দেওয়া, অযথা চিৎকার করে চেঁচামেচি করা, বেহুদা কথা বলা, মিথ্যা কথা বলা, অশ্লীল গান গাওয়া, কারো মুখোমখি প্রশংসা করা, আল্লাহ অসন্তুষ্ট হন এমন কথা না বলা, কেউ মারা গেলে উচ্চ স্বরে বিলাপ করা থেকে বিরত থাকা প্রয়োজন।
জবান বা জিহবা যেসব কারণে নিয়ন্ত্রণ রাখা সম্ভব হয়না তা চিহ্নিত করতে হবে। যেমন আমরা অধিক রাগের কারণে অনেক সময় মেজাজের ভারসাম্য রক্ষা করতে পারিনা। আবু হুরাইরা বলেন রাসূল সা. বলেছেন কুস্তিতে প্রতিপক্ষকে হারিয়ে জয় লাভ করাতে বীরত্ব নেই বরং ক্রোধ ও রাগের মুহূর্তে নিজেকে সংবরণ করতে পারাই প্রকৃত বীরত্বের লক্ষণ। জনৈক সাহাবা রাসূল সা. কে বললেন ইয়া রাসূলাল্লাহ আমাকে অসিয়ত করুন। আল্লাহর রাসূল বলেন লাতাগযাব-তুমি রাগ করোনা। এই কথা তিনি বারবার উল্লেখ করেন। রাগ নিয়ন্ত্রণ করা মুমিনের বৈশিষ্ট্য। (সূরা আলে ইমরান : ১৩৪) রাসূল সা. বলেন যে ব্যক্তি রাগ নিয়ন্ত্রণ করে অথচ সে তা বহিঃপ্রকাশ করতে সক্ষম। তাকে আল্লাহ তায়ালা যে কোন হুর নির্বাচন করার ইখতিয়ার দিবেন।
কারো অপরাধ ক্ষমা করা মহত্ত্বের লক্ষণ। কারো দুঃখ কষ্ট বা অন্যায় ক্ষমা করে দিলে তার সাথে খারাপ কথা বলার প্রশ্নই উঠে না। একজন মুমিন আরেকজন মুমিনকে হৃদয় থেকে ক্ষমা করে দেয়। (সূরা আলে ইমরান : ১৩৪)। হযরত উকবা ইবন আমের বলেন, রাসূল সা. বলেছেন হে উকবা আমি কি তোমাকে দুনিয়া ও আখেরাতবাসীর সর্বোত্তম বৈশিষ্ট্য বলব। (আর তা হলো) যে তোমার সাথে সম্পর্কছেদ করবে তুমি সম্পর্ক গড়বে; যে তোমাকে বঞ্চিত করেছে তুমি তাকে দান করবে; আর যে তোমার প্রতি যুলুম করেছে তুমি তাকে ক্ষমা করবে। আল্লাহ তায়ালা অন্যকে তার ভুলের জন্য ক্ষমা করতে বলেছেন। (৭ : ১৯৯) আবু হুরাইরা বলেন, রাসূল সা. এর কাছে জনৈক ব্যক্তি বলল ইয়া রাসূলাল্লাহ। আমার কিছু আত্মীয়স্বজন আছে আমি তাদের সাথে আত্মীয়তা রক্ষা করি কিন্তু তারা আমার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে। আমি তাদের সাথে ভালো ব্যবহার করি কিন্তু তারা আমার সাথে খারাপ আচরণ করে। আমি তাদের বেলায় সহ্য করি কিন্তু তারা আমার সাথে কুআচরণ করে। তখন তিনি বললেন যদি তুমি তোমার কথায় সত্যবাদী হয়ে থাক তাহলে তুমি যেন তাদের মুখে গরম ছাই প্রবেশ করাচ্ছ। আর আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন ফেরেশতা তোমার সাহায্যে রত থাকবে যতক্ষণ তুমি সে অবস্থার উপর থাকবে- মুসলিম।

প্রতিনিয়ত মুহাসাবা করা। আত্মপর্যালোচনা ও আত্মপর্যবেক্ষণ করা। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘তোমরা যেখানেই থাকনা কেন আল্লাহ তোমাদের সাথে আছেন?’ (সূরা হাদীদ : ৪) আল্লাহ তায়ালা চোখের ঘাতকতা ও মনের গোপন কথা জানেন। (সূরা গাফের : ১৯)। আমাদের সকল কথা রেকর্ড হচ্ছে। অতএব আমাদেরকে প্রতিনিয়ত আত্মপর্যালোচনা করা প্রয়োজন আমরা আমাদের মুখের ভাষা ও জিহবা দিয়ে কাউকে কষ্ট দিয়েছি কিনা? কারো প্রতি কটু কথা বলেছি কিনা? শরিয়তের সীমালংঘন হয়েছে কিনা? মূলত এইভাবে মাহে রমযানের সিয়াম সাধনা শুধু পানাহার ও যৌনসংগম থেকে বিরত থাকা সুবহে সাদেক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত বিরত থাকার নাম নয়। বরং দেহের রোযার সাথে সাথে চোখ, পেট ও জিহবার সিয়াম সাধনা যথাযথ করলেই প্রকৃত রোযা পালন হবে। মাগফিরাত, রহমত ও নাজাতের মাসে ঈমান ও ইহতিসাবের সাথে রোযা রেখেই আমাদেরকে জান্নাতের দরজা উন্মুক্ত করতে হয় আর দোজখের দরজা বন্ধ রাখতে হয়। প্রতি বছর মাহে রমযানের এই ট্রেনিং সারা বছর জাগরূক রাখতে পারলেই আমাদের দুনিয়ার জীবন শান্তিময় হবে আর আখিরাতে মিলবে নাজাত।
জিহবা বা ভাষা নিয়ন্ত্রণের জন্য নিজস্ব কোনো পন্থা অবলম্বন করা। হযরত আবু বকর একদিন স্বীয় জিহবা ধরে বসেছিলেন। লোকেরা জিজ্ঞাসা করলেন আপনি এমনটি করছেন কেন? তিনি জবাব দেন যে এই জবান আমাকে ধ্বংসের দিকে নিপতিত করছে এজন্য আমি এটাকে নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রয়াস চালাচ্ছি। আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ বলেন তাঁর কসম যিনি ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই। জিহবা ব্যতীত ভূপৃষ্ঠে আর কোনো বস্তু নাই যাকে দীর্ঘসময় কারারুদ্ধ করে রাখা প্রয়োজন। ইবনে উমর বলেন মুসলিমদের জন্য সবচেয়ে সংশোধনের অঙ্গ হলো তার জিহবা। ইমাম শাফেয়ী বলেন হে রাবী অনর্থক কথা বলোনা। কেননা তোমার বলে ফেলা কথার জন্য একদিন তোমাকে পাকড়াও করা হবে। উমর ইবন আব্দুল আজিজ বলেন হৃদয় হলো রহস্যের সিন্ধুক ওষ্ঠাধর হল তার তালা, আর জিহবা হলো তার চাবি। (সমাপ্ত)
লেখক : গবেষক ও প্রাবন্ধিক

SHARE

Leave a Reply